ঢাকা ৯ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মেসির জোড়া গোলে অস্ট্রিয়াকে হারিয়ে নকআউটে আর্জেন্টিনা গ্যালারির সবচেয়ে ব্যতিক্রমী মুখটি এবার বিশ্বকাপে মেসির রেকর্ড গড়া গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে আর্জেন্টিনা ক্লোসাকে ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন মেসি অপ্রত্যাশিত এক রেকর্ড মেসির পেনাল্টি মিস করলেন মেসি বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেলেন জার্মান ডিফেন্ডার পরবর্তী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম দশমিকের হিসাবে আটকে আছে তামাক কর, রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার দক্ষিণ এশীয় শিশু সুরক্ষা সম্মেলনে যোগ দিতে কলম্বো পৌঁছেছেন সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী চীনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সেনা মোতায়েন সাঁথিয়ায় বুদ্ধি প্রতিবন্ধীকে ধর্ষণ, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে আর্জেন্টিনার একাদশে পরিবর্তন মানিকগঞ্জে মারিয়া হত্যা মামলায় প্রধান শিক্ষকসহ গ্রেপ্তার ৮ গাজীপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আ.লীগের ৩৪ নেতাকর্মী আটক সাতকানিয়ায় যুবলীগ নেতা হাসান মাহমুদ গ্রেপ্তার নোয়াখালীতে আসল র‍্যাবের হাতে নকল র‍্যাব সদস্য গ্রেপ্তার সারাদেশে ভূমিকম্প অনুভূত সুরে সুরে শেষ হলো বিশ্ব সংগীত দিবসের বর্ণিল আয়োজন টাইব্রেকারে জামালপুরকে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন মাগুরা প্রকৃত মুমিন নিজেকে কীভাবে সামলে নেয়? সহিংসতা এড়াতে গোপালগঞ্জেও পৌঁছেছে সেনাবাহিনী ‘মসজিদ-মাদরাসায় রাজনৈতিক সভা ও জামায়াত রাজনীতি নিষিদ্ধে সংসদে আইন পাসের দাবি’ রাম মূর্তি নির্মাণ ও হিন্দুত্ববাদী তৎপরতার প্রতিবাদে ইসলামপুরে বিক্ষোভ মিছিল নাশকতা ঠেকাতে গাজীপুরেও সেনা মোতায়েনের নির্দেশ চবি ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের মোটরসাইকেল শোডাউন ফরিদপুরে আ. লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সেনাবাহিনী মোতায়েন শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানবাক্সে মাত্র ৫ দিনে মিলল প্রায় ১৮ লাখ টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার ঈশ্বরদীতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা

জনগণের অধিকার সুরক্ষায় সংবাদপত্রের ভূমিকা

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০২:২৬ পিএম
জনগণের অধিকার সুরক্ষায় সংবাদপত্রের ভূমিকা
ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটাররা যাতে সঠিকভাবে নির্বিঘ্নে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে, তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সংবাদপত্র বিরাট ভূমিকা পালন করতে পারে। সাধারণ মানুষ যেখানে যেতে পারে না, সাংবাদিকরা সেখানে বিনা বাধায় যেতে পারেন। ফলে তাদের পক্ষে বিভিন্ন অসংগতি ও অনিয়ম খুঁজে বের করা সহজ। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে বিতর্কিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানামুখী প্রচার চালানো হতে পারে। সে মিথ্যা প্রচারের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে মূলধারার প্রচারমাধ্যমকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে যে দলই ক্ষমতাসীন হোক না কেন, তারা যাতে জনগণের স্বার্থপরিপন্থি কোনো কাজ করতে না পারে, সেজন্য সংবাদপত্র বিশেষ ভূমিকা পালন করতে পারে।

চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানকালীন পুরোটা সময় দেশের সংবাদপত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আগামী দিনেও সংবাদপত্র জনগণের অধিকার সুরক্ষায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখবে। ২০০৮-এর পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে যে তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো অংশগ্রহণমূলক ছিল না। কারণ সাধারণ ভোটাররা এসব নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারেনি, অথবা ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বেশির ভাগ রাজনৈতিক দলই অংশগ্রহণ করেছিল। তাই বলে সে নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক বলা যাবে না। কারণ ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়নি। একটি রাজনৈতিক দল, নির্বাহী আদেশে যার কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ রয়েছে, তারা কীভাবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে? দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশের মানুষ তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেতে যাচ্ছে। 

উপমহাদেশে সংবাদপত্রের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। রাজা রামমোহন রায়ের আর্থিক সহযোগিতায় ১৮১৮ সালে ‘বেঙ্গল গেজেট’ নামে একটি সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। পরে ‘সমাচার দর্পণ’ নামে আরও একটি পত্রিকা বের হয়। বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চলে প্রথম বাংলা পত্রিকা প্রকাশিত হয় ১৮৬৩ সালে। কাঙ্গাল হরিনাথ কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ‘গ্রামবার্ত্তাপ্রকাশিকা’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। এ পত্রিকার মূল লক্ষ্য ছিল ইংরেজ ও স্থানীয় জমিদারদের নানা অন্যায় কর্ম তুলে ধরা। এরপর একের পর এক পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে, তার মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন পত্রিকা হচ্ছে দৈনিক সংবাদ ও দৈনিক ইত্তেফাক। স্বাধীনতা আন্দোলনকে গতিশীল ও চাঙ্গা করার ক্ষেত্রে এ দুটি পত্রিকার গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। বর্তমানে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা মিলিয়ে সহস্রাধিক পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে। আজকের দিনে পত্রিকার সংখ্যা বেশি না কম সেটা যত না বিবেচ্য বিষয়, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে পত্রিকাগুলো কতটা দায়িত্বশীলতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে পারছে।

সব পেশায়ই নিরপেক্ষতা এবং নিয়মিত চর্চার কোনো বিকল্প নেই। আর তা যদি হয় সাংবাদিকতা তাহলে তো কথাই নেই। কথায় বলে, সাংবাদিক, শিক্ষক ও আইনজীবী- এই তিনটি পেশায় সর্বোচ্চ সততা ও নিরপেক্ষতা বজায় রাখা একান্ত প্রয়োজন। কারণ এই তিনটি পেশাজীবীদের কোনো স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই।

প্রতিটি সংবাদপত্রের কাজ হচ্ছে অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে জাতি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সত্য তুলে ধরা। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে এর প্রকাশিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা। তারা পাঠকদের মনে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকা আছে, যারা অন্য গোষ্ঠীর পত্রিকার বিরুদ্ধে নানাভাবে কুৎসা রটনা করে থাকে। আমি আশা করি, ন্যায় ও সত্যের পথে আগামীদিন সংবাদপত্র এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।...

বর্তমান সমাজে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কোনোভাবেই অস্বীকার করা যাবে না। বিশেষ করে সঠিক তথ্য-পরিসংখ্যান প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের কোনো বিকল্প নেই। সংবাদপত্র হচ্ছে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাসের প্রতীক। সংবাদপত্র ছাড়া আমাদের একদিনও চলে না। সংবাদপত্রের উপস্থিতি ছাড়া স্বাভাবিক জীবন কল্পনা করা যায় না। সংবাদপত্রকে বলা হয় সমাজের দর্পণ বা আয়না। আয়না যেমন সামনে দৃশ্যমান যেকোনো বস্তুর অবয়ব সঠিকভাবে তুলে ধরে, সংবাদপত্রও ঠিক তেমনি একটি সমাজের ভালোমন্দ নির্মোহভাবে প্রকাশ করে। আধুনিক বিশ্বে সংবাদপত্রকে ‘রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ’ বলা হয়। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্ন করাই হচ্ছে একজন প্রকৃত সাংবাদিকের কাজ। রাষ্ট্রযন্ত্রকে প্রশ্নবিদ্ধ করে যাবতীয় অন্যায় ও অপকর্ম থেকে বিরত রাখাই হচ্ছে সংবাদপত্রের প্রধান কাজ। গণতন্ত্রের প্রধান রক্ষাকবচ হচ্ছে সংবাদপত্র। যে দেশের সংবাদপত্র যত স্বাধীন, সেই দেশ তত গণতান্ত্রিক ও আধুনিক বলে বিবেচিত হয়ে থাকে।

সংবাদপত্র একটি দেশে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। স্বাধীন সংবাদপত্র একটি দেশের সংবিধান ও স্বাধীনতা রক্ষার অন্যতম রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করে; বিশেষ করে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য এবং অবিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিগত সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের অসংগতিগুলো আমরা পত্রিকার মাধ্যমেই জানতে পারি। দেশ এখন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে বহু প্রত্যাশিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। দেশের রাজনীতি এখন নির্বাচনমুখী হয়ে পড়েছে। আগামী নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দলের জন্য ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ তৈরির ক্ষেত্রে সংবাদপত্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। প্রচারমাধ্যম যদি নির্মোহভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে, তাহলে নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের পক্ষেই অসৎ পন্থা অবলম্বন করা সম্ভব হবে না। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে এবং চলমান মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকাজ বিঘ্নিত করার লক্ষ্যে দেশের অভ্যন্তরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর জন্য মহলবিশেষ পরিকল্পিতভাবে চেষ্টা চালাতে পারে। কারা কীভাবে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করতে পারে, তা সাংবাদিকরা তুলে ধরে প্রশাসনকে প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের ক্ষেত্রে সহায়তা করতে পারেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের অপপ্রচার আরও বৃদ্ধি পাবে বলেই মনে হচ্ছে। মূলধারার পত্রিকাগুলো এসব অপপ্রচারের বিপরীতে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরে সকারকে সহায়তা করতে পারে। জুলাই বিপ্লবের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ভোটাররা যাতে উপযুক্ত প্রার্থীকে তাদের ভোট দেয়, সে ব্যাপারে পত্রিকাগুলো জনমত গঠনে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

প্রতিটি সংবাদপত্রের কাজ হচ্ছে অনুরাগ-বিরাগের বশবর্তী না হয়ে জাতি ও রাষ্ট্রের কল্যাণে সত্য তুলে ধরা। সংবাদপত্রের সবচেয়ে বড় মূলধন হচ্ছে এর প্রকাশিত সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা ও সত্যতা। তারা পাঠকদের মনে আস্থা ও বিশ্বাস স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছে। কোনো কোনো পত্রিকা আছে, যারা অন্য গোষ্ঠীর পত্রিকার বিরুদ্ধে নানাভাবে কুৎসা রটনা করে থাকে। আমি আশা করি, ন্যায় ও সত্যের পথে আগামীদিন সংবাদপত্র এগিয়ে যাবে, এটাই প্রত্যাশা।

লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই
মো. সাখাওয়াত হোসেন

অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে রায় কার্যকর করা যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব, ঠিক তেমনিভাবে অপরাধ প্রতিরোধেও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের উৎস ধ্বংসে সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন ব্যক্তিদের বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্রতী হতে হবে।...

সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের উপস্থিতি একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন, বৈচিত্র্যতা, অপরাধীর সক্রিয়তা ইত্যাদি সার্বিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধী অপরাধ করবেই, সামাজিক বাস্তবতায় অপরাধের সুযোগও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটালাইজের কারণে পৃথিবীর পরিধিও ছোট হয়ে এসেছে। অপরাধীরা এক দেশে বসে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে বাংলাদেশে বসেও আমরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অপরাধীর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারি। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হয়ে যাচ্ছে। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ। অনলাইনের ফাঁদে পড়ে রাষ্ট্রের জরুরি তথ্য অন্য দেশের হ্যাকাররা সহজেই ছিনিয়ে নিচ্ছে। বর্ডার-ভিত্তিক অপরাধের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মানব পাচার, মাদক পাচার ও অন্যান্য পাচারের অপরাধ সহসাই ঘটছে। তাছাড়া যুদ্ধময় পৃথিবীতে ভাইরাসের জীবাণু কৃত্রিমভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ জনগণকে আক্রান্ত করা হচ্ছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপরাধের বৈচিত্র্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অপরাধও তীব্রতর হচ্ছে; ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। তাছাড়া পুঁজিবাদ বাজার ব্যবস্থাপনায় একদল মানুষ আর্থিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে এবং অন্য দলের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। যাদের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে তারা নানাভাবে অপরাধে আক্রান্ত হচ্ছে।

সঙ্গত কারণেই সরকারকে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় এবং কতিপয় ক্ষেত্রে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়। সরকারের প্রচলিত নিয়মে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ নির্মূলে সর্বতভাবে কাজ করছে। তথাপি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়ে উঠছে না। জনমানুষের স্বস্তির জন্য হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারকে বিকল্প উপায় বের করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কমিউনিটির ওরিয়েন্টেশনকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সমাজ থেকে অপরাধের সব ধরনের উৎস নির্মূল করতে হবে, অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের কারণগুলো উদ্ঘাটন করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। বিশেষ করে পুলিশের নিয়মিত পেট্রলিং, টহল, জনসাধারণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং দুর্যোগব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য এ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের মূল বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ১ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া এ বাজেটে পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আধুনিকায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও তা খুব বেশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নয়।

নতুন বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জননিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বাজেট নথি অনুযায়ী, জননিরাপত্তা বিভাগের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন, সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, কারাগার ব্যবস্থাপনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পাসপোর্ট ও ভিসা সেবা এবং অগ্নি ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম। এসব ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি সেক্টরই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ইস্যুকে ভিত্তি করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটির সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধকেন্দ্র নির্মাণ এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণা, সাইবার হামলা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন গতি আসতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তাও এবার বাজেটের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ৭৩টি আধুনিক কম্পোজিট বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) নির্মাণ, নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, নতুন বাজেটে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। উপকূলীয় নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্যও নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিস্থাপক জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে। দেশের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সমস্যাকে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকেও মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারাগারব্যবস্থার উন্নয়নেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য কারাগারগুলোকে ধীরে ধীরে আধুনিক সংশোধনাগারে রূপান্তর করা। এদিকে পাসপোর্ট ও অভিবাসনব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট সেবাকে আরও ডিজিটাল ও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্তব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাস্তবায়ন দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এ বিনিয়োগ দেশের নিরাপত্তা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক বাহিনীকে বিশেষায়িত হিসেবে তৈরি করার নিমিত্তে সরকার বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে। এখন বাস্তবায়নের ওপর বাজেট বরাদ্দের সফলতা ব্যর্থতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

কাজেই সরকারের উচিত হবে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপরাধীদের শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে রায় কার্যকর করা যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব, ঠিক তেমনিভাবে অপরাধ প্রতিরোধেও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের উৎস ধ্বংসে সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন ব্যক্তিদের বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্রতী হতে হবে। দেশের সব পর্যায়ের জনসাধারণকে নিরাপদে ও নিশ্চিতে বসবাসের অধিকার প্রদানে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ ও আধুনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
 
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে
গোলাম মোহাম্মদ কাদের

দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।...

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার প্রারম্ভে এ বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক বাজেট কী তা পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। তবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বলতে উনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন। তা ছাড়া সব শ্রেণির মানুষের জন্য মোটামুটি যে যা চেয়েছে তা দেওয়ার অঙ্গীকার বাজেটভুক্ত করেছেন। সে হিসেবে বাজেটটি নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন ও জনতুষ্টিমূলক বা সবাইকে খুশি করার বাজেট বলা যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা। যার মোট পরিচালন ব্যয় ৬,২১,৯২৫ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থ সংগ্রহ কীভাবে হবে: রাজস্ব আহরণ ৬,৯৫,০০০ টাকা, অনুদান ৬,১৫০ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ১,০৯,৮৫০ টাকা, অভ্যন্তরীণ ঋণ ১,২৭,০০০ টাকা। মোট অর্থ সংগ্রহ ৯,৩৮,০০০ টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটের অগ্রাধিকার বলতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; করব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা। সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ, মধ্যবিত্ত ও নতুন করদাতাদের জন্য কর কাঠামোয় কিছু সংস্কারের সম্ভাবনা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার ৬৮,৩০,০২৪ কোটি টাকা।

নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্কে রেয়াত দেওয়া হয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বাজেট প্রস্তাবনায় নানা ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সবকিছুই করা হয়েছে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য। এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে যে আয়ের ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে, তা খুবই অনিশ্চিত।

পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, রাজস্ব আহরণের ধারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিম্নমুখী। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬-এর এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে আয় হয়েছে ৩,২৬,৯২৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে একই হারে আয় হলে বছর শেষে আয় হতে পারে প্রায় ৩,৯২,৩১৪ কোটি টাকা বা এর চেয়ে অল্প কমবেশি।

করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে টিআইএন, বিআইএন, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রকে সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদেরও করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ফলে আগামী অর্থবছরেই বড় ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পাওয়া সহজ হবে না।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। গণমাধ্যমে ৮ জুন ২০২৬, টিআইবির একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতে খুনের সংখ্যা ৬০৫, অপহরণ ১৯৬ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচলে ভয় পায়। কারণ যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা বিরাজমান। এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ জনগণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা থাকছে না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এরই মধ্যে ৪০০টির মতো মিল-কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে বেশির ভাগই গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিল, যার অধিকাংশই শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২৯.০১.২৬)। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। প্রবাসী আয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী। নতুন মিল-কারখানা স্থাপন শূন্যের কোঠায়। মূল্যস্ফীতি বেশি এবং এটা ঊর্ধ্বগামী। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২। সার্বিক পরিস্থিতির ফলে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ; আইএমএফ বলছে, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ; এডিবি বলছে, ৪ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। (সূত্র ১২ জুন ২০২৬, খবরের কাগজ)

অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য ওপরে বর্ণিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের সমর্থক বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার বহাল না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার আইনিভাবে হরণ করা হলে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা জেল, জুলুম এবং নির্যাতন-নিপিড়নের মাধ্যমে দমন করে রাখা হলে এই বিরাট জনগোষ্ঠী সব সময় তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

তা ছাড়া, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না করা হয়, সে ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগ। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি।

ধারণা করি, বর্তমান সরকার আর একটি বিষয় তেমনভাবে বিবেচনায় আনেনি। ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও সারের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তা ছাড়া সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ দিয়েও অনেক সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা করছে। কেউ কেউ এটা ২ শতাংশ পর্যন্ত কমবে বলে প্রাক্কলন করেছে। এক কথায় বিশ্ব আজ অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে বলা যায়। জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। দেশে জ্বালানি সরবরাহ সহজলভ্য করতে গেলে ভর্তুকিমূল্যে বিক্রয় করতে হবে। সে অর্থ বরাদ্দ বাজেটে আছে বলে মনে হলো না। তেল এবং গ্যাস সঠিক মূল্যে বিক্রয় করতে গেলে সাধারণ জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হবে। কৃষকদের যদি ভর্তুকিমূল্যে এবং সময়মতো সার সরবরাহ করা না হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। সে ক্ষেত্রে আশঙ্কা আছে বড় ধরনের খাদ্যসংকট তৈরির। সে বিষয়টিও বাজেটে আলোকপাত করা হয়নি।

প্রাক্কলিত পরিচালন ব্যয় প্রস্তাবিত বাজেটে দেখানো হয়েছে ৬,২১,৯২৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ সম্পূর্ণ ব্যবহার করার পরও অতিরিক্ত ২,২৯,৬১১ কোটি টাকা ঘাটতি হবে। অর্থাৎ সরকার পরিচালনার জন্য রাজস্ব আহরণের পরও দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে ২,২৯,৬১১ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ফলে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হবে। সে বিচারে এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলা যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে যে, বাস্তবায়নের ব্যত্যয়গুলো পরে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কা থাকবে।

আমরা মনে করি, দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি

সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?
ড. নাহিদ ফেরদৌসি

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।...

পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করে আসছি। যদিও এই বসবাসের অভ্যাস একদিনে করে গড়ে ওঠেনি। আদিম যুগে নানারকম বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে বসবাস করার এক অদৃশ্য তাগিদ মানুষের কাছে অনুভূত হয়। শিকার বা শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা একসঙ্গে বসবাস করার যে মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কালক্রমে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে সমাজ তথা সামাজিকভাবে বসবাস করার চিন্তাভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নয়, তারও আগে এই সমাজ তথা সামাজিকতার অবদান ছিল। এমনকি আজকের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে এই রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে মতবাদ রয়েছে তা হলো–সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এই মতবাদের জ্ঞানপ্রতিমরা হলেন–থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশোদের লেখনীতেও সমাজের গুরুত্ব ও এই সমাজের গুরুত্ব থেকেই যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে তা স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র হলো সমাজের বৃহত্তর পরিধি। এই পরিধিকে আমরা যত্ন করেই আগলে রাখছি সভ্যতার শুরু থেকেই। আবার, এই যত্নের কারিগররা তথা মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় যে, তারা একসঙ্গে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তাদের কাছে বসবাসযোগ্য।

সামাজিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয় সামাজিক চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে। মানুষ যখন একাকী বসবাস করত, তখন তারা বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। তাই তারা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করল। এই একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন্দলে। ফলস্বরূপ একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। মানুষ নিজেদের সামান্য লাভ ও স্বার্থের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্বিচারে আঘাত হানতে শুরু করল। বনভূমি উজাড় করা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার ক্রমে পরিবেশের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ব এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমান যুগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের লোভনির্ভর কর্মকাণ্ড। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে, জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। এমতাবস্থায়, আমাদের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরাই চুক্তিতে আবদ্ধ হই। এই চুক্তি একে অপরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। আজকের যে সামাজিক অস্থিরতা দেখি তা মূলত আমাদের সমাজে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে যে চুক্তিটি আছে, তা ভঙ্গের কারণেই। যেহেতু রাষ্ট্র সমাজের এক বৃহত্তর পরিসর, তাই এই সামাজিক অস্থিরতা থেকেই রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসীমা হলো সমগ্র পৃথিবী। তাইতো আমরা দেখতে পাই, ১৯১৪ সালের ২৮ জুনের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবী দেখেছিল এক কালো অধ্যায়। চার বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ মিলিয়নের মতো তাজা প্রাণ। যাদের মৃত্যু কেড়ে নিয়েছিল আরও ৬০ মিলিয়ন মানুষের জীবনের আনন্দ। তারা বেঁচে ছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু এই একটি উদাহরণ নয়, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়েও যে বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ও যত রকমের আইন ও চুক্তি আছে সেগুলোকে ভেঙে দেয় তা হলো–মানবতার হত্যা। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ডই খুব বাজেভাবে বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন ও পৃথিবীর রূপ। তাহলে এই মানুষ হত্যাই যেহেতু সব সমস্যার মূলে রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অন্যতম উপায় যেহেতু বিপক্ষ দলের বা মতের মানুষকে হত্যা করা। যার ফলাফল হিসেবে আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সম্মুখীন হই। তাই এই মানব হত্যাকেই বন্ধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো–এই গর্হিত অপরাধকে কীভাবে দমন করা যায়? কীভাবে মানবজাতিকে বোঝানো যায়, ‘পৃথিবীতে সব মানুষেরই সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার, কারও কোনো অধিকার নেই এই বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করার।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে হত্যা করে, তখন তার নিজের বিবেক বোধ ও মানবতাবোধকে বিসর্জন দিয়েই এই অপরাধ করে। যদিও আত্মরক্ষা বা নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অধিকার দেয় এই অপরাধের জন্য। কিন্তু তাও সেটি অপরাধ হিসেবেই থাকে, আইনের কাছে হোক বা নিজের বিবেকের কাছেই হোক। তাহলে এই অপরাধকে দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন অথবা নাস্তিকতা চর্চা করলেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত নন। ইসলাম ধর্মে যেমন বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা করার যে অপরাধ তা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার অপরাধের নামান্তর। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতে নরহত্যা জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, একটি অপরাধ ঢাকার জন্য ভিক্টিম যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, তার জন্য ভিক্টিমকেই হত্যা করা হয়। প্রথম অপরাধটিও করা হয় নৈতিক অনুশাসন ভেঙে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও নৈতিক মূল্যবোধ না থাকাটাই মানুষকে অপরাধ করার জন্য প্রলুব্ধ করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিভাগের জন্য ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ নামে একটি আবশ্যিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবকল্যাণের জন্য এসব জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তারা শিখবে কীভাবে নীতি ও নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা যায়। একই সঙ্গে তারা এমন শিক্ষা লাভ করবে, যা তাদের অনৈতিক, অন্যায় ও মানবকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সব বিভাগের পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে, আর কর্মক্ষেত্রেই নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তোলা যায় যে অন্যের ক্ষতি করে, সমাজের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে অর্জিত সুখ ও সাফল্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষণস্থায়ী, তবে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের চোখের পানির কারণ হওয়া কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত নৈতিকতার একটি প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা আজীবন এই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, আজকে যারা অপরাধ করছে, তারা যেহেতু শিশু নয়। তাই এই অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য সমাজের সব স্তরে ‘নৈতিক গণশিক্ষা কার্যক্রম’ পরিচালিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ধর্মকে শ্রদ্ধা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, ঠিক তেমনিভাবে নৈতিক মূল্যবোধকে প্রচার করতে হবে।

অন্যদিকে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা হতে পারে। যদিও আমাদের পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি হিসেবে দুটি উপায়ের কথা উল্লেখ আছে, একটি হলো–মৃত্যুদণ্ড, অন্যটি হলো–যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হত্যার শাস্তি প্রয়োগ করলেই হবে না। এই শাস্তির কথা প্রচার করতে হবে। যাতে অপরাধী মন হত্যা বা এই রকম অপরাধ করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]

কে কাকে শক্তি জোগায় বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
বাংলাদেশে সমৃদ্ধি ও বঞ্চনার পাহাড়
আনু মুহাম্মদ

দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে।...

তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ কর্মসূচির নামে যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের পরিচালিত সন্ত্রাস, দখল, যুদ্ধ, গণহত্যা ভয়ংকর পর্যায়ে নিয়ে যায়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে লাশের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ বাড়তে থাকে। ২০১৫ সালে ‘বডি কাউন্ট: ক্যাজুয়ালটি ফিগারস আফটার টেন ইয়ারস অব দ্য ওয়ার অন টেরর’ শিরোনামে যৌথভাবে একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে জার্মান, কানাডিয়ান ও মার্কিন তিনটি সংগঠন। এগুলো হলো ‘ইন্টারন্যাশনাল ফিজিশিয়ানস ফর দ্য প্রিভেনশন অব নিউক্লিয়ার ওয়ার’, ‘ফিজিশিয়ানস ফর সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি’ এবং ‘ফিজিশিয়ানস ফর গ্লোবাল সারভাইভাল’।

এ রিপোর্টে ২০০৪ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত পরিচালিত সমীক্ষা থেকে দেখানো হয়েছে–এক দশকে যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে ইরাক, আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে ১৩ লাখেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ১০ লাখ ইরাকে, দুই লাখের বেশি আফগানিস্তানে। মার্কিন ড্রোন ও অন্যান্য আক্রমণে ৮০ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে শুধু পাকিস্তানেই। এর মধ্যে বেসামরিক নাগরিকের সংখ্যা প্রায় ৫০ হাজার। এখনো আন্তর্জাতিক সব রীতিনীতি, প্রস্তাব ও সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে প্যালেস্টাইনে মার্কিন পৃষ্ঠপোষকতায় ইসরায়েলের অবিরাম গণহত্যা অব্যাহত আছে।

২০০১-এর আগে ইরাক, লিবিয়া ও সিরিয়ায় আল-কায়েদা বা তালেবান ধারার কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব ছিল না। তথাকথিত ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ’ এ অঞ্চলকে চেনা-অচেনা সন্ত্রাসীদের অভয়ারণ্যে পরিণত করে। একপর্যায়ে এ অঞ্চলে বিরাট জৌলুস নিয়ে আবির্ভূত হয় আইসিস। যারা তাদের ভাষায় ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ বা ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠার কর্মসূচি ঘোষণা করে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী, নতুন শত শত গাড়ি, বার্ষিক ১৬ হাজার কোটি টাকার বাজেট এবং প্রায় ৩০ হাজার সশস্ত্র সদস্য নিয়ে তারা যেন আচমকা হাজির হয়। তারা ইরাক ও সিরিয়ায় একের পর এক অঞ্চল দখল করে। তবে কখনোই ইসরায়েলে হামলা করেনি। তারা আরও বিভিন্ন দেশে একের পর এক মুসলমানসহ ভিন্নধর্ম ও মতাবলম্বী মানুষদের আক্রমণ করতে থাকে, গলা কাটা ও নির্যাতনের দৃশ্য ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচার করে বীরত্ব দেখাতে থাকে। হঠাৎ  করে এরকম একটি বিশাল বাহিনীর জন্ম এবং ক্রমান্বয় বিজয়ের কয়েক বছর আগে আফগানিস্তানে তালেবানদের আচমকা আবির্ভাব এবং দ্রুত আফগানিস্তান দখলের কথা মনে করিয়ে দেয়।

ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ছিন্নভিন্ন হওয়ার ফলে এ দেশগুলোর মানুষকে নারকীয় অনিশ্চিত অবস্থায় পড়তে হয়েছে। ইউরোপে অভিবাসনে বিশাল স্রোত এরই ফল। অন্যদিকে এর প্রত্যক্ষ সুবিধাভোগী তিন পক্ষ–সৌদি আরব, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র। তাদের কাছে ইরাকের সাদ্দামের আসল অপরাধ স্বৈরশাসন ছিল না, ছিল তেলক্ষেত্র জাতীয়করণ এবং সামরিক শক্তি হিসেবে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের কর্তৃত্ব অস্বীকারের ক্ষমতা। লিবিয়ার গাদ্দাফিরও একই অপরাধ ছিল। সৌদি রাজতন্ত্র বরাবরই তাদের ওপর গোস্বা ছিল। গাদ্দাফি জীবনের শেষপর্যায়ে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার লক্ষ্যে ‘নয়া উদারতাবাদী’ বলে কথিত পুঁজিপন্থি কিছু সংস্কারের পথে গেলেও তার বড় অপরাধ ছিল সৌদি রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে স্পষ্ট আক্রমণাত্মক কথাবার্তা। ২০১১ সালে গাদ্দাফি সরকারকে উচ্ছেদ করার জন্য ন্যাটো বাহিনীর ঐক্যবদ্ধ কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভাড়াটিয়া উগ্রপন্থিদের জড়ো করার কাজটি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশ ও সৌদি আরবের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়।

এদের কাছে সিরিয়ার আসাদ সরকারেরও অপরাধ স্বৈরশাসন নয়, অপরাধ সৌদি আরব-ইসরায়েল অক্ষের বিরোধিতা। সিরিয়ার আসাদ সরকার উচ্ছেদের জন্য সে কারণে বিভিন্ন ক্ষুব্ধ গোষ্ঠীকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয় পশ্চিমা শক্তি ও সৌদি-কাতার-জর্ডান রাজতন্ত্র। ইসরায়েলকে শক্তি জোগানো এবং ইরানকে কাবু করাও এর অন্যতম লক্ষ্য ছিল। সৌদি আরব, কাতার, তুরস্ক, জর্ডান, সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিপুল অর্থ, যুক্তরাষ্ট্র থেকে অস্ত্র জোগানের ওপর ভর করেই এসব উগ্রপন্থি গোষ্ঠী শক্তিপ্রাপ্ত হয়। এর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ফ্রান্স ও ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। বাইডেন যখন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট, তখন এক বক্তৃতায় মুখ ফসকে আইসিসের পেছনে তাদের ও মিত্র দেশগুলোর শত হাজার কোটি ডলারসহ নানা পৃষ্ঠপোষকতার কথা বলে ফেলেন। পরে মিত্রদের ক্ষোভের মুখে আবার মাফও চেয়েছেন। কিন্তু সত্য ঢাকা পড়েনি।

ব্রিটিশ-পাকিস্তানি লেখক তারিক আলী তথ্য যুক্তি দিয়ে সঠিকভাবেই দেখান যে, বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বড় মৌলবাদ, সব মৌলবাদের জন্মদাতা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ।

সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্যদিয়ে স্বাধীনতা লাভের পর গত প্রায় ৫৪ বছরে বাংলাদেশের অনেক পরিবর্তন হয়েছে। প্রথাগত বিচারে ‘অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি’র অনেক দিকই চিহ্নিত করা যায়। যেমন–অবকাঠামোগত পরিবর্তন হয়েছে, সড়ক পথের বিস্তার ঘটেছে অনেক, পরিবহন ও যোগাযোগ সম্প্রসারিত হয়েছে, বহুতল ভবন বেড়েছে অভূতপূর্ব মাত্রায়, আমদানি-রপ্তানি দুটোই বেড়েছে, রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে গার্মেন্টস বড় সাফল্য তৈরি করেছে, প্রবাসী আয় বৈদেশিক মুদ্রার বিশাল মজুত তৈরি করেছে, প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক তৎপরতায় ক্ষুদ্রঋণ ও এনজিও মডেল অনেক বিস্তৃত হয়েছে, নগরায়ণ বেড়েছে, মোবাইল ইন্টারনেট শহর-গ্রামে যোগাযোগ প্রযুক্তির সম্প্রসারণে পেশাগত ও অর্থনৈতিক নতুন নতুন সুযোগ বেড়েছে, জনসংখ্যার তুলনায় খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে অনেক; যদিও মানুষের যথেষ্ট এবং নিরাপদ খাদ্যের সংস্থান হয়নি। মানুষের সচলতা বেড়েছে।

এ সমৃদ্ধির গতি ও ধরনের কারণে প্রত্যক্ষ সুফলভোগী হয়েছে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠী। এর সামাজিক ও পরিবেশগত খেসারতও বেশি। নদীনালা, খালবিল, বন শিকার হয়েছে দখল ও বিপর্যয়ের। বৈষম্য বেড়েছে। এ সময়কালেই দেশে একটি অতি-ধনিক গোষ্ঠীর আবির্ভাব হয়েছে। ‘কালো টাকা’ নামে পরিচিত চোরাই টাকার মালিকদের বিত্ত এবং দাপট বেড়েছে বহু গুণ। ঢাকা শহরে এখন একই সঙ্গে বিত্তের জৌলুস এবং দারিদ্র্যের নারকীয়তা দুটোই পাশাপাশি অবস্থান করে। চোরাই কোটিপতির সংখ্যা যখন বেড়েছে তখন মাথাগণনায় দারিদ্র্যের প্রচলিত সংজ্ঞা বা কোনোভাবে টিকে থাকার আয়সীমার নিচে মানুষের সংখ্যা চার কোটির বেশি। যদি দারিদ্র্যসীমায় শিক্ষা, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন যুক্ত করা হয় তাহলে দেখা যাবে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই অমানবিক জীবনে আটকে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে যতসংখ্যক মানুষ বিভিন্ন ধরনের শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত তার চেয়ে বেশিসংখ্যক মানুষ শ্রমিক হিসেবে বিদেশে কর্মরত। এদের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। দেশে তাদের কর্মসংস্থান নেই। বিদেশেও তাদের জীবন ও জীবিকা চরম নিরাপত্তাহীনতার শিকার। অন্যদিকে এদেরই পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা অর্থাৎ রেমিট্যান্স এখন বাংলাদেশের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। দেশে সার্ভিস সেক্টরের দ্রুত বিকাশ হলেও তা কর্মসংস্থানকে খুবই অস্থায়ী, নাজুক ও নিম্ন আয়ের ফাঁদে আটকে রেখেছে।

কয়েক দশকে নারীর দৃশ্যমান সচলতা স্পষ্টতই অনেক বেড়েছে। পাশাপাশি ঘরে-বাইরে যৌন নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনাও বাড়ছে। তার বিরুদ্ধে ছোটবড় প্রতিরোধও তৈরি হচ্ছে। গার্মেন্টস এ বর্তমানে শ্রমিকদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৭০ ভাগই নারী। শহর ও গ্রামে সরাসরি মজুরিশ্রমিক হিসেবে নারীর উপস্থিতি এখন তুলনায় অনেক বেশি দেখা যায়। মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদেরও উপার্জনমুখী কাজে অংশগ্রহণ অনেক বেড়েছে। গ্রাম-শহরে জমি, কাজ ও আশ্রয় থেকে উচ্ছেদ হয়ে যাওয়া ছিন্নমূল মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধি পাচ্ছে, তাদের শিশু ও নারীর অবস্থা তুলনায় আরও বেশি নাজুক। জালিয়াতি প্রতারণা এবং নিপীড়নের মাধ্যমে যৌনবাণিজ্যে শিশু কিশোরী ও তরুণীদের ক্রমবর্ধমান হারে যুক্ত করা, নারী ও শিশু পাচারের সুযোগ এখান থেকেই তৈরি হচ্ছে।

গত কয়েক দশকে একদিকে ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীর জৌলুস, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠের দারিদ্র্য ও বৈষম্যের বিভীষিকা, একদিকে সম্ভাবনার বিকাশ, অন্যদিকে দেশি-বিদেশি দখলদারদের দাপটে জননিরাপত্তার বিপর্যয় একটি নির্মম বৈপরীত্যের মধ্যে বাংলাদেশকে নিক্ষেপ করেছে। দেশে এযাবৎ অনেক সামরিক-নির্বাচিত-অনির্বাচিত সরকারের পরিবর্তন হয়েছে; কিন্তু এসব নীতির ক্ষেত্রে কোনো পরিবর্তন হয়নি, নতুন কোনো গতিমুখ সৃষ্টি হয়নি। আগের তুলনায় দুর্নীতি ও লুণ্ঠনের মাত্রা বেড়েছে। দল বদলেছে, মুখ বদলেছে, প্রক্রিয়ার বদল হয়নি। রাজনীতির মূলধারা তাই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে না, করে দেশি ও বিদেশি দখলদারদের। এসব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই তাদের প্রতিযোগিতা আর হিংস্র সংঘাত দেখা গেছে গত কয়েক দশকে। তাদের বর্ম হিসেবেই ধর্ম ও ধর্মপন্থি গোষ্ঠী ব্যবহার ও পৃষ্ঠপোষকতার প্রতিযোগিতাও এ সময়ে ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। 

লেখক: শিক্ষক, লেখক এবং ত্রৈমাসিক জার্নাল সর্বজনকথার সম্পাদক

নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন

প্রকাশ: ২০ জুন ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
আইনের শাসন ও মানবাধিকার নিশ্চিত করুন
ড. খলিলুর রহমান

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।...

বাংলাদেশে নারী ও শিশুদের ওপর সাম্প্রতিক সহিংসতা, প্রকাশ্যে অপমান এবং নির্যাতনের ঘটনাগুলো আবারও একটি গভীর উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে সামনে এনেছে। গণপিটুনি ও জনতার বিচার (মব জাস্টিস) ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে এবং আইনের শাসন দুর্বল হয়ে পড়ছে। এসব ঘটনা বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড নয়; বরং এগুলো এমন এক দায়মুক্তির সংস্কৃতির লক্ষণ, যা ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে এবং বিভিন্ন রূপে বর্তমান নির্বাচিত সরকারের আমলেও তা অব্যাহত রয়েছে।

রাজনৈতিক মতাদর্শনির্বিশেষে বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিকের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত যে, কত ঘন ঘন সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে নারীরা, আইনবহির্ভূত ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দ্বারা হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। রাজনৈতিক পরিচয়, লিঙ্গ, ধর্ম কিংবা সামাজিক অবস্থান যাই হোক না কেন, কোনো নাগরিককে জনতা, স্বঘোষিত ন্যায়বিচারক বা আইনগত কর্তৃত্ববিহীন ব্যক্তিদের দ্বারা শাস্তি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজের ভিত্তি অত্যন্ত স্পষ্ট: কোনো অভিযোগ থাকলে তা আইনানুগ প্রতিষ্ঠান ও যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে। পুলিশ তদন্ত করবে, প্রসিকিউটর মামলা পরিচালনা করবেন এবং আদালত নির্ধারণ করবেন কে দোষী আর কে নির্দোষ। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ও ক্ষমতা কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের হাতে তুলে নিতে পারে না।

বিশেষ করে গত ১৮ জুন প্রকাশ্য দিবালোকে রাস্তায় নারীদের ওপর হামলার ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কি কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য হিসেবে বৈধ কর্তৃত্বের অধিকারী ছিলেন? যদি না হয়ে থাকেন, তাহলে কোন আইনের বলে একজন সাধারণ নাগরিক অন্য কাউকে প্রকাশ্যে আটকে রাখতে, আক্রমণ করতে বা অপমান করতে পারেন? উত্তরটি অত্যন্ত সহজ: এমন কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

যখন এ ধরনের ঘটনা প্রকাশ্যে এবং বারবার ঘটতে থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি জনগণের আস্থা অনিবার্যভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এটি আমাদের প্রশ্ন করতে বাধ্য করে–বাংলাদেশ কি এখনো আইন দ্বারা পরিচালিত একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, নাকি এমন একটি সংস্কৃতির দিকে ধাবিত হচ্ছে যেখানে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হয় ভয়ভীতি, প্রকাশ্য অপমান এবং জনতার শক্তির মাধ্যমে?

এই বিপজ্জনক প্রবণতার প্রধান শিকার নারী ও শিশুরা। বিষয়টি আরও উদ্বেগজনক, কারণ নারীর ক্ষমতায়ন, কন্যাশিশুর শিক্ষা, মাতৃস্বাস্থ্য এবং সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অর্জনগুলো এ ধরনের সহিংসতা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এটি শুধু অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থার বিষয় নয়; এটি আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতার বিষয়ও।

বাংলাদেশ নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW) এবং শিশু অধিকার সনদের (CRC) সদস্য রাষ্ট্র। এসব আন্তর্জাতিক চুক্তি রাষ্ট্রকে নারী ও শিশুদের সহিংসতা, বৈষম্য, নির্যাতন, শোষণ এবং অবমাননাকর আচরণ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা আরোপ করে। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদের (ICCPR) সদস্য এবং জাতিসংঘ সনদের সেই মৌলিক নীতিগুলোর প্রতি অঙ্গীকারাবদ্ধ, যা মানবিক মর্যাদা, আইনের দৃষ্টিতে সমতা, মৌলিক স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারী আচরণ থেকে সুরক্ষার নিশ্চয়তা দেয়।

অতএব, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা কেবল একটি নীতিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সাংবিধানিক, আইনগত এবং আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা। একই সঙ্গে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা বাংলাদেশের সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার। নাগরিকদের সরকারের সমালোচনা করা, শান্তিপূর্ণভাবে সংগঠিত হওয়া এবং রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের পূর্ণ অধিকার রয়েছে।

২০২৪ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতাগুলোর একটি হলো জনতানির্ভর আইন প্রয়োগের সংস্কৃতির দৃশ্যমান স্বাভাবিকীকরণ। বহু প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আনুষ্ঠানিক আইনগত প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকা বিভিন্ন গোষ্ঠীর দ্বারা নাগরিকরা হয়রানি, হুমকি, হামলা এবং প্রকাশ্যে অপমানের শিকার হয়েছেন। অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, নির্বাচিত সরকার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হলে এসব কর্মকাণ্ডের অবসান ঘটবে। কিন্তু সে প্রত্যাশা এখনো পূরণ হয়নি।

বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পূর্ববর্তী অনির্বাচিত প্রশাসনের তুলনায় মৌলিকভাবে ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে। অনির্বাচিত সরকারের মতো নয়, এ সরকার জনগণের ভোট থেকে সরাসরি বৈধতা অর্জন করেছে। ফলে নাগরিকদের অধিকার রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্ব আরও বেশি।

অতএব, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার যেকোনো ঘটনায় সরকারকে দ্রুত, দৃঢ় এবং কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রতিটি অভিযোগ স্বচ্ছভাবে তদন্ত করতে হবে এবং রাজনৈতিক পরিচয়, সামাজিক প্রভাব বা মতাদর্শগত সহানুভূতি নির্বিশেষে অপরাধীদের আদালতের মুখোমুখি করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভূমিকাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলো প্রায়ই ঢাকাস্থ বিভিন্ন পশ্চিমা দূতাবাস, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং জাতিসংঘ কর্মকর্তাদের শক্তিশালী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করত। প্রকাশ্য বিবৃতি, কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং উদ্বেগ প্রকাশ ছিল নিয়মিত ঘটনা। কিন্তু ২০২৪ সালের আগস্টের পর অনেক বাংলাদেশি লক্ষ্য করেছেন, পরিস্থিতির প্রতি কিছুটা ভিন্ন ধরনের দৃষ্টিভঙ্গি দেখা যাচ্ছে। নারী নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলা এবং অন্যান্য কথিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা একই ধরনের দৃশ্যমান উদ্বেগ বা প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া পায়নি। বিশেষ করে কূটনৈতিক মহলের কিছু অংশ, ঢাকাসহ কয়েকটি পশ্চিমা দূতাবাস এবং জাতিসংঘের কিছু কর্মকর্তা ও মানবাধিকার প্রতিনিধির নীরবতা অনেকের দৃষ্টিতে লক্ষণীয় হয়ে উঠেছে–বিশেষ করে ইউনূস প্রশাসন এবং বর্তমান সরকারের আমলে সংঘটিত ঘটনাগুলোর ক্ষেত্রে। এ ধারণা পুরোপুরি সঠিক হোক বা না হোক, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড প্রয়োগে ধারাবাহিকতা ও নিরপেক্ষতা সম্পর্কে এটি বৈধ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

মানবাধিকার নীতিমালার বিশ্বাসযোগ্যতা এর সর্বজনীনতার ওপর নির্ভর করে। ক্ষমতায় যারাই থাকুক, নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা নিন্দিত হওয়া উচিত। রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর বিধিনিষেধ উদ্বেগের কারণ হওয়া উচিত। শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ওপর হামলা সরকারপক্ষ, বিরোধী দল কিংবা নাগরিক সমাজ–যার বিরুদ্ধেই হোক না কেন, সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। মানবাধিকার তখনই নৈতিক শক্তি হারায়, যখন তা পক্ষ বাছাই করে প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হয়।

দেশি প্রতিষ্ঠানগুলোকেও তাদের ভূমিকা পালন করতে হবে। মানবাধিকার সংগঠন, নারী অধিকার সংগঠন, পেশাজীবী সংগঠন, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংবাদিক এবং নাগরিক সমাজের নেতাদের সহিংসতা ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে সোচ্চার হতে হবে। মানবিক মর্যাদার সুরক্ষা কখনোই দলীয় বা রাজনৈতিক বিষয় হতে পারে না।

নারীর ক্ষমতায়ন, শিশুমৃত্যু হ্রাস, জনস্বাস্থ্য, শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অর্জন বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত। এসব অর্জন ধরে রাখতে শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি বা নির্বাচনি বৈধতা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আইনের শাসন, মানবিক মর্যাদা এবং সব নাগরিকের সমান সুরক্ষার প্রতি অটল অঙ্গীকার।

সামনের পথ পরিষ্কার। সরকারকে দ্ব্যর্থহীনভাবে জনতার বিচার ও আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করতে হবে, অপরাধীদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে, নারী ও শিশুদের সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং সব নাগরিকের মতপ্রকাশ ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

বাংলাদেশ এমন একটি ভবিষ্যতের দাবিদার, যেখানে কোনো নারী প্রকাশ্যে অপমানিত হওয়ার ভয়ে থাকবে না, কোনো শিশু সহিংসতার শিকার হবে না, কোনো নাগরিক যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তি পাবে না এবং কোনো সরকার–নির্বাচিত বা অনির্বাচিত–জবাবদিহি এড়াতে পারবে না।

নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতা বন্ধ হোক। দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসান হোক। বাছাই করা মানবাধিকার চর্চার অবসান হোক। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হোক।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ সরকারের সচিব, সাবেক জ্যেষ্ঠ জনস্বাস্থ্য নীতিবিষয়ক উপদেষ্টা এবং জাতিসংঘের ESCAP-এ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) প্রতিনিধি