এই জয় তৃণমূলের টানা ১৫ বছরের চরম দুর্বিষহ অপশাসনের বিরুদ্ধে অত্যাচরিত, নিষ্পেষিত ও ক্ষুব্ধ রাজ্যবাসীর নীরব ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। যা তারা প্রকাশ্যে বুঝতে দেননি ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় পর্বের ভোট শেষের পরও। কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের এটাও উপলব্ধি, এই জয়ের দ্বারা পশ্চিমবঙ্গবাসীর অনুরাগ বা হিন্দু ভাবাবেগের রসায়ন নেই, তাই বাংলার মসনদ দখলে দীর্ঘদিনের সাধ পূরণ করার পর এবার এই দখলকে দীর্ঘমেয়াদে পরিণত করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করতে হবে।...

ভাগ মমতা ভাগ। চোর-জোচ্চরদের শাসন থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায় পশ্চিমবাংলা। তাই রীতিমতো ভোটবাক্সে দমদম দাওয়াই দিয়ে পিসি-ভাইপোর দলকে বাংলাছাড়া করেছে আমজনতা। পশ্চিমবঙ্গের আপামর জনতার কাছে এবারের নির্বাচনে একটাই এজেন্ডা সামনে এসেছিল, তা হলো- যে করেই হোক চরম দুর্নীতিগ্রস্ত, তোলাবাজ তৃণমূল কংগ্রেসকে ক্ষমতার মসনদ থেকে মাটিতে নামাতে হবে। মমতা ও অভিষেকের নিরন্তর ঔদ্ধত্য এবং বিরোধীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করার দাম তাই কড়ায়গণ্ডায় চোকাতে হয়েছে। মমতা তাড়াও, বাংলা বাঁচাও- এই স্থির লক্ষ্যকে সামনে রেখে মানুষ একাট্টা হয়ে ভোট দিয়েছে। প্রচারে বামেরা অন্য দুই পক্ষের সঙ্গে কাঁটায় কাঁটায় টক্কর দিলেও, তাদের ভোটভাগ্য কিন্তু খোলেনি। তার একমাত্র কারণ, তৃণমূল কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে বামমনস্ক মানুষ একজোট হয়ে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। সেজন্য এক ধাক্কায় বিজেপির ৭ শতাংশ ভোট সুইং হয়েছে। গত বিধানসভা নির্বাচনে তাদের ছিল ৩৮ শতাংশ ভোট, এবার তা বেড়ে হয়েছে ৪৫ শতাংশ। অন্যদিকে তৃণমূলের ঠিক সমপরিমাণ ভোটই কমেছে। এ পরিস্থিতিতে আগামী দিনে মুখ্যমন্ত্রী পদের মুখ্য দাবিদার যে শুভেন্দু অধিকারী, তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ কম। তবে হাওয়ায় শমীক ভট্টাচার্য আর দিলীপ ঘোষের নামও ভেসে আসছে।
শমীকবাবু দলের রাজ্যসভার সদস্য। অন্যদিকে দিলীপ ঘোষ স্বয়ং খড়গপুর সদরকেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে জিতে এসেছেন। ধরাশায়ী হয়েছেন অনেক তাবড় তৃণমূল কংগ্রেস নেতা। কলকাতার মানিকতলা কেন্দ্রে শ্রেয়া পান্ডে, শ্যামপুকুর কেন্দ্রে শশী পাঁজা, কাশীপুর-বেলগাছিয়া কেন্দ্রে অতীন ঘোষ, দমদমে ব্রাত্য বসু, বিধাননগরে সুজিত বসু, আসানসোলে মলয় ঘটক পিছিয়ে গেছেন। বামেদের একটি আসনেই জিত নিশ্চিত ছিল। সেটা হলো ডোমকল, সেখানে মুস্তাফিজুর রহমান বহু ভোটে জয়লাভ করেছেন। শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে ছিলেন উত্তর দমদম কেন্দ্রের সিপিআইএম প্রার্থী দিপ্সীতা ধর। অন্যদিকে সদ্য প্রতিষ্ঠিত আমজনতা পার্টির নেতা হুমায়ুন কবীর নয়ডা আসন থেকে জিতেছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভোট এত কমে যাওয়ার কারণ কী? এর প্রধান কারণ হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভেবেছিলেন শুধু তোষণের রাজনীতির ওপর নির্ভর করে নির্বাচনি রাজনীতি পেরিয়ে যাবেন। এর পাশাপাশি খয়রাতি সাহায্য প্রকল্প অর্থাৎ কন্যাশ্রী, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, যুবশ্রী তাকে জিতিয়ে দেবে বলেও তারা ষোলোআনার ওপর আঠারোআনা নিশ্চিন্তে বসেছিলেন। কিন্তু বাংলার নারী সমাজ মমতাকে ভোট দেয়নি। তাদের কাছে চাকরি চুরি, চাল চুরি, সিন্ডিকেট রাজ, নারী ধর্ষণ ইত্যাদি অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। মহিলাদের সামনে সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছিল আরজি কর হাসপাতালে অভয়ার নির্যাতন ও খুনের ঘটনা। যেভাবে হাসপাতালের ভেতর একজন চিকিৎসককে ধর্ষিতা ও খুন হতে হয়েছিল, তাতে গোটা রাজ্যে ক্রোধের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছিল। সেই ক্রোধ এবার আগুনের হলকা হয়ে ভোটবাক্সে ছড়িয়ে পড়েছে। বামেরা অভয়ার নির্যাতনের বিচার চেয়ে পথে নামলেও সাধারণ মানুষ মনে করেছেন, নারী ধর্ষক এ সরকারকে হটাতে বিজেপিতেই ভরসা রাখতে হবে। নির্যাতিতার মায়ের হাতেই বিচার বা জাস্টিস তুলে দিতে হবে। এবারে লক্ষ করার বিষয় হলো নতুন সরকার আদৌ নির্যাতিতার বিচার দিতে পারবে কি না।
এবারের নির্বাচনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের তোষণের রাজনীতি। ক্রমাগত একটি সম্প্রদায়কে মাথায় তুলে রাখতে গিয়ে তিনি স্বয়ং বিজেপির হিন্দু সাম্প্রদায়িক প্রচারকে বাড়তে দিয়েছেন। তাই এবারের ভোট হিন্দু সমাজের একটা বড় অংশের কাছেই ছিল ‘ধর্মযুদ্ধ’। হিন্দু সাম্প্রদায়িক প্রচারের মোকাবিলা করতে গিয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের হাতিয়ার হিসেবে উঠে এসেছিল বাঙালি অস্মিতার প্রশ্ন। কিন্তু আপামর বাঙালির কাছে জাতিগত অস্মিতার চেয়ে সম্প্রদায়গত ঐক্য আরও বেশি জরুরি বলে মনে হয়েছে। তাদের ধারণা হয়েছে, এবার মমতাকে উচিত শিক্ষা দেওয়া দরকার। কুম্ভমেলায় বাঙালি তীর্থযাত্রীদের ভিড়, রামমন্দিরকে কেন্দ্র করে উচ্ছ্বাসের আবহে বোঝাই যাচ্ছিল, তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ব শিকড় গাড়তে চলেছে। একাংশের মানুষ স্পষ্ট বুঝতে পেরেছিলেন, মমতা নিজেই খাল কেটে কুমির ডেকে এনেছেন। তার হাত ধরেই এ রাজ্যে বিজেপির আত্মপ্রকাশ।
প্রশ্ন হলো, ভোটাররা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে ভোট দিল না কেন? প্রাথমিকভাবে নির্বাচনি ফল দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাঁওতাবাজি তারা ধরে ফেলেছেন। বামফ্রন্ট সরকারের সময় সাচার কমিশন পশ্চিমবঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের যে শোচনীয় অবস্থার কথা তুলে ধরেছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা দূর করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন। কিন্তু গত ১৫ বছরের শাসনে তা একটাও তিনি পূরণ করতে পারেননি। মুসলমান সমাজের অবর্ণনীয় দুর্দশা সেরকমই রয়েছে। শিক্ষার হার কম, চাকরি নেই, নেই ব্যবসা। ক্রমাগতভাবে সামাজিক মানদণ্ডের নিরিখে এ রাজ্যের সংখ্যালঘু সম্প্রদায় ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল। ইমাম ভাতা বাড়ানো আর মাথায় হিজাব টেনে বক্তৃতা দেওয়া ছাড়া মুসলিম সমাজের আর কোনো কাজ মমতার দ্বারা হয়নি। তাই মুসলমান সম্প্রদায় এবার স্থির করেছিল অস্তিত্বকে বজায় রাখতে নিজেদের সম্প্রদায়ভুক্ত প্রার্থীর মধ্যে যার যেখানে জোর বেশি, তাকেই ভোট দেওয়া হবে। তৃণমূল কংগ্রেসকে একেবারেই নয়। সে সূত্রেই এসডিপিআই, আমজনতা পার্টি অনেক সংখ্যালঘু ভোট টেনেছে। সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছে নওশাদ সিদ্দিকির আইএসএফও। আসন তারা হয়তো জিততে পারেনি। কিন্তু বহু কেন্দ্রে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোট কেটে নেওয়ায় বিজেপির পক্ষে জেতাটা সহজ হয়েছে।
মধ্যবিত্ত শিক্ষিত লোকজনও কিন্তু তৃণমূল কংগ্রেসকে দাঁতে দাঁত চেপে শুইয়ে দিয়েছে। ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ছিনিমিনি খেলেছে। লাখ লাখ বেকার উচ্চশিক্ষিত ছেলেমেয়ের চোখের জল ফেলেছে। প্রাথমিকে ইচ্ছেমতো টাকার বিনিময়ে চাকরি বিক্রি করেছে। দিনের পর দিন এসএসসি পরীক্ষা হয় না। হয় না সরকারি চাকরির পিএসসি পরীক্ষাও। অর্থাৎ বাংলার যুবসমাজের কাছে অন্ধকার ক্রমশ ঘণীভূত হচ্ছিল। এর থেকে হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন তারা। বাংলার বিদায়ি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে জীবিকা বলতে ‘চপ-মুড়ির দোকান দেওয়া। শুধু তাই নয়, রাস্তায় রাস্তায় সিভিক ভলান্টিয়ার নামিয়ে তাদের আইনবহির্ভূত পথে রোজগারকেই মান্যতা দিতে চেয়েছিলেন তিনি। বারবার অঙ্গনওয়ারি কর্মীরা ভাতা বাড়ানোর জন্য মমতার কাছে দরবার করেছিলেন। কিন্তু তিনি তাতে কর্ণপাত করেননি। উল্টো পুলিশ লেলিয়ে আন্দোলনকারীদের হটিয়ে দিয়েছেন। আন্দোলন করতে গেলে নেমে এসেছে পুলিশের লাঠি। কসবা ল’ কলেজে নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে এক ছাত্রীকে। এ অপকর্মে যে ছাত্রনেতা জড়িত ছিলেন, তিনি আবার তৃণমূল কংগ্রেসের তাবড় নেতাদের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত।
অন্যদিকে শূন্যের গেরো কাটানোর লক্ষ্যে এবার প্রবল পরাক্রমে নির্বাচনি আসরে ঝাঁপিয়ে পড়া সিপিআই (এম) তথা বামেরা পেল মাত্র দুটি। অথচ রাজ্যের দুই পর্বের ভোটের শেষেও রক্ষণশীল হিসেবে তাদের সম্ভাব্য আসন ধরা হয়েছিল গোটা দশেক। নিদেনপক্ষে ৬-৭টি তো বটেই। তবে আশার কথা, শুধু বিধানসভায় আসন সংখ্যার শূন্যের লজ্জা মোছা নয়। এবার তাদের প্রাপ্ত ভোট সংখ্যা গত কয়েকটি নির্বাচনের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে, যা রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আগামী পাঁচ বছর পর তাদের পক্ষে নতুন করে আশার আলো জাগাবে নিঃসন্দেহে।
রাজ্যের ২৩ জেলার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেস শূন্যে পরিণত হয়েছে ১০ জেলায়। বাকি ১৩টির মধ্যে ১০টিতে তাদের আসন সংখ্যা গতবারের চেয়ে অর্ধেক কমেছে। কোথাওবা আরও কম। বাঁকুড়ার ১২টির মধ্যে টিএমসি জিতেছে মাত্র একটিতে। তৃণমূলের আসন শূন্য হওয়া জেলাগুলো হলো কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, কালিম্পং, দার্জিলিং, দক্ষিণ দিনাজপুর, পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া ও পশ্চিম বর্ধমান। ব্যতিক্রম একমাত্র উত্তর দিনাজপুর। সেখানে সাতটি আসনের মধ্যে সাতটিই পেয়েছে তৃণমূল। অন্যদিকে বামেদের জোটসঙ্গী নওশাদ সিদ্দিকির দল আইএসএফ আশানুরূপ ফল করতে পারেনি। ভাঙড়ে নওশাদ জিতছেন। ধারণা ছিল, ২৫টা আসনে লড়ে তারা অন্তত ১৫টি আসনে জিতবেন। আর এবারে বামেদের সঙ্গে জোটে না যাওয়া কংগ্রেস সবকটি আসনে প্রার্থী দিয়েও ঘরে তুলতে পেরেছে দুটি আসন- ফারাক্কা এবং রানিনগর। দলের পরাজিতের তালিকায় আছেন গোদ অধীর চৌধুরী, বর্তমান রাজ্য সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, মনোজ চক্রবর্তী প্রমুখ।
রাজ্য ভোটের এই ফলাফলে আনন্দ উৎসবের ঢেউ গিয়ে আছড়ে পড়েছে সুদূর দিল্লিতেও। যেখানে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে দুপুরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব ঝালমুড়িসহযোগে বিজয় উৎসব উদ্যাপন করেন। সন্ধ্যা ৭টায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বিশেষ সাংবাদিক বৈঠক ডাকেন এ বিজয় উৎসবের ধামাকা বাজতে। বিজেপির সব কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এ ব্যাপারে একমত যে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই অভাবনীয় সাফল্য কোনো গেরুয়া ঝড়ের ফলে নয়, কিংবা এই জয়ের পেছনে একান্তই নড়বড়ে সংগঠনের পশ্চিমবঙ্গ বিজেপির কেরামতিতেও নয়। এই জয় তৃণমূলের টানা ১৫ বছরের চরম দুর্বিষহ অপশাসনের বিরুদ্ধে অত্যাচরিত, নিষ্পেষিত ও ক্ষুব্ধ রাজ্যবাসীর নীরব ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। যা তারা প্রকাশ্যে বুঝতে দেননি ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় পর্বের ভোট শেষের পরও। কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের এটাও উপলব্ধি, এই জয়ের দ্বারা পশ্চিমবঙ্গবাসীর অনুরাগ বা হিন্দু ভাবাবেগের রসায়ন নেই, তাই বাংলার মসনদ দখলে দীর্ঘদিনের সাধ পূরণ করার পর এবার এই দখলকে দীর্ঘমেয়াদে পরিণত করার জন্য নিরন্তর চেষ্টা করতে হবে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক


