রাজনীতি মানেই পালাবদল। পরিবর্তনের এই লয়ে আশা-নিরাশার দোলাচল থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে যেমন আলোচনায় সরব ছিল সাধারণ থেকে রাজনৈতিক মহল, তেমনি ভারতের বিধানসভার এই নির্বাচনও এর বাইরে নয়। স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই দুই বাংলার নির্বাচন নিয়ে সমালোচক, বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষকদের মতামত ব্যবচ্ছেদে নানা শঙ্কা, অনিশ্চয়তার আভাসের কথা থাকলেও মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা জরুরি।...
ঐতিহাসিক বিবেচনায় বামপন্থি, কমিউনিস্ট পার্টির পর তৃণমূল কংগ্রেসের শক্ত রাজনৈতিক ঘাঁটি ছিল পশ্চিমবঙ্গে। শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর দাঁড়ানো বামফ্রন্টকে হটিয়ে মধ্যমপন্থা ও জনমুখী রাজনৈতিক কৌশলের ওপর প্রতিষ্ঠিত তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠিত করেছিল তাদের সুদীর্ঘকালের ক্ষমতা। তার অবসান ঘটল বিজেপি শক্তির উত্থানের মাধ্যমে। এটি বৃহত্তর ভারতের রাজনীতির জন্য মূলত একটি কৌশলগত সম্প্রসারণ। বিজেপির এ জয়ের নেপথ্যে শক্তিশালী অনুষঙ্গ হলো ভোটব্যাংক।
কেবল উচ্চবর্ণের দল, এই ট্যাগ থেকে বেরিয়ে বিজেপি এবার বৃহত্তর জাতীয় দল হিসেবে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করে দক্ষ রাজনৈতিক কৌশলের পরিচয় দিয়েছে। পাশাপাশি নিম্নবর্ণ, নারী ভোটার, গ্রামীণ দরিদ্র শ্রেণি ও সংখ্যাগুরুর ভোট একত্রিত করা এবং জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণের মতো বিষয়গুলোও তাদের পক্ষে ভূমিধস সমর্থন আদায়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
দুই বাংলার রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বিধানসভার এ নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব কী হতে পারে, তা নিয়ে স্বভাবতই দুই বাংলার সাধারণ থেকে রাজনৈতিক ও বুদ্ধিজীবী মহলে চলছে আলোচনা-পর্যালোচনা। বস্তুত, বিজেপির বর্তমান একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোটিভ হতে পারে কেন্দ্রীয় জাতীয়তাবাদী ন্যারেটিভে ভর করে বাঙালির অবিচ্ছেদ্য পরিচয়ের সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের এক নতুন সংযোগ স্থাপনের প্রচেষ্টা। বিশ্লেষকদের মতে, পরিচয়ভিত্তিক একটি রাজনৈতিক চাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পর্যবেক্ষকদের ধারণা, বিজেপির ধর্মভিত্তিক রাজনীতির আদর্শের উপস্থিতি, ভারতকে একটি সাংস্কৃতিক ধর্মীয় রাষ্ট্র হিসেবে পুনর্গঠনে সক্রিয় করে তুলতে পারে। অর্থাৎ এখানে পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক উত্থান ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের ধারাবাহিকতা তৈরিতে বহুমাত্রিক পরিবর্তনের পক্ষে নবনির্বাচিত সরকার তাদের অবস্থান স্পষ্ট করে তোলার পূর্বাভাস দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে এই ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক প্রবণতা তৈরি হলে, তা হয়তো বাঙালি সাংস্কৃতিক পরিচয় ও ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে গড়তে পারে নতুন গাণিতিক সমীকরণ।
রাজনৈতিক, ভৌগলিকসহ নানা দিক থেকে বিভিন্ন সময়ে NRC/CAA ইস্যুগুলো বরাবরই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে তর্কবিতর্কেই সীমাবদ্ধ ছিল। পশ্চিমবাংলার নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে এটি আবারও বিতর্ক সৃষ্টির ইন্ধন হতে পারে। সমালোচক মহলের ধারণা, বিজেপির রাজনৈতিক পলিসি মেকিংয়ের প্রতিফলন উভয় বাংলায় একটি মিশ্র আলোড়ন তৈরি করবে।
মূলত, ৫ আগস্ট বাংলাদেশে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে যে চিড় ধরেছিল তার খানিকটা উপশম বাংলাদেশের নবনির্বাচিত বিএনপি সরকার করবে বলে আন্দাজ করছিল বোদ্ধামহল। বস্তুত, রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনে বিশ্বের সব জায়গায় প্রতিবেশী ও আঞ্চলিক ভূখণ্ডগুলোর মধ্যে পারস্পরিক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে স্বভাবতই প্রভাব ফেলে। সেদিক বিবেচনায় পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের এই ফলাফল বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলার মধ্যকার বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে কিছু হলেও প্রভাবিত করবে।
ঔপনিবেশিক সময় থেকে উপমহাদেশের রাজনৈতিক চালে ধর্ম একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ। অতএব, প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ধর্মভিত্তিক রাজনীতির বদল ঘটলে বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতেও পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। সেই সঙ্গে দেশের শীর্ষস্থানীয় দলগুলোর মধ্যে ভারতকেন্দ্রিক একটি কূটনৈতিক বিভাজন তৈরি হওয়ার অনুমান অহেতুক মনে করছে না সমালোচক মহল। তবে এটাও ঠিক, এমনটা অবশ্য কেবল ওপার বাংলার নির্বাচনের ফলাফলের ওপর পুরোপুরি বর্তায় না বরং এখানে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, বাস্তব কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অর্থনৈতিক স্বার্থটাও মুখ্য।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, ওপার বাংলায় ধর্মভিত্তিক বয়ান যদি কঠোর মতাদর্শের পথে পরিচালিত হয় তাহলে দুই বাংলায় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় যে অসাম্প্রদায়িকতার সরল আহ্বান তা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়াতে পারে। সে ক্ষেত্রে রাজনৈতিক এই পালাবদল দুই বাংলার মধ্যে রাজনীতি, ভাষা, সাহিত্য-সংস্কৃতির যে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন রয়েছে তা কিছুটা দুর্বল হতে পারে। যা বাঙালির স্বকীয়তাকে দুর্বল করার পাশাপাশি দুই প্রতিবেশীর পারস্পরিক সম্পর্ক বদলের একটি পরোক্ষ আভাস দেয়। সীমান্ত অস্থিরতা, বাণিজ্য- এসব ক্ষেত্রে একটা বড়সড় রদবদল ঘটবে এমনও ধারণা পোষণ করছে পর্যবেক্ষক মহল।
রাজনীতি মানেই পালাবদল। পরিবর্তনের এই লয়ে আশা-নিরাশার দোলাচল থাকাটাই স্বাভাবিক। আমাদের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে যেমন আলোচনায় সরব ছিল সাধারণ থেকে রাজনৈতিক মহল, তেমনি ভারতের বিধানসভার এই নির্বাচনও এর বাইরে নয়। অতএব, স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এই দুই বাংলার নির্বাচন নিয়ে সমালোচক, বিশ্লেষক, পর্যবেক্ষকদের মতামত ব্যবচ্ছেদে নানা শঙ্কা, অনিশ্চয়তার আভাসের কথা থাকলেও মুদ্রার অপর পিঠটাও দেখা জরুরি।
ইতিহাসে প্রমাণিত, অতীতে নানা রাজনৈতিক পরিবর্তন সত্ত্বেও দুই বাংলার মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন দুর্বল করতে সক্ষম হয়নি। বরং কালের প্রয়োজনে সাহিত্য, সংগীত, চলচ্চিত্র মাধ্যম, এই দুই বাংলার সাংস্কৃতিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে। দুই বাংলার ভিত যেখানে রবীন্দ্র-নজরুলের সৃজনের যুগলবন্দিতে সাজানো, সেখানে দুই বাংলায় ‘বাঙালি’ পরিচয়টি যেকোনো পরিচয়ভিত্তিক রাজনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের দুর্গ করে তুলতে যথেষ্ট। সাংস্কৃতিক বন্ধনে আবদ্ধ কোনো জাতিকে প্রকৃত অর্থে কখনই সংকীর্ণ গণ্ডিতে বেঁধে রাখা যায় না।
বিশ্লেষকদের ধারণা, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির এই জয় ভারতের জাতীয়তাবাদী ও ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে একটা শক্ত ভিত দেবে। যার ফলে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক কৌশল বয়ানেও একটা স্বচ্ছ প্রতিফলন ঘটবে। যেটা বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করার পাশাপাশি জাতীয়তাবাদী চেতনার সঙ্গে বাঙালি পরিচয়কে সুদৃঢ় করে তুলবে।
মূলত, পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ধারায় এক নতুন মাত্রা সংযোজিত করেছে। ১৯৪৭-পরবর্তী সময়ে সুদীর্ঘ পরিসর এবং পশ্চিম বাংলার এবারের নির্বাচনের মধ্যদিয়ে উপমহাদেশের রাজনীতি তথাকথিত ধর্মীয় পরিচয়কেন্দ্রিক একটি রাজনৈতিক আবহে প্রবেশ করেছে বলে মনে করছে বোদ্ধা মহল থেকে আমজনতা।
পরিবর্তিত এই রাজনীতির মোড়কে কতটুকু ভারসাম্যের সঙ্গে দুই বাংলা মোকাবিলা করবে, এর দ্বিপক্ষীয় প্রভাব কতটুকু সুদূরপ্রসারী? সেসব সময়ই বলে দেবে। তবে শান্তিকামী বিশ্বের নাগরিক হিসেবে এবং দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বন্ধুত্বকামী জনগণ হিসেবে সবারই চাওয়া, বিভাজনের নীতিতে নয়, বরং ঐক্য ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠাই হবে রাজনৈতিক দলগুলোর মূল লক্ষ্য। আঞ্চলিক থেকে বিশ্বশান্তি কায়েম করাই হবে তাদের প্রধান ব্রত।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলাম লেখক
.jpg)
