ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
এমবাপ্পের সমালোচনা ‘অতিরিক্ত ও অন্যায়’ দেড় দশকের জ্বালানিনীতি ছিল আমদানিনির্ভর: তথ্যমন্ত্রী ইরানের অনুশীলন মাঠের পাশে মরদেহ উদ্ধার ওয়ানডে সিরিজ বাংলাদেশ ইমার্জিংদের ঝিলিকের মৃত্যুর রহস্যে নতুন মোড়, গ্রেপ্তার স্বামী রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ মার্তিনেজকে ঘিরে নতুন শঙ্কা শাহবাগে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ নাটোরে ৭০ দরিদ্র রোগীর বিনামূল্যে ছানি অপারেশন চাকরি মেলায় সাড়া, রাজশাহীতে ৫০ শতাংশ প্রার্থীর তাৎক্ষণিক নিয়োগ ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন মাইকেল অলিভার ‘ফেনীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় ওছমান হারুন মাহমুদ দুলাল’ পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মিসরকে কেন জার্সি পরিবর্তন করতে বলল ফিফা? রবিবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবস যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায় রাজধানীতে প্রান্তিক গ্রামের ফুটবল উন্মাদনা, আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল ম্যাচ একদিনে ৫ মরদেহ উদ্ধার, বরগুনায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ দাউদকান্দিতে শিবির নেতার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায়কারীরা জনগণের বন্ধু নয়: তারেক রহমান মুন্সীগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের নতুন কমিটি ঘোষণা করায় আনন্দ মিছিল বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আগারগাঁওয়ে ‘রান ফর আর্থ’ আয়োজন সিদ্ধিরগঞ্জের ডিএনডি লেকে একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু জনদুর্ভোগ নিরসন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের দাবি ডা. শফিকুর রহমানের ভারতীয় সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে ধীরাজ শেঠ ‘তুই আসামি, চোখ নামিয়ে কথা বল’—ওসির বিরুদ্ধে নাঈম হাসানের অভিযোগ প্রযুক্তিদক্ষ তরুণরাই গড়বে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ: তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী
Nagad desktop

দোস্ত যেন দুশমন না হয়ে যায়: পন্থা আবিষ্কার করে মিলল চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল

প্রকাশ: ২৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৩:৪৯ পিএম
আপডেট: ২৭ অক্টোবর ২০২৫, ০৪:০২ পিএম
দোস্ত যেন দুশমন না হয়ে যায়: পন্থা আবিষ্কার করে মিলল চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল
বায়জীদ খুরশীদ রিয়াজ

রক্ষকই ভক্ষক হয়েছে, এমনকি হত্যাকারী হয়েছে, এমন অনেক দৃষ্টান্ত রয়েছে; ইতিহাসে এমন ঘটনাকে ‘প্রিটোরিয়ান গার্ডের বিশ্বাসঘাতকতা’ বলা হয়। ইম্পেরিয়াল রোমান সেনাবাহিনীর রাজকীয় বাহিনী ‘প্রিটোরিয়ান গার্ড’রা ছিল রোমান সম্রাটের নিরাপত্তারক্ষী, কিন্তু তারাই অনেক রোমান সম্রাটের ঘাতকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল; তাদের হাতে বলি হতে হয়েছিল ক্যালিগুলা, গ্যালবা, ডিডিয়াস জুলিয়ানাস, কমোডাস প্রমুখকে।

খ্রিষ্টপূর্বে রোম সম্রাট জুলিয়াস সিজার, আকিমিনিদ পারস্য সম্রাট জার্কসিজ-১, খ্রিষ্টাব্দে ফরাসি সম্রাট হেনরি-৬, মিশরের আনোয়ার সাদাত, ভারতের মহাত্মা গান্ধী, ইন্দিরা গান্ধী, বাংলাদেশের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রমুখ তাদের রক্ষাকর্তা বা দেহরক্ষীর হাতে নিহত হয়েছেন।

১. দ্বিধার তলোয়ার: ইমিউন সিস্টেম (Immune System)
মানবদেহকে অসুখ-বিসুখ থেকে রক্ষা করার জন্য ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলে ইমিউন সিস্টেম, বাংলায় ‘রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা’। ইমিউন সিস্টেম একটি অত্যন্ত উন্নত প্রতিরক্ষা নেটওয়ার্ক; যা ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক এবং পরজীবীর মতো রোগজীবাণু শনাক্ত করে এবং ধ্বংস করে। এটি শক্তিশালী ইনফ্ল্যামেটরি প্রতিক্রিয়া তৈরি করে, যা অসুস্থতা থেকে নিরাময়ের ব্যবস্থা করে। ইনফেকশনের পরে এটি ‘স্মৃতিকোষ’ তৈরি করে যা ভবিষ্যতে একই রোগ-জীবাণুর (টিকা দেওয়ার নেপথ্যের নীতি) সঙ্গে মুখোমুখি হওয়ার বিরুদ্ধে স্থায়ী সুরক্ষা দেয়। তাছাড়া এটি ক্রমাগত শরীরে টহল দেয়, ক্যান্সারে পরিণত কোষগুলিকে শনাক্ত করে এবং নির্মূল করে। অর্থাৎ বেঁচে থাকার জন্য ইমিউন সিস্টেম অপরিহার্য। 

এবার তলোয়ারের অপর ধারটা দেখে নিই। একই ইমিউন সিস্টেম মানবদেহের মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুর কারণ হতে পারে। ইমিউন সিস্টেম মানবদেহে বহিরাগত জীবাণুর কোষকে নিজ দেহের সুস্থ কোষ থেকে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়; এটি ভুল করে শরীরের নিজস্ব (self) টিস্যুকে ‘বহিরাগত’ (non-self) হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তাদের আক্রমণ করে বসে। ফলে মারত্মক সব অটোইমিউন রোগের উদ্ভব হয়; যেমন- রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস (জয়েন্ট আক্রমণ করে), লুপাস (ত্বক, জয়েন্ট, কিডনি ইত্যাদি আক্রমণ করে), মাল্টিপল স্ক্লেরোসিস (স্নায়ুকোষ আক্রমণ করে) এবং টাইপ-১ ডায়াবেটিস (ইনসুলিন উৎপাদনকারী কোষ আক্রমণ করে)। 

আবার ইমিউন সিস্টেম মাত্রাতিরিক্ত প্রদাহও সৃষ্টি করতে পারে; ফলে অ্যালার্জি, সাইটোকাইন ঝড় (যেমন গুরুতর কোভিড-১৯ বা সেপসিসের ক্ষেত্রে), অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস (ধমনী শক্ত হয়ে যাওয়া) এবং হাঁপানির মতো রোগের কারণ হতে পারে। তাছাড়া কিডনি, লিভার, হার্ট ইত্যাদি অঙ্গ ট্রান্সপ্লানটেশন (প্রতিস্থাপন) করার পর ইমিউন সিস্টেমের প্রতিক্রিয়ার কারণে তা প্রত্যাখ্যাত হতে পারে।

ইমিউন সিস্টেমের এই পরষ্পরবিরোধী ভূমিকার কারণে একে ‘দ্বিধার তলোয়ার’ বলা হয়ে থাকে। কিন্তু কথায় আছে, ‘তরবারি তার খাপকে কাটে না’। তার মানে মানবদেহে এমন একটা ব্যবস্থা আছে যা ইমিউন সিস্টেমের উপকারী এবং অপকারী ভূমিকাকে নিয়ন্ত্রণ করে। কে বা কারা করে, কীভাবে করে তা আবিষ্কার করে ২০২৫ সালে ফিজিওলজি বা মেডিসিনে নোবেল পুরস্কার জয় করে নিয়েছেন তিন বিজ্ঞানী। তারা হলেন -  যুক্তরাষ্ট্রের মেরি ব্রুনকো ও ফ্রেড র‌্যামসডেল এবং জাপানের শিমন সাকাগুচি।

২. নোবেল কমিটির বক্তব্যের সারাংশ
আমাদের দেহে আক্রমণ করার চেষ্টা করে এমন হাজার হাজার জীবাণু থেকে প্রতিনিয়ত আমাদের রক্ষা করছে ইমিউন সিস্টেম। এসব জীবাণুর আলাদা আলাদা চেহারা রয়েছে; কিন্তু এদের ছদ্মবেশ ধারণ করার ক্ষমতাও আছে। এরা এমন ছদ্মবেশ ধারণ করে যে এদের চেহারা মানবদেহের কোষের সঙ্গে মিলে যায়। তাহলে ইমিউন সিস্টেম কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয় যে কাদেরকে আক্রমণ করতে হবে, আর কাদেরকে রক্ষা করতে হবে? কেনই বা ইমিউন সিস্টেম আমাদের দেহকে ঘন ঘন আক্রমণ করে না?

গবেষকরা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বাস করতেন যে তারা প্রশ্নগুলার উত্তর জানেন: ইমিউন সিস্টেমের কোষগুলি ‘কেন্দ্রীয় রোগ প্রতিরোধ সহনশীলতা’ (central immune tolerance) নামক একটি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিপক্ক হয়। কিন্তু তারা যা ধারণা করেছিলেন, আমাদের ইমিউন সিস্টেম তার চেয়েও জটিল। যে যুগান্তকারী মৌলিক ধারণা আবিষ্কারের জন্য ওই বিজ্ঞানীত্রয়কে পুরস্কৃত করা হয়েছে, তা ‘প্রান্তীয় রোগ প্রতিরোধ সহনশীলতা’ (peripheral immune tolerance) সম্পর্কিত, যা ইমিউন সিস্টেমকে শরীরের ক্ষতি করতে বাধা দেয়। নোবেল বিজয়ীরা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সুরক্ষাপ্রহরী ‘নিয়ন্ত্রক টি-কোষ’ (regulatory T cell) চিহ্নিত করেছেন, যা রোগ প্রতিরোধের কোষগুলিকে আমাদের নিজের শরীর ধ্বংস করা থেকে বিরত রাখে। 

নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ওলে কাম্পে বলেন, ‘আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং কেন আমরা সবাই গুরুতর অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হই না, সে সম্পর্কে আমাদের বোঝার জন্য তাদের আবিষ্কারগুলি নির্ণায়ক।’

৩. ইমিউন সিস্টেমের গঠন, কর্মস্থল ও কর্মপদ্ধতি
ইমিউন সিস্টেম হলো বিভিন্ন কোষ, টিস্যু এবং অঙ্গের একটি জটিল নেটওয়ার্ক। প্রাথমিকভাবে এর কোষীয় উপাদান শ্বেত রক্তকণিকা। মাইক্রোস্কোপের নিচে দেখা যায়, কয়েক প্রকার শ্বেত রক্তকণিকার সাইটোপ্লাজম দানাদার (গ্রানুলোসাইট), আবার কয়েক প্রকারের অদানাদার (অ্যাগ্রানুলোসাইট)। গ্রানুলোসাইট তিন প্রকার - নিউট্রোফিল, ইওসিনোফিল, বেসোফিল। অ্যাগ্রানুলোসাইট দুই প্রকার - লিম্ফোসাইট এবং মনোসাইট। নিউট্রোফিল সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায়, যা ব্যাকটেরিয়াকে গ্রাস এবং ধ্বংস করার জন্য প্রথম প্রতিক্রিয়াকারী হিসাবে কাজ করে। ইওসিনোফিল পরজীবীর বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং অ্যালার্জিতে জড়িত থাকে, অন্যদিকে ব্যাসোফিল প্রদাহ বৃদ্ধির জন্য হিস্টামিন নিঃসরণ করে। মনোসাইট টিস্যুতে ম্যাক্রোফেজে পরিণত হয়, যা শক্তিশালী ‘বড় ভক্ষক’, যা রোগজীবাণু এবং মৃত কোষ পরিষ্কার করে।

লিম্ফোসাইট তিন প্রকার - টি-লিম্ফোসাইট, বি-লিম্ফোসাইট এবং ন্যাচারাল কিলার সেল। সংক্ষেপে টি-লিম্ফোসাইট ‘টি-সেল’ (T cell) এবং বি-লিম্ফোসাইট ‘বি-সেল’ (B cell) নামে অধিক পরিচিত; thymus থেকে T, আর bone marrow (অস্থিমজ্জা ) থেকে B। এই কোষগুলি বিশেষায়িত অঙ্গের মধ্যে বিকশিত হয় এবং কাজ করে।

প্রাথমিক লিম্ফয়েড অঙ্গ হলো অস্থিমজ্জা (যেখানে বি-সেলসহ সব ধরণের রক্তকণিকা উৎপন্ন এবং পরিপক্ক হয়) এবং থাইমাস (thymus) (যেখানে টি-সেল পরিপক্ক হয় এবং তাকে দোস্ত-দুশমনের পার্থক্য নিরূপনের শিক্ষা দেওয়া হয়)। থাইমাস বুকের ঠিক মধ্যবর্তী অস্থির পিছনে ও হার্টের উপরের দিকে অবস্থিত একটি ছোট গ্রন্থি।

গৌণ লিম্ফয়েড অঙ্গ, যেমন লিম্ফনোড, স্প্লিন এবং টনসিল হলো সেসব স্থান; যেখানে রোগ প্রতিরোধক কোষগুলি রোগজীবাণুর মুখোমুখি হয় এবং একটি অভিযোজিত (adaptive) রোগ প্রতিরোধক প্রতিক্রিয়া শুরু করে।

৪. নোবেল বিজয়ীদের আবিষ্কার
সেটা বুঝতে টি-সেলে মনোনিবেশ করলেই যথেষ্ট। ১৯৯০-এর দশকে টি-সেল সম্বন্ধে কী ধারণা ছিল তা দেখে নেওয়া যাক: টি-সেল ২ ধরণের।

সহায়ক টি-সেল (Helper T cells): ক্রমাগত শরীরে টহল দেয়। যদি তারা কোনো আক্রমণকারী জীবাণু আবিষ্কার করে, তবে তারা ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষগুলিকে সতর্ক করে, যারা তখন জীবাণুটিকে আক্রমণ করে।

ঘাতক টি-সেল (Killer T cells): ভাইরাস বা অন্যান্য রোগজীবাণু দ্বারা সংক্রমিত কোষগুলিকে নির্মূল করে ফেলে। তারা টিউমার কোষকেও আক্রমণ করতে পারে।

৪.১ সেন্সর: যা আক্রমণকারীদের শনাক্ত করতে পারে
সেন্সর বিষয়টার সঙ্গে আমরা এখন পরিচিত। পানির কলের কাছাকাছি হাত নিয়ে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পানি ঝরতে থাকে, কারণ কলে সেন্সর থাকে, যা হাতের অস্তিত্ব সেন্স করতে (বুঝতে) পেরে নিজের মুখ খুলে দেয়। সব টি-সেলের পৃষ্ঠে ‘টি-সেল রিসেপ্টর’ নামক বিশেষ প্রোটিন থাকে যেগুলোকে সেন্সরের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। এগুলি ব্যবহার করে টি-সেলগুলি অন্যান্য কোষকে স্ক্যান করতে পারে যাতে শরীর কোনো আক্রমণাত্মক জীবাণুর কবলে পড়েছে কিনা তা আবিষ্কার করা যায়। 

টি-সেল রিসেপ্টরগুলি বিশেষায়িত, কারণ জিগ্স (Jigsaw) খেলার টুকরোর মতো তাদের সবারই বিভিন্ন আকার রয়েছে। এর অনেকগুলি জিন (gene) থেকে তৈরি হয়, যেগুলো এলোমেলোভাবে সংযুক্ত হয়। 

তত্ত্ব অনুসারে, এর অর্থ হলো শরীর ১ হাজার ১৫টিরও বেশি সংখ্যক ধরণের টি-সেল রিসেপ্টর তৈরি করতে পারে। বিভিন্ন রকমের রিসেপ্টর লাগানো বিপুল সংখ্যক টি-সেল নিশ্চিত করে যে এমন কিছু সক্রিয় আছে যা সর্বদা আক্রমণকারী জীবাণুর আকৃতি শনাক্ত করতে পারে। নতুন ভাইরাস-সহ, যেমন সার্স-কভ-২ ভাইরাস যা ২০১৯ সালে করোনা মহামারি ঘটিয়েছিল। তবে, শরীর অনিবার্যভাবে এমন টি-সেল রিসেপ্টরও তৈরি করে যা শরীরের নিজস্ব টিস্যুর সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে। তাহলে, কী কারণে টি-সেল বহিরাগত জীবাণুর প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়, কিন্তু আমাদের নিজস্ব কোষের ক্ষেত্রে প্রতিক্রিয়াহীন থাকে?

৪.২ থাইমাসে টি-সেলের শিক্ষা এবং পরীক্ষা 
১৯৮০-এর দশকে গবেষকরা বুঝতে পেরেছিলেন, যখন টি-সেলগুলি থাইমাসে পরিপক্ক হয়, তখন তাদেরকে এক ধরণের শিক্ষা দেওয়া হয়। এই শিক্ষার দুটি প্রধান ‘জীবন-মৃত্যু’ পরীক্ষা রয়েছে:

৪.২.১ ইতিবাচক নির্বাচন:  
পরীক্ষা: টি-সেলগুলি পরীক্ষা করে দেখা হয় যে তাদের রিসেপ্টরগুলি শরীরের নিজস্ব ‘স্ব’ (self) মার্কারগুলির সঙ্গে দুর্বলভাবে আবদ্ধ হতে পারে কিনা।
ফলাফল: পরীক্ষায় যেসব টি-সেল পাস করে তারা এটাই প্রমাণ করে যে শরীরের নিজস্ব কোষ দ্বারা উপস্থাপিত হুমকিগুলি শনাক্ত করার ক্ষমতা তাদের রয়েছে। তারা পরবর্তী পর্যায়ে চলে যায়। যেসব টি-সেল পরীক্ষায়  ফেইল করে (কোনওভাবেই আবদ্ধ হতে পারে না), তারা ইমিউন সিস্টেমের জন্য অকেজো এবং অ্যাপোপটোসিস প্রক্রিয়ায় ধ্বংস/নির্মূল হয়ে যায়।

৪.২.২ নেতিবাচক নির্বাচন:
পরীক্ষা: প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ টি-কোষগুলি এখন পরীক্ষা করা হয় যে তারা শরীরের নিজস্ব ‘স্ব’-প্রোটিনের সঙ্গে অত্যধিক শক্তভাবে আবদ্ধ হচ্ছে কিনা।
ফলাফল: যেসব টি-সেল অত্যধিক শক্তভাবে আবদ্ধ করে তারা আসলে এই পরীক্ষায় ফেল করে। তারা বিপজ্জনক, কারণ তারা শরীরের নিজস্ব টিস্যু আক্রমণ করে অটোইমিউন রোগ সৃষ্টি করতে পারে। তাদেরকে জোরপূর্বক ধ্বংস/নির্মূল করে ফেলা হয়।

এই পরীক্ষায় সেসব টি-সেলই পাস করে যারা ‘স্ব’-প্রোটিনের সাথে দুর্বলভাবে আবদ্ধ হয় বা একেবারেই আবদ্ধ হয় না।

শিক্ষার লক্ষ্য: সমগ্র প্রক্রিয়াটি নিশ্চিত করে যে কেবলমাত্র সবচেয়ে কার্যকর এবং নিরাপদ টি-সেলগুলি রক্তপ্রবাহে মুক্তি পায়, যেগুলি আমাদের নিজস্ব কোষগুলিকে চিনতে পারে এবং তাদের আক্রমণ করবে না, বরং বহিরাগত আক্রমণকারীদের আক্রমণ করবে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়াটিকে ‘কেন্দ্রীয় সহনশীলতা’ বলা হয়। 

৪.৩ আরেক ধরণের টি-সেল কি আছে?
উপরোক্ত দুই ধরণের টি-সেলের পাশাপাশি কিছু গবেষক আরেক ধরণের কোষের অস্তিত্বের সন্দেহ করেছিলেন, যাকে তারা ‘অবদমনকারী টি-সেল’ (suppressor T cells) বলে অভিহিত করেছিলেন। তারা বিশ্বাস করেছিলেন যে এগুলি থাইমাসে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ টি-সেলগুলির সাথে সম্পর্কিত। কিন্তু যখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে ‘অবদমনকারী টি-সেলে’র কিছু প্রমাণ ভুল, তখন গবেষকরা পুরো অনুমানটি প্রত্যাখ্যান করেন এবং গবেষণা ক্ষেত্রটি কমবেশি পরিত্যক্ত হয়ে যায়।

তা সত্ত্বেও একজন গবেষক স্রোতের বিরুদ্ধে সাঁতার কাটতে থাকেন। তার নাম শিমন সাকাগুচি এবং তিনি জাপানের নাগোয়ায় ‘আইচি ক্যান্সার সেন্টার রিসার্চ ইনস্টিটিউটে’ কাজ করতেন।

৪.৪ সাকাগুচির বিশ্বাস: ইমিউন সিস্টেমের জন্য একজন নিরাপত্তারক্ষী থাকা আবশ্যক
সাকাগুচির সহকর্মীরা আগেই টি-সেলের বিকাশে থাইমাসের ভূমিকা বোঝার জন্য নবজাতক ইঁদুর থেকে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই অঙ্গটি অপসারণ করেছিলেন। তারা অনুমান করেছিলেন যে ইঁদুরগুলিতে কম টি-সেল তৈরি হবে এবং তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হবে। দেখা গেল, যদি ইঁদুরের জন্মের তিন দিন পরে অপারেশন করা হয়, তাহলে ইমিউন সিস্টেম অতিরিক্ত গতিতে চলে যায় এবং উত্তেজিত হয়ে পড়ে। যার ফলে ইঁদুরগুলি বিভিন্ন ধরণের অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হয়।

ঘটনাটি ভালোভাবে বোঝার জন্য ১৯৮০-র দশকের শুরুতে সাকাগুচি জিনগতভাবে অভিন্ন ইঁদুরের মধ্যে পরিপক্ক হয়েছে এমন টি-সেলগুলিকে বের করে এনে সেগুলো থাইমাসবিহীন ইঁদুরের দেহে ঢুকিয়ে দেন। আকর্ষণীয় ফলাফল পাওয়া যায়। এমন ধরণের টি-সেল পাওয়া গেছে বলে মনে হয়েছিল যা ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে।

এটি এবং অন্যান্য অনুরূপ ফলাফল সাকাগুচিকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে ইমিউন সিস্টেমে অবশ্যই এমন ধরণের নিরাপত্তারক্ষী রয়েছে, যা অন্যান্য টি-সেলকে শান্ত করে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে রাখে। প্রশ্ন হচ্ছে - সেটি কোন ধরণের সেল?

৪.৫ সাকাগুচি কর্তৃক নতুন ধরণের টি-সেলের আবিষ্কার
‘সহায়ক টি-সেল’ তাদের গায়ে ‘সিডিফোর’ (CD4) এবং ‘ঘাতক টি-সেল’ ‘সিডিএইট’ (CD8) নামক প্রোটিন (এক ধরণের কো-রিসেপ্টর) বহন করে। অর্থাৎ ‘সিডিফোর’ ও ‘সিডিএইট’-এর মাধ্যমে এই দুই প্রকার টি-সেল শনাক্ত করা যায়। যে পরীক্ষায় সাকাগুচি ইঁদুরকে অটোইমিউন রোগ থেকে রক্ষা করেছিলেন, তাতে তিনি ‘সিডিফোর’ বহনকারী ‘সহায়ক টি-সেল’ ব্যবহার করেছিলেন। সাধারণত এই কোষগুলি ইমিউন সিস্টেমকে জাগিয়ে তোলে এবং এটিকে সক্রিয় হতে তৈরি রাখে। কিন্তু সাকাগুচির পরীক্ষায় ইমিউন সিস্টেম থমকে গিয়েছিল। এতে তিনি এই উপসংহার টেনেছিলেন যে, নিশ্চয়ই ‘সিডিফোর’ বহনকারী আরেক ধরণের টি-সেল রয়েছে।

তার অনুমানের সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য সাকাগুচিকে বিভিন্ন ধরণের টি-সেলের মধ্যে পার্থক্য করার একটি উপায় খুঁজে বের করতে হয়েছিল। এতে তার এক দশকেরও বেশি সময় লেগেছিল, কিন্তু ১৯৯৫ সালে তিনি বিশ্বের কাছে সম্পূর্ণ নতুন ধরণের টি-সেল উপস্থাপন করেন। ‘দ্য জার্নাল অব ইমিউনোলজি’তে তিনি দেখিয়েছিলেন যে এই টি-সেলগুলি - যা ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করে, তারা তাদের পৃষ্ঠে কেবল ‘সিডিফোর’ বহন করে না, CD25 নামক আরেক ধরণের প্রোটিনও বহন করে।

এই নতুন শনাক্তকৃত টি-সেল শ্রেণির নামকরণ করা হয়েছিল ‘নিয়ন্ত্রক টি-সেল’; ইংরেজিতে Regulatory T Cell, সংক্ষেপে Treg বলা হয়। কিন্তু অনেক গবেষক এর অস্তিত্ব নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন; সাকাগুচির আবিষ্কার বিশ্বাস করার আগে তারা আরও প্রমাণ দাবি করেন।

৪.৬ ১৯৪০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবরেটরিতে যে গবেষণা হয়েছিল 
টেনেসির ওক রিজোর একদল গবেষক তখন রেডিয়েশনের পরিণতি নিয়ে গবেষণা করছিলেন। তাদের কাজ ছিল ঐতিহাসিক ‘ম্যানহাটন প্রকল্পে’র অংশ, যা পারমাণবিক বোমার জন্ম দিয়েছিল। ওই গবেষণার সময় ‘স্কার্ফি’ নামক একটি ইঁদুরের প্রজাতির মধ্যে ‘এলোমেলো রূপান্তর’ আবিষ্কৃত হয়েছিল। এই ‘এক্স-ক্রোমোজোম-সম্পৃক্ত রূপান্তর’র ফলে পুরুষ ইঁদুরগুলি আঁশযুক্ত ত্বক, বর্ধিত অঙ্গ এবং খুব কম আয়ু নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। কয়েক দশক পরে, ১৯৯০-এর দশকে বিজ্ঞানীরা নির্ধারণ করেছিলেন যে এই অসুস্থতা ইমিউন সিস্টেমের বিদ্রোহের কারণে ঘটেছিল, যেখানে ইঁদুরের টি-সেল তাদের শরীরের নিজস্ব টিস্যুকে আক্রমণ করেছিল এবং ধ্বংস করে দিয়েছিল।

৪.৭ মঞ্চে মেরি ব্রুনকো ও ফ্রেড র‍্যামসডেলের আবির্ভাব এবং অটোইমিউন রোগের কারণ আবিষ্কার
বায়োটেক কোম্পানি সেলটেক কাইরোসায়েন্সের গবেষক মেরি ব্রুনকো এবং ফ্রেড র‍্যামসডেল স্কার্ফি ইঁদুরের প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন, বিশ্বাস করেন যে তাদের কাছে অটোইমিউন রোগ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র রয়েছে। তারা নির্দিষ্ট মিউট্যান্ট জিনকে দায়ী করার লক্ষ্যে কাজ করছিলেন। আশা করছিলেন যে, এর প্রক্রিয়াটি অটোইমিউন রোগগুলি কীভাবে উদ্ভূত হয় সে সম্পর্কে সিদ্ধান্তমূলক অন্তর্দৃষ্টি দেবে। যাহোক, ১৯৯০-এর দশকে, ইঁদুরের এক্স-ক্রোমোজোমে একটি একক মিউটেশন (যার মধ্যে প্রায় ১৭০ মিলিয়ন বেস জোড়া থাকে) সনাক্ত করা, খড়ের গাদায় একটি সুই খুঁজে বের করার মতো একটি কঠিন কাজ ছিল, যার জন্য প্রচুর সময়, ধৈর্য এবং আধুনিক যুগের আণবিক সরঞ্জামগুলির সৃজনশীল ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল।

গবেষকদ্বয় প্রথমে এক্স-ক্রোমোজোমে স্কার্ফি মিউটেশনের অবস্থানকে ৫ লাখ নিউক্লিওটাইডের একটি অংশে সংকুচিত করেছিলেন এবং সাবধানতার সঙ্গে এই অঞ্চলটির ‘ম্যাপিং’ করেছিলেন। সেখানে ২০টি সম্ভাব্য জিন সনাক্ত করার পর তারা সুস্থ এবং স্কার্ফি ইঁদুরের মধ্যে সেগুলি একে একে তুলনা করেছিলেন। সর্বশেষ (২০তম) জিনে মিউটেশনটি খুঁজে পেয়েছিলেন। এই ত্রুটিপূর্ণ জিন, যা ছিল পূর্বে অজানা, কিন্তু ফর্কহেড বক্স/ফক্স জিন পরিবারের অনুরূপ, এর নামকরণ করা হয়েছিল ফক্সপিথ্রি (FOXP3)।

ব্রুনকো এবং র‍্যামসডেল সন্দেহ করেছিলেন যে, মানুষের এক্স-লিঙ্কড অটোইমিউন রোগ আইপেক্স (IPEX) স্কার্ফি ইঁদুরের অবস্থার সমতুল্য। তারা ফক্সপিথ্রি জিনের মানব সংস্করণ আবিষ্কার করেছিলেন এবং আইপেক্স রোগে আক্রান্ত ছেলেদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে নিশ্চিত করেছিলেন যে, ফক্সপিথ্রি জিনের ক্ষতিকারক মিউটেশন আইপেক্স সৃষ্টি করে। তাদের ২০০১ সালের প্রকাশনা এটিকে মানুষ এবং ইঁদুর উভয় প্রাণীর রোগের কারণ হিসাবে প্রকাশ করেছিল, যা পরবর্তীতে গবেষকদের বুঝতে সাহায্য করেছিল যে সাকাগুচি দ্বারা আবিষ্কৃত ‘রেগুলেটরি টি সেলে’র কার্যকারিতার জন্য ফক্সপিথ্রি জিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

৪.৮ শরীরের নিরাপত্তারক্ষী ‘রেগুলেটরি টি সেল’: প্রমাণিত 
এর দুই বছর পর (২০০৩ সালে) শিমন সাকাগুচি এই আবিষ্কারগুলিকে সংযুক্ত করতে সক্ষম হন। তিনি প্রমাণ করেন যে ১৯৯৫ সালে তিনি যে ‘নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) টি-সেল’ শনাক্ত করেছিলেন, তার বিকাশ নিয়ন্ত্রণ করে ফক্সপিথ্রি জিন। এই টি-সেল ইমিউন সিস্টেমের অন্যান্য কোষকে পর্যবেক্ষণে রাখে এবং নিশ্চিত করে যে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা আমাদের নিজস্ব টিস্যুকে সহ্য করে নেয়। এভাবে তারা অন্যান্য টি-সেলকে ভুলভাবে শরীরের নিজস্ব টিস্যু আক্রমণ করা থেকে বিরত রেখে অপরিহার্য নিরাপত্তারক্ষী হিসাবে কাজ করে। এই প্রক্রিয়া ‘পেরিফেরাল ইমিউন টলারেন্স’ নামে পরিচিত। অতিরিক্ত কার্যকলাপ প্রতিরোধ করার জন্য সংক্রমণ পরিষ্কার হওয়ার পরে ইমিউন সিস্টেমকে শান্ত করার জন্যও তাদের গুরুত্বপূর্ণ কাজ রয়েছে।

৫. আবিষ্কারের উপযোগিতা
‘নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটরি) টি-সেল’ আবিষ্কার নতুন চিকিৎসার সূচনা করেছে। ক্যান্সার চিকিৎসায় গবেষকরা টিউমারের চারপাশে এই কোষগুলির প্রতিরক্ষামূলক ‘প্রাচীর’ ভেঙে ফেলছেন যাতে ইমিউন সিস্টেম তাদের আক্রমণ করতে পারে। বিপরীতে, অটোইমিউন রোগ এবং ট্রান্সপ্লানটেশন প্রত্যাখ্যানের ক্ষেত্রে এমন কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে যেন রেগুলেটরি টি-সেলের কার্যকলাপ বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে রয়েছে রোগীদের ইন্টারলিউকিন-২ দেওয়া, যাতে এই কোষগুলি বৃদ্ধি পায়, অথবা রোগীর নিজস্ব রেগুলেটরি টি-সেলকে ‘ঠিকানা’ দিয়ে বিচ্ছিন্ন করা এবং এমনকি সংশোধন করা। যাতে তারা নির্দিষ্ট অঙ্গগুলিকে রক্ষা করতে পারে। এই চিকিৎসাগুলির বেশ কয়েকটি এখন ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ব্রুনকো, র‍্যামসডেল এবং সাকাগুচির বিপ্লবী আবিষ্কার মানবজাতির জন্য অশেষ কল্যাণ বয়ে এনছে। 

৬. দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়/ বেড়া যেন খেত না খেয়ে ফেলে
স্কটিশ সাহিত্যিক রবার্ট লুই স্টিভেনসনের ‘স্ট্রেঞ্জ কেস অব ডক্টর জেকিল অ্যান্ড মিস্টার হাইড’ উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র ডক্টর হেনরি জেকিল বিশ্বাস করেন যে, প্রতিটি মানুষের দ্বৈত প্রকৃতি থাকে - একটি সম্মানজনক এবং একটি মন্দ। তিনি এই দুটি অংশকে আলাদা করার উদ্দেশ্যে একটি ওষুধ তৈরি করেন, যার ফলে তার সৎ-সত্ত্বা তার নিজের শরীরেই থাকে এবং তার অন্ধকার আবেগগুলিকে একটি নতুন রূপে পরিশুদ্ধ করা হয়। এটি সফল হয়। কিন্তু একটি ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে তিনি শারীরিকভাবে নীচ এবং পাশবিক মিস্টার অ্যাডওয়ার্ড হাইডে রূপান্তরিত হন। এক পর্যায়ে দুশ্চরিত্র হাইড সচ্চরিত্র জেকিলের ওপর কর্তৃত্ব করতে শুরু করে। মানবদেহের ইমিউন সিস্টেম অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থারও বিপরীতমুখী দুটি সত্ত্বা বিদ্যমান। নোবেল পুরষ্কার দ্বারা সম্মানিত মহান আবিষ্কারটি এই সত্যই প্রকাশ করে যে দ্বন্দ্বপূর্ণ এই সম্পর্কের মধ্যে বিজ্ঞ কূটনীতিক হিসাবে কাজ করে রেগুলেটরি টি-সেল, তারাই ক্রমাগত মধ্যস্থতা করে চলে - দোস্ত যেন দুশমন হয়ে না যায়। ফক্সপিথ্রির মতো জিন দ্বারা পরিচালিত এই জটিল ভারসাম্য হলো গৃহযুদ্ধের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত সুরক্ষা।

এই কূটনীতিকরা যেন স্বাচ্ছন্দ্যে কাজ করতে পারে সেজন্য আমাদের কী করণীয়? ঘুরেফিরে সংক্ষেপে উত্তর একটাই - নিয়ন্ত্রণ এবং ভারসাম্য বৃদ্ধি করে এমন একটি জীবনধারা গ্রহণ করা। দীর্ঘস্থায়ী চাপ (stress) প্রদাহজনক বিদ্রোহের কারণ হতে পারে, কাজেই তা এড়িয়ে চলা বা ম্যানেজ করে চলা। পরিপাকতন্ত্রের সুস্থ মাইক্রোবায়োমকে সমর্থন করার জন্য ফাইবার এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ একটি সুষম খাদ্য বজায় রাখা, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশিক্ষণ ক্ষেত্র। পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা, যে সময় রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা পুনর্নির্মিত হয়; এবং নিয়মিত পরিমিত ব্যায়াম করা, যা প্রদাহ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। ভারসাম্যপূর্ণ জীবনযাপন করে আমরা একটি অভ্যন্তরীণ সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারি যেখানে আমাদের প্রতিরক্ষা সর্বদা জাগ্রত, অনুগত এবং চিরকালের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ থাকবে।

লেখক: জনস্বাস্থ্য ও হাসপাতাল প্রশাসন বিশেষজ্ঞ

রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ১১:২৫ পিএম
রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ
ডা. তিমির কুমার সাহা

দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিনিয়ত অসংখ্য রোগীর জীবন বাঁচাতে রক্ত সঞ্চালন করা হয়। দুর্ঘটনায় আহত ব্যক্তি, প্রসূতি মা, ক্যান্সার রোগী, অস্ত্রোপচাররত রোগী কিংবা থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কোনো শিশুর প্র্রয়োজন হয় রক্তের। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। যে রক্ত দেওয়া হচ্ছে, সেটি কতটা নিরাপদ? এক ব্যাগ রক্ত জীবন বাঁচাতে পারে, আবার সঠিক পরীক্ষা ছাড়া সেই রক্তই নতুন রোগ, জটিলতা এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। 

বিশুদ্ধ বা নিরাপদ রক্ত আসলে কী?
অনেকেই মনে করেন, রক্তে কোনো রোগ না থাকলেই সেটি নিরাপদ। বাস্তবে নিরাপদ রক্তের তিনটি মৌলিক শর্ত রয়েছে। রক্তটি হতে হবে: ১. সংক্রমণমুক্ত, ২. সঠিক রক্তের গ্রুপ এবং ৩. রোগীর শরীরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকা।

কেন রক্ত পরীক্ষা করা হয়?
একজন মানুষ দেখতে সম্পূর্ণ সুস্থ হলেও তার রক্তে এমন ভাইরাস বা জীবাণু থাকতে পারে; যা তিনি নিজেও জানেন না। এ কারণেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) রক্ত সঞ্চালনের আগে কিছু বাধ্যতামূলক সংক্রমণ পরীক্ষা করার সুপারিশ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশকৃত পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হলো- এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া (বিশেষত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে)।

ICT ও ELISA : কেন গুরুত্বপূর্ণ?
বাংলাদেশসহ অনেক দেশে রক্ত পরীক্ষার ক্ষেত্রে ICT এবং ELISA পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়। ICT (Immunochromatographic Test) দ্রুত ফলাফল দেয় এবং প্রাথমিক স্ক্রিনিংয়ের জন্য কার্যকর। তবে কিছু ক্ষেত্রে খুব প্রাথমিক সংক্রমণ শনাক্ত করার সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।

ELISA (Enzyme-Linked Immunosorbent Assay)
ELISA তুলনামূলকভাবে বেশি সংবেদনশীল এবং নির্ভরযোগ্য। ভাইরাস বা সংক্রমণের ক্ষুদ্র উপস্থিতিও শনাক্ত করার সক্ষমতা বেশি হওয়ায় এটি আন্তর্জাতিকভাবে বহুল ব্যবহৃত।

NAT Testing : আধুনিক নিরাপত্তার আরেক ধাপ
উন্নত দেশগুলোতে অনেক ব্লাড ব্যাংক এখন NAT (Nucleic Acid Testing) ব্যবহার করে। এই প্রযুক্তি ভাইরাসের জিনগত উপাদান শনাক্ত করতে পারে।

শুধু গ্রুপ মিললেই কি যথেষ্ট?
এর উত্তর হলো, না। রোগীর শরীর ও দাতার রক্তের মধ্যে সামঞ্জস্য নিশ্চিত করতে থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং করাও দরকার। এই পরীক্ষার মাধ্যমে দেখা হয়, রোগীর শরীরে এমন কোনো অ্যান্টিবডি আছে কি না, যা দাতার রক্তের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে তা পরীক্ষা করা হয়।

ভুল বা অপরীক্ষিত রক্ত কতটা বিপজ্জনক?
HIV সংক্রমণ, হেপাটাইটিস বি অথবা সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া, তীব্র অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া, হেমোলাইটিক ট্রান্সফিউশন রিঅ্যাকশন, কিডনি বিকল হওয়া, বহু অঙ্গ বিকল হওয়া। এমনকি মৃত্যু পর্যন্তও হতে পারে।

এক ব্যাগ রক্তের নিরাপত্তার আট ধাপ
একটি নিরাপদ রক্ত রোগীর শরীরে পৌঁছানোর আগে সাধারণত কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করে। ১. রক্তদাতা নির্বাচন, ২. স্বাস্থ্য ইতিহাস যাচাই, ৩. রক্ত সংগ্রহ, ৪. সংক্রমণ পরীক্ষা (ICT, ELISA বা NAT), ৫. রক্তের গ্রুপ নির্ধারণ, ৬. থ্রি-ফেজ ক্রস ম্যাচিং, ৭. সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষণ এবং ৮. রোগীর শরীরে সঞ্চালন।

রক্ত নেওয়ার আগে রোগী বা স্বজনদের জানা উচিত
রক্ত কোথায় পরীক্ষা হয়েছে, WHO-স্বীকৃত স্ক্রিনিং সম্পন্ন হয়েছে কি না, ক্রস ম্যাচিং করা হয়েছে কি না, রক্ত সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না ইত্যাদি। এসব প্রশ্ন করা রোগীর অধিকার এবং নিরাপত্তার জন্য প্রয়োজনীয়।

রক্তদান একটি মহৎ কাজ, কিন্তু নিরাপদ রক্তদান আরও বড় দায়িত্ব। এক ব্যাগ রক্তের পেছনে থাকে বিজ্ঞান, পরীক্ষা, সতর্কতা এবং দায়িত্বশীলতার সমন্বয়। কারণ রক্তের প্রয়োজনীয়তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সঠিক রোগীর জন্য সঠিকভাবে পরীক্ষিত রক্ত নিশ্চিত করা। বিশ্বের সকল রক্তগ্রহীতা পাক নিরাপদ নিশ্চিত রক্ত। বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের শুভেচ্ছা।

ডা. তিমির কুমার সাহা: এমবিবিএস, পিজিটি, মেডিকেল কাউন্সেলর, কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন

বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম
বড় বাজেটের বড় প্রশ্ন
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

কয়েক সপ্তাহ ধরে সামাজিকমাধ্যমে একটা কথা বেশ ঘুরছে। কেউ কেউ বলছেন, এবারের বাজেট ‘উচ্চাভিলাষী’। কেউ আবার বলছেন, ‘একই বাজেট, নতুন মোড়ক।’ এই দুই মেরুর মাঝখানে বসে আমি যখন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের মূল কাঠামোটা পড়লাম, মনে হলো আলোচনাটা আসলে অনেক গভীরে যাওয়া দরকার।

সরকার এবারের বাজেটে ১৩টি খাতকে অগ্রাধিকারে রেখেছে। তালিকায় আছে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান, সামাজিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা, বিনিয়োগ পরিবেশ উন্নয়ন, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো, সৃজনশীল অর্থনীতিসহ আরও কিছু। লক্ষ্যও বড়। ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই অগ্রাধিকার তালিকাটা কি আসলে কার্যকর পরিকল্পনা, নাকি নির্বাচনি প্রতিশ্রুতির পুনরাবৃত্তি?

সরাসরি বলছি, ১৩টি খাত একসঙ্গে অগ্রাধিকার পেলে কোনটি আসলে কার্যকর মনোযোগ পাবে, সেটা নিয়েই আমার মূল সংশয়। বাংলাদেশের বাজেটের ইতিহাসে দেখা গেছে, অনেক ক্ষেত্রেই বড় বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবায়নের হার হতাশাজনক থেকে যায়। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বছরের পর বছর ধরে অব্যয়িত অর্থের অভিযোগ নতুন নয়। 

এবারের বাজেটের আকার ধরা হচ্ছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। চলতি সংশোধিত বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি। এই বড় বাজেটের পেছনে যুক্তি আছে। নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি পূরণ, মূল্যস্ফীতির চাপ মোকাবিলা, আর নতুন বেতন কাঠামোর বোঝা সামলানো। কিন্তু রাজস্ব আদায়ের চিত্র যদি আগের বছরগুলোর মতো হয়, তাহলে ঘাটতির চাপটা কোথায় গিয়ে পড়বে?

আমার মতে, বাজেটের আকারের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবায়নের সক্ষমতা। বড় সংখ্যা মানুষকে আশাবাদী করে, কিন্তু মাঠে পৌঁছানোটাই আসল কাজ।

এবারের অগ্রাধিকারে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সবার আগে রাখা হয়েছে। এটা সময়োচিত। গত দুই বছর ধরে সাধারণ মানুষ নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপে আছে। বাজারে গেলে এ বাস্তবতা বোঝা যায়। মধ্যবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত, সবার জন্যই বাজার করার হিসাবটা এখন আগের চেয়ে কঠিন। সরকার বলছে, আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশে নামিয়ে আনার পরিকল্পনা আছে। লক্ষ্যটা বাস্তবসম্মত, কিন্তু পথটা কঠিন। শুধু বরাদ্দ বাড়ালেই মূল্যস্ফীতি কমে না। এর জন্য সরবরাহ শৃঙ্খল ঠিক করতে হয়, বাজার তদারকি জোরদার করতে হয়, আর আমদানি নীতিতে নমনীয়তা আনতে হয়। সুদের হার বাড়িয়ে মূল্যস্ফীতি নামানোর চেষ্টা চলছে। এটি একটি পরিচিত পদ্ধতি। কিন্তু এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হলো বেসরকারি বিনিয়োগ ধাক্কা খায়। ঋণের সুদ বাড়লে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে পিছিয়ে আসেন। এই দুই লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই আসল চ্যালেঞ্জ।

কর্মসংস্থানের বিষয়টাও আলাদাভাবে ভাবার আছে। দেশে প্রতি বছর বিশাল সংখ্যক তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। শুধু ভর্তুকি দিয়ে বা সরকারি চাকরির সুযোগ বাড়িয়ে এই চাহিদা মেটানো সম্ভব না। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। আর তার জন্য ব্যবসার পরিবেশ স্বাভাবিক রাখতে হবে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, সুদের হার, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এগুলো যতক্ষণ না কমবে, বিনিয়োগকারীরা উৎসাহ পাবেন না। বাজেটে উদ্যোক্তা উন্নয়নে মনোযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা ছাড়া এটা কাগুজে থেকে যাওয়ার আশঙ্কাই বেশি।

সামাজিক নিরাপত্তা খাতে এবারও বরাদ্দ বেড়েছে। এটা ইতিবাচক। দেশে বয়স্ক, প্রতিবন্ধী, বিধবা অনেকেই আছেন যারা রাষ্ট্রীয় সহায়তা ছাড়া টিকতে পারেন না। কিন্তু এই খাতের দীর্ঘদিনের একটা সমস্যা হলো উপকারভোগীদের তালিকার নির্ভরযোগ্যতা। প্রকৃত অভাবীরা তালিকায় নেই, অথচ সচ্ছল পরিবারের সদস্যরা সুবিধা পাচ্ছেন, এই অভিযোগ পুরোনো। ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাইয়ের কথা বলা হচ্ছে বছরের পর বছর। বাস্তবায়নের গতি এখনো যথেষ্ট দ্রুত নয়।

স্বাস্থ্য আর শিক্ষা, দুটো খাত নিয়ে আলাদাভাবে একটু বলতে চাই। স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বেড়েছে, ভালো কথা। কিন্তু মোট বাজেটের অনুপাতে এটা এখনো যথেষ্ট নয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ হলো, জিডিপির অন্তত ৫ শতাংশ স্বাস্থ্যে ব্যয় করা উচিত। আমরা এখনো সেখানে নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গেলে বোঝা যায় বাস্তবতা। অনেক জায়গায় বিশেষজ্ঞ ডাক্তার নেই। ওষুধ নেই। যন্ত্রপাতি থাকলেও চালানোর লোক নেই। টাকা বরাদ্দ হলেই সব ঠিক হয় না। ব্যবস্থাপনার উন্নতি না হলে বরাদ্দের সুফল মানুষের কাছে পৌঁছায় না।

শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই কথা। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা, সর্বত্র কিছু না কিছু সমস্যা আছে। শিক্ষকের মান, পাঠ্যক্রমের মান, মূল্যায়ন পদ্ধতি, এগুলো নিয়ে গত কয়েক বছরে অনেক আলোচনা হয়েছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পরিবর্তনটা এখনো দৃশ্যমান নয় সব জায়গায়।

আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোর কথা বলা হয়েছে। এটা সবচেয়ে দরকারি পদক্ষেপ, আমার মতে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বিপুল। এই টাকাগুলো আটকে থাকার কারণে নতুন উদ্যোক্তারা ঋণ পান না। ব্যাংকের সুদের হার কমে না। বিনিয়োগের পরিবেশ সংকুচিত থাকে। এই সমস্যাটার সমাধান না হলে অর্থনীতির গতি স্বাভাবিক হবে না।
এবারের বাজেটে আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। দেখার বিষয় হলো, এটা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়।

ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি কি সম্ভব? হ্যাঁ, সম্ভব। তবে সেটার জন্য শুধু বাজেটের আকার বাড়ানো যথেষ্ট নয়। প্রতিষ্ঠানিক সংস্কার, শাসনব্যবস্থার উন্নতি, আর দুর্নীতি কমানো না হলে লক্ষ্যমাত্রা কাগজেই থাকবে। এবারের বাজেটের সুযোগ হলো, নতুন সরকারের প্রতি মানুষের একটা প্রত্যাশা আছে। সেই প্রত্যাশা পূরণের জানালা বেশি দিন খোলা থাকে না।

বাজেটের পরিকল্পনা ভালো হলেই সব হয় না। মাঠপর্যায়ে যারা বাস্তবায়ন করবেন, তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। আগামী অর্থবছরের শেষে যদি এই ১৩টি খাতের অর্ধেকেও দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যায়, সেটাই হবে বড় অর্জন।

লেখক: ব্যাংকার ও অর্থনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০৩ পিএম
রাজস্ব বাড়ানোর চ্যালেঞ্জ: এনবিআরের লক্ষ্য কতটা বাস্তবসম্মত?
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের নানা হিসাব-নিকাশ শুরু করেছে। সরকার যেহেতু ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করে, তাই প্রথমে ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন; পরে সে অনুযায়ী আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেন। বাজেট প্রণয়নের ক্ষেত্রে ব্যয়ের দিক থেকে সরকার চেষ্টা করে কতটা সংকোচন করা যায়, অর্থাৎ ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব। অপরদিকে, আয়ের ক্ষেত্রে সরকার চেষ্টা করে কীভাবে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি করা যায়। আয়ের খাত যত বৃদ্ধি পাবে, সরকার তত বেশি আর্থিকভাবে নিশ্চয়তা লাভ করবে। এমন পরিস্থিতিতে সরকার এনবিআরের মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির লক্ষ্যে ছোট ব্যবসায়ীদের ওপর বছরে ন্যূনতম ১ হাজার টাকা ভ্যাট আরোপের পরিকল্পনা করছে। এ ছাড়া বিভিন্ন খাতে এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর ভ্যাট বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে এনবিআর। অর্থাৎ, সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ানোর অন্যতম কৌশল হিসেবে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি বর্তমান সরকার অগ্রিম কর বৃদ্ধির পরিকল্পনাও করছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সরকার কেন ভ্যাট ও আয়কর বৃদ্ধির এই পরিকল্পনা গ্রহণ করছে? একই সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো–এ উদ্যোগ বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে এবং আদৌ কতটা সফল হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?

সরকার ২০২৫-২৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা বাজেট বৃদ্ধি করছে। ফলে এই অতিরিক্ত ব্যয় মেটাতে সরকারকে আয় বৃদ্ধি করতে হবে, অর্থাৎ রাজস্ব আয়ের প্রবৃদ্ধি ঘটাতে হবে। অথচ চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ১ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। সুতরাং, শুধু বর্তমান অর্থবছরের সঙ্গে তুলনা করলেও আগামী অর্থবছরে ২ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অতিরিক্ত রাজস্ব আদায় করতে হবে। এ কারণেই যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের কাছ থেকে বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট আদায়ের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর প্রভাব শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রতিটি নাগরিককেই বহন করতে হবে। 

বর্তমান সরকার আগামী অর্থবছরেই ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করতে চায়। অথচ বর্তমানে নিবন্ধিত ৮ লাখ প্রতিষ্ঠানের সবাই নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করে না। এর মধ্যে মাত্র সাড়ে ৫ লাখ প্রতিষ্ঠান ভ্যাট দেয়। আবার যারা ভ্যাট প্রদান করে, তারা সবাই সঠিকভাবে ভ্যাট দেয় কি না, সে বিষয়েও যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। অন্যদিকে অবশিষ্ট আড়াই লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান ভ্যাট প্রদান করে না এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তারা এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে পারেননি।

সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায়, এ সংখ্যা ৮ লাখ থেকে ২০ লাখে উন্নীত করা কতটা সম্ভব হবে? আর যদি তা সম্ভবও হয়, তাহলে সবাই কি সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদান করবে? আমাদের দেশে যারা ভ্যাট বা আয়কর প্রদান করেন, তাদের শনাক্ত করা এবং অডিট করার জন্য পর্যাপ্ত কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু যারা ভ্যাট বা আয়কর দেন না, অথচ যাদের তা দেওয়ার সামর্থ্য ও যোগ্যতা উভয়ই রয়েছে, তাদের চিহ্নিত করার জন্য রাষ্ট্র কিংবা এনবিআরের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা খুব একটা দেখা যায় না। ফলে যারা নিয়মিত ভ্যাট প্রদান করেন, তাদের অনেকের মধ্যেই এমন ধারণা তৈরি হতে পারে যে ভ্যাট দেওয়ার চেয়ে না দেওয়াই যেন সুবিধাজনক। অন্যদিকে, যারা আয়কর বা ভ্যাট প্রদান করেন, তারাও সব সময় যে সঠিক ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাবের ভিত্তিতে তা দেন, এমনটিও নয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, ভুল বা শুদ্ধ–যেভাবেই হোক, তারা অন্তত কর ও ভ্যাট প্রদান করছেন। তাহলে যারা একেবারেই ভ্যাট বা আয়কর দেন না, তাদের কেন আমরা কর ব্যবস্থার আওতায় আনতে পারছি না?

প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দেশের কল্যাণে কতটুকু নিবেদিত? রাষ্ট্রের স্বার্থে তাদের আরও সক্রিয় ও দায়িত্বশীলভাবে দায়িত্ব পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রত্যেক নাগরিকেরও নিজের অধিকার ও রাষ্ট্রের প্রতি দায়িত্ববোধ থেকে আরও দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত। উদাহরণস্বরূপ, দৈনিক কালবেলা পত্রিকায় ৪ জুন ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘রয়্যালটি কমিয়ে ২০০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি’। প্রতিবেদনে বলা হয়, কক্সবাজারের মহেশখালীতে মাতারবাড়ী বন্দর উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে নির্মাণাধীন ‘মাতারবাড়ী পোর্ট এক্সেস রোড’ প্রকল্পে বালু উত্তোলনকে কেন্দ্র করে ভয়াবহ অনিয়ম, বিধি লঙ্ঘন এবং শতকোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় রাষ্ট্র রাজস্ব আয় বৃদ্ধির জন্য যতই চেষ্টা করুক না কেন, বাস্তবতা অনেকটা সর্ষের মধ্যে ভূতের মতো। একদিকে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির কারণে সে প্রচেষ্টা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অপরদিকে, অনেক করদাতাও ভ্যাট বা আয়কর পরিশোধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। যাদের মোট বার্ষিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকা, তাদের জন্য বছরে ১ হাজার টাকা ভ্যাট প্রদান করার কথা কোনো বড় বিষয় হওয়ার কথা নয়। তার পরও অনেকে বিভিন্ন উপায়ে কীভাবে কর ফাঁকি দেওয়া যায়, সেই পথ খোঁজেন। দেখা যায়, এনবিআরে নিবন্ধিত হিসাবে যে ব্যাংক হিসাবের তথ্য দেওয়া আছে, অনেকেই বাস্তবে সেই হিসাবে লেনদেন করেন না। আবার যারা রাষ্ট্রের হয়ে দায়িত্ব পালন করেন, তাদের মধ্যেও অনেকে রাষ্ট্রীয় স্বার্থের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেন। ফলে দেশের যে পরিমাণ উন্নয়ন হওয়ার কথা, তা কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় অর্জন করা সম্ভব হচ্ছে না। আরও একটি উদাহরণ হলো–গত মে ৫, ২০২৬ তারিখে বাংলাদেশ হিমাগার মালিক সমিতিকে চিঠি দেয় এনবিআর। প্রতিক্রিয়ায় সংগঠনটির সভাপতি বলেন, যারা সংগঠনের সদস্য নন তাদের তথ্য আমরা দিতে পারব না। আর সদস্যরা বলবেন, ‘সদস্য হয়ে আমরা বিপদে পড়েছি।’ এতে সমিতি দুর্বল হবে, ব্যবসায়ীদের আস্থা কমবে। এ ধরনের চিন্তা অবিবেচনাপ্রসূত এবং দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা। ঠিক যেন রাষ্ট্রের চেয়ে সংগঠন বড়, সংগঠনের চেয়ে ব্যক্তি।

অপরদিকে, সরকার যদি আয়কর বৃদ্ধির তুলনায় ভ্যাট বৃদ্ধি করাকে সহজতর মনে করে, তাহলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ মূল্যস্ফীতিও এক ধরনের পরোক্ষ কর, যার প্রভাব থেকে একজন দিনমজুরও রেহাই পান না। আবার ভ্যাট বৃদ্ধি করা হলে এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যা সরকারের সাফল্য অর্জনের পথকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ধরা যাক, একজন ব্যক্তি বছরে যে আয় করেন, তার করযোগ্য আয়ের অংশ ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকার বেশি হলেই তিনি আয়কর প্রদান করবেন। অর্থাৎ তার আয়কর দেওয়ার সামর্থ্য রয়েছে বলেই তিনি আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুযায়ী সরকার তথা এনবিআরকে আয়কর প্রদান করবেন। কিন্তু সরকার যদি কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর উৎসে কর শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করে, তবে তা আপাতদৃষ্টিতে সামান্য মনে হলেও এর প্রভাব হবে ব্যাপক। কারণ এই অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা একজন দিনমজুরও এড়াতে পারবেন না। অথচ আয়কর আদায় বৃদ্ধি পেলে মূলত যারা আয়কর দেওয়ার যোগ্য, তারাই এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বহন করবেন। নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠী এ ধরনের করের প্রভাব থেকে অনেকাংশে মুক্ত থাকবে। তাই রাজস্ব আহরণের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সামাজিক বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। আমাদের দেশে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠীগুলো প্রায়ই এমন কৌশল খোঁজে, যার মাধ্যমে সরকারকে চাপ প্রয়োগ করে কর-সুবিধা কিংবা আয়কর মওকুফের সুযোগ নেওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে সরকারও ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় তাদের সেই সুবিধা দিতে বাধ্য হয়। এর ফলে গত কয়েক দশকে বিত্তবান শ্রেণি আরও বেশি সম্পদশালী হয়েছে, অথচ নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ তাদের আর্থিক অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটাতে পারেনি।

সরকারের বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার কারণে রাষ্ট্রের এই কঠিন সময়ে সফল হওয়ার অন্যতম প্রধান উপায় হলো সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ এবং রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। তবেই হয়তো আমাদের দেশেও মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে আয়কর ও ভ্যাট প্রদান করতে উৎসাহিত হবে। যখন নাগরিকরা দেখবেন যে তাদের প্রদত্ত কর সঠিকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে, তখন কর প্রদানের প্রতি তাদের আস্থা ও আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে এবং উন্নয়নের সুফল পৌঁছে যাবে প্রতিটি মানুষের কাছে। সর্বোপরি, রাষ্ট্রের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন তখনই সম্ভব হবে, যখন সরকার ও নাগরিক উভয়েই নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবে এবং উন্নয়ন প্রক্রিয়ার অংশীদার হবে দেশের প্রতিটি মানুষ ও প্রতিটি নাগরিক।

লেখক: ব্যাংকার ও লেখক
[email protected]

ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:০১ পিএম
ভূমিকম্পে ক্ষতির বড় কারণ শুধু কম্পন নয়, বরং খারাপ মানের ডিজাইন ও নির্মাণ
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

ভূমিকম্প একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মানুষের জীবন ও সম্পদের ক্ষতি করতে পারে। তবে প্রকৌশলগত দৃষ্টিকোণ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য হলো–ভূমিকম্পে মানুষ সাধারণত কম্পনের কারণে মারা যায় না; বরং ভবন, সেতু ও অন্যান্য কাঠামো ধসে পড়ার কারণেই অধিকাংশ প্রাণহানি ঘটে।

একই মাত্রার ভূমিকম্পে কোনো কোনো ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়ে, আবার কোনো ভবন সামান্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এই পার্থক্যের মূল কারণ ডিজাইনের মান, নির্মাণের গুণগত মান এবং প্রকৌশলগত নিয়ম মেনে কাজ করা হয়েছে কি না। তাই বলা যায়–ভূমিকম্প নয়, দুর্বল ও ত্রুটিপূর্ণ ভবনই মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু।

কেন ডিজাইন এত গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকম্পের সময় মাটির কম্পনের কারণে ভবনের ওপর বিভিন্ন ধরনের বল কাজ করে। ভবনের নিজস্ব ওজনের পাশাপাশি অতিরিক্ত গতিশীল বল (Dynamic Force) সৃষ্টি হয়।
প্রধানত দুই ধরনের বল গুরুত্বপূর্ণ: অনুভূমিক বল (Lateral Force)। ভূমিকম্পে মাটি ডানে-বামে কাঁপে। ফলে ভবনের ওপর অনুভূমিক বল কাজ করে। সাধারণত ভবনগুলো উল্লম্ব লোড (নিজস্ব ওজন) বহনের জন্য বেশি প্রস্তুত থাকে, কিন্তু ভূমিকম্পের অনুভূমিক লোড ভবনের জন্য সবচেয়ে বিপজ্জনক। গতিশীল বল (Dynamic Load)। ভূমিকম্প একটি গতিশীল ঘটনা। কম্পনের ফলে ভবনের বিভিন্ন অংশে ত্বরণ (Acceleration) সৃষ্টি হয়, যা অতিরিক্ত বল তৈরি করে। ভবনের ওজন যত বেশি, তত বেশি ভূমিকম্পীয় বল সৃষ্টি হয়।

খারাপ ডিজাইনের প্রধান সমস্যাসমূহ
Soft Storey (দুর্বল নিচতলা): বাংলাদেশে অনেক ভবনের নিচতলা গ্যারেজ, দোকান বা খোলা জায়গা হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফলে নিচতলায় দেয়াল কম থাকে এবং কাঠামোগত দৃঢ়তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। ভূমিকম্পের সময় ওপরের তলাগুলো তুলনামূলক শক্ত থাকলেও নিচতলা অতিরিক্ত বিকৃত হয়।
একে বলা হয়: Soft Storey Failure। এর ফলে পুরো ভবন একসঙ্গে নিচের দিকে ধসে পড়তে পারে। অনেক ভূমিকম্পে দেখা গেছে যে, পার্কিং ফ্লোরযুক্ত ভবনগুলো প্রথমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। Irregular Shape (অসামঞ্জস্যপূর্ণ আকৃতি): স্থাপত্যগত সৌন্দর্যের জন্য অনেক সময় L-Shape, U-Shape বা অন্যান্য জটিল আকৃতির ভবন নির্মাণ করা হয়।

সমস্যা কোথায়
ভূমিকম্পের সময় ভবনের সব অংশ সমানভাবে নড়াচড়া করে না। ফলে ভবনের ওপর Torsion (মোচড়) Uneven Stress Distribution Concentrated Damage সৃষ্টি হয়। ফলে একটি অংশে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়ে কাঠামোগত ব্যর্থতা ঘটতে পারে। নিম্নমানের উপকরণ ও নির্মাণকাজ: ডিজাইন যত ভালোই হোক, নিম্নমানের নির্মাণকাজ পুরো প্রকল্পকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। নিম্নমানের সিমেন্ট ব্যবহার, অপর্যাপ্ত রড, অপর্যাপ্ত কংক্রিট কভার, ভুল রড বাঁধাই, পর্যাপ্ত curing না করা। এর ফলে কংক্রিটের শক্তি কমে যায় এবং ভূমিকম্পের সময় কাঠামো ভেঙে পড়ে। সঠিক Load Path না থাকা। Roof→Beam→Column→Foundation. যদি Load Path সঠিক না হয় তাহলে স্থানীয়ভাবে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। কিছু অংশ হঠাৎ ব্যর্থ হয় অর্থাৎ Progressive Collapse শুরু হতে পারে। ফলে পুরো ভবন ধসে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। দুর্বল কলাম–শক্তিশালী বিম সমস্যা।

ভূমিকম্পপ্রতিরোধী ডিজাইনের একটি মৌলিক নীতি হলো: Strong Column–Weak Beam
অর্থাৎ কলাম হবে শক্তিশালী এবং বিম তুলনামূলক দুর্বল। ভূমিকম্পের সময় বিম ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভবন সাধারণত দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু কলাম ব্যর্থ হলে পুরো ভবন ধসে পড়তে পারে। তাই আধুনিক ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনে কলামকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কীভাবে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়? Ductility (নমনীয়তা): ভূমিকম্পের সময় একটি ভালো ভবন সম্পূর্ণ শক্ত ও অনমনীয় হওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং ভবন এমনভাবে ডিজাইন করা উচিত যাতে এটি: শক্তি শোষণ করতে পারে। কিছুটা বাঁকতে পারে। হঠাৎ ভেঙে না পড়ে: এটাই Ductility। Redundancy (বিকল্প লোড বহন ব্যবস্থা): ভালো ডিজাইনে একাধিক Structural System থাকে। একটি উপাদান ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অন্য অংশগুলো লোড বহন করতে পারে। ফলে সম্পূর্ণ ধসের সম্ভাবনা কমে যায়।

Regularity (সুষম বিন্যাস): সুষম আকৃতির ভবনে Stress Distribution ভালো হয়। Torsion কম হয়। ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণে থাকে। Code Compliance (কোড অনুসরণ): ভূমিকম্প প্রতিরোধী ডিজাইনের জন্য অবশ্যই প্রযোজ্য বিল্ডিং কোড অনুসরণ করতে হবে।
বাংলাদেশে: BNBC (Bangladesh National Building Code)। আন্তর্জাতিকভাবে: ACI, ASCE, ,IBC. Eurocode-এর নীতিমালা অনুসরণ করা হয়।

বাংলাদেশের বাস্তবতা: বিশেষ করে ঢাকা শহর একটি ভূমিকম্প ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল। বর্তমানে অনেক প্রধান সমস্যাগুলো অনুমোদিত ডিজাইন অনুসরণ না করা। প্রকৌশলীর তত্ত্বাবধানের অভাব। নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী। অতিরিক্ত তলা নির্মাণ। পুরোনো ভবনের কাঠামোগত মূল্যায়ন না করা। সঠিক Soil Investigation না করা। এসব কারণে ভূমিকম্পের সময় ক্ষতির ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায়।

নেপাল ভূমিকম্প ২০১৫–একটি শিক্ষণীয় উদাহরণ। ২০১৫ সালের নেপাল ভূমিকম্পে ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছিল। তদন্তে দেখা যায় দুর্বল নকশা, অপর্যাপ্ত রড, নিম্নমানের কংক্রিট, অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণ, ক্ষয়ক্ষতির অন্যতম কারণ ছিল। অন্যদিকে সঠিক প্রকৌশল নীতিতে নির্মিত অনেক ভবন উল্লেখযোগ্যভাবে টিকে ছিল। এটি প্রমাণ করে ভালো ডিজাইন জীবন বাঁচায়। প্রকৌশলীদের করণীয়: Structural Analysis নিশ্চিত করা, Static Analysis, Dynamic, Analysis, Response Spectrum Analysis, প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হবে। Seismic Load বিবেচনা করা: ডিজাইনের শুরু থেকেই ভূমিকম্পীয় লোড অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। Proper Detailing নিশ্চিত করা, Beam-Column Joint, Stirrup Spacing, Anchorage Length, Lap Splice সঠিকভাবে নির্ধারণ করতে হবে। Construction Supervision জোরদার করা। ডিজাইন অনুযায়ী নির্মাণ হচ্ছে কি না তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে।

ভূমিকম্প থামানো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। কিন্তু সঠিক পরিকল্পনা, প্রকৌশল নকশা, মানসম্মত নির্মাণসামগ্রী এবং দক্ষ তদারকির মাধ্যমে ভূমিকম্পজনিত ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
একটি নিরাপদ ভবন কেবল ইট, বালি, সিমেন্ট ও রডের সমষ্টি নয়; এটি মানুষের জীবন, স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার প্রতীক।

লেখক: প্রকৌশলী বিভাগীয় প্রধান, প্রকৌশল বিভাগ, স্টুডিও ডিএনএ, প্রতিষ্ঠাতা, হেলদি কংক্রিট ও হেলদি এডুকেশন

নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৮ পিএম
নারীর নিরাপত্তা নিয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

আমাদের দেশে পত্রিকান্তরে নারী নির্যাতনের যে খবর প্রায়ই  সামনে আসে, তা সত্যিই উদ্বেগজনক। এরই অংশ হিসেবে দেশে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের মামলার ক্রমবর্ধমান সংখ্যা নতুন করে ভাবিয়ে তোলে। পরিসংখ্যান বলছে, নির্যাতনের ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। এটি একটি গভীর সামাজিক সংকেত। উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা আলোচনার মধ্যেও এ বাস্তবতা আমাদের অস্বস্তিতে ফেলে। কারণ একটি সমাজের প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় তার সব নাগরিকের নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, তার ওপর। সে জায়গায় আমরা যেন বারবার প্রশ্নের মুখে পড়ছি।

পুলিশের দেওয়া এক মাস আগের তথ্য বলছে, এক বছরে ধর্ষণের মামলা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে হওয়া মামলার সংখ্যাও বেড়েছে। এ সংখ্যাগুলো কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়। প্রতিটি ঘটনার পেছনে রয়েছে একজন মানুষের কষ্ট, একটি পরিবারের দুঃখ এবং একটি সমাজের দায়। একটি মেয়ে বা শিশুর ওপর নির্যাতনের ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়। এটি আমাদের সামাজিক কাঠামোর দুর্বলতাকেও সামনে নিয়ে আসে।

২০২৫ সালে দেশে নারী নির্যাতনের প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়েছে। এর মধ্যে সাত হাজারের বেশি মামলা ধর্ষণের অভিযোগে। গড় হিসাবে প্রায় প্রতিদিনই নতুন নতুন অভিযোগ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে। কিন্তু আমরা জানি, বাস্তব সংখ্যা হয়তো আরও বেশি। অনেক ঘটনা থানায় পৌঁছায় না। সামাজিক চাপ, পারিবারিক সংকোচ কিংবা অপমানের ভয় অনেককে নীরব থাকতে বাধ্য করে।

এই নীরবতাই সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। অপরাধীরা তখন আরও সাহসী হয়ে ওঠে। তারা ধরে নেয়, শেষ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়াবে না। বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করে। ফলে সমাজে ভয় এবং অসহায়ত্বের অনুভূতি বাড়তে থাকে।

ঢাকার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের দৃশ্য অনেক কিছুই বলে দেয়। আদালতের করিডরে অপেক্ষমাণ মানুষের ভিড়। কেউ মেঝেতে বসে আছেন। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন। অনেকের সঙ্গে স্বজন রয়েছে। আবার অনেকেই একা। তাদের চোখে ক্লান্তি। মুখে উদ্বেগের ছাপ। কেউ হয়তো প্রথমবার আদালতে এসেছেন। কেউ বছরের পর বছর ধরে একই পথে হাঁটছেন।

অনেক সময় আদালতের ভেতরে জায়গা হয় না। বিচারপ্রার্থীদের বাইরে বসে থাকতে হয়। কেউ ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন। কেউ উদ্বেগে আইনজীবীর দিকে তাকান। এই অপেক্ষা শুধু মামলার ডাকের জন্য নয়। এটি ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা। অনেকের কাছে এটি মর্যাদা ফিরে পাওয়ার সংগ্রাম।

আইন আছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন কঠোর শাস্তির বিধান রেখেছে। কিন্তু আইন থাকলেই সব সমস্যার সমাধান হয় না। বাস্তবতা আরও জটিল। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে আইন কাগজেই থেকে যায়। তদন্তে ধীরগতি বা প্রমাণ সংগ্রহে দুর্বলতা থাকলে মামলার ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়ে।

অনেক নারী নির্যাতনের শিকার হলেও মামলা করতে পারেন না। পরিবার থেকে চাপ আসে। সমাজের ভয় থাকে। কখনো প্রভাবশালী ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতা সামনে আসে। তখন ভুক্তভোগীর পক্ষে এগিয়ে যাওয়া আরও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক সময় আপসের চাপ তৈরি হয়। কখনো অর্থের প্রলোভন দেওয়া হয়। কখনো আবার ভয় দেখানো হয়।

যেসব মামলা আদালতে আসে, সেগুলোরও দ্রুত নিষ্পত্তি হয় না। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালগুলোতে বিপুলসংখ্যক মামলা বিচারাধীন। অনেক মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকে। এতে বিচারপ্রার্থীরা হতাশ হয়ে পড়েন। অনেক সময় দেখা যায়, মামলার তারিখের পর তারিখ পড়ছে। কিন্তু অগ্রগতি খুব কম।

বিচারপ্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে সাক্ষী পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেকে দূরে সরে যান। কেউ ভয় পান। কেউ আর ঝামেলায় জড়াতে চান না। ফলে মামলার অগ্রগতি থমকে যায়। এতে বিচারব্যবস্থার প্রতিও মানুষের আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে মাঝেমধ্যে নৃশংস ঘটনার খবর সামনে আসে। কোথাও কিশোরী ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে। কোথাও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কোথাও দলবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিটি ঘটনা সমাজকে নাড়া দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভও দেখা যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ক্ষোভ ম্লান হয়ে যায়।

সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, নারী নির্যাতনের পেছনে নানা কারণ কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে সামাজিক মানসিকতার সংকট, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি। অনেক অপরাধী মনে করে শেষ পর্যন্ত তারা পার পেয়ে যাবে। এ ধারণাই অপরাধ করতে উৎসাহিত করে।

এই বাস্তবতা বদলাতে হলে কেবল আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন সামাজিক মনোভাবের পরিবর্তন। নারীর প্রতি সম্মান এবং সমতার ধারণা পরিবার থেকেই গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে না। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের মানবিক মূল্যবোধ শেখানো জরুরি। 

গণমাধ্যমের দায়িত্বও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের ঘটনা সামনে আনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সমাজকে ভাবতে বাধ্য করাও প্রয়োজন। সংবাদ কেবল তথ্য দেয় না। এটি সমাজকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নের অনেক ইতিবাচক উদাহরণ রয়েছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান, প্রশাসন এবং রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। এটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। একই সঙ্গে নারী নির্যাতনের ঘটনা বৃদ্ধি এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা।

উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। নারী ও শিশু যদি নিরাপদ না থাকে, তাহলে উন্নয়নের সাফল্য অসম্পূর্ণ থেকে যায়।

রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজেরও দায় রয়েছে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।

ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। নির্যাতনের পর অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তাদের চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এবং সামাজিক সহায়তা প্রয়োজন হয়। এ সহায়তা নিশ্চিত করা না গেলে তারা দীর্ঘদিন মানসিক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ান।

আন্তর্জাতিক নারী দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারী অধিকার কোনো স্লোগান নয়। এটি মৌলিক মানবাধিকার।

প্রতিটি শিশুর নিরাপদ শৈশব এবং প্রত্যেক নারীর মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে। এই অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব। এখন প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ, কার্যকর আইন প্রয়োগ এবং মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। তাহলেই পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে।

লেখক: প্রকাশক ও কলাম লেখক