ডোনাল্ড ট্রাম্পের গাজাসংক্রান্ত প্রথম পরিকল্পনা দেখে ইউরোপীয় নেতারা সম্মিলিতভাবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিলেন। দুই বছর ধরে চলা লড়াইয়ের পর যুদ্ধবিরতি, ইসরায়েলি জিম্মি এবং ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি, গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনাদের আংশিক প্রত্যাহার এবং গাজা ভূখণ্ডে মানবিক প্রবেশাধিকার আশার সঞ্চার করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এসব ঘটনাকে ইউরোপ আবার গাজা সম্পর্কে নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হিসেবে দেখছে।
রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের প্রেক্ষাপটে ইউরোপ যে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, সেই তুলনায় তারা গাজার ক্ষেত্রে শুধু ভঙচঙ করে চলেছে। গাজার বিষয়ে তাদের মধ্যে ঐক্য নেই আর এই রাজনৈতিক বিভক্তির ফলে নীতিগত পক্ষাঘাত দেখা দিয়েছে। কিন্তু এভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে হাত কচলানোর চেয়ে ব্রাসেলসের ইউরোপীয় সরকার এবং ইইউ প্রতিষ্ঠানগুলো ইসরায়েলকে যুদ্ধাপরাধে জড়িত থাকার জন্য অভিযুক্ত করতে পারে। অথচ দেখা যাচ্ছে, তারা অপরাধী ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে অনিচ্ছুক। ইজরায়েলের সঙ্গে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং সামরিক সহযোগিতার সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করায় সাধারণ ইউরোপীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমাগত বেড়েছে। এর ফলে ইইউ সরকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের নাগরিকদের, বিশেষ করে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে।
পাঁচ বছর আগে ইউরোপীয় ইউনিয়ন জলবায়ু কর্মসূচির পক্ষে ছিল। তরুণ ইউরোপীয়রা এই দাবির প্রতি ভালোই সাড়া দিয়েছিলেন। এখন সেই একই তরুণ সমাজ গাজা নিয়ে তাদের নেতাদের নিষ্ক্রিয়তা দেখে হতবাক। দুই বছর ধরে চলা যুদ্ধ, যে যুদ্ধকে মনে করা হয় গণহত্যা; গত বছর স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে ও স্লোভেনিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর ফ্রান্স, ব্রিটেন, পর্তুগাল, বেলজিয়াম, লুক্সেমবার্গ ও মাল্টা রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আর কেবল গত মাসে ইউরোপীয় কমিশন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রথম নামকাওয়াস্তে কিছু শাস্তিমূলক ব্যবস্থার প্রস্তাব করে। এই শাস্তির আওতায় আনা হয়েছে ইসরায়েলের চরমপন্থি মন্ত্রী এবং বসতি স্থাপনকারী সহিংস ব্যক্তিদের। প্রস্তাবে ইইউ ব্যবসা-বাণিজ্যে ইসরায়েলের অগ্রাধিকার পাওয়ার সুবিধার বিষয়টিও স্থগিত করে। কিন্তু এই পদক্ষেপগুলোর কোনোটিই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি। প্রথম প্রস্তাবটির জন্য ২৭টি ইইউ সরকারের মধ্যে সর্বসম্মত চুক্তির প্রয়োজন রয়েছে। হাঙ্গেরি ও গ্রিসের মতো দেশগুলোর সোচ্চার সংখ্যালঘুদের তীব্র বিরোধিতার কারণে প্রস্তাবটি গ্রহণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। দ্বিতীয় প্রস্তাবটি প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের সমর্থনে পাস হয়ে যেতে পারে। কিন্তু জার্মানি ও ইতালির বিরোধিতার কারণে অর্থপূর্ণ এই পদক্ষেপটি মৃত দলিলে পরিণত হতে যাচ্ছে।
জুন মাসে ইইউ আবিষ্কার করে, ইসরায়েল ইইউ-ইসরায়েল অ্যাসোসিয়েশন চুক্তিতে থাকা মানবাধিকারের বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘন করেছে। কিন্তু গত সোমবার ইইউ পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের প্রধান কর্তাব্যক্তি কাজা ক্যালাস বাণিজ্য সুবিধা স্থগিতের বিষয়টি স্থগিত করে দেন। সম্ভবত আজ বৃহস্পতিবার ইইউর সরকারপ্রধানরা যখন একটা সম্মেলনে মিলিত হবেন, তখন সেটি গ্রহণ করতে পারেন। রাশিয়ার ওপর ইইউ আরোপিত ১৯টি নিষেধাজ্ঞা প্যাকেজের সঙ্গে এর স্পষ্ট বৈপরীত্য দেখা যাচ্ছে। ইউক্রেনের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র এবং আন্তর্জাতিক আইন রক্ষা করার জন্য ইউরোপ উঠেপড়ে লেগেছে। কিন্তু গাজার ক্ষেত্রে ইউরোপ বিশ্বের চোখে তার এই ভাবমূর্তি ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুরোপুরি হারিয়েছে।
এখন ট্রাম্পের পরিকল্পনা ইউরোপকে পালানোর পথ করে দিয়েছে। ইউরোপীয় সরকার এবং প্রতিষ্ঠানগুলো ওয়াশিংটনের দাবির সঙ্গে একাত্ম হতে পারে; যেমনটি তারা বেশ অস্বস্তির সঙ্গে করেছে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা এবং বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। ট্রাম্পের পরিকল্পনা তাদের মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির নতুন ভোরের ঘোষণা দেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। তারা এখন ইসরায়েলের জন্য মৃদু শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা থেকে মনোযোগ সরিয়ে মার্কিন পরিকল্পনাকে সমর্থন করতে পারে।
ইউরোপ এখন মনে হয়, দ্বিতীয়বার আমেরিকার সঙ্গে হাত মিলিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যের জায়গায় ফিরে যেতে সমর্থ হবে। বাস্তবিক পক্ষে আরব ও মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো গাজায় আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা হবে বলে আশা করছে। কিন্তু ইউরোপীয় সরকারগুলো শুধু মানবিক সহায়তা, পুনর্গঠন, শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন এবং সীমান্ত পর্যবেক্ষণ করার কথা ভাবছে। ইসরায়েলের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়টি প্রায় অদৃশ্য হয়ে গেছে। অধিকন্তু ইসরায়েল জোর দিয়ে বলছে, ইইউর প্রস্তাবিত শাস্তিমূলকব্যবস্থা প্রত্যাহার করা হলেই কেবল তারা গাজার পুনর্গঠনে ইউরোপীয়দের ভূমিকা পালনের জন্য উৎসাহিত করবে। ইউরোপ যখন এভাবে পশ্চাদপসারণ করছে, তখন ইসরায়েলের নেতারা ইউরোপের নিষ্ক্রিয় হয়ে যাওয়ার জন্য নিজেদের অভিনন্দিত করছে। এই হচ্ছে আসলে ইউরোপের খুব পরিচিত পিছিয়ে পড়া আচরণ।
এর সবই সহজে বোঝা যায়। ট্রাম্পের পরিকল্পনা সফল হওয়ার সম্ভাবনা যতই কম হোক, এটিই হচ্ছে একমাত্র পরিকল্পনা। অন্তর্নিহিত কোনো সমস্যার জন্য নয়, এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার সমস্যাটি অন্যত্র নিহিত রয়েছে। সেই কারণটি হলো যুক্তরাষ্ট্রই একমাত্র খেলোয়াড় ইসরায়েলি সরকারের সিদ্ধান্তকে যারা বদলে ফেলার জন্য প্রভাবিত করতে পারে। ফলে মার্কিন কূটনীতিকে সমর্থন করা ইউরোপীয়দের জন্য শুধু সুবিধাজনক নয়, যুক্তিসংগতও বটে।
তবে প্রথম পর্যায়ের পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা যতটা সহজ ছিল, এখন ততটা সহজ হবে না। অনেক বাধার মুখোমুখি হতে হবে। হামাস নিরস্ত্র না হলে গাজা থেকে ইসরায়েলিদের সম্পূর্ণভাবে সরে আসার সম্ভাবনা কম। কিন্তু ইসরায়েল গাজা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার না করলে হামাসও পুরোপুরি অস্ত্র ত্যাগ করবে না, অর্থাৎ নিরস্ত্র হবে না।
যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা হলো ফিলিস্তিনিদের স্বশাসনের দিকে নিয়ে যাওয়া। প্রথমে ফিলিস্তিনি টেকনোক্র্যাটরা ভূমিকা রাখবেন, পরে ‘রিফর্মড’ ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ থাকবে। কিন্তু এই সংস্কার হওয়া কর্তৃপক্ষের অর্থ যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, আরব দেশ এবং ফিলিস্তিনিদের কাছে এক নয়, একেবারেই ভিন্ন ভিন্ন। ইসরায়েল এই কর্তৃপক্ষকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে এবং ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ধারণাকে মেনে নেয়নি।
হামাসকে ধ্বংস করার লক্ষ্য থেকে ইসরায়েল বিচ্যুত হয়নি। তাদের অপরিবর্তিত লক্ষ্যের নির্মমতা দিন দিন বেশ স্পষ্ট হচ্ছে। সেই লক্ষ্য হচ্ছে হামাসকে ধ্বংস করা। এ কারণেই তারা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে বলা থেকে বিরত আছে। তারা যুদ্ধবিরতি পুরোপুরি মেনে চলছে না। যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইসরায়েল কয়েক ডজন ফিলিস্তিনি বেসামরিক নাগরিককে হত্যা করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপ ইসরায়েলের ওপর আরও বেশি চাপ প্রয়োগ না করলে ব্যাপক সহিংসতা আবার শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং সেটি ঘটলে গাজা ও পশ্চিম তীর ইসরায়েলের দখলেই থাকবে। সংক্ষেপে বললে, পরিকল্পনার অবশিষ্ট দিকগুলো আলোর মুখ দেখবে না।
এ কারণেই ইউরোপীয়রা ট্রাম্পের পরিকল্পনার প্রতি সমর্থন দিচ্ছে। ইসরায়েলের ওপর তাদের চাপকে আলাদা করে বা পরস্পরবিরোধী হিসেবে বিবেচনা করাটা ভুল হবে। এটি রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক হলেও কার্যত ভুল। এটা মনে করবার কোনো কারণ নেই যে, ইউরোপ শান্তি চাচ্ছে আর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ অব্যাহত রাখতে চায়।
ইইউ এবং এর সদস্য রাষ্ট্রগুলোর তাই এখনই ইসরাইলের ওপর থেকে শর্তসাপেক্ষ শাস্তির থাবাটা সরিয়ে নেওয়া কিংবা তাদের গৃহীত ভীতু পদক্ষেপগুলো পরিত্যাগ করা ঠিক হবে না। ইসরায়েলের ওপর অব্যাহতভাবে চাপ প্রয়োগ করে যাওয়াই হবে রাজনৈতিক বাধা অতিক্রম করার একমাত্র উপায়। যদি তা করা যায়, ইউরোপ তাহলে অবশেষে এই অঞ্চলের শান্তি প্রতিষ্ঠায় ছোট কিন্তু ইতিবাচক অবদান রাখতে পারবে।
লেখক: দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকার ইউরোপ বিষয়ের কলামিস্ট
গার্ডিয়ান থেকে অনুবাদ: মাসুদুজ্জামান
.jpg)
