নানা রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, অ্যাসোসিয়েশন, পরিষদ এবং জনগণের নানা অংশের বিপুল সংখ্যক প্রতিনিধি বর্তমান সরকারের নানাবিধ প্রশংসা ও সমালোচনার মধ্যদিয়ে একসময় এমন মনে হচ্ছিল যে, তেমন কোনো ইতিবাচক জাতীয় গুরুত্বের পরিবর্তন করার কাঠামোগত নতুন ব্যবস্থার রূপরেখা পাওয়ার আগেই হয়তো জাতি কেবল একটি নির্বাচনের দিকেই অগ্রসর হবে। প্রকৃতপক্ষে এ সরকারের সমর্থনে আগামীতে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত আনয়নের একটি দার্শনিক ওপরকাঠামো এখন জাতির কাছে ক্রমশই পরিস্ফুট হয়েছে। তা হলো এই যে, বিশেষ করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল তথা বিএনপি, এনসিপি, বামজোট, ইসলামি জোট এবং নানাবিধ নবসৃষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের দাবি ও সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থনে ও তত্ত্বাবধানে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন আগামী দিনের বাংলাদেশের আইনসভা, শাসনতন্ত্র, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ নীতিমালার খুঁটিনাটি বিষয়-সংবলিত একটি দার্শনিক ও আদর্শগত রূপরেখা প্রণয়ন করতে সমর্থ হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের ঐকান্তিক পরিশ্রম, মেধা এবং ছোট-বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরস্পরবিরোধী বিভিন্ন মত গ্রহণ করার সহনশীলতার সংস্কৃতি ছাড়া এটি অর্জিত হতো না। ফলে এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ ও অভিনন্দন না দিয়ে পারা যায় না। কারণ দেশে অনুমিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অন্তত ৬৯টি। এদের একটি বিপুল আসন পেয়ে তিনবার দেশ শাসনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ। অপর দলগুলো কোনো কোনোটি একান্ত নবীন। অন্যদিকে বাকি দলগুলোর আইনসভায় প্রতিনিধিত্ব ইতিহাসের ভিন্ন সময়ে দুই থেকে সর্বোচ্চ ১০টির মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। আদর্শগত দিক থেকে এরা পুঁজিবাদ, ইসলাম, শ্রমজীবীর সমানঅধিকার- এই মূল ধারায় পরস্পরবিরোধী অবস্থানে অধিষ্ঠিত। অন্যদিকে গত অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত দেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল এবং তাদের অন্যায় কর্মকাণ্ডের মদতদাতা অপর একটি মোটামুটি পরিচিত রাজনৈতিক দল এখন রাজনীতির মাঠ থেকে সমাজ ও রাষ্ট্র কর্তৃক বর্জিত। এ অবস্থায় এত বিশাল সংখ্যক প্রতিনিধি ও তাদের মতাদর্শ সংক্রান্ত লিখিত ও মৌখিক তথ্য নিয়ে এবং দীর্ঘদিন চা পানের আমন্ত্রণের মাধ্যমে সরাসরি আলোচনা করে ঐকমত্য কমিশন যে জুলাই সনদে পৌঁছাতে পেরেছে, তা তাদের দেশপ্রেমের পরিচায়ক। এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়েছে এ জন্য যে, কেবল বিশিষ্ট প্রাক্তন আমলা, শাসনতন্ত্র বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতিনিধি, আইনবিদ সবাই মিলে যে এ অনবদ্য ফসল উৎপাদন করেছেন তা নয়। এটির সর্বময় তত্ত্বাবধানে ছিলেন বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল জয়ী এ সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস। জনমতের কোনো অংশই বলতে পারবে না যে, এই জুলাই সনদের ব্যাপরে তাদের দেওয়া মতামত এ ঐকমত্য কমিশন সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করেছে। এটাও ঠিক প্রতিনিধিত্ব যত বৃহৎ হোক তাদের প্রদত্ত মতামতের শতকরা ১০০ ভাগই আবার গ্রহণ করা যায়নি। সে ক্ষেত্রেও প্রণীত সুপারিশের অংশ বিশেষে যে কোনো প্রতিনিধির দ্বিমত বা নোট অব ডিসেন্ট লিখিতভাবে রেকর্ড করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। ফলে এ সনদটি একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে বিতর্কের মাধ্যমে সর্বোচ্চ জনপ্রতিনিধিত্বমূলক দর্শন হিসেবে যেকোনো সমালোচকও অভিহিত করতে পারেন। কারণ জনজীবন তথা গভর্নেন্সের এমন কোনো দিক নেই যা নিয়ে অংশগ্রহণকারী এতে সুপারিশ করেননি। সংসদ নির্বাচনের পদ্ধতি, প্রধানমন্ত্রীর পদের স্থায়িত্ব, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মহামান্য রাষ্ট্রপতির অধিষ্ঠান ও ক্ষমতা যদি বর্তমান আইনের বাইরে আরও গণমুখী তথা প্রতিনিধিত্বমূলক করা যায়, তাহলে তাই হবে সংস্কারের নির্যাস। কারণ বলা হয়েছে যে, এমন ব্যবস্থারই সংস্কার করা দরকার যা কি না একনায়কতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের জন্মকে রুদ্ধ করে দিতে পারে। যাতে করে নাগরিকদের মধ্যে সম্পদ ও সম্মানের বণ্টন আরও সুষম হয়। এই সঙ্গে এসেছে পুলিশ, হিসাব ও নিরীক্ষা এবং আরও কিছু বিভাগের সংস্কারের প্রস্তাবনা। সেগুলোর লক্ষ্য একই। অর্থাৎ ওইসব দপ্তরের কর্মকাণ্ডকে আরও গণমুখী করা। খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো ঐকমত্য কমিশন আলোচনা করে ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য কার্যপত্র তৈরি করে দিয়েছে। পরবর্তী নির্বাচনে যারা জয়লাভ করবেন তারা কেবলমাত্র সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে এগুলোকে অগ্রাহ্য করে কেবল তাদের দলীয় নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন না। জাতি আশা করতে পারে- ’২৪-এর রক্তপাত এবং দীর্ঘ আলোচনা, সময়, পরিশ্রম ও জনগণের করের অর্থ ব্যয় করে প্রণিত এ সনদ সাধারণভাবে ভবিষ্যৎ শাসকদের আনুকুল্যে এবং ভোটারদের চাপে কার্যকর হবে। এ দলিলের ছাপানো ভার্সন পড়ে বিএনপির দুজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলছেন, তাদের সঙ্গে কোনো কোনো বিষয়ে নাকি বিশ্বাস ভঙ্গের কাজ করা হয়েছে। বিশেষ করে তারা শেখ মুজিবের ছবি টাঙানো/নামিয়ে ফেলার বিষয়ে যে মতামত পেশ করেছিলেন তা নাকি রাখা হয়নি। জাতি এ নিয়ে সরকার ও দলগুলোর মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি চায় না এবং দৃঢ়ভাবে আশা করে যে, যেহেতু প্রধান উপদেষ্টার হাতে চূড়ান্ত কর্তৃত্ব রয়েছে, তার মাধ্যমে এ সমস্যার সুন্দর সমাধানের পথে গিয়ে জাতির প্রত্যাশা- আসন্ন নির্বাচন সুসম্পন্ন করা হবে। এত চমৎকার অর্জনকে কিছু দেওয়া-নেওয়ার মানসিকতার পথে না গিয়ে সংশ্লিষ্ট সবাই জাতির স্বপ্ন পূরণ করে ইতিহাস রচনা করবেন।
লেখক: কথাসাহিত্যিক ও প্রজাতন্ত্রের সাবেক কম্পট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল
.jpg)
