রাজধানীর ব্যস্ততম বইপাড়া নীলক্ষেত বই মার্কেট। বছরের বারো মাসই এখানে বইয়ের ঘ্রাণ, ক্রেতাদের দরদাম আর বিক্রেতাদের ডাকাডাকি। রমজান এলেও সেই চেনা কোলাহল থেমে থাকে না। তবে দিনের শেষে, ইফতারের ঠিক আগে, এই ব্যস্ত বাজারে দেখা মেলে ইফতার তৈরির ব্যস্ততা।
গতকাল বৃহস্পতিবার, ঘড়িতে ইফতারের বাকি মিনিট দশ। কারও দোকানের শাটার অর্ধেক নামানো, কারও পুরোটা। ভেতরে চলছে ইফতারির শেষ মুহূর্তের তোড়জোড়। কেউ ফল কাটছেন, কেউ প্লেটে সাজাচ্ছেন বেগুনি-চপ, কেউবা শরবত গুলছেন বড় জগে। কে মালিক, কে কর্মচারী- বুঝে ওঠার উপায় নেই। সবাই যেন এক পরিবারের সদস্য, একই টেবিলে বসার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত।
ব্রাইট কালেকশনের কর্মচারী মো. সজীব রোজা রেখেও কাজ করে যাচ্ছেন। শরীরটা ভালো নয়, তবু জীবিকার তাগিদে দোকানে হাজির। রমজানের প্রতিদিনের রুটিনের অংশ হিসেবে তিনি শরবত বানাচ্ছেন। কাজের ফাঁকেই জানালেন, গড়ে জনপ্রতি ১০০ থেকে ১৫০ টাকা ইফতারের পেছনে খরচ করেন মালিক। আমরা আগে ঠিক করি কে কী খেতে চাই, তারপর সেই অনুযায়ী কেনা হয়।
পাশের দোকানের কর্মচারী মাকসুদ রানা খবরের কাগজকে বলেন, ‘ইফতারের সময় বাড়ি যাওয়ার সুযোগ থাকে না। তাই মালিক-কর্মচারী সবাই একসঙ্গে ইফতার করি। শুরুতে আলোচনা হয়-কী থাকবে মেনুতে। ফল, ভাজাপোড়া, শরবত সবই থাকে। এখানে ইফতারে কোনো ভেদাভেদ নেই। সবাই খেয়াল রাখে, কারও কিছু লাগবে কি না।’
আরাফাত বুক হাউসের আব্দুর রশিদ রিপন তখন ব্যস্ত পেঁয়াজ-টমেটো কাটায়। চোখেমুখে তাড়া, তবু কণ্ঠে তৃপ্তি। তিনি বলেন, ‘পুরো খরচটাই মালিক দেন। কখনো ১০০, কখনো ১২০ টাকা জনপ্রতি পড়ে। যা খেতে ইচ্ছে হয়, তাই আনি।’
ইফতারে মালিক-কর্মচারীর মধ্যে কোনো ভেদাভেদ থাকে না উল্লেখ করে দেশ পাবলিকেশন্সের মালিক জসিম উদ্দিন বলেন, ‘ইফতারির সময়ে সবারই কাজ করা উচিত; সে মালিক হোক বা কর্মচারী। আমরা কাজ ভাগাভাগি করে প্রতিদিন আয়োজন করি।’
এই আয়োজন শুধু দোকানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অনেক সময় বই কিনতে এসে ক্রেতারাও ইফতারে শামিল হন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেক সময় এমন হয়, কোনো ক্রেতা বই কিনতে এসে আটকে পড়েছেন, আজান হয়ে গেছে। তখন আমাদের সামান্য আয়োজনে আমরা তাদের বসতে বলি। তারাও বসে পড়েন।’
এদিকে আজানের ধ্বনি ভেসে এলে সজীব-রানা-রিপনের মতো সব দোকানের মালিক-কর্মচারীরা সবাই একসঙ্গে দোয়া করে ইফতার করেন। ক্ষণিকের এই মুহূর্তটিতে নেই কোনো প্রভু-ভৃত্যের সম্পর্ক, নেই পদমর্যাদার দূরত্ব। আছে শুধু সহমর্মিতা, ভাগাভাগি আর একসঙ্গে থাকার আনন্দ।