ঢাকা ১০ আষাঢ় ১৪৩৩, বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
প্রথমার্ধে ইংল্যান্ডকে রুখে দিল ঘানা বিশ্বকাপে ইরানের সফর নীতি নিয়ে নতুন সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের ফুটবলের ক্যানভাসে চিরযৌবন নেইমারে ভয় নেই স্কটল্যান্ডের মাঠে হেঁটেই সফল মেসি রোনালদোর রেকর্ডের রাতে পর্তুগালের গোল উৎসব ৪১ বছরেও থামেননি রোনালদো, ভাঙলেন মেসির রেকর্ড পর্তুগিজ কিংবদন্তিতে ছাড়িয়ে শীর্ষে রোনালদো রোনালদোর বিশ্বরেকর্ড, প্রথমার্ধে উজবেকিস্তানের জালে ৩ গোল পর্তুগালের গোল করেই ইতিহাস গড়লেন রোনালদো ফ্রান্স ম্যাচ নিয়ে ভাবছেন না হালান্ড তৃণমূল থেকে ফিরহাদ-অরূপসহ ৮ নেতা বহিষ্কার উপদেষ্টা জাহেদের ফেরা ছিল তার নিজের সিদ্ধান্ত: জয়সওয়াল কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় সিএফমোটো বাংলাদেশের নতুন শোরুম উদ্বোধন পর্তুগালের একাদশে ২ পরিবর্তন ব্লিং লেদার প্রোডাক্টস লিমিটেড ঘুরে দেখলেন রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি বিস্ফোরক সংকটে বন্ধ মধ্যপাড়া পাথরখনির উত্তোলন কার্যক্রম জলবায়ু অঙ্গীকার বাস্তবায়নে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর হরমুজ প্রণালিতে রেকর্ড তেল রপ্তানির তথ্য দিলেন ট্রাম্প কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ে শিশু নির্যাতন ও ধর্ষণবিরোধী মানববন্ধন আলোচিত কৃষক কবির হোসেন আর নেই ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল, ২০২৬’ সংসদে উত্থাপন আদব মানুষকে সম্মানিত করে, আদবহীনতা মর্যাদা নষ্ট করে: ছারছীনার পীর ছাহেব কারা পাবেন হেদায়েতের এই পরম নিয়ামত? রেকর্ড তাপপ্রবাহে ফ্রান্সে ট্র্যাজেডি, পানিতে ডুবে ৪০ জনের মৃত্যু জাইমা রহমানের ছবি ব্যবহার করে প্রতারণা, রিমান্ডে আইনজীবী বাংলাদেশের সঙ্গে ৫৮ দেশের বাণিজ্য ঘাটতি, শীর্ষে চীন ও ভারত: বাণিজ্যমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে কড়া বক্তব্য দিলেন এমপি রেহানা রানু টিআর-কাবিটা প্রকল্পে অনিয়মের তদন্ত চলছে: ত্রাণমন্ত্রী এক অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩০.৩২ বিলিয়ন ডলার: প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্য এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা

প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২৬, ০৩:২৫ পিএম
মধ্যপ্রাচ্য এবং ভবিষ্যৎ বিশ্বব্যবস্থা
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন (অব.)

বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ করে ইউরোপীয় নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা হওয়া উচিত এ যুদ্ধ কত দ্রুত বন্ধ করা যায়। এ যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি ইউরোপ এবং তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর ওপর পড়বে। কারণ জ্বালানির অভাব এ দুই শ্রেণির রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ক্ষতি করতে বাধ্য। বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে এখন থেকেই সরকারকে উঠে পড়ে লাগতে হবে। বর্তমান এই যুদ্ধ বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে।...

স্যার হেলফোর্ড মেকেন্ডার (১৮৬১-১৯৪৭) ছিলেন একজন ব্রিটিশ বিশ্ববিখ্যাত ভৌগোলিক এবং শিক্ষাবিদ। তিনি হলেন ভূরাজনীতি (Geo-Politics) শিক্ষার প্রতিষ্ঠাতা। ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন তার প্রদত্ত বিখ্যাত হার্টল্যান্ড তত্ত্বের (Heartland Theory) জন্য। ১৯০৪ সালে প্রস্তাবিত এই ভূরাজনৈতিক মতবাদ বর্তমান আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যে কত সত্য প্রমাণিত হচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অধুনা ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে এই হার্টল্যান্ড তত্ত্বের পুনর্বিবেচনা অত্যন্ত জরুরি।

সহজ বাংলায় হার্টল্যান্ড তত্ত্বের দুটি পূর্বানুমান এবং একটি উপসংহার ছিল, যেভাবে যুক্তিবিদ্যায় আমরা প্রাক্কলিত বিবৃতির ওপর ভিত্তি করে উপসংহারে উপনীত হই। মেকেন্ডার তার হার্টল্যান্ড তত্ত্বটি এভাবে উপস্থাপন করেছিলেন:
‘যে পূর্ব ইউরোপ নিয়ন্ত্রণ করবে, সে মূল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করবে,
যে মূল ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করবে, সে বিশ্বদ্বীপ নিয়ন্ত্রণ করবে;
যে বিশ্বদ্বীপ নিয়ন্ত্রণ করবে, সে পৃথিবী নিয়ন্ত্রণ করবে।’

মেকেন্ডার মূল ভূখণ্ড বলতে মূলত: পূর্ব ইউরোপ এবং পশ্চিম এশিয়া-ইউরেশিয়াকে বুঝিয়েছিলেন। বিশ্বদ্বীপ বলতে ইউরোপ, এশিয়া এবং আফ্রিকাকে অভিহিত করেছিলেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল যে, স্থলশক্তি নৌশক্তির চেয়ে ভবিষ্যতে বেশি শক্তিশালী হতে পারে, কারণ পরাশক্তিগুলোর মূল লক্ষ্য হবে সম্পদ আহরণের জন্য দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর ভূমি দখল করা। এ ভূরাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন ভূকৌশল (Geo-Strategy)। সহজ কথায়, কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার সামরিক শক্তি, অর্থনৈতিক প্রভাব এবং কূটনৈতিক চাল কাজে লাগিয়ে তার ভৌগলিক অবস্থানকে সুদৃঢ় করবে, তার কৌশলগত পরিকল্পনা হলো ভূকৌশল। ভূকৌশল মূলত বৃহৎ শক্তিগুলোর আন্তর্জাতিক রাজনীতির অপরিহার্য মূলনীতি। ভূকৌশল ব্যতীত যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং ভারত আন্তর্জাতিক বিশ্বব্যবস্থায় তাদের প্রাধান্য বজায় রাখতে সক্ষম হবে না। তাই প্রতিটি রাষ্ট্রের একটি ভূকৌশল রয়েছে, যার অভিঘাতে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর ওপর এক ধরনের ভূরাজনৈতিক চাপ সৃষ্টি হয়, যা আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জস্বরূপ।

মেকেন্ডার যে পূর্ব ইউরোপকে কল্পনা করে তার মূল খণ্ড চিত্রয়ায়িত করেছিলেন, উত্তর-স্নায়ুযুদ্ধ (Post-Cold War) যুগে, তার বাস্তব সংস্করণ হলো পশ্চিম এশিয়া কিংবা মধ্যপ্রাচ্য। পূর্ব ইউরোপের ভৌগলিক অর্থপূর্ণ তাৎপর্য প্রাক্তন সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্যদিয়ে ১৯৮৯ সালে হয়েছিল। ১৯৮৯ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্যের সময়কে আমরা এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। ধীরে ধীরে বিশ্বে চীন অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে লাগল। অন্যদিকে ভারত দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে তার অপ্রতিদ্বন্দ্বী উত্থান সূচনা করল। পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে যোগদান করে ইউরোপকে একটি মহাদেশীয় শক্তিতে পরিণত করতে সচেষ্ট হলো এবং এর নেতৃত্বে রয়েছে প্রধাণত ফ্রান্স এবং জার্মানি। বর্তমান এ সময়টিকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, কারণ তারা কোনো একটি পরাশক্তির বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় একচ্ছত্র সিদ্ধান্ত গ্রহণের যোগ্যতাকে অস্বীকার করেন। কিন্তু বিশ্ব রাজনীতিতে বাস্তবতা ভিন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের পরাশক্তি বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনকে সাহস জুগিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির বিভিন্ন রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে ঔদ্বত্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত একপক্ষীয়ভাবে গ্রহণ করতে। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য দেশগুলোর ওপর একতরফাভাবে শুল্ক আরোপ, যার লক্ষ্য অর্থনৈতিক তুলনামূলক সুবিধা অর্জন নয় বরং যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর প্রভাব খাটিয়ে অন্য রাষ্ট্রকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল করা কিংবা সামরিক শক্তি ব্যবহার করে উসকানি ব্যতীত অন্য রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ঢুকে রাষ্ট্রপ্রধানকে অপহরণ করে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দি করা- এসবই পরাশক্তির এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা কায়েম করার পূর্বাভাস মাত্র।

বর্তমান ভূরাজনৈতিক অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্য হলো সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দু (Flash Point)। মধ্যপ্রাচ্যে ১৭টি দেশ রয়েছে। তারা হলো বাহরাইন, সাইপ্রাস, মিসর, ইরান, ইরাক, ইসরায়েল, জর্ডান, কুয়েত, লেবানন, ওমান, পেলেস্টাইন, কাতার, সৌদি আরব, সিরিয়া, তুর্কি, যুক্ত আরব আমিরাত এবং ইয়ামেন। সাইপ্রাস ব্যতীত প্রত্যেকটি দেশই মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম রাষ্ট্র। ইসলাম, খ্রিষ্টান এবং ইহুদি এই তিনটি ধর্মের পাদপীট জেরুজালেমও মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত। মুসলমান এবং খ্রিষ্টানদের মধ্যে ধর্মীয় যুদ্ধ ক্রসেডের লীলাভূমি হলো এই মধ্যপ্রাচ্য। মুসলমানদের বড় দুটি ধর্মীয় গোষ্ঠী- শিয়া ও সুন্নিও এ অঞ্চলে অবস্থিত। ভেনেজুয়েলার পরে মধ্যপ্রাচ্য হচ্ছে খনিজ তৈল উৎপাদনের বিশ্বসেরা অঞ্চল; তার মধ্যে সৌদি আরব রয়েছে সর্বোচ্চ অবস্থানে এবং এর পরেই ইরানের অবস্থান।

অতএব, মধ্যপ্রাচ্যের ওপর বড় বড় শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর একটা দৃষ্টি থাকা স্বাভাবিক। পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো শিয়া এবং সুন্নিদের সংঘাতকে কাজে লাগিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নিজেদের উপস্থিতিকে সুদৃঢ় করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২০টি সামরিক ঘাঁটি বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব এবং যুক্ত আরব আমিরাতে মোতায়েন রয়েছে। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম রাষ্ট্রগুলো কেবলমাত্র ইরান ব্যতীত, তাদের সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের ওপর ন্যস্ত করে রেখেছে। মুসলিম রাষ্ট্রগুলো নিজেদের ওপর আত্মবিশ্বাস না থাকার কারণেই মধ্য প্রাচ্যের আঞ্চলিক নিরাপত্তার এ করুণ পরিস্থিতি।

ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির কারণ হলো ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়াকে তাদের সাধারণ শত্রু হিসেবে গণ্য করে এবং রাশিয়ার বিশাল শক্তির মোকাবিলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের শরণাপন্ন হয়। এখন প্রশ্ন হলো, মধ্যপ্রাচ্যে এমন শক্তিশালী রাষ্ট্র কে, যার ভয়ে মুসলিম রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্র ব্যতীত তাদের নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সন্দিহান। কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো, এ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্মিলিত শত্রু কে হতে পারে। স্বভাবত উত্তর পাই ইসরায়েল। কিন্তু ইসরায়েলের প্রতি রাজকীয় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক দেখে মোটেই তা মনে হয় না। এদের ভয়ের কারণ ইসরায়েল নয়, ইরান। কারণ, মধ্যপ্রাচ্যে ইরানই একমাত্র মুসলিম রাষ্ট্র যারা বর্তমানে পেলেস্টাইনের পক্ষে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে। ইরানের পক্ষে হামাস এবং হিজবুল্লাহ ফিলিস্তিনিদের সহযোগিতা করে আসছে। অক্টোবর ২০২৩ হতে গাজা এবং পশ্চিম তীরে ইহুদিদের হাতে প্রায় ৮০ হাজার ফিলিস্তিনির মৃত্যু ঘটেছে, যার অধিকাংশই হলো শিশু এবং মহিলা। গণহত্যার এ ধরনের নগ্ন আগ্রাসন সাম্প্রতিক ইতিহাসে নেই। অথচ মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ব্যতীত কোনো মুসলিম রাষ্ট্রই ক্ষমতাধর ইসরায়েলের মুখোমুখী হতে রাজি নয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র হলো ইসরায়েল এবং রাজকীয় মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর মিত্র। এতে প্রমাণিত হয় যে, মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে মার্কিনি সৈন্যের উপস্থিতি ইরানের ওপরই একমাত্র হুমকি হিসবে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক খেলায় যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েল অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে মুসলমান রাষ্ট্রগুলোকে নিজেদের দাঁড় করিয়ে তাদের যৌথ সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করতে সক্ষম হয়েছে।

প্রথমে ইরাক, পরে লিবিয়া এবং সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় কাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর থেকে ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়া ব্যর্থ রাষ্ট্রে পতিত হয়েছে। গত ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে ইরানের ওপর যৌথ ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সরকার পরিবর্তনের (Regime Change) কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু এবারের আক্রমণ সম্পূর্ণ এক ভিন্ন যুদ্ধে রূপান্তরিত হয়েছে। একদিকে ইরান এবং অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলসহ তাদের মুসলিম মিত্র দেশগুলো। ইরান আক্রমণ চালিয়েছে কাতার, বাহরাইন, যুক্ত আরব আমিরাত এবং সৌদি আরবের ওপর। লক্ষ্য- এসব দেশে নিয়োজিত সামরিক ঘাঁটি। ইরানের এ ব্যতিক্রমধর্মী ভূরাজনৈতিক উদ্দেশ্য এ যুদ্ধকে এক ভিন্ন মাত্রায় উপনীত করেছে।

বর্তমানে ইরানের বিরুদ্ধে এ যুদ্ধ কতদিন চলবে, নিশ্চিত করে বলাটা কঠিন। কিন্তু কোন যুদ্ধ কবে শেষ হবে, তার সম্ভাব্যতা যাচাই করা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিরর্থক প্রমাণিত হয়। প্রেসিডেন্ট পুতিনের বিশ্বাস ছিল যে, ইউক্রেনের যুদ্ধ দুই সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। আজ প্রায় চার বছর হতে চলল এ যুদ্ধের, এরই মধ্যে সামরিক এবং বেসামরিক মৃত্যু সংখ্যা আমেরিকার প্রসিদ্ধ রাজনীতিবিদ, নেতা ক্রফডের গবেষণা অনুযায়ী, জুলাই ২০২৫ পর্যন্ত ছিল ৩ লাখ ২৩ হাজার। এখানে উল্লেখ্য যে, ভিয়েতনাম যুদ্ধের মেয়াদকাল ছিল প্রায় ১৩ বছর। সেখানে কেবলমাত্র আমেরিকান সৈন্য মৃত্যুবরণ করেছিল ৫৮ হাজার ২০০ জন এবং ভিয়েতনামের সামরিক এবং বেসামরিক নিহত সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল প্রায় ৯ লাখ। কিন্তু ভিয়েতনাম যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে কোনোরূপ ফলপ্রসূ ভূরাজনৈতিক কৌশলগত লক্ষ্য অর্জনে সফল করেনি। এতে প্রমাণিত হয় যে, শত্রুপক্ষ যদি জাতীগতভাবে একতাবদ্ধ থাকে, তাহলে সে সামরিকভাবে দুর্বল হলেও তাকে পরাস্ত করা অত্যন্ত কঠিন। ভিয়েতনাম এবং ইউক্রেনের ক্ষেত্রে সেটাই প্রমাণিত হয়েছে। বিশ বছর নিরলস ধৈর্য এবং অটলতার মধ্যদিয়ে তালেবানরা প্রমাণিত করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের মত পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধেও যুদ্ধ করে ক্ষমতায় ফিরে আসা যায়। আফগানিস্তানে তালেবান পরিবর্তন কৌশল সক্ষম হয়নি, ইরানের ক্ষেত্রে সক্ষম হবে কি না, তা নিশ্চিত করে বলা দুষ্কর।

অতএব, বৃহৎ রাষ্ট্রগুলোর বিশেষ করে ইউরোপীয় নেতাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টা হওয়া উচিত এ যুদ্ধ কত দ্রুত বন্ধ করা যায়। এ যুদ্ধের অভিঘাত সরাসরি ইউরোপ এবং তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর ওপর পড়বে। কারণ জ্বালানির অভাব এ দুই শ্রেণির রাষ্ট্রের অর্থনীতিকে ক্ষতি করতে বাধ্য।

বাংলাদেশে নতুন সরকার গঠিত হয়েছে। আগামী দিনগুলোতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে হলে এখন থেকেই সরকারকে উঠে পড়ে লাগতে হবে। বর্তমান এই যুদ্ধ বাংলাদেশের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থ বহন করে। অথছ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে আমরা জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন করতে পারিনি। মধ্যপ্রাচ্য এবং বিশ্বব্যবস্থার ভবিষ্যৎ চিত্র অনুধাবনের জন্য জাতীয় নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এ প্রতিষ্ঠানটি যে কত তাৎপর্যপূর্ণ, তা বর্তমান পরিস্থিতিতে বোঝার অপেক্ষা রাখে না।

লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত

৯১তম জন্মদিনে শ্রদ্ধাঞ্জলি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অসামান্য গদ্যশৈলীর রূপকার
হরিপদ দত্ত

ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯১তম জন্মদিনে মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি। ভিন্দেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো হবেও না আমৃত্যু।...

রাজনৈতিক প্রবন্ধ সাহিত্যের উদ্দেশ্য হচ্ছে পাঠক মননে শ্রেণি-শাসিত সমাজ সম্পর্কে কৌতূহল সৃষ্টি করা। যে শ্রেণিবিভক্ত সমাজে পাঠক বসবাস করে সেই সমাজ সম্পর্কে এক ধরনের অজ্ঞতা, অস্পষ্টতা বা অমনোযোগিতায় আচ্ছন্ন থাকে তারা। রাজনৈতিক প্রবন্ধ সমাজের গতি-প্রকৃতির স্বরূপটি উদ্ঘাটন করে পাঠকের সামনে তুলে ধরে এবং সে সম্পর্কে কৌতূহলী পাঠককে তাদের সামাজিক দায়দায়িত্ব বোধের আলোর সামনে এগিয়ে যেতে সহায়তা করে। রাজনীতি অবশ্যই একটি জটিল বিষয়। তাই এ বিষয়টিকে পাঠকের সামনে বিশ্লেষণ করতে গেলে কেবল তত্ত্ব নির্মাণই প্রধান কাজ নয়, লেখকের ভাষা বা গদ্যশৈলীটিও হতে হবে শিল্পগুণে অন্বিত। জটিল শব্দ চয়ন, বাক্য-বিন্যাস কুয়াশাচ্ছন্ন ভাব দ্বারা বিষয়বস্তুকে দুর্বোধ্য করে তুললে রচনার উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়ে যায়। গদ্যের জটিলতার কারণে যদি বিষয়বস্তুর ভেতর পাঠক প্রবেশ করতে না পারল, তবে লেখক নিজের জন্য তো নয়, পাঠকের জন্যও কোনো সুসংবাদ বহন করতে পারেন না।

বাংলাদেশের সাহিত্যে রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধ তথা প্রগতিশীল রাজনৈতিক প্রবন্ধের ইতহাস খুব বেশি পুরাতন নয়। যদিও এর সূত্রপাত অভিভক্ত বাংলায়, তবু নিজস্ব ধারাটি তৈরি হয়েছে পঞ্চাশের দশকের ঢাকা শহরকে কেন্দ্র করে। প্রকৃত অর্থে এর চূড়ান্ত বিকাশ ঘটেছে স্বাধীনতা-উত্তরকালে। কলকাতাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চার ধারা থেকে ঢাকাকেন্দ্রিক বুদ্ধিচর্চার ধারাটি যে স্বতন্ত্র তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে ষাটের দশকের শেষ দিকে। কেননা, পশ্চিমবঙ্গে দিল্লির কেন্দ্রীয় শাসন এবং পূর্ববঙ্গ (বাংলাদেশ) পাকিস্তানি শাসনে থাকার ফলে বাংলার দুটি অংশেরই সামাজিক ও রাজনৈতিক রূপরীতির পরিবর্তন ঘটে। কেবল রাজনৈতিক বাস্তবতা নয়, সাংস্কৃতিক তথা বাংলাভাষার সাহিত্যের বিষয় এবং রূপগত স্বতন্ত্রধারাটিও স্পষ্ট হয়ে পড়ে সে সময়। রাজনৈতিক ধারার প্রবন্ধের ক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর থেকে শুরু করে গোপাল হালদার, বিনয় ঘোষ, আবু সায়ীদ আইয়ুব এবং আরও অনেকে বিষয়-ভাবনা এবং রূপান্তরীতির বিবর্তন ঘটিয়েছেন। কিন্তু বাঙালি জাতির আলাদা রাষ্ট্রের দীর্ঘ জন্মযন্ত্রণা এবং জন্মের ধারাবাহিক কম্পন-প্রকম্পনের মধ্যদিয়েই নতুন অভিযাত্রার স্বতন্ত্র রূপ রাজনৈতিক ধারাটি প্রবন্ধ সাহিত্যে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যায় ড. আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সরদার ফজলুল করীম, দেবেন শিকদার, ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল কাসেম ফজলুল হক এবং পরবর্তীতে ফরহাদ মজহার, আহমদ ছফা এবং আরও অনেককে। আমার লেখার উদ্দেশ্য রাজনৈতিক ধারার লেখালেখির বিষয় ভাবনা নয়, রূপরীতি তথা গদ্য স্টাইলটি।

সমাজবাদী দর্শনের আলোকে প্রবন্ধ রচনা অত্যন্ত জটিল সাহিত্যকর্ম। দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের জটিল প্রক্রিয়ায় সমাজ ও রাষ্ট্রকে আগে শনাক্ত করতে হয়, তার পর শুরু নিজের লেখাটি। কাজটি অনেকটা নিষ্কাম সাধনার মতো। কাজ করা কিন্তু ভোগের তৃষ্ণাকে দমন করা। খ্যাতির মোহ সেখানে অদৃশ্য। কেননা সমাজবাদী রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা নিজের জন্য বা আত্মরতির জন্য সাহিত্য রচনা করেন না, উদ্দেশ্যটা হচ্ছে সমাজ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জানেন তার লেখালেখির উদ্দেশ্য পাঠকের স্নায়ুতে মাদক রস কিংবা আমোদ-প্রমোদ রস প্রবেশ করানো নয়, পাঠকের চিন্তার অনুশীলন দ্বারা সামাজিক সত্যের সামনে দাঁড় করানো। একটু মনোযোগ দিয়ে পাঠক যদি তার রচনা পাঠক করেন তবেই লেখকের শিল্প কৌশলটি ধরতে পারবেন। দ্বন্দ্বমূলক, বস্তুমূলক বস্তুবাদের সূত্র-উপসূত্র এবং অনুগামী সূত্রগুলোকে তিনি প্রথমেই ছড়িয়ে দেন চলমান সমাজ জীবন ও রাজনীতিতে। তার পর গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন সমাজস্থিত শ্রেণিগুলোর আচরণ ও গতি-প্রকৃতি। নিরীক্ষণ বা পর্যবেক্ষণের পর বিশ্লেষণের কাজে হাত দেন তিনি। এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তির কাজকর্ম ও জীবনকে তিনি পর্যবেক্ষণ করেন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বমূলক কৌশলে এবং শ্রেণির প্রতিনিধি হিসেবে বিবেচনা করে। ‘তাজউদ্দীন আহমদের অবস্থান’, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা’, ‘শেখ মুজিবের অঙ্গীকার’, ‘বিদ্যাসাগরের কাজ’ ‘আমার পিতার মুখ’ ইত্যাদি প্রবন্ধ তার দৃষ্টান্ত।

যেকোনো লেখাই (প্রবন্ধ) যখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী লিখতে বসেন তখন তার গদ্য রূপটি হয়ে ওঠে একের ভেতর বহুর রূপ। কখনো গল্পের প্রতীকী ব্যঞ্জনায় কিংবা কখনো কবিতার শব্দ ও ছন্দের অনিবার্য বিন্যাসে সমাজের স্বপ্ন ও আগামী কল্পনার রূপকে নিজের করে নিয়ে তিনি পাঠকের সামনে তুলে ধরেন। তার রচনায় ‘উত্তম পুরুষ’ রীতিতে বলা গদ্য এবং ‘সর্বজ্ঞ লেখকের দৃষ্টিকোণ’ থেকে বলা গদ্যগুলো পাঠ করলে বোঝা যায়, গদ্যরীতিটি সুনির্দিষ্ট বিষয়ের জন্যই উপযুক্ত। তাই মনোযোগী এবং কৌতূহলী পাঠক ভুলে যান তিনি গদ্য কবিতা নাকি গল্প নয় তো প্রবন্ধ পাঠ করছেন। প্রবন্ধের গঠনরীতিটি যে মন্ময় বা তন্ময় উপবিভাগ রয়েছে, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্যের ভেতর তা মিলেমিশে একাকার হয়ে সম্পূর্ণ আলাদা রীতিতে পরিণত হয়। সেই গদ্যরীতিটিই তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর। তার এই গদ্যশৈলীর পেছনে কাজ করে নিজস্ব গভীর শ্রেণিজ্ঞান বা শ্রেণি চেতনা। সেই জ্ঞানে ঋদ্ধ বলেই তিনি মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে ওঠে আসা পাঠক শ্রেণি এবং সাধারণ মানুষের বোধ বা অনুভবের ভাষাকে বুঝতে পারেন।

আর একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করার মতো বাংলাদেশ তো বটেই, পশ্চিম বাংলায়ও বহু পাঠক আছেন যারা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক দর্শনে আগ্রহী এবং তার গদ্যের মুগ্ধ পাঠক। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত খ্যাতিমান অধ্যাপক অমলেন্দু দের মন্তব্য হচ্ছে, ‘দ্যাখো, মি. চৌধুরীর গদ্য বলার ঢংটি কিন্তু চমৎকার। রাজনীতির শুকনো কথাগুলোকে তিনি কী করে যেন খাঁটি শিল্প বানিয়ে ফেলেন। আজকাল অমনটা কলকাতায়ও খুব একটা দেখা যায় না।’

শিল্পচর্চার বিষয়টিতে অন্য অনেকের সঙ্গে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রয়েছে পার্থক্য। তিনি প্রতিনিয়ত যে চর্চা করেন তার প্রমাণ তার ক্রমবিকাশমান গদ্যশৈলী। তার প্রবন্ধের গদ্যশৈলী কবিতার মতো অলংকার বহুল। চিন্তার সঙ্গে যুক্তি এবং সূক্ষ্ম অনুভবের সঙ্গে যুক্ত করে কৌতুক। ‘দুই বাঙালির লাহোর যাত্রা’ প্রবন্ধে পাকিস্তান প্রস্তাবের বিষয়টি লেখক এভাবে বর্ণনা করছেন, ‘হক সাহেবের প্রস্তাবটি তার নিজের ছিল না। ধারণা নয়, ভাষাও নয়, সবই মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর। মঞ্চে ওঠার আগে প্রস্তাবটি হক সাহেব দেখেনওনি, তিনি তৈরি প্রস্তাব পড়ে দিয়েছিলেন শুধু। বলা তাই সম্ভব যে তিনি এটি উপস্থাপন করেননি, তাকে দিয়ে উত্থাপন করিয়ে দেওয়া হয়েছে, কণ্ঠ তার স্বর অন্যের।’ (নির্বাচিত রাজনৈতিক প্রবন্ধ: পৃ. ৪৪) এই গদ্য পাঠকচিত্তে যেমনি কৌতূহল সৃষ্টি করে তেমনি করে কৌতুক। অন্যদিকে ‘কণ্ঠ এবং স্বর’ শব্দ দুটি গভীর ব্যঞ্জনা কবিতার মতো হয়ে ওঠে। লেখক গদ্যের শরীরের চিত্রকল্পের আবহ নির্মাণ করে কাব্যের কৌতুক রস পরিবেশনের ভেতর দিয়ে তীব্র শ্লেষ সৃষ্টিতেও দক্ষ। যেমন, ‘মুসলমান সমাজে মাকড়সার জাল বোনা অনেকটাই চলল; শাস্ত্র নিয়ে তর্ক হলো। পুঁথিসাহিত্যের চর্চা হলো। কিন্তু বুর্জোয়া বিকাশের উদার আলো তেমন দেখা গেল না।’ (বেকনের মৌমাছিরা: নির্বাচিত প্রবন্ধ: পৃ. ১৬২)।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ঘটনা বা তার কার্যকারণের ওপর আলোকসম্পাৎ করে পাঠককে নিজের বোধের অংশীদার করে নেন। যেমন, ঐতিহাসিক ভাষা আন্দোলনের কথা তিনি এভাবে বাণীবন্ধন করেন, ‘আমি উৎপাটিত নই, আমি বেড়ে উঠব বৃক্ষের মতো, শেকড় প্রোথিত থাকবে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ভূমিতে, আকাঙ্ক্ষা ছিল এটাও।’ (বায়ান্নর আন্দোলন: নিঃরাজনৈতিক পৃ. ৪১)। গদ্যের এই বাণীভঙ্গিটি আবেগাত্মক অথচ প্রত্যয়দৃঢ় বাণীর মিশ্রণে তৈরি হয়েছে। পাঠকের স্বপ্ন ও উত্তেজনা সত্তার সঙ্গে একাকার হয়ে যায় এ কারণে যে, বিষয়বস্তুর সঙ্গে লেখকের ব্যক্তিত্বও মিশে একাকার হয়েছে। রচনার সঙ্গে লেখক ব্যক্তিত্বের মেলবন্ধনের বিষয়টি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতিটি প্রবন্ধে ছড়িয়ে আছে। ‘লেনিন কেন জরুরি’ প্রবন্ধে তাকে পাওয়া যায় কী অসীম বিশ্বাসে দৃঢ়। সোভিয়েত সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় লেখক চিত্তে ক্ষোভ-দুঃখ সৃষ্টি হয় কিন্তু আপন বিশ্বাসকে, ব্যক্তিত্বকে বিপর্যয়ে ঠেলে দেন না তিনি। তিনি লিখলেন, ‘যতদিন পৃথিবীতে শোষণ থাকবে ততদিন তিনি থাকবেন। মূর্তি ভাঙলেও তিনি অমর হয়ে রইবেন।... পৃথিবী যদি শোষণশূন্য হয় কখনো, লেনিন তখনো থাকবেন। তখন থাকবেন ইতিহাসের অন্তর্গত হয়ে।’ (নির্বাচিত প্রবন্ধ: পৃ. ২৭৬)। বাক্যটিতে বা অনুচ্ছেদটিতে কোথাও আবেগের উচ্ছ্বাস নেই, নাটকীয় বাণীবিন্যাসও নেই, রোমান্টিক অলীক স্বপ্নও নেই। আছে বিশ্ববাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে দূরদর্শী মানুষের চূড়ান্ত ব্যক্তিত্বের হিসাব। এই ব্যক্তিত্বই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে দাঁড় করিয়ে দেয় তার শিল্প মানসে। তাই তার গদ্য হয়ে ওঠে জনগণের শিল্প সম্পত্তি।

রচনার স্টাইল রচয়িতার মানস ব্যক্তিত্বের পরিচায়ক। সেই ব্যক্তিত্বের কারণেই রচনা হয়ে ওঠে ব্যাকরণ শুদ্ধ, ভাষায় গভীর, বুদ্ধিতে সূক্ষ্ম, চিন্তায় পরিচ্ছন্ন, প্রকাশভঙ্গিতে স্নিগ্ধ। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর রাজনৈতিক ধারার গদ্যের ভাষাটি তার অর্জিত ব্যক্তিত্বেরই প্রতিফলন। ২৩ জুন প্রিয় এই ব্যক্তিত্বের ৯১তম জন্মদিনে মর্মান্তিক দেশভাগের হতভাগ্য শিকার আমি। ভিন্দেশের নাগরিক হয়েও স্বদেশ ভুবনের পিছুটান এড়ানো সম্ভব হয়নি। হয়তো হবেও না আমৃত্যু। শ্রদ্ধেয় স্যারকে জন্মদিনে জানাই অফুরান শ্রদ্ধা-ভালোবাসা।

লেখক: কথাসাহিত্যিক

অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৬, ০৪:৪৮ পিএম
অস্তিত্ব সংকটে মমতার তৃণমূল
সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত

কলকাতার পরিস্থিতি যদি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তাহলে দিল্লি আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি। বিধানসভায় ফাটল তৃণমূলকে চাপে ফেলেছে। কিন্তু লোকসভার ভাঙন আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক প্রভুত্বের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলার ক্ষমতায় থাকা। আর দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে বড় সংসদীয় দল ধরে রাখা। এই দুটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়েছে।...

ভারতের অঙ্গরাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সদ্য পরাজিত শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস কার্যত বিলুপ্ত হওয়ার পথে। শুধু তাই নয়, একথা এখনই স্পষ্টভাবে বলে দেওয়া যায় যে, ওই দলটির মাথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন।

রাজনৈতিক দলের নির্বাচনে পরাজয় কোনো নতুন বিষয় নয়। ভোটে হারার পর কোনো কোনো দল আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে আসে। কোনো কোনো দলকে বছরের পর বছর কাটাতে হয় বিরোধী পক্ষে। তার পর ফিরে আসে ক্ষমতায়। কোনো কোনো দল আবার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। পরিণতি যাই হোক না কেন, রাজনৈতিক দলকে আসল পরীক্ষার মুখে গড়তে হয় নির্বাচনে পরাজয়ের পর।

কিন্তু তৃণমূল দলের অবস্থা হলো–এক বিধায়ক প্রকাশ্যে দলের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন। তাকে সমর্থন করছেন অন্য নির্বাচিত বিধায়করা। পরিষদীয় দলের মতো সংসদীয় দলেও চওড়া হচ্ছে ভাঙন। দলীয় লাইনের বাইরে গিয়ে অধিকাংশ বিধায়ক এনডিএ সরকারকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। দলের প্রবীণ নেতারা শীর্ষ নেতাদের একাধিক সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন প্রকাশ্যে। এমন কিছু যে হতে পারে তা কয়েক বছর আগে ছিল কল্পনারও অতীত। শুধু কয়েক বছর আগে কেন, এই ২০২৬ সালের প্রথম দিকেও এরকম কোনো সম্ভাবনাকে বাস্তবোচিত বলে মনে করা ছিল প্রায় অসম্ভব। কিন্তু আজ তৃণমলের কাছে এসবই ঘোর বাস্তব, চূড়ান্ত সত্যি।

আর তাই বঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বিরাট জয় পশ্চিম বাংলার রাজনীতির সব থেকে বড় খবর নয়। বরং ১৫ বছর ধরে বাংলার শাসনব্যবস্থা যে দলের হাতে ছিল তাদের অভ্যন্তরীণ বিবাদই জায়গা করে নিয়েছে শিরোনামে। জীবনের একটা দীর্ঘ সময় বিরোধী থাকার পর একদা ক্ষমতায় আসা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে এই প্রথম অস্তিত্বের সংকটে পড়তে হচ্ছে। আবারও ক্ষমতায় ফেরার প্রশ্ন তো কোনো ছাড়–ক্ষমতার বাইরে থাকা অবস্থায় তার দল টিকে থাকবে কি না সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

নির্বাচন-পরবর্তী বিধানসভার ট্রেজারি বেঞ্চ বা শাসকপক্ষের তরফ থেকে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য খবরটি আসেনি। এসেছে ক্ষমতাচ্যুত তৃণমূলের তরফ থেকে। উলুবেড়িয়া পূর্ব আসনের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে সামনে রেখে যেভাবে একদল তৃণমূল বিধায়ক বিদ্রোহ করেছেন তা কয়েক মাস আগেও ছিল কল্পনার অতীত। তাকে বরখাস্ত করেছে তৃণমূল। কিন্তু বিধানসভার খাতাকলমে এখন তিনিই তৃণমূলের নেতা। এখান থেকেই বোঝা যায়, এখন তৃণমূলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি ঠিক কতটা খারাপ।

কলকাতার পরিস্থিতি যদি তৃণমূলকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে তাহলে দিল্লি আরও বড় চ্যালেঞ্জ নিয়ে তৈরি। বিধানসভায় ফাটল তৃণমূলকে চাপে ফেলেছে। কিন্তু লোকসভার ভাঙন আরও বড় সংকট তৈরি করেছে। জাতীয় রাজনীতিতে মমতার রাজনৈতিক প্রভুত্বের দুটো দিক আছে। প্রথমত, বাংলার ক্ষমতায় থাকা। আর দ্বিতীয়ত, দিল্লিতে বড় সংসদীয় দল ধরে রাখা। এই দুটির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই দুর্বল হয়েছে।

তৃণমূলের অসন্তোষের অন্যতম বড় দিক একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে। তা হলো গত কয়েক বছরের মধ্যে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন্দ্র করে তৈরি হওয়া নেতৃত্বের মডেল। সেসব অভিযোগ এখন খুবই চেনাজানা। পরামর্শদাতা সংস্থার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা, ক্ষমতার একচ্ছত্র কেন্দ্রীকরণ, দলের ভেতরে বিতর্কের অবকাশ কমে যাওয়া এবং নিচুতলার কর্মীদের সঙ্গে নীতি-নির্ধারকদের দূরত্ব–এ ধরনের নানা অভিযোগ এখন একত্রিত হয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। অভিযোগ সত্য না মিথ্যা সেটা আর বিবেচ্য নয়। যা বিবেচ্য তা হলো সবাই এখন প্রকাশ্যেই এ ধরনের কথা বলছেন। এ পরিস্থিতিতে মমতার ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তার গোটা রাজনৈতিক জীবনের বিভিন্ন সময়ে সংকট এসেছে। প্রতিবার তিনি নিজেই তার ত্রাতার ভূমিকা নিয়েছেন। তার সুনামের নেপথ্যে আছে তার রাজনৈতিক প্রতিরোধ। তাকে এভাবেই দেখতে প্রস্তুত সমর্থকরা। তাই নির্বাচনের পর থেকে মমতার নীরব অবস্থান তার সমর্থকদের কাছে শুধু অচেনাই নয়, উদ্বেগেরও কারণ বটে। তৃণমূলের সংকটের কারণ শুধু একটা নির্বাচনে পরাজয় নয়। বরং ক্ষমতা ছাড়া দলটির অস্তিত্ব থাকে কি না, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।

ষোলোআনা বেআব্রু হয়েছে দলবদলের রাজনীতির কদর্য রূপ। তৃণমূলের ২০ জন সাংসদের সর্বশেষ পদক্ষেপ–এনসিপিআইয়ের মতো অজ্ঞাতনামা একটি দলে প্রত্যেকের যোগদান। দলবদল করলে মুখে অন্তত নতুন দলের আদর্শ সম্পর্কে কিছু কথা থাকত। কিন্তু যে দলটাই অস্তিত্বহীন, সে সম্পর্কে কী-ই বা বলতে পারেন বেপথুরা। কোনো এককালে দলটির রেজিস্ট্রেশন হয়েছিল নির্বাচন কমিশনের খাতায়। তার পশ্চিমবঙ্গে না আছে কোনো সংগঠন, না কর্মতৎপরতা। এরা একসময় ত্রিপুরায় কয়েকটি নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল বলে জানা গেছে। সেখানেও না মিটিং, না মিছিল–কেবল খাতাকলমে নামটা ছিল। সেই দলে যোগ দিতে হলো তৃণমূলের তথাকথিত বিদ্রোহী সাংসদদের। উদ্দেশ্য আসলে একটাই–কী করে সাংসদ পদ বাঁচিয়ে তৃণমূল কংগ্রেস ছাড়া যায়। বিজেপিতে যোগ দেওয়াটা যখন অসম্ভব হয়ে পড়েছে তখন এ রাস্তায় যাওয়ার বুদ্ধিই দেওয়া হয়েছে। 
 
এ ছাড়া আর উপায়ই বা কী আছে? বিজেপির পক্ষ থেকে তাদের সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, হয় দল বদলাও, নয়তো জেলে যাও। কাজেই এভাবে নিজেদের সাংসদ পদ বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন ওই সাংসদরা। তবে শেষ রক্ষা হবে কি? ওয়াকিবহাল মহল কিন্তু বলছে, আলাদা দলে যোগ দিয়েও নিস্তার পাওয়ার উপায় নেই।

এদিকে চলতি সপ্তাহেই সম্প্রতি আগ্নেয়াস্থ এবং বুলেটের স্তূপ উদ্ধার হয়েছে উত্তর চব্বিশ পরগনার সন্দেশখালী ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার বাসন্তীতে। এর আগে ধৃত এক তৃণমূল নেতার ভাই এবং ঘনিষ্ঠদের জেরা করে যে তথ্য মেলে, তার ভিত্তিতে রাজ্য পুলিশের বিশেষ টাস্ক ফোর্স স্থানীয় একটি পুকুরে তল্লাশি অভিযান চালায়। সেখান থেকেই এবার প্রচুর অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র এবং কার্তুজ উদ্ধার করেছেন তদন্তকারীরা। ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনআইএর আধিকারিকরা মনে করছেন, এই অনুশস্ত্র উত্তর ও দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের জিহাদিদের কাছে চালান করা হতো। গোটা ব্যাপারটাই যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যবস্থাপনায় হতো সে ব্যাপারে সোচ্চার হয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলী ঘোষ দস্তিদার। তৃণমূল সরকারের প্রশাসন সবটাই জানত, কিন্তু তাদের চোখ বন্ধ করে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল সর্বোচ্চ মহল থেকে।

লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৫:১০ পিএম
অপরাধ নির্মূলে কার্যকর ভূমিকার বিকল্প নেই
মো. সাখাওয়াত হোসেন

অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে রায় কার্যকর করা যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব, ঠিক তেমনিভাবে অপরাধ প্রতিরোধেও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের উৎস ধ্বংসে সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন ব্যক্তিদের বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্রতী হতে হবে।...

সমাজের অস্তিত্বের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের উপস্থিতি একটি অত্যাবশ্যকীয় বিষয়। সমাজ পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধের ধরন, বৈচিত্র্যতা, অপরাধীর সক্রিয়তা ইত্যাদি সার্বিক বিষয় ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। অপরাধী অপরাধ করবেই, সামাজিক বাস্তবতায় অপরাধের সুযোগও আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। ডিজিটালাইজের কারণে পৃথিবীর পরিধিও ছোট হয়ে এসেছে। অপরাধীরা এক দেশে বসে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় তাদের অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে। ঠিক তেমনিভাবে বাংলাদেশে বসেও আমরা পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের অপরাধীর দ্বারা আক্রান্ত হতে পারি। মাঝেমধ্যে দেখা যায়, সরকারি ওয়েবসাইট হ্যাক হয়ে যাচ্ছে। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে মানুষ। অনলাইনের ফাঁদে পড়ে রাষ্ট্রের জরুরি তথ্য অন্য দেশের হ্যাকাররা সহজেই ছিনিয়ে নিচ্ছে। বর্ডার-ভিত্তিক অপরাধের সংখ্যা পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। মানব পাচার, মাদক পাচার ও অন্যান্য পাচারের অপরাধ সহসাই ঘটছে। তাছাড়া যুদ্ধময় পৃথিবীতে ভাইরাসের জীবাণু কৃত্রিমভাবে ছড়িয়ে দিয়ে সাধারণ জনগণকে আক্রান্ত করা হচ্ছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে, সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে অপরাধের বৈচিত্র্যতা পরিবর্তিত হচ্ছে এবং অপরাধও তীব্রতর হচ্ছে; ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ জনগণ। তাছাড়া পুঁজিবাদ বাজার ব্যবস্থাপনায় একদল মানুষ আর্থিকভাবে শক্তিশালী হচ্ছে এবং অন্য দলের অবস্থা ধীরে ধীরে খারাপ হচ্ছে। যাদের অবস্থা ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে তারা নানাভাবে অপরাধে আক্রান্ত হচ্ছে।

সঙ্গত কারণেই সরকারকে পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয় এবং কতিপয় ক্ষেত্রে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়। সরকারের প্রচলিত নিয়মে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অপরাধ নির্মূলে সর্বতভাবে কাজ করছে। তথাপি অপরাধ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়ে উঠছে না। জনমানুষের স্বস্তির জন্য হলেও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে সরকারকে বিকল্প উপায় বের করতে হবে। প্রয়োজনে বিকল্প উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির দিকে মনোযোগ দিতে হবে। কমিউনিটির ওরিয়েন্টেশনকে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়ে সমাজ থেকে অপরাধের সব ধরনের উৎস নির্মূল করতে হবে, অপরাধীদের অপরাধ সংঘটনের কারণগুলো উদ্ঘাটন করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। বিশেষ করে পুলিশের নিয়মিত পেট্রলিং, টহল, জনসাধারণের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের ভিত্তিতে অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশ কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে।

নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও আধুনিক করার লক্ষ্য নিয়ে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বাড়িয়েছে সরকার। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার, সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং দুর্যোগব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১ হাজার ৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপনকালে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য এ বরাদ্দের প্রস্তাব দেন। এর আগে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ মন্ত্রণালয়ের মূল বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ১ কোটি টাকা এবং সংশোধিত বরাদ্দ দাঁড়ায় ২৭ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়া এ বাজেটে পুলিশ, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, ফায়ার সার্ভিস ও মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের আধুনিকায়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে গত অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বাড়লেও তা খুব বেশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে নয়।

নতুন বাজেটের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো জননিরাপত্তা ও সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের বিনিয়োগ। বাজেট নথি অনুযায়ী, জননিরাপত্তা বিভাগের মূল দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সন্ত্রাস ও উগ্রবাদ দমন, সীমান্ত সুরক্ষা, চোরাচালান প্রতিরোধ, কারাগার ব্যবস্থাপনা, মাদক নিয়ন্ত্রণ, পাসপোর্ট ও ভিসা সেবা এবং অগ্নি ও দুর্যোগ মোকাবিলা কার্যক্রম। এসব ক্ষেত্রে ব্যয় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রত্যেকটি সেক্টরই নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ইস্যুকে ভিত্তি করে বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বাংলাদেশ পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীটির সক্ষমতা বৃদ্ধির অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের জন্য আধুনিক সরঞ্জাম সংগ্রহ, সন্ত্রাস দমন ও আন্তর্জাতিক অপরাধ প্রতিরোধকেন্দ্র নির্মাণ এবং জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বাড়ানোর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি ও ডিজিটাল নিরাপত্তাঝুঁকি মোকাবিলায় পুলিশকে আরও প্রযুক্তিনির্ভর বাহিনীতে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে অনলাইন প্রতারণা, সাইবার হামলা ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা দেখা গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজেটে ডিজিটাল তদন্ত সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় নতুন গতি আসতে পারে।

সীমান্ত নিরাপত্তাও এবার বাজেটের অগ্রাধিকারের তালিকায় রয়েছে। সীমান্ত এলাকায় ৭৩টি আধুনিক কম্পোজিট বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) নির্মাণ, নবগঠিত ৬৩ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সীমান্ত নজরদারি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সীমান্তে চোরাচালান, অবৈধ অনুপ্রবেশ ও আন্তসীমান্ত অপরাধ নিয়ে যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, নতুন বাজেটে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। উপকূলীয় নিরাপত্তা ও সামুদ্রিক সম্পদ রক্ষায় বাংলাদেশ কোস্ট গার্ডের জন্যও নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতে প্রতিস্থাপক জাহাজ সংগ্রহের উদ্যোগ রাখা হয়েছে। বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে বাণিজ্যিক ও কৌশলগত গুরুত্ব বাড়ায় সামুদ্রিক নিরাপত্তা জোরদারকে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

দুর্যোগ ও অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলায় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে। দেশের ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে নতুন ফায়ার স্টেশন নির্মাণ এবং পুরোনো স্টেশন পুনর্নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য আবাসিক ভবন নির্মাণ করা হবে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ও শিল্পাঞ্চলগুলোতে বড় কয়েকটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ফায়ার সার্ভিসের সক্ষমতা বাড়ানোর দাবি আরও জোরালো হয়েছে। মাদক নিয়ন্ত্রণেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্র নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযান জোরদারের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্প্রসারণের মাধ্যমে এ সমস্যাকে সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত দৃষ্টিকোণ থেকেও মোকাবিলার পরিকল্পনা রয়েছে।

কারাগারব্যবস্থার উন্নয়নেও বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ময়মনসিংহ কেন্দ্রীয় কারাগার পুনর্নির্মাণ, নরসিংদী জেলা কারাগার নির্মাণ এবং পুরান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের ঐতিহাসিক স্থাপনা সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। সরকারের লক্ষ্য কারাগারগুলোকে ধীরে ধীরে আধুনিক সংশোধনাগারে রূপান্তর করা। এদিকে পাসপোর্ট ও অভিবাসনব্যবস্থার আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট সেবাকে আরও ডিজিটাল ও সহজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, দ্বৈত নাগরিকত্ব এবং অভিবাসন-সংক্রান্ত সেবার ক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, সীমান্তব্যবস্থাপনা এবং প্রযুক্তিনির্ভর অপরাধ মোকাবিলার চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে এবারের বাজেটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ বৃদ্ধি করা হয়েছে। বাস্তবায়ন দক্ষতা নিশ্চিত করা গেলে এ বিনিয়োগ দেশের নিরাপত্তা অবকাঠামোকে আরও শক্তিশালী ও আধুনিক করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। দেশের শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেক বাহিনীকে বিশেষায়িত হিসেবে তৈরি করার নিমিত্তে সরকার বাজেটে বরাদ্দ রেখেছে। এখন বাস্তবায়নের ওপর বাজেট বরাদ্দের সফলতা ব্যর্থতা নিরূপণ করা সম্ভব হবে।

কাজেই সরকারের উচিত হবে পরিবর্তনশীল বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে অপরাধীদের শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করে রায় কার্যকর করা যেমনভাবে সরকারের দায়িত্ব, ঠিক তেমনিভাবে অপরাধ প্রতিরোধেও সরকারকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। অপরাধের উৎস ধ্বংসে সব ধরনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে; অপরাধে উদ্বুদ্ধ হতে পারে এমন ব্যক্তিদের বাধাগ্রস্ত করতে পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নে ব্রতী হতে হবে। দেশের সব পর্যায়ের জনসাধারণকে নিরাপদে ও নিশ্চিতে বসবাসের অধিকার প্রদানে সরকারকে ঐক্যবদ্ধ ও আধুনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।
 
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

প্রস্তাবিত বাজেট ২০২৬-২৭ আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে

প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫০ পিএম
আপডেট: ২২ জুন ২০২৬, ০৪:৫১ পিএম
আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হবে
গোলাম মোহাম্মদ কাদের

দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।...

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতার প্রারম্ভে এ বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অগ্রযাত্রা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন। গণতান্ত্রিক বাজেট কী তা পরিষ্কার হয়নি আমার কাছে। তবে মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতি বলতে উনি দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ব্যাপকভাবে সামাজিক সুরক্ষা জালের আওতায় আনার প্রস্তাব করেছেন। তা ছাড়া সব শ্রেণির মানুষের জন্য মোটামুটি যে যা চেয়েছে তা দেওয়ার অঙ্গীকার বাজেটভুক্ত করেছেন। সে হিসেবে বাজেটটি নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়ন ও জনতুষ্টিমূলক বা সবাইকে খুশি করার বাজেট বলা যায়। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট ৯,৩৮,০০০ কোটি টাকা। যার মোট পরিচালন ব্যয় ৬,২১,৯২৫ টাকা। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের অর্থ সংগ্রহ কীভাবে হবে: রাজস্ব আহরণ ৬,৯৫,০০০ টাকা, অনুদান ৬,১৫০ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ১,০৯,৮৫০ টাকা, অভ্যন্তরীণ ঋণ ১,২৭,০০০ টাকা। মোট অর্থ সংগ্রহ ৯,৩৮,০০০ টাকা। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। বাজেটের অগ্রাধিকার বলতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জনগণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও বেসরকারি বিনিয়োগ উৎসাহিত করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে সংস্কার, রপ্তানি বৃদ্ধি এবং শিল্প উৎপাদন সম্প্রসারণ, সামাজিক নিরাপত্তা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন; করব্যবস্থাকে আধুনিক, স্বচ্ছ ও বিনিয়োগবান্ধব করা। সাধারণ মানুষের জন্য সম্ভাব্য প্রভাব রয়েছে: নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজার স্থিতিশীল রাখার উদ্যোগ, মধ্যবিত্ত ও নতুন করদাতাদের জন্য কর কাঠামোয় কিছু সংস্কারের সম্ভাবনা, অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি, নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রচেষ্টা। বাংলাদেশের মোট জিডিপির আকার ৬৮,৩০,০২৪ কোটি টাকা।

নিত্যপণ্যের বাজার নিয়ন্ত্রণে অনেক পণ্যের আমদানি শুল্কে রেয়াত দেওয়া হয়েছে। জনআকাঙ্ক্ষা পূরণে বাজেট প্রস্তাবনায় নানা ধরনের বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর সবকিছুই করা হয়েছে সাধারণ জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার জন্য। এসব বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগান দেওয়ার জন্য প্রস্তাবিত বাজেটে যে আয়ের ক্ষেত্র দেখানো হয়েছে, তা খুবই অনিশ্চিত।

পরিসংখ্যান অনুয়ায়ী, রাজস্ব আহরণের ধারা বর্তমান প্রেক্ষাপটে নিম্নমুখী। চলতি অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৫-২৬-এর এপ্রিল পর্যন্ত ১০ মাসে আয় হয়েছে ৩,২৬,৯২৮ কোটি টাকা। সে হিসাবে একই হারে আয় হলে বছর শেষে আয় হতে পারে প্রায় ৩,৯২,৩১৪ কোটি টাকা বা এর চেয়ে অল্প কমবেশি।

করের আওতা বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে টিআইএন, বিআইএন, ব্যাংক হিসাব, সম্পত্তির তথ্য ও জাতীয় পরিচয়পত্রকে সমন্বিত ডেটাবেজে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীদেরও করের আওতায় আনার চেষ্টা করা হচ্ছে। এগুলো ইতিবাচক উদ্যোগ হলেও এর সুফল পেতে সময় লাগবে। ফলে আগামী অর্থবছরেই বড় ধরনের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি পাওয়া সহজ হবে না।

বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো নয়। গণমাধ্যমে ৮ জুন ২০২৬, টিআইবির একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। সেখানে বর্তমান সরকারের ১০০ দিনের যে তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতে খুনের সংখ্যা ৬০৫, অপহরণ ১৯৬ এবং ৩,৪৯৬টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া সাধারণ মানুষ নির্বিঘ্নে চলাচলে ভয় পায়। কারণ যেকোনো স্থানে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির তৈরি হতে পারে, এমন আশঙ্কা বিরাজমান। এমনকি মৃত্যুর মতো ঘটনাও ঘটতে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে সাধারণ জনগণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্বাভাবিকতা থাকছে না।

অর্থনৈতিক পরিস্থিতি উদ্বেগজনক। এরই মধ্যে ৪০০টির মতো মিল-কারখানা বন্ধ হয়েছে। ফলে বেকারত্ব বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে। এর মধ্যে বেশির ভাগই গার্মেন্টস, টেক্সটাইল, স্পিনিং মিল, যার অধিকাংশই শতভাগ রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান (সূত্র: কালের কণ্ঠ, ২৯.০১.২৬)। এ ছাড়া প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কারখানা বন্ধের আশঙ্কা বাড়ছে। বিনিয়োগ শূন্যের কোঠায়। রপ্তানি আয় নিম্নমুখী। প্রবাসী আয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিম্নগামী। নতুন মিল-কারখানা স্থাপন শূন্যের কোঠায়। মূল্যস্ফীতি বেশি এবং এটা ঊর্ধ্বগামী। বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, মে ২০২৬-এ মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪২। সার্বিক পরিস্থিতির ফলে দরিদ্রের সংখ্যা বাড়ছে উল্লেখযোগ্য হারে।

এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক সংস্থা বিশ্বব্যাংক পূর্বাভাস দিয়েছে, জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৯ শতাংশ; আইএমএফ বলছে, ৪ দশমিক ৭ শতাংশ; এডিবি বলছে, ৪ দশমিক শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। (সূত্র ১২ জুন ২০২৬, খবরের কাগজ)

অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার জন্য ওপরে বর্ণিত আর্থসামাজিক পরিস্থিতি উন্নয়নের জন্য এই মুহূর্তে জরুরি প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে তাদের সমর্থক বৃহৎ একটি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখা হয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মৌলিক রাজনৈতিক অধিকার বহাল না করলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হবে।

আওয়ামী লীগের সমর্থকদের রাজনৈতিক অধিকার আইনিভাবে হরণ করা হলে এবং তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা জেল, জুলুম এবং নির্যাতন-নিপিড়নের মাধ্যমে দমন করে রাখা হলে এই বিরাট জনগোষ্ঠী সব সময় তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করবে। ফলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

তা ছাড়া, এই বৃহৎ জনগোষ্ঠীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক অর্থাৎ তাদের ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরাপত্তা যদি নিশ্চিত না করা হয়, সে ক্ষেত্রে এই জনগোষ্ঠীর অর্থনীতিতে অংশগ্রহণ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন বিনিয়োগ। এজন্য রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সার্বিক নিরাপত্তা অত্যন্ত জরুরি।

ধারণা করি, বর্তমান সরকার আর একটি বিষয় তেমনভাবে বিবেচনায় আনেনি। ইরান যুদ্ধ পরিস্থিতির ফলে পৃথিবীব্যাপী জ্বালানি তেল, জ্বালানি গ্যাস ও সারের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। তা ছাড়া সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। অর্থ দিয়েও অনেক সময় সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হ্রাসের আশঙ্কা করছে। কেউ কেউ এটা ২ শতাংশ পর্যন্ত কমবে বলে প্রাক্কলন করেছে। এক কথায় বিশ্ব আজ অর্থনৈতিক মন্দার দ্বারপ্রান্তে বলা যায়। জ্বালানি তেল এবং গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত না হলে নতুন বিনিয়োগ আসবে না। দেশে জ্বালানি সরবরাহ সহজলভ্য করতে গেলে ভর্তুকিমূল্যে বিক্রয় করতে হবে। সে অর্থ বরাদ্দ বাজেটে আছে বলে মনে হলো না। তেল এবং গ্যাস সঠিক মূল্যে বিক্রয় করতে গেলে সাধারণ জনগণের ওপর মূল্যস্ফীতির চাপ বাড়বে এবং দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হবে। কৃষকদের যদি ভর্তুকিমূল্যে এবং সময়মতো সার সরবরাহ করা না হয়, তাহলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। সে ক্ষেত্রে আশঙ্কা আছে বড় ধরনের খাদ্যসংকট তৈরির। সে বিষয়টিও বাজেটে আলোকপাত করা হয়নি।

প্রাক্কলিত পরিচালন ব্যয় প্রস্তাবিত বাজেটে দেখানো হয়েছে ৬,২১,৯২৫ কোটি টাকা। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এ খরচ কমানোর কোনো সুযোগ নেই। বরং ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে রাজস্ব আহরণ সম্পূর্ণ ব্যবহার করার পরও অতিরিক্ত ২,২৯,৬১১ কোটি টাকা ঘাটতি হবে। অর্থাৎ সরকার পরিচালনার জন্য রাজস্ব আহরণের পরও দেশি-বিদেশি ঋণের মাধ্যমে ২,২৯,৬১১ কোটি টাকার ঘাটতি পূরণ করতে হবে। ফলে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট অতিরিক্ত ঋণনির্ভর হবে। সে বিচারে এ বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলা যায়। বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে যে, বাস্তবায়নের ব্যত্যয়গুলো পরে আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক সংকটকে আরও ঘনীভূত করার আশঙ্কা থাকবে।

আমরা মনে করি, দেশ একটি সংকটকাল অতিক্রম করছে। সংকটের মাত্রা এবং গভীরতা এখন পর্যন্ত ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে, সেটা যে বিশাল এ বিষয়ে সংশয় থাকা উচিত নয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় ঐক্য অর্থাৎ প্রতিহিংসা, বিদ্বেষ ভুলে দল-মতনির্বিশেষে সব নাগরিককে একতাবদ্ধ করতে হবে। দেশবাসীর সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এ সংকট থেকে আমাদের স্বস্তি এবং মুক্তি দিতে পারে। এটা সম্ভব হলেই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রা’ হিসেবে গণ্য করা যাবে।

লেখক: চেয়ারম্যান, জাতীয় পার্টি

সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?

প্রকাশ: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
আপডেট: ২১ জুন ২০২৬, ০৫:২৯ পিএম
সামাজিক অস্থিরতায় মানবতা হত্যা: প্রতিকার কোথায়?
ড. নাহিদ ফেরদৌসি

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।...

পৃথিবীর সৃষ্টির শুরু থেকেই মানুষ সামাজিকভাবে বসবাস করে আসছি। যদিও এই বসবাসের অভ্যাস একদিনে করে গড়ে ওঠেনি। আদিম যুগে নানারকম বিপদ থেকে বাঁচার জন্য দলবদ্ধভাবে বসবাস করার এক অদৃশ্য তাগিদ মানুষের কাছে অনুভূত হয়। শিকার বা শিকারির হাত থেকে বাঁচার জন্য আমরা একসঙ্গে বসবাস করার যে মানসিকতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা কালক্রমে আজ সুপ্রতিষ্ঠিত। বলতে গেলে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলভিত্তি হিসেবে সমাজ তথা সামাজিকভাবে বসবাস করার চিন্তাভাবনা থেকেই সৃষ্টি হয়েছে। শুধু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নয়, তারও আগে এই সমাজ তথা সামাজিকতার অবদান ছিল। এমনকি আজকের যে রাষ্ট্রব্যবস্থা রয়েছে এই রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে মতবাদ রয়েছে তা হলো–সামাজিক চুক্তি মতবাদ। এই মতবাদের জ্ঞানপ্রতিমরা হলেন–থমাস হবস, জন লক এবং জঁ-জ্যাক রুশোদের লেখনীতেও সমাজের গুরুত্ব ও এই সমাজের গুরুত্ব থেকেই যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়েছে তা স্পষ্ট। সাধারণভাবে বলতে গেলে, রাষ্ট্র হলো সমাজের বৃহত্তর পরিধি। এই পরিধিকে আমরা যত্ন করেই আগলে রাখছি সভ্যতার শুরু থেকেই। আবার, এই যত্নের কারিগররা তথা মানুষ কিছু সময়ের জন্য ভুলে যায় যে, তারা একসঙ্গে আছে বলেই পৃথিবী নামক গ্রহটি তাদের কাছে বসবাসযোগ্য।

সামাজিক অস্থিরতা মূলত শুরু হয় সামাজিক চুক্তি ভঙ্গের মাধ্যমে। মানুষ যখন একাকী বসবাস করত, তখন তারা বিভিন্ন দুর্যোগের মুখোমুখি হতো। তাই তারা একসঙ্গে বসবাস করতে শুরু করল। এই একসঙ্গে বসবাস করতে গিয়েই তারা একে অপরের সঙ্গে বিবাদে জড়িয়ে পড়ল, নিজেদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কোন্দলে। ফলস্বরূপ একে অপরকে হত্যা করতে লাগল। মানুষ নিজেদের সামান্য লাভ ও স্বার্থের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্বিচারে আঘাত হানতে শুরু করল। বনভূমি উজাড় করা, নির্বিচারে গাছ কাটা, নদী-খাল দখল ও দূষণ, এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অযৌক্তিক ব্যবহার ক্রমে পরিবেশের ভারসাম্যকে নষ্ট করে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ বিশ্ব এক গভীর পরিবেশগত সংকটের মুখোমুখি।

বর্তমান যুগে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এর পেছনে প্রধান কারণ সামাজিক অস্থিরতা ও মানুষের লোভনির্ভর কর্মকাণ্ড। স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে, বনভূমি ধ্বংস করছে, জীববৈচিত্র্যকে বিলুপ্তির দিকে ঠেলে দিচ্ছে এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক চক্রকে ব্যাহত করছে। এমতাবস্থায়, আমাদের মাঝে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার জন্য আমরাই চুক্তিতে আবদ্ধ হই। এই চুক্তি একে অপরের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে। আজকের যে সামাজিক অস্থিরতা দেখি তা মূলত আমাদের সমাজে প্রাকৃতিক নিয়মের অধীনে যে চুক্তিটি আছে, তা ভঙ্গের কারণেই। যেহেতু রাষ্ট্র সমাজের এক বৃহত্তর পরিসর, তাই এই সামাজিক অস্থিরতা থেকেই রাষ্ট্রের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। আবার রাষ্ট্রের বৃহত্তর পরিসীমা হলো সমগ্র পৃথিবী। তাইতো আমরা দেখতে পাই, ১৯১৪ সালের ২৮ জুনের একটি হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে কীভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়েছিল। যার ফলাফল হিসেবে পৃথিবী দেখেছিল এক কালো অধ্যায়। চার বছর ধরে চলা এই হত্যাযজ্ঞে প্রাণ হারিয়েছিল ২০ মিলিয়নের মতো তাজা প্রাণ। যাদের মৃত্যু কেড়ে নিয়েছিল আরও ৬০ মিলিয়ন মানুষের জীবনের আনন্দ। তারা বেঁচে ছিল শুধু বেঁচে থাকার জন্য। শুধু এই একটি উদাহরণ নয়, সমাজ ও ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রের সীমানা পেরিয়েও যে বিষয় সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে ও যত রকমের আইন ও চুক্তি আছে সেগুলোকে ভেঙে দেয় তা হলো–মানবতার হত্যা। একটি মাত্র হত্যাকাণ্ডই খুব বাজেভাবে বদলে দিতে পারে মানুষের জীবন ও পৃথিবীর রূপ। তাহলে এই মানুষ হত্যাই যেহেতু সব সমস্যার মূলে রয়েছে এবং সাম্রাজ্যবাদ ও পেশিশক্তি প্রদর্শনের অন্যতম উপায় যেহেতু বিপক্ষ দলের বা মতের মানুষকে হত্যা করা। যার ফলাফল হিসেবে আমরা এক অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদের সম্মুখীন হই। তাই এই মানব হত্যাকেই বন্ধ করতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো–এই গর্হিত অপরাধকে কীভাবে দমন করা যায়? কীভাবে মানবজাতিকে বোঝানো যায়, ‘পৃথিবীতে সব মানুষেরই সমান অধিকার আছে বেঁচে থাকার, কারও কোনো অধিকার নেই এই বেঁচে থাকার অধিকারকে খর্ব করার।

মানুষ যখন অন্য মানুষকে হত্যা করে, তখন তার নিজের বিবেক বোধ ও মানবতাবোধকে বিসর্জন দিয়েই এই অপরাধ করে। যদিও আত্মরক্ষা বা নারীদের সম্ভ্রম রক্ষা করার ক্ষেত্রে ব্যক্তিকে অধিকার দেয় এই অপরাধের জন্য। কিন্তু তাও সেটি অপরাধ হিসেবেই থাকে, আইনের কাছে হোক বা নিজের বিবেকের কাছেই হোক। তাহলে এই অপরাধকে দমন করার ক্ষেত্রে আমাদের নৈতিক অনুশাসন জোরদার করতে হবে। আপনি যে ধর্মের অনুসারীই হোন না কেন অথবা নাস্তিকতা চর্চা করলেও নৈতিকতা ও মূল্যবোধ থেকে কিন্তু আপনি মুক্ত নন। ইসলাম ধর্মে যেমন বলা হয়েছে একজন মানুষকে হত্যা করার যে অপরাধ তা সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করার অপরাধের নামান্তর। ঠিক তেমনিভাবে হিন্দু, খ্রিষ্টান, বৌদ্ধসহ সব ধর্ম ও মতে নরহত্যা জঘন্যতম অপরাধ হিসেবে স্বীকৃত।

বর্তমানে আমাদের সমাজে দেখা যাচ্ছে, একটি অপরাধ ঢাকার জন্য ভিক্টিম যাতে আইনের আশ্রয় নিতে না পারে, তার জন্য ভিক্টিমকেই হত্যা করা হয়। প্রথম অপরাধটিও করা হয় নৈতিক অনুশাসন ভেঙে। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রেও নৈতিক মূল্যবোধ না থাকাটাই মানুষকে অপরাধ করার জন্য প্রলুব্ধ করে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরে সব বিভাগের জন্য ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ নামে একটি আবশ্যিক পাঠ্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবকল্যাণের জন্য এসব জ্ঞান কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, সে বিষয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাবে। তারা শিখবে কীভাবে নীতি ও নৈতিকতায় বলীয়ান হয়ে নিজের পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র এবং সর্বোপরি সমগ্র মানবজাতির কল্যাণে কাজ করা যায়। একই সঙ্গে তারা এমন শিক্ষা লাভ করবে, যা তাদের অনৈতিক, অন্যায় ও মানবকল্যাণবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে সহায়তা করবে। অন্যদিকে, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়েও সব বিভাগের পাঠ্যক্রমে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক একটি কোর্স অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা সম্পন্ন করার পরই অধিকাংশ শিক্ষার্থী কর্মজীবনে প্রবেশ করে, আর কর্মক্ষেত্রেই নীতি-নৈতিকতার প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয়। যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে এই উপলব্ধি গড়ে তোলা যায় যে অন্যের ক্ষতি করে, সমাজের ক্ষতি করে কিংবা রাষ্ট্রের ক্ষতি করে অর্জিত সুখ ও সাফল্য প্রকৃতপক্ষে ক্ষণস্থায়ী, তবে তারা সহজেই বুঝতে পারবে যে ব্যক্তিগত লাভের জন্য অন্যের চোখের পানির কারণ হওয়া কখনোই প্রকৃত সাফল্য নয়। এই উপলব্ধি তাদের দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে দূরে রাখবে এবং নিজ নিজ দায়িত্ব সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে উদ্বুদ্ধ করবে। এ ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক হলো, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে ‘নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও সুশাসন’ বিষয়কে অন্তর্ভুক্ত করেছে। এর ফলে শিক্ষার্থীরা অন্তত নৈতিকতার একটি প্রাথমিক ধারণা অর্জনের সুযোগ পাচ্ছে। যদি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে গড়ে তোলা যায়, যেখানে নীতি-নৈতিকতা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধ শিক্ষার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে, তবে শিক্ষার্থীরা আজীবন এই আদর্শ দ্বারা পরিচালিত হবে। অন্যদিকে, আজকে যারা অপরাধ করছে, তারা যেহেতু শিশু নয়। তাই এই অপরাধকে মোকাবিলা করার জন্য সমাজের সব স্তরে ‘নৈতিক গণশিক্ষা কার্যক্রম’ পরিচালিত করতে হবে। এই ক্ষেত্রে রাষ্ট্র অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে পারে। এছাড়া যেহেতু বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি মানুষ তাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে ধর্মকে শ্রদ্ধা করে এবং ধর্মীয় অনুভূতিকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে না। তাই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধর্মের মৌলিক বিষয়াবলিকে যতটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে, ঠিক তেমনিভাবে নৈতিক মূল্যবোধকে প্রচার করতে হবে।

অন্যদিকে আইনের সঠিক বাস্তবায়ন প্রতিটি অপরাধীর ক্ষেত্রে একটি কার্যকরী ভবিষ্যৎ কর্ম পরিকল্পনা হতে পারে। যদিও আমাদের পেনাল কোডের ৩০২ ধারায় হত্যার শাস্তি হিসেবে দুটি উপায়ের কথা উল্লেখ আছে, একটি হলো–মৃত্যুদণ্ড, অন্যটি হলো–যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। হত্যার শাস্তি প্রয়োগ করলেই হবে না। এই শাস্তির কথা প্রচার করতে হবে। যাতে অপরাধী মন হত্যা বা এই রকম অপরাধ করার আগেই নিজেকে গুটিয়ে নেয়।

যুগের সঙ্গে তালমিলিয়ে আমরা মূল্যবোধ, নৈতিকতা ও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। এমনভাবে চলতে থাকলে যেকোনো অপরাধ স্বাভাবিক নিয়ম হয়ে উঠবে। তখন হয়তোবা সমাজে বসবাস করার মতো মানুষই থাকবে না। তাই আমাদের নিজ নিজ জায়গা থেকে সচেতন হতে হবে এবং অপরকে সচেতন করতে হবে।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]