মূল্যস্ফীতির কারণে বহু পরিবার এখন কম পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশেও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মাছ, মাংস, দুধ ও ফলের পরিবর্তে কমদামি খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে শিশুদের অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নারী ও শিশুরা এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।...

বিশ্বজুড়ে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এখন শুধু অর্থনৈতিক আলোচনার বিষয় নয়; এটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনসংগ্রাম, খাদ্যনিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এক গভীর সংকটে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে সাধারণ মানুষ প্রতিদিন বাজারে গিয়ে নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন। চাল, ডাল, তেল, ডিম, মাছ, মাংস, শাকসবজি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা ও বাসাভাড়া- প্রায় প্রতিটি খাতে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় মানুষের জীবনযাত্রা ক্রমশ কঠিন হয়ে উঠছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন নিম্ন ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ, যাদের আয়ের বড় অংশ ব্যয় হয় খাদ্য ও মৌলিক চাহিদা পূরণে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ধারাবাহিকভাবে উচ্চপর্যায়ে অবস্থান করেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১৪ দশমিক ১০ শতাংশে পৌঁছায়, যা গত এক দশকের মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। পরবর্তীতে কিছুটা কমলেও ২০২৫ ও ২০২৬ সালজুড়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ থেকে ১০ শতাংশের কাছাকাছি অবস্থান করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশের সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে দাঁড়ায় এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৩৯ শতাংশে পৌঁছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের আয় বাড়ার তুলনায় জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতির বাস্তব চিত্র আরও স্পষ্ট হয় পারিবারিক ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করলে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ৬২ শতাংশ পরিবার তাদের মোট আয়ের অর্ধেকেরও বেশি খাদ্য ব্যয়ে ব্যবহার করে। নিম্নআয়ের মানুষের ক্ষেত্রে এই হার আরও বেশি। অর্থাৎ খাদ্যপণ্যের দাম সামান্য বাড়লেও তাদের জীবনযাত্রা সরাসরি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। বর্তমানে বহু পরিবার মাছ, মাংস, দুধ ও ফলের মতো পুষ্টিকর খাবার কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছে। কেউ কেউ চিকিৎসা ব্যয় কমাচ্ছেন, কেউ সন্তানের কোচিং বন্ধ করছেন, আবার কেউ সঞ্চয় ভেঙে সংসার চালাচ্ছেন। ফলে মূল্যস্ফীতি এখন শুধু অর্থনৈতিক চাপ নয়; এটি মানুষের জীবনমান, পুষ্টি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার ওপরও গভীর প্রভাব ফেলছে।
বর্তমান সংকটের পেছনে একাধিক বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ কারণ কাজ করছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় বিশ্বব্যাপী উৎপাদন, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিবহনে সংকট, কনটেইনার ভাড়া বৃদ্ধি এবং সরবরাহব্যবস্থার অস্থিরতায় আমদানিনির্ভর দেশগুলো বড় চাপে পড়ে। মহামারির অভিঘাত পুরোপুরি কাটার আগেই রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি বাজারে নতুন অস্থিরতা তৈরি করে। রাশিয়া ও ইউক্রেন বিশ্বে গম, ভুট্টা, সূর্যমুখী তেল ও সারের অন্যতম বড় রপ্তানিকারক দেশ। যুদ্ধের ফলে এসব পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যাহত হয় এবং দাম দ্রুত বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশ যেহেতু ভোজ্য তেল, গম, জ্বালানি ও বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব দেশের বাজারেও পড়ে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমে যাওয়া। কয়েক বছর আগে যে পণ্য আমদানি করতে ব্যবসায়ীদের কম অর্থ ব্যয় করতে হতো, এখন একই পণ্য আমদানিতে অনেক বেশি টাকা খরচ হচ্ছে। এলসি খোলা, ব্যাংকিং ব্যয় এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকট আমদানিকে আরও ব্যয়বহুল করে তুলেছে। ব্যবসায়ীরা সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপিয়ে দিচ্ছেন। ফলে আমদানিনির্ভর পণ্যের পাশাপাশি স্থানীয় উৎপাদিত পণ্যের দামও বেড়ে যাচ্ছে।
তবে শুধু বৈশ্বিক কারণ দিয়ে বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করা যায় না। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম কমলেও দেশের বাজারে তার প্রতিফলন দ্রুত দেখা যায় না। বিশেষ করে ভোজ্য তেল, চিনি, ডাল ও পেঁয়াজসহ অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় বাজারে এ অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাজারে অতি মুনাফাপ্রবণতা, সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্বচ্ছতা, মজুতদারি এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের আধিপত্য মূল্যবৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করছে। কৃষক যে দামে পণ্য বিক্রি করেন, ভোক্তা সেই পণ্য কয়েক গুণ বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের মানুষের ওপর। শহরের বস্তিবাসী, দিনমজুর, রিকশাচালক, ক্ষুদ্র কৃষক, নিম্ন আয়ের চাকরিজীবী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের শ্রমিকদের আয় প্রায় স্থির থাকলেও বাজার ব্যয় দ্রুত বেড়ে গেছে। ফলে অনেকে ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছেন। বর্তমানে বহু নিম্নআয়ের পরিবার বাধ্য হয়ে শিক্ষা, চিকিৎসা ও পুষ্টিকর খাদ্যে ব্যয় কমিয়ে শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য সংগ্রহে মনোযোগ দিচ্ছে। অনেক পরিবার সঞ্চয় ভেঙে বা ধারদেনা করে সংসার চালাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এ পরিস্থিতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক ও মানবিকসংকটও আরও গভীর করতে পারে।
বর্তমান দ্রব্যমূল্যের পরিস্থিতিতে চালের বাজার বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ বাংলাদেশে চাল শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়; এটি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, অর্থনীতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। দেশের মোট চাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশের বেশি আসে বোরো মৌসুম থেকে এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সাতটি হাওড় জেলা একাই প্রায় ২০ শতাংশ বোরো উৎপাদন করে। ফলে হাওড় অঞ্চলে টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে এবার বিস্তীর্ণ বোরো খেত পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জাতীয় খাদ্য সরবরাহ ও চালের বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ৫০ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যদিও স্থানীয় পর্যায়ে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে কয়েক লাখ কৃষক আর্থিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বোরো উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। হাওড় অঞ্চলের ধান সাধারণত মৌসুমের শুরুতেই বাজারে সরবরাহ বৃদ্ধি করে চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ফলে এ অঞ্চলে উৎপাদন কমে গেলে জাতীয় পর্যায়ে চালের দাম বৃদ্ধির চাপ আরও বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে নিম্ন ও প্রান্তিক আয়ের ভোক্তাদের জীবনযাত্রার ওপর।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির নেতিবাচক প্রভাব শুধু বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতিকেও চাপে ফেলছে। বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল ইতোমধ্যে সতর্ক করেছে যে, দীর্ঘমেয়াদি উচ্চ মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্য বৃদ্ধি, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস এবং সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলে তাদের ভোগব্যয়ও কমে যায়। যখন মানুষ খাদ্য ও মৌলিক ব্যয় মেটাতেই অধিকাংশ আয় ব্যয় করে ফেলেন, তখন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিনোদন বা অন্যান্য খাতে ব্যয় কমে যায়। এর ফলে বাজারে চাহিদা হ্রাস পায় এবং উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। অনেক উন্নয়নশীল দেশে ইতোমধ্যে খাদ্য সংকট, ঋণচাপ এবং সামাজিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টির ওপর। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, মূল্যস্ফীতির কারণে বহু পরিবার এখন কম পুষ্টিকর খাদ্যের দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশেও নিম্নআয়ের পরিবারগুলো মাছ, মাংস, দুধ ও ফলের পরিবর্তে কমদামি খাদ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে শিশুদের অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। নারী ও শিশুরা এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বর্তমান মূল্যস্ফীতির সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে। অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরা ও তাপপ্রবাহ কৃষি উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ধান, পেঁয়াজ ও সবজি উৎপাদনে আবহাওয়াজনিত ক্ষতির কারণে বাজারে সরবরাহ কমে গেছে। উৎপাদন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই দাম বেড়ে যায়। আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তাপপ্রবাহ ও খরার কারণে খাদ্যশস্য উৎপাদনে চাপ তৈরি হয়েছে, যা বৈশ্বিক খাদ্যমূল্য বৃদ্ধিকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
মূল্যস্ফীতির দীর্ঘস্থায়ী চাপ মোকাবিলায় বাজারকে শুধু সরবরাহ ও চাহিদার অঙ্ক হিসেবে দেখলে হবে না; এটিকে সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্ন হিসেবেও বিবেচনা করতে হবে। ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষায় আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন। বাজারে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, পণ্যের সঠিক ওজন নিশ্চিতকরণ, খাদ্যের মান নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন ও অফলাইন উভয় বাজারে জবাবদিহিতা বৃদ্ধি জরুরি। একই সঙ্গে ভোক্তা সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি শক্তিশালী ভোক্তা-আন্দোলন বাজারে স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত পরিবেশ প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আজকের বিশ্বে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আর শুধু অর্থনীতির একটি পরিসংখ্যানগত বিষয় নয়। এটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং মানবিক মর্যাদার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। তাই এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন মানবকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক নীতি, শক্তিশালী বাজার তদারকি, কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা এবং ভোক্তাবান্ধব রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। অন্যথায় মূল্যস্ফীতির এই দীর্ঘস্থায়ী চাপ ভবিষ্যতে আরও বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিতে পারে।
লেখক: সভাপতি, কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন
অব বাংলাদেশ (ক্যাব)
[email protected]


