২০১৮ সালের জুলাই মাসে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনায় দুই কলেজশিক্ষার্থীর মৃত্যুর ঘটনায় শুরু হওয়া আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রতি বছর ২২ অক্টোবরকে জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস হিসেবে পালন করা হয়। শিক্ষার্থীরা ৯ দফা দাবিতে রাস্তায় নেমে আসে এবং এই আন্দোলনের ফলে দ্রুততম সময়ে সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮ পাস হয়। নিরাপদ সড়ক দিবস পালনের প্রধান উদ্দেশ্য হলো সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সড়ক আইন মেনে চলার গুরুত্ব বোঝানো। এ বছরের নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এই দিনে নানা কর্মসূচি গ্রহণ করে, যেমন শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভা। ২০২৫ সালের জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘মানসম্মত হেলমেট ও নিরাপদ গতি, কমবে জীবন ও সম্পদের ক্ষতি’।
সড়ক নিরাপত্তা উন্নয়নের লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন বাংলাদেশ সরকারি সংস্থা ও বিশ্বব্যাংকের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার সমন্বয়ে একটি বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। সরকার সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এটি যাত্রীবাহী যানবাহন, পথচারী, চালক এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন মানুষের সুরক্ষার বিষয়গুলোকে অগ্রাধিকার দেবে।
বাংলাদেশের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের ইতিহাস শুরু হয় ১৯৯৩ সালে চিত্রনায়ক ইলিয়াস কাঞ্চনের স্ত্রী সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যাওয়ার পর তার নেতৃত্বে গঠিত ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) আন্দোলনের মাধ্যমে। তবে, ২০১৮ সালে ঢাকার বিমানবন্দর সড়কে দুই বাসের সংঘর্ষে কলেজ ছাত্রছাত্রী নিহত হওয়ার পর শিক্ষার্থীরা এই দাবিতে দেশব্যাপী যে আন্দোলন গড়ে তোলে, তা এই ইতিহাসকে এক নতুন মাত্রা দেয়। ২০১৮ সালের এই আন্দোলনটি পরে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং সরকারিভাবে ‘নিরাপদ সড়ক দিবস’ পালনের দাবি ওঠে।
পরবর্তী ও বর্তমান অবস্থা: আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আইন সংশোধন করা হয়েছে এবং নাগরিক সচেতনতা বেড়েছে। বিভিন্ন সংগঠন এই আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত থেকে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তবে, এখনো সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যা থেকে বোঝা যায় যে সড়কপথে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।
গত ১০ বছরে বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা থেকে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যায়।
নিচে প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপ তুলে ধরা হলো: বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী (২০১৪-২০২৪ পর্যন্ত ১১ বছরে): দুর্ঘটনা: ৬০,৯৮০টি। নিহত: ১,০৫,৩৩৮ জন। আহত: ১,৪৯,৮৪৭ জন।
বছরভিত্তিক সাম্প্রতিক কিছু তথ্য: ২০২৪ সালে- বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৬,৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮,৫৪৩ জন নিহত এবং ১২,৬০৮ জন আহত হন। ২০২৩ সালে- একই সংস্থার তথ্যে, ৬,২৬১টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৭,৯০২ জন নিহত এবং ১০,৩৭২ জন আহত হয়েছিলেন। ২০২২ সালে- রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে ৬,৮২৯টি দুর্ঘটনায় ৭,৭১৩ জন নিহত এবং ১২,৬১৫ জন আহত হন। ২০১৯ সালে- সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী জাতীয় সংসদকে জানান, ২০০৯ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৯ সালের এপ্রিল পর্যন্ত দশ বছরে ২৫,৫২৬ জন মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। বিভিন্ন সংস্থার পরিসংখ্যানে কিছু পার্থক্য দেখা যায়, যা তথ্য সংগ্রহের ভিন্ন পদ্ধতির কারণে হতে পারে। তবে, সব প্রতিবেদনে হতাহতের সংখ্যা ব্যাপক বলে উঠে এসেছে এবং এটি একটি বড় উদ্বেগের বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
বাংলাদেশের সড়ককে নিরাপদ করতে হলে চালক, পথচারী, যানবাহন এবং রাস্তার পরিবেশ- এই চারটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
চালকদের জন্য: প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্সিং- চালকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে এবং লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে আরও কঠোর নীতিমালা অনুসরণ করতে হবে। ট্রাফিক নিয়ম মেনে চলা- বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানো, এবং মোবাইল ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে। শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা- ক্লান্তি বা অন্য কোনো মানসিক অস্থিরতা থাকলে গাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকতে হবে।
পথচারীদের জন্য: সচেতনতা ও নিয়ম মেনে চলা- রাস্তা পার হওয়ার সময় জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করা, কানে হেডফোন বা মোবাইলে কথা না বলা উচিত। রাস্তা পরিচ্ছন্ন রাখা- রাস্তায় কোনো আবর্জনা, ফলের খোসা বা অন্যান্য ময়লা ফেলা থেকে বিরত থাকতে হবে।
যানবাহন ও পরিকাঠামোর জন্য: যানবাহনের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ- যানবাহনের ফিটনেস নিয়মিত পরীক্ষা করা এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে। উন্নত রাস্তা ও লেন- নির্দিষ্ট গতিতে যানবাহন চলাচলের জন্য আলাদা লেনের ব্যবস্থা করা এবং রাস্তার মান উন্নত করা প্রয়োজন।
মগ্রিক ব্যবস্থাপনা: সড়ক নিরাপত্তা আইন ও তার প্রয়োগ- নতুন সড়ক পরিবহন আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সমন্বিত ব্যবস্থাপনা- নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনার জন্য একটি সমন্বিত পদ্ধতি গ্রহণ করতে হবে, যেখানে ‘জিরো ডেথ’ বা দুর্ঘটনায় কারও মৃত্যু বা গুরুতর আহত না হওয়ার লক্ষ্য থাকবে।
দুর্ঘটনা-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া- দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকরভাবে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য একটি ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
সড়ক দুর্ঘটনা একটি মর্মান্তিক ঘটনা, কারণ এটি প্রায়শই প্রাণহানি, গুরুতর আঘাত এবং সম্পত্তির ক্ষতি ঘটায়। এই দুর্ঘটনাগুলো অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে এবং এর ফলে পরিবার ও সমাজে গভীর শোক এবং ক্ষতির সৃষ্টি হয়। প্রাণহানি এবং আঘাত- অনেক সড়ক দুর্ঘটনায় তাৎক্ষণিক মৃত্যু ঘটে বা যাত্রীরা মারাত্মকভাবে আহত হন। মানবিক ট্র্যাজেডি- একটি সাধারণ দুর্ঘটনার ঘটনায় পুরো পরিবার ধ্বংস হয়ে যেতে পারে, যেমনটি কিছু ঘটনায় দেখা গেছে যেখানে স্বামী-স্ত্রী এবং সন্তান মারা গেছে। আঘাত ও মানসিক প্রভাব- বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যেও দীর্ঘমেয়াদি মানসিক আঘাত, যেমন PTSD (Post Traumatic Stress Disorder) দেখা দিতে পারে। অপ্রত্যাশিত এবং আকস্মিক ঘটনা- সাধারণত এটি একটি আকস্মিক ও অপ্রত্যাশিত ঘটনা যা দ্রুত ঘটে এবং এর জন্য কেউ প্রস্তুত থাকে না। অন্যদের ওপর প্রভাব- দুর্ঘটনার ফলে উদ্ধার কাজের সময়ও অন্য মানুষের জীবনহানি হতে পারে, যা ঘটনার ভয়াবহতাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
বাংলাদেশে যেসব কারণে অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে: দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো। কুয়াশার মতো প্রতিকূল আবহাওয়ায় অসতর্কতা। গাড়ির যান্ত্রিক ত্রুটি বা নিয়ন্ত্রণ হারানো। ট্রাফিক নিয়ম না মানা।
বিভিন্ন গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অনেক সড়ক দুর্ঘটনার পেছনে চালকদের মাদকাসক্তি একটি বড় কারণ। এমনকি কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, ৩০ শতাংশ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য চালকের মাদক সেবন দায়ী। কারণ মাদকাসক্ত চালকরা যাত্রাপথে নিম্নলিখিত প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন: প্রতিক্রিয়া ক্ষমতা কমে যাওয়া- মাদক সেবনের ফলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ধীর হয়ে যায় এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা কমে যায়। ফলে সামনে কোনো অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, যেমন- হঠাৎ ব্রেক চাপা বা পথচারী চলে আসা, এড়িয়ে যাওয়া তাদের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অক্ষমতা- মাদকাসক্তি যুক্তিতর্ক ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে ব্যাহত করে। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় একজন চালক তার গতি, অন্য গাড়ির দূরত্ব এবং সময়ের ব্যবধান সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারে না। ভুল আত্মবিশ্বাস- মাদকের প্রভাবে অনেক চালকের মধ্যে একটি ভুল আত্মবিশ্বাস তৈরি হয়, যেখানে তারা নিজেদের ড্রাইভিং দক্ষতা স্বাভাবিকের চেয়ে ভালো মনে করে। এর ফলে তারা বেপরোয়াভাবে গাড়ি চালায় এবং ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং করার চেষ্টা করে। দৃষ্টিশক্তির সমস্যা- মাদক সেবনের কারণে দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে যেতে পারে বা ফোকাস নষ্ট হতে পারে। এর ফলে চালক সড়ক সংকেত, পথচারী বা অন্য কোনো বিপদ দেখতে ব্যর্থ হয়। সমন্বয়ের অভাব- মাদক কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রকে প্রভাবিত করে, যার ফলে হাত, পা ও চোখের মধ্যে সমন্বয় কমে যায়। এর ফলে সঠিকভাবে স্টিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করা, গিয়ার বদলানো বা ব্রেক চাপার মতো কাজগুলো সঠিকভাবে করা কঠিন হয়ে পড়ে। ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ- মাদকের প্রভাবে চালকরা ট্রাফিক আইন ভাঙা বা সিগন্যাল অমান্য করার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করে। ঘুমঘুম ভাব বা তন্দ্রাচ্ছন্নতা- অনেক মাদকদ্রব্য ঘুমঘুম ভাব তৈরি করে, যার কারণে নেশাগ্রস্ত চালক গাড়ি চালাতে চালাতে তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ে বা ঘুমিয়ে যায়। এর ফলে দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
মাদকাসক্ত চালকদের কারণে সৃষ্ট বিপদ কমাতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে: ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা, আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার পথে দুর্নীতি একটি বড় বাধা, কারণ এটি সড়ক নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, এবং পরিবহন খাতে নিম্নমানের কাজ, অতিরিক্ত ব্যয়, অব্যবস্থাপনা, পরিবহন খাতে মাফিয়া চক্রের প্রভাব, লাইসেন্স ও ফি প্রদানের ক্ষেত্রে দুর্নীতি এবং অবৈধ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং অসাধুতার জন্ম দেয়।
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের কিছু উল্লেখযোগ্য স্লোগান হলো: ‘পথ যেন হয় শান্তির, মৃত্যুর নয়’, ‘ছাত্র-জনতার অঙ্গীকার, নিরাপদ সড়ক হবে সবার’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’, এবং ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে?’। এই স্লোগানগুলো মূলত সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবিতে ব্যবহৃত হয়েছিল।
বাংলাদেশে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে, সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮-এর মতো আইনগুলোর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করা এবং লাইসেন্স দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। সড়ক খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করাও অপরিহার্য।
লেখক: প্রেসিডেন্ট, আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী সংগঠন ফ্রিডম ইন্টারন্যাশনাল এন্টি অ্যালকোহল
[email protected]