শনিবার রাত ৮টা। রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ের ফুটপাতে পাঁচ বছরের শিশু আলামিনের জন্য পাঞ্জাবি খুঁজছেন আজিমপুর এলাকার অটোরিকশাচালক আব্বাস উদ্দিন (৪৫)। ঈদ সামনে রেখে পরিবারের জন্য কেনাকাটায় ব্যস্ত তিনি। কী কী কিনলেন জানতে চাইলে আব্বাস উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমার বউয়ের জন্য একটু আগে নিউ মার্কেট থেকে একটা শাড়ি কিনেছি। এখন ছেলের জন্য পাঞ্জাবি দেখছি, এরপর মেয়ের জন্য জুতা কিনব। তারপর হাতে টাকা থাকলে নিজের জন্য একটা পাঞ্জাবি দেখব।’
মার্কেটে না গিয়ে ফুটপাতে কেনাকাটা কেন–এই প্রশ্নে তিনি মৃদু হাসলেন। বললেন, ‘এসব খোলা দোকানে জিনিসের দাম তুলনামূলক কম। আমি নিম্ন আয়ের মানুষ। জিনিসপত্রের যে দাম, সংসারের খরচ চালাতেই কষ্ট হয়। মার্কেটে গিয়ে কেনার সামর্থ্য কই? তাই প্রতি ঈদেই ফুটপাত থেকেই পরিবারের জন্য কিছু কিনি। এবারও কিনছি। তবে এবার দামে পেরে উঠছি না। তার পরও সাধ্যের মধ্যে পরিবারের ঈদের খুশি কেনার চেষ্টা করছি।’
ঈদুল ফিতর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এমন দৃশ্য এখন নিত্যদিনের।
এলিফ্যান্ট রোড, ঢাকা কলেজ রোড এবং নিউ মার্কেট এলাকার ফুটপাতজুড়ে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে জমে উঠছে কেনাকাটা। সারি সারি অস্থায়ী দোকানে ঝুলছে পাঞ্জাবি, শার্ট, টি-শার্ট, প্যান্ট, শিশুদের পোশাক ও নানা ধরনের জুতা-স্যান্ডেল। দোকানগুলোতে ক্রেতাদের ভিড়ও চোখে পড়ার মতো। ভিড় এমন যে ফুটপাত দিয়ে কারও হেঁটে চলার অবস্থা পর্যন্ত নেই। অনেকেই পরিবারের সদস্যদের জন্য একসঙ্গে কয়েকটি পোশাক কিনছেন। শপিংমলের তুলনায় অনেক কম দামে পোশাক পাওয়ায় নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই এখন ফুটপাতের এই বাজারের দিকে ঝুঁকছেন।
রাজধানীর গুলিস্তান ও গোলাপ শাহ মাজার এলাকায়ও ফুটপাতজুড়ে ঈদের কেনাকাটা চলছে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত। বিক্রেতারা হাঁকডাক দিয়ে ক্রেতাদের ডাকছেন, আর ক্রেতারাও দরদাম করে পোশাক কিনছেন। গুলিস্তানের ফুটপাতে ভ্যানগাড়িতে শার্ট বিক্রি করছেন আয়নাল। তার হ্যান্ড মাইকে বাজছে- ‘একদাম ২০০ টাকার শার্ট’। ক্রেতারা ভ্যান ঘিরে পছন্দের শার্ট বেছে নিচ্ছেন।
আয়নাল জানান, ঈদের সময়ই তাদের ব্যবসা সবচেয়ে ভালো হয়। প্রতিদিন ২০০টি শার্ট বিক্রির টার্গেট থাকে। ইফতারের পর বেচাকেনা আরও বাড়ে।
রাজধানীর বাণিজ্যিক কেন্দ্র শাপলা চত্বর থেকে বক চত্বর পর্যন্ত ফুটপাতেও এখন একই চিত্র। বিশেষ করে এখানে পাঞ্জাবি ও শার্টের দোকানে ভিড় বেশি। ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে পাঞ্জাবি। আর টি-শার্টের দাম ২০০ থেকে ৩৫০ টাকার মধ্যে।
বিক্রেতারা জানান, এসব পণ্যের বড় একটি অংশই তৈরি পোশাক কারখানার স্টক লট বা রিজেক্টেড পণ্য। স্টক লট বলতে সাধারণত বিদেশে রপ্তানির জন্য তৈরি হলেও অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে দেশে থেকে যাওয়া পোশাককে বোঝানো হয়। আর রিজেক্টেড পণ্য হলো সামান্য ত্রুটির কারণে বিদেশে পাঠানো হয়নি এমন পোশাক।
বক চত্বরের রোডে ফুটপাতের এক বিক্রেতা মালেক বলেন, ‘বড় গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি থেকে স্টক লট বা রিজেক্টেড পোশাক পাইকারি দামে কিনে আনি। মার্কেটের তুলনায় এখানে দাম অনেক কম। তাই গরিব মানুষ বেশি আসে। শপিংমলে যে শার্ট ২-৩ হাজার টাকা, এখানে সেটার মতো দেখতে স্টক লট শার্ট ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়।’
ক্রেতাদেরও একই অভিজ্ঞতা। মতিঝিল এলাকায় কেনাকাটা করতে আসা একটি বেসরকারি কোম্পানির কর্মচারী সাইফুল বলেন, ‘আমার যে আয় তা দিয়ে বড় শপিংমল থেকে সবাইকে ঈদের কাপড় কিনে দেওয়া সম্ভব না। তাই ফুটপাত থেকেই কিনি। কম দামে মোটামুটি ভালো পোশাক পাওয়া যায়।’
তবে ফুটপাতের এসব পণ্য নিয়ে অভিযোগও কম নয়। অনেক ক্রেতার অভিযোগ, কিছু পোশাক ধোয়ার পর রং উঠে যায় বা কাপড়ের মান ভালো থাকে না। তবু কম দামের কারণে অনেকেই ঝুঁকি নিয়েই এসব পোশাক কিনে থাকেন। এ ছাড়া দরদামও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেক দোকানে নির্দিষ্ট দাম থাকলেও বেশির ভাগ জায়গায় দরদাম করে পোশাক কেনা যায়। ক্রেতারা কয়েকটি দোকান ঘুরে দাম তুলনা করে তারপর সিদ্ধান্ত নেন।
ঈদ ঘিরে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার অলিগলির ফুটপাতে অস্থায়ী দোকানগুলোতে জমে উঠেছে পোশাকের বেচাকেনা। প্রতিদিনই রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এসব এলাকায় কেনাকাটার ভিড়ও বাড়ছে। অফিস শেষে অনেকেই পরিবার নিয়ে ফুটপাতে এসে কেনাকাটা করছেন। দোকানগুলোও রাত ১০টা থেকে ১১টা পর্যন্ত খোলা থাকে।
অন্যদিকে ফুটপাত দখল করে বসানো এসব দোকানের কারণে পথচারীদের চলাচলে কিছুটা ভোগান্তিও তৈরি হয়েছে। অনেক জায়গায় ফুটপাত সংকুচিত হয়ে পড়েছে। তবু ঈদের আনন্দে ক্রেতা-বিক্রেতা সবার মধ্যেই এখন উৎসবের আমেজ। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঈদের মৌসুম তাদের জন্য বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। অনেকেই সারা বছর অপেক্ষা করেন এই সময়টির জন্য। ঈদের আগে কয়েক সপ্তাহের ব্যবসাতেই তাদের বছরের বড় অংশের আয় হয়ে যায়।
সামর্থ্য কম হলেও ঈদে পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে নতুন পোশাক কিনতে চান সবাই। আর তাই রাজধানীর ফুটপাতজুড়ে এখন জমে উঠেছে ঈদের বেচাকেনা। অভিযোগ যতই থাক, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফুটপাতের এসব বাজারই হয়ে উঠেছে ঈদের কেনাকাটার প্রধান ভরসাস্থল।