‘আল্লাহু আকবার’– আজান শুরুর চিরচেনা এই শব্দযুগল যেন এক সুতোয় গেঁথে নিল জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইফতার করতে আসা পাঁচ হাজারের বেশি মুসল্লিকে।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) মসজিদের মাইকে আজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হাজারও মুসল্লির এই সহাবস্থানে নেমে এল গভীর নিস্তব্ধতা। ইফতারের দোয়া পড়ে সবাই ইফতার মুখে নিতে শুরু করলেন।
মুহূর্তেই ভাঙলো নীরবতা। ‘আসেন ভাই’, ‘বসেন ভাই’, ‘পানি নেন ভাই’, ‘রোজা ভাঙেন ভাই’– এমন নানা শব্দ আসতে লাগল এদিক ওদিক থেকে। কারণ ইফতার শুরু হয়ে গেলেও মুসল্লিরা তখনো দলে দলে ঢুকছিলেন বায়তুল মোকাররমে। তাই দেখে এরই মধ্যে ইফতার শুরু করা মুসল্লিরা নতুন আসা মুসল্লিদের ডেকে তাদের সঙ্গে ইফতারে বসার অনুরোধ করতে থাকলেন।
এখানে ইফতার করতে আসা মুসল্লিদের কেউ একেক ডিশে (বড় থালা) ৫-৭ জন করে, আবার কেউ আলাদা আলাদা বাটিতে মুখোমুখি দীর্ঘ সারিতে বসে ইফতার করেন। তারা কেউ কারও চেনা-পরিচিত নন। সমবয়সীও নন। আবার আলাদা করে ছোট ছোট দলে বসেও কেউ ইফতার করেন। বোঝা যাচ্ছিল, তারা পরিচিত-বন্ধু-স্বজন। কোনো কোনো দলে নারী-পুরুষ একসঙ্গে ইফতার করেন।
তাদের একজন আবু হানিফ খবরের কাগজকে বললেন– আমি স্ত্রীসহ এসেছি এখানে ইফতার করতে। আমরা নিজেরা ইফতার নিয়ে এসে এখানে এক পাশে বসে ইফতার করেছি। কিন্তু এত মানুষের সঙ্গে বসে ইফতার করছি। এটার তো একটা বরকত আছে। এত মানুষের মধ্যে আল্লাহ কার দোয়া কবুল করে তো জানি না। তার উছিলায় আমরাও তো পুলসিরাত পার হয়ে যেতে পারি।
ইফতার শুরুর আগে সেলফি তুলছিলেন রাশেদুল ইসলাম। বললেন, আমি প্রতি রোজাতেই বায়তুল মোকাররমে এক-দুই বার ইফতার করি। সেলফি তুললাম। এত মানুষের সঙ্গে ইফতার করলাম। এটা একটা স্মৃতি আরকি। তাই ফেসবুকে দিয়ে রাখলাম।
একটি বেসরকারি গৃহায়ণ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন মো. ইসমাইল হোসেন। তিনি বললেন, আমার বাসা-অফিস মিরপুরে। আজ সরকারি ছুটির দিন, তাই এলাম। অন্যদিন তো আসার সুযোগ পাই না। আজ আল্লায় নসিবে রেখেছে, তাই এখানে হাজার হাজার মানুষের সঙ্গে ইফতার করতে পারলাম।
বায়তুল মোকাররমে ইফতারের বড় আয়োজন করে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ মুসল্লি কমিটি। কমিটির প্রেসিডেন্ট আবদুল গাফ্ফার বলেন, আমাদের আজকের আয়োজন দুই হাজার লোকের। আজ বন্ধের দিন, আগামীকাল অফিস খোলার দিন, তাই হয়তো মুসল্লি বেশি হবে। তাই আরও বেশি আয়োজন করতে হবে।
তিনি জানান, তারা প্রত্যেকের জন্য আলাদা বাটিতে ইফতারের ব্যবস্থা করেছেন। প্রতি বাটিতে রাখেন– খেজুর, ছোলা, মুড়ি, পেঁয়াজু, বেগুনি, জিলাপি, পুরি ও আলাদা এক বোতল করে পানি। প্রধানত ব্যবসায়ীদের উদ্যোগে এই আয়োজন করেন তারা। ঢাকায় অবস্থিত সৌদি অ্যামবাসিও তাদের সঙ্গে শরিক হয়েছে বলে জানান তিনি। এ ছাড়া যে কেউ এই আয়োজনে শরিক হতে পারবেন বলে তিনি জানান।
পর্দা দিয়ে পাশাপাশি সমপরিমাণ জায়গা জুড়ে ইফতার আয়োজন করেছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন। এখানে প্রতিটি ডিশে পাঁচ জনের জন্য ব্যবস্থা রাখা হয়। ডিশের পাশে পাঁচ বোতল করে খাবার পানিও রাখা হয়। প্রতিটি ডিশে ছিল ছোলা, মুড়ি, জিলাপি, খেজুর, পিঁয়াজু, আলুর চপ ও বেগুনি। এখানেও দুই হাজারের মতো মুসল্লির জন্য আয়োজন রাখা হয়। তবে ইফতার শুরু হয়ে যাওয়ার পরও মুসল্লি আসতে থাকা সাউন্ড সিস্টেমে আহ্বান জানানো হয় যে, আজ মুসল্লি বেশি এসেছেন, তাই প্রতি ডিশে যেন ৬-৭ জন করে বসেন।
এ ছাড়া আরেকটি আয়োজনের কোনো ব্যানার ছিল না। সেখানে যিনি নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তিনি জানান তার নাম পীর ফজলুল হক। এখানে ৬০০–৭০০ মানুষের ইফতারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তিনিও জানান, এখানেও ইফতার খরচ বাবদ যে কেউ শরিক হতে পারেন। এভাবে সংগ্রহ করা আর্থিক সহায়তা দিয়েই পুরো রমজান মাসে এই ইফতার আয়োজন করা হয়।
জানা গেছে, তাবলিগ জামায়াত থেকেও ইফতার আয়োজন করা হয় বায়তুল মোকাররমে। তবে গতকাল শনিবার সরকারি ছুটির দিন হওয়ায় এই আয়োজন বন্ধ ছিল।