বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও নদীভাঙনের কারণে আমাদের অর্থনীতি এবং জীবিকা সরাসরি হুমকির মুখে।
এ পরিস্থিতিতে সবুজ বাণিজ্য ও কম কার্বন রূপান্তর বাংলাদেশের জন্য কেবল পরিবেশগত প্রয়োজন নয়, অর্থনৈতিক টিকে থাকার শর্তও বটে। বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি খাত হলো রেডিমেড গার্মেন্টস (RMG), যা দেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮৪ শতাংশ। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।
Carbon Border Adjustment (CBAM) কার্যকর হলে, কার্বন-নিবিড় উৎপাদন পদ্ধতি আমাদের পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক চাপাতে পারে। এতে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হুমকির মুখে পড়বে। কম কার্বন উৎপাদনের জন্য আমাদের শিল্প খাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানি, জ্বালানি-দক্ষ যন্ত্রপাতি এবং আন্তর্জাতিক মানের সবুজ সার্টিফিকেশন প্রয়োজন।
গার্মেন্টস খাতে ইতোমধ্যেই কিছু সবুজ কারখানা গড়ে উঠেছে, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পাচ্ছে। তবে বৃহত্তর রূপান্তরের জন্য দরকার বহুজাতিক সহযোগিতা এবং জলবায়ু অর্থায়ন। বাংলাদেশের ৯০ শতাংশ পণ্য সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়।
২০২৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থার কার্বন-কর কার্যকর হলে, রপ্তানি ব্যয় বাড়বে এবং ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের প্রতিযোগিতা কমে যাবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ BIMSTEC I SAARC-এর মাধ্যমে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও নীতি প্রণয়ন করা সম্ভব হলে আঞ্চলিক সবুজ বাণিজ্য উদ্যোগে নেতৃত্ব দিতে পারে।
বাংলাদেশ এ বিষয়ে নিজেদের অনুকূলে কিছু করতে চাইলে আন্তর্জাতিক ফোরামে WTO, COP সম্মেলন, G20 সংলাপ সক্রিয়ভাবে জলবায়ু ন্যায়বিচার ও সবুজ অর্থায়নের দাবি তুলতে হবে।
যেমন- Loss and Damage Fund থেকে বিশেষ সহায়তা, সবুজ রূপান্তরের জন্য স্বল্প সুদের আন্তর্জাতিক ঋণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তর। বাংলাদেশের জন্য সবুজ বাণিজ্য ও জলবায়ুনীতি কেবল পরিবেশ সুরক্ষার নয়, বরং রপ্তানি বাজার রক্ষা ও অর্থনৈতিকভাবে টিকে থাকার বিষয়।
এ কথা সত্য যে, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি নানমুখী অনিশ্চয়তার মধ্যদিয়ে যাচ্ছে। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা, অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা, টানাপোড়েন এবং সুরক্ষাবাদী বাণিজ্যনীতির উত্থান বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে। তবে এসবের মধ্যেও রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। বিশেষ করে সবুজ সমাধান এবং কম কার্বন অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়া। তবে নীতিনির্ধারকদের অবশ্যই আফ্রিকা এবং গ্লোবাল সাউথজুড়ে কম কার্বন রূপান্তরকে সমর্থন করে এমন নতুন বাণিজ্য নিয়ম চালু করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে খারাপ প্রভাব প্রশমিত করার জন্য উচ্চাকাক্ষা এবং ন্যায়বিচারের সমন্বয় সাধন করারও প্রয়োজন রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াই এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে হলে এমন বাণিজ্যনীতি দরকার, যা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য সহায়ক হয়। এসব দেশ যেন সহজে সবুজ প্রযুক্তি পায়, বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য রপ্তানি করতে পারে- তা নিশ্চিত করতে হবে। এতে করে শক্তির ন্যায্য পরিবর্তন ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতিতে যাওয়াও সহজ হবে।
দুঃখের বিষয় হলো, আজকের অনেক বাণিজ্যনীতি উন্নয়নশীল দেশগুলোর সবুজ উচ্চাকাক্ষাকে সীমাবদ্ধ করে। বিশেষ করে, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকরণ, প্রধান শক্তি এবং উদীয়মান ব্লকগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ দ্বারা পরিচালিত। উদীয়মান প্রযুক্তিগুলোতে প্রবেশ সীমিত করার এবং বিদ্যমান শক্তি ভারসাম্যহীনতাকে শক্তিশালী করার হুমকি দেয়। যদি নিয়ন্ত্রণ না করা হয়, তাহলে এ প্রবণতা গ্লোবাল সাউথজুড়ে বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং আঞ্চলিক একত্রীকরণ প্রচেষ্টাকে দুর্বল করার ঝুঁকি তৈরি হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের কার্বন সীমান্ত সমন্বয় ব্যবস্থা একটি প্রধান উদাহরণ। যদিও Carbon Border Adjustment (CBAM) জলবায়ু কর্মকাণ্ড EU-কে বিশ্বব্যাপী প্রতিষ্ঠিত করার উদ্দেশ্যে তৈরি। অনেক উন্নয়নশীল দেশ, বিশেষ করে আফ্রিকায় এটিকে একটি সুরক্ষাবাদী পদক্ষেপ হিসেবে দেখে এবং ২০১৫ সালের প্যারিস জলবায়ু চুক্তির নীতির সঙ্গে এর সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এই উদ্বেগগুলো মোটামুটিভাবে প্রতিষ্ঠিত। গবেষণা থেকে জানা যায় যে, CBAM-এর প্রত্যক্ষ ফল হিসেবে আফ্রিকান দেশগুলো বার্ষিক ২৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি করতে পারে এবং প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো সর্বদা আফ্রিকান রপ্তানিকারকদের জন্য উপকারী নাও হতে পারে। অধিকন্তু, আফ্রিকান মহাদেশীয় মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল (AfCFTA) প্রতিষ্ঠা সত্ত্বেও, EU খণ্ডিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো অনুসরণ করে চলেছে যা আফ্রিকার একত্রীকরণ এজেন্ডাকে দুর্বল করে এবং আঞ্চলিক বাণিজ্য কৌশলগুলোর সমন্বয়কে দুর্বল করে।
আরও একটি উদাহরণ হলো- আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা (IMO) জাহাজ চলাচলের ওপর কার্বন নির্গমন কর চালুর যে পরিকল্পনা করেছে, তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। ২০২৮ সালে চালু হতে যাওয়া এই করের হার তুলনামূলকভাবে খুবই কম। অথচ, যদি এটি উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রস্তাব অনুযায়ী বেশি হতো, তবে তা জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য কম কার্বন অর্থনীতিতে রূপান্তর, অভিযোজন এবং সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বড় ধরনের সহায়তা দিতে পারত।
বিনিয়োগকারী-রাষ্ট্র বিরোধ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াগুলো কার্যকর জলবায়ু পদক্ষেপের ক্ষেত্রেও উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জ উপস্থাপন করে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত এ বিধানগুলো প্রায়শই আফ্রিকান সরকারগুলোর জনস্বার্থে আইন প্রণয়ন বা পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন এবং টেকসই উন্নয়নকে সমর্থন করে এমন বাণিজ্য ও বিনিয়োগনীতি বাস্তবায়নের ক্ষমতা সীমিত করে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন বিশেষজ্ঞরা ক্রমবর্ধমানভাবে বাণিজ্য এবং জলবায়ুনীতির মধ্যে সংযোগের ওপর মনোনিবেশ করেছেন। এটি জলবায়ু পরিবর্তনের একটি সম্পূর্ণ আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরও বাস্তববাদী পদ্ধতিতে স্থানান্তরের ইঙ্গিত দেয় যা জলবায়ু নীতিকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং বিনিয়োগের চালিকাশক্তি হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
একই সময়ে, বৈশ্বিক বাণিজ্য একটি গভীর রূপান্তরের মধ্যদিয়ে যাচ্ছে, কারণ প্রধান বাণিজ্য শক্তিগুলো বৈষম্যহীনতা এবং বহুপক্ষীয় সহযোগিতার দীর্ঘস্থায়ী প্রতিশ্রুতির চেয়ে ভূ-রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়, ফলে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ পটভূমিতে, উন্নত এবং উন্নয়নশীল অর্থনীতি উভয়ই তাদের জলবায়ু লক্ষ্যগুলোকে দেশীয় সবুজ শিল্প কৌশলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য আর্থিক উদ্দীপনা প্যাকেজ, ভর্তুকি এবং সুরক্ষাবাদী বাণিজ্য ব্যবস্থা প্রয়োগ করছে। যার লক্ষ্য তাদের অনুকূলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন করা। সবুজ শিল্পে প্রতিযোগিতামূলক অগ্রসরতা অর্জনের প্রতিযোগিতা আংশিকভাবে গত দশকে চীনের রাজস্ব সম্প্রসারণ, কৌশলগত ভর্তুকি এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও মূল সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত প্রভাবশালী অবস্থানের দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
প্যারিস চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বের প্রত্যাহার আন্তর্জাতিক আস্থা ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতায় আঘাত হেনেছিল, যা উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতির ওপর প্রশ্ন তোলে। তবুও, বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনার দ্বারও খুলে দিচ্ছে। ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উত্তেজনার মধ্যেও আফ্রিকা ও বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ন্যায্য ও জলবায়ু-সমন্বিত বাণিজ্যনীতির মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


