মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর উপজেলার পারিল গ্রামটি যেন একটি ছবির গ্রাম। সে গ্রাম থেকে ছবিয়ালের জন্ম হবে এ আর আশ্চর্যের কী! গ্রামের চারপাশে নিচু জমি, বর্ষাকালে সেসব জমি জল থইথই অকুল পাথার, শরতে জল টানতেই সেখানে ফুটে থাকে অজস্র শাপলা-পদ্ম। বর্ষায় জলমগ্ন সে গ্রামের দৃশ্য দেখে সেখানকার ছেলেমেয়েরা মুখে মুখে ছড়া কাটে- ‘ডোবা নালা গারা/ নওয়াধা-পারিল-বলধারা।’ হেমন্তে বিল থেকে কাটা হয় জলী আমন ধান, শীতের কুয়াশা ফুঁড়ে জেগে থাকে বিস্তীর্ণ হলুদ সরিষা খেত। গ্রীষ্মের প্রশান্তি মেলে তিন-চার শ বছর বয়সী প্রাচীন বট-পাকুড়ের ছায়ায়। জনশ্রুতি আছে যে, হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর সফরসঙ্গী ৩৬ জন আউলিয়ার একজন হজরত গাজীউল মুলক ইকরাম ইব্রাহীম বোগদাদি শাহ্ (রহ.)-এর হাত ধরে পারিল গ্রামের গোড়াপত্তন। সেই পারিল গ্রামেই ১৯৩৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি জন্মেছিলেন চিরকুমার নওয়াজেশ আহমদ। তার বড় ভাই নাইব উদ্দিন আহমেদ ছিলেন তার চেয়ে ১০ বছরের বড়।

সে গ্রামেরই দুই যুগল জাদুকর ছিলেন নওয়াজেশ আহমদ ও নাইব উদ্দিন আহমেদ। দুজনরেই জীবন ও চেতনা ছিল আলোর ঝরনাধারায় সিক্ত, সে প্রতিভা পল্লবিত হয়েছিল অসংখ্য সৃজনশীল আলোকচিত্রে। বলা যায় এ দুজনই এ দেশে সৃজনশীল আলোকচিত্রের পথিকৃৎ। বিশেষ করে নাইব উদ্দিন আহমেদের মতো আর কেউ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়কার ছবি তুলেছেন কি না সন্দেহ। নায়েব উদ্দিন আহমেদ ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ময়মনসিংহের আলোকচিত্রী। সেখানে পড়ার সময় তার প্রত্যক্ষ সান্নিধ্য পেয়েছি, ফটোগ্রাফির টুকটাক তালিমও পেয়েছি। তার নেতৃত্বে শুরু করেছিলাম সেখানকার উদীচী শাখার কার্যক্রম। মুক্তিযুদ্ধের পর সে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তোলা একটি ছবির কথা এখনো মনকে শিহরিত করে। ঘাসের ভেতরে একটা মানুষের মাথার খুলি পড়ে আছে, তার ভিতর থেকে একটি গাছ গজিয়ে উঠেছে। কী অসাধারণ অর্থপূর্ণ একটা ছবি!
দুই ভাইয়েরই ছোটবেলা থেকে ছিল ছবি তোলার অসম্ভব নেশা। ছেলেবেলায় পারিল গ্রামে দুই ভাইয়ের ছবি তোলার এক চমৎকার স্মৃতিচারণ করেছেন নওয়াজেশ আহমেদ তার মহাবনস্পতির পদাবলী বইয়ে। নাইব উদ্দিন আহমেদ তখন ম্যাট্রিক পরীক্ষার্থী। তিনি তার বেবি ব্রাওনি ক্যামেরা ও নওয়াজেশকে সঙ্গে নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন শাপলা ফুলের ছবি তুলতে। পুরোপুরি ফোটা শাপলা ফুলের ছবি তোলা এক কঠিন কাজ। সূর্য ওঠার ঠিক আগে বা সামান্য পরে সে ছবি তুলতে হয়। ভোরের আজানের আগেই দুই ভাই বেরিয়ে পড়লেন সে কঠিন কাজটি করতে। নাইব উদ্দিনের ইচ্ছা, তিনি কবি জসীম উদ্দীনের কবিতার দুটি লাইনের মতো শাপলা ফুলের ছবি তুলবেন, যে ছবিতে থাকবে ‘মাঝখানেতে জলীর বিলে জ্বলছে কাজল জল/ বক্ষে তাহার জল-কুমুদী মেলছে শতদল।’ কুমুদীই শাপলা। একসঙ্গে অনেক ফুল পাওয়া যাচ্ছিল না। শেষে নাইব উদ্দিন গলা পানিতে নেমে পড়লেন। সব ফুল একসঙ্গে করে পানিকে থিতিয়ে পরিষ্কার করে তাতে সেসব ফুলের ছায়া ফেললেন। নওয়াজেশকে দিয়ে সেসব ফুলের ওপর পানি ছিটিয়ে শিশিরের ইমেজ তৈরি করলেন। ক্লিক ক্লিক শব্দে অনেক ছবি তোলা হলো। নাইব উদ্দিনের সে ছবি পৃথিবীর বহু জায়গায় প্রদর্শিত হয়েছে। শিল্পী কামরুল হাসান জাতীয় প্রতীকের নকশা করার সময় নাইব উদ্দিন আহমেদের তোলা পূর্ণ বিকশিত সেই সাদা শাপলার ছবি নিরীক্ষণ করেছিলেন গভীরভাবে। স্বাধীনতার পর ১৯৭৫ সালে দুই ভাইয়ের উল্লেখযোগ্য কিছু আলোকচিত্র নিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বাংলাদেশ’ নামের অ্যালবাম। সে ফটো অ্যালবামটির ৬ হাজার কপির ১ হাজার কপি উদ্বোধনী দিনেই বিক্রি হয়ে যায়। ব্রিটিশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি সে অ্যালবামকে ‘বুক অব দ্য ইয়ার’ সম্মানে ভূষিত করেছিল। অন্য উল্লেখযোগ্য অ্যালবামগুলো হলো পোট্রেট অব বাংলাদেশ (১৯৮৩), কোয়েস্ট অব রিয়েলিটি (১৯৮৬), ওয়াইল্ড ফ্লাওয়ার্স অব বাংলাদেশ (১৯৯৭) ও গৌতম।
নওয়াজেশ আহমদ মূলত কৃষিবিদ ও কৃষিবিজ্ঞানী। ১৯৫৪ সালে ঢাকার ইস্ট বেঙ্গল অ্যাগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট (বর্তমান শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) থেকে বিএজি ডিগ্রি লাভের পর ফুলব্রাইট বৃত্তি নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং সেখানকার উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ের নোবেল পুরস্কৃত অধ্যাপক জসুয়া লিডারবার্গ ও বিবর্তনবাদের প্রখ্যাত প্রফেসর সুয়েল রাইটের ছাত্র বলে তিনি গর্বিত ছিলেন। সেখান থেকে ১৯৬০ সালে ফিরে এসে ডানকান ব্রাদার্স টি-এস্টেটে গবেষণা উপদেষ্টা পদে যোগ দেন। অচিরেই তিনি পাকিস্তান সরকারের টি বোর্ডের সদস্য সচিব হিসেবে নিয়োগ পান। ১৯৭৯ সাল থেকে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থায় দীর্ঘকাল পরামর্শকের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি যুক্তরাষ্ট্রে ছিলেন। সে সময় মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করেন।
গত ১৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে গিয়েছিলাম অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের বাসায়। ড. নওয়াজেশ আহমদের প্রসঙ্গ তুলতেই তিনি বলছিলেন তার সঙ্গে সায়ীদ স্যারের ঘনিষ্ঠতার কথা, ‘অনেকবারই গ্রিন রোডে তাদের বাসায় গিয়েছি। তাদের গ্রিন রোডের বাসার পারিল গ্রিন নামটিও তার গ্রাম ও সবুজের প্রতি ভালোবাসার প্রতীক। তাদের তোলা একটি ছবি এখনো যেন তার চোখে লেগে আছে- বিস্তীর্ণ কূল নাই কিনারা নাই নদীর বুকে পাল তুলে ছুটে চলেছে বিরাট বিরাট নৌকা। সেটাই তো বাংলার আসল রূপ। কোথায় আজ হারিয়ে গেল সেসব দৃশ্য!’ তার আমার বাংলা অ্যালবামের প্রচ্ছদে ছাপা একটি ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকি এখনো, পালতোলা নৌকা ভেসে চলেছে জলভরা নদীতে, আর একটি নৌকায় বসে উদোম গায়ের এক তরুণ আপনমনে বাঁশি বাজিয়ে চলেছে।
১৯৬৬ সালের দিকে নতুন বাংলা বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য একটি খোলা জায়গায় অনুষ্ঠান করার কথা ভাবলেন ছায়ানটের কর্তাব্যক্তিরা। কিন্তু কোথায় অনুষ্ঠান করলে সেটি ভালো হবে তা ভেবে বের করা যাচ্ছিল না। সে সময় বিদেশ থেকে ফিরলেন নওয়াজেশ আহমদ। ওয়াহিদুল হক বললেন, ‘এই তো নওয়াজেশকে পাওয়া গেছে। ছবি তোলার নেশায় অনেক জায়গায় ঘুরে বেড়ান। নববর্ষের অনুষ্ঠানের উপযুক্ত একটা খোলা জাযগার খোঁজ দেন তো আমাদের।’ এ প্রসঙ্গে নওয়াজেশ আহমদ তার স্মৃতিচারণে বলেছেন, ‘১৯৬৭ সালে বাঙালি সংস্কৃতির আকাশে মেঘের ঘনঘটা। মনে পড়ে সরকারি হামলা ও প্রতিবাদী অভিব্যক্তির কথা। থমথমে ভাব চারদিকে। আজিমপুরে সন্জীদাদের ফ্ল্যাটে গিয়ে শুনি সেই প্রতিরোধী বজ্রকণ্ঠ। ছায়ানটের সভা বসেছে। সভায় ঠিক হলো, প্রতিবাদের স্থান হিসেবে নববর্ষের অনুষ্ঠান হবে উন্মুক্ত ময়দানে- সর্বসাধারণের সমাগমে। সন্জীদা প্রস্তাব করলেন কোনো বড় গাছের নিচে অনুষ্ঠান করার কথা। ওয়াহিদুল এতে সায় দিয়ে আমার দিকে তাকাল, চেনা কোনো জায়গা আছে? হঠাৎ মনে পড়ে গেল, রমনা পার্কের মহীরুহ অশ্বত্থের কথা। দোয়েল পাখির ছবি তুলতে গিয়ে একদিন গাছটার সন্ধান পাই। চারদিকে তখন ছিল জংলি ঘাসে আচ্ছাদিত আর বেশ নিভৃত ছিল জায়গাটা। ছায়ানটের কর্মকর্তাদের বললাম গাছটার কথা।
কৃষি কলেজে তার সহপাঠী গোলাম এবনে সামাদ স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, গল্প লেখায় নওয়াজেশের হাত ছিল, তবে তাতে মাঝে মাঝে ছেদ পড়লেও ছবি তোলায় কখনো ছেদ পড়ত না। ছবি ও কথা দিয়ে তিনি অসাধারণ সব শিল্প সৃষ্টি করে গেছেন। তার লেখা মহাবনস্পতির পদাবলী, বনবনানী, মহাঅশ্বত্থের সন্ধানে ইত্যাদি বইগুলো এখনো বারবার পড়তে মন চায়।
এক অদ্ভুত জাদুকরী ক্ষমতা ছিল নওয়াজেশ আহমদের। প্রতি বছর শীতকালে পারিল-নওয়াধায় তাদের বাড়ি জহির মঞ্জিলে আয়োজন করতেন আনন্দ উৎসবের। সে মিলন মেলায় উপস্থিত থাকতেন দেশের প্রথিতযশা কবি, সাহিত্যিক ও শিল্পীরা। নওয়াজেশ আহমদ বিশ শতকের শুরু থেকে এ মিলনমেলার প্রচলন করেন। তার ভাইপো শিল্পী নাসিম আহমেদ নাদভী বলেন, ‘সে ধারাটি আমরা অব্যাহত রাখার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি, তার মৃত্যুর পর ২০১৭ সাল পর্যন্ত আমরা তা করেছিলাম। বাড়ির সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় সেটি সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। তবে সে আনুষ্ঠানিক ধারায় ছেদ পড়লেও লোকজনের সেখানে যাওয়া-আসা থেমে থাকছে না। এবার ২০২৫ সালে আমরা সেটিকে আবার সুধীজনের স্মৃতিচারণের মধ্যদিয়ে তাকে স্মরণ করার আয়োজন শুরু করতে যাচ্ছি।’ ২০০৯ সালের ২৪ নভেম্বর এই প্রকৃতিশিল্পী মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুবার্ষিকীতে তার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা।
এশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ আলোকচিত্র উৎসবে ২০১৯ সালে তাকে আজীবন সম্মাননা পুরস্কার প্রদান করা হলেও এ মহান আলোকচিত্রী, প্রকৃতি ও পরিবেশের অকৃত্রিম বন্ধু, কৃষিবিজ্ঞানী ড. নওয়াজেশ আহমদকে দেওয়া হয়নি কোনো রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় পুরস্কার। সে আক্ষেপের কথা বললেন আর এক গুণী আলোকচিত্রী নাসির আলী মামুন, যিনি নওয়াজেশ আহমদের মতো ছবির কবিরও ছবি তুলেছিলেন। পরিশেষে রবীন্দ্রনাথের ভাষায় বলতে ইচ্ছে করে- ‘আলোকের এই ঝর্ণধারায় ধুইয়ে দাও।/ আপনাকে লুকিয়ে-রাখা ধুলার ঢাকা ধুইয়ে দাও\’ নওয়াজেশ আহমেদের তোলা প্রায় ৫৪ হাজার ছবির ধুলা ধুয়ে এখন সেগুলো উন্মোচিত করা দরকার।
লেখক: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক গবেষক
[email protected]


