পাকিস্তান সরকার ১৯৭১ সালের ৩ জানুয়ারি পশ্চিম সীমান্ত দিয়ে ভারত আক্রমণ করে, অভিযানের নাম দেয় ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’। এ অভিযান চেঙ্গিস খানের (১১৬২-১২২৭) অভিযানের মতো এতটাই মধ্যযুগীয় ছিল যে, ভারতের আধুনিক সমরবিদ্যার কাছে অনায়াসেই নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। তারা পূর্ব পাঞ্জাব ও ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ পরিচালনা করেও বিশেষ কোনো ক্ষতিই করতে পারেনি। পাকিস্তানি সমরপরিকল্পনা যে খুবই অপরিণত ছিল তা প্রমাণিত হয় পূর্ব সীমান্তেও। ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’-এর বিপরীতে দ্রুত ঢাকা দখলের পরিকল্পনা করে ভারত, নাম দেয় ‘অপারেশন ঢাকা বোল’। পরিকল্পনা করেন ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লেয়ার, অনুমোদন করেন পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। ৪ ডিসেম্বর পরিকল্পনার পর শুরু হয় ১২ দিনের অভিযান। এ অভিযানের তাত্ত্বিক ভিত্তি যেমন দৃঢ় ছিল, তেমনি শৈল্পিক ছিল তার নামকরণ। চারটি নদীর বৃত্তের ওপর ভাসমান ঢাকা দেখতে অনেকটা একটি প্রশস্ত বোলের মতো- এই তুলনা থেকে অভিযানের নামকরণ করা হয় ‘অপারেশন ঢাকা বোল’। এ বোলের পশ্চিমে প্রবাহিত বুড়িগঙ্গা, উত্তরে তুরাগ, পূর্বে বালু এবং দক্ষিণে শীতলক্ষ্যা নদী। অভিযানটিকে তুলনা করা যায় ম্যারাথনের সঙ্গেও- যে প্রতিযোগিতায় দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দৌড়বিদরা মশাল হাতে নিয়ে এগিয়ে আসে বোলের আকৃতি স্টেডিয়ামের দিকে, ক্ষিপ্রতা ও দক্ষতার ওপর আয়োজকরা নির্ধারণ করেন পুরস্কার। তবে এটি মূলত উত্তর প্রান্ত থেকে ‘তুরা টু তুরাগ’ জয়ের অভিযান হলেও, দেশের অন্য তিন প্রান্ত থেকে মিত্রবাহিনীর রথ প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে ঢাকা অভিমুখে ধেয়ে আসে।
পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানে একই সময়ে শুরু হয় দুই অপারেশন: ‘অপারেশন চেঙ্গিস খান’ ও ‘অপারেশন ঢাকা বোল’। পূর্ব পাকিস্তানে এ অভিযান শুরু হয় পশ্চিম, উত্তর-পশ্চিম, উত্তর ও পূর্ব এই চার প্রান্ত থেকে। ক্যারম বোর্ডের খেলায় চারজন খেলোয়াড়ের একটাই লক্ষ্য থাকে ‘রেড’-এ স্টাইক করা- অনেকটা সেরকম।
পশ্চিম ফ্রন্টে মেজর জেনারেল টি এন রায়নার বাহিনীর দুটি ডিভিশন যাত্রা শুরু করে চব্বিশ পরগনা ও কৃষ্ণনগর সদর দপ্তর থেকে। উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টে মেজর জেনারেল থাপানের বাহিনী যাত্রা শুরু করে ইংলিশ বাজার থেকে। উত্তর ফ্রন্টের সদর দপ্তর গৌহাটি থেকে জি এস গিলের নেতৃত্বে অগ্রসর হয় ১০১ কমিউনিকেশন জোনের সৈন্যরা। এটি ছিল ভারতীয় ৩৩ কোরের একটা অংশ। পূর্ব ফ্রন্ট থেকে এগিয়ে আসে ইস্টার্ন কমান্ডের অধীন আসামভিত্তিক ফোর্থ কোরের কমান্ডার সগত সিংয়ের ৫৭ ও ২৩ ডিভিশন।
পশ্চিম ফ্রন্টে মেজর জেনারেল টি এন রায়নার বাহিনীর দুটি কলাম যশোর-ঢাকা হাইওয়ের ওপর এসে পড়ে। যশোর প্রথম হানাদারমুক্ত হয় ৬ ডিসেম্বর। পশ্চিমে একটি বাহিনী ছুটল ঝিনাইদহের দিকে। ১০ ডিসেম্বর কামারখালী বিজিত হওয়ার পর হানাদার বাহিনী পালাল ফরিদপুরের দিকে। ১০ ডিসেম্বর নড়াইল মুক্ত হওয়ার পর একটি বাহিনী পৌঁছে যায় মধুমতী নদীর তীরে, মধুমতী পার হয়ে পদ্মার তীরে পৌঁছে ১৩ ডিসেম্বর আর একটা বাহিনী ৮ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গা মুক্ত করে পৌঁছে কুষ্টিয়ায়। ৯ তারিখে কুমারখালী এবং ১১ তারিখ কুষ্টিয়া মুক্ত করার পর তারা চলল পদ্মা অভিমুখে। পদ্মা নদীর তীরবর্তী সব এলাকা মুক্ত করতে সক্ষম হয় এ বাহিনী কিন্তু স্রোতের তোড়ে উত্তর দিক থেকে দক্ষিণে প্রবাহিত পদ্মা আড়াআড়িভাবে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে পাড়ি দেওয়া ছিল দুষ্কর।
উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টে মেজর জেনারেল থাপানের বাহিনী ১১ ডিসেম্বর হিলি মুক্ত করে তীরের বেগে ছুটে চলে যমুনা অভিমুখে। হিলিতে তুমুল যুদ্ধের পর পাকিস্তানি বাহিনী পালিয়ে আসে বগুড়ায়। রংপুর-বগুড়া হাইওয়ের মধ্যবর্তী গোবিন্দগঞ্জ জয় করে মিত্রবাহিনী ১২ ডিসেম্বর পৌঁছে যায় গাইবান্ধা ও ফুলছড়ি ঘাটে। তবে নদী এতই অপ্রতিরোধ্য ছিল যে ফুলছড়ি ঘাট থেকে জামালপুরের সঙ্গে সংযোগসাধনের জন্য সাহায্য নিতে হয় হেলিকপ্টারের। আরেকটি বাহিনী ১৪ ডিসেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জ মুক্ত করার পর মহানন্দা পার হয়ে পৌঁছে রাজশাহী, রাজশাহী থেকে আত্রাই নদী পার হয়ে একই তারিখে নাটোরে। পাবনা মুক্ত করার পর দিগন্তরেখার মধ্যে এসে যায় যমুনা নদী। ভারতীয় জেনারেল গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্রের মধ্যবর্তী এলাকা পাকিস্তানি অধিনায়ক মেজর জেনারেল নজর হোসেন শাহের বাহিনীর হাত থেকে মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় মুক্ত করতে সক্ষম হন কিন্তু নদীর প্রতিবন্ধকতার কারণে ঢাকা ছিল সুদূর স্বপ্ন।
সগত সিংহের বাহিনী উত্তরে মেঘালয় থেকে ত্রিপুরার দক্ষিণে ফেনী পর্যন্ত ২৪০ মাইল বিস্তৃত এলাকায় ধাবিত হয়। সুরমা থেকে মেঘনার পূর্ব তীর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা মুক্ত করতে সক্ষম হলেও সগত সিংয়ের ডিভিশন ঢাকা বিজয়ের গৌরব লাভ করতে পারেনি। কারণ এলাকাটা ছিল নদীসংকুল। তার একটা ডিভিশন ৬ ডিসেম্বর আখাউড়া মুক্ত করার পর ৮ ডিসেম্বর বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। আরেকটা ডিভিশন ৮ ডিসেম্বর গোমতী নদী পার হয়ে পৌঁছে কুমিল্লা। ৯ ডিসেম্বর আশুগঞ্জ পৌঁছে মেঘনা নদীর বাধার সম্মুখীন হন; আরেকটা ডিভিশনও দাউদকান্দি ও চাঁদপুরে এসে প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। ৯ ডিসেম্বর হানাদারমুক্ত হয় দাউদকান্দি ও চাঁদপুর। হালুয়াঘাট থেকে এগিয়ে আসা বাহিনী যখন পৌঁছে গেল ময়মনসিংহের কাছাকাছি, তখন পূর্ব ফ্রন্টে মিত্রবাহিনী পৌঁছে যায় আশুগঞ্জ, দাউদকান্দি এবং চাঁদপুর। হেলিকপ্টারযোগে ভারতীয় বাহিনী ১১ তারিখ নরসিংদীর রায়পুরায় অবতরণ করে। নরসিংদী স্বাধীন হয় ১৪ ডিসেম্বর, তবে তার বাহিনী শীতলক্ষ্যা নদীর পাড়ে মুড়াপাড়ায় এসে গতি থামিয়ে দিতে বাধ্য হলো।
অন্যদিকে ৩ ডিসেম্বর যুদ্ধ শুরু হতেই মেজর জেনারেল জি এস গিলের নেতৃত্বে একটা ব্রিগেড উত্তর ফ্রন্টের তুরা থেকে নেমে এগিয়ে আসে জামালপুরের দিকে। ১০ ডিসেম্বর ময়মনসিংহ মুক্ত হওয়ার পর পাকবাহিনী টাঙ্গাইল হয়ে ঢাকার দিকে পালিয়ে যায় শম্ভুগঞ্জ সেতু উড়িয়ে দিয়ে। ১১ ডিসেম্বর টাঙ্গাইলের মির্জাপুর, গাজীপুরের কালিয়াকৈর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে ছত্রীসেনা অবতরণ করে। ১২ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল মুক্ত হওয়ার পর পাকবাহিনী মির্জাপুর হয়ে পালিয়ে যায় কালিয়াকৈরের দিকে। ব্রিগেডিয়ার হরদেব সিং ক্লেয়ার ও ব্রিগেডিয়ার সান সিং রাত সাড়ে ৯টায় টাঙ্গাইলের ওয়াপদা রেস্ট হাউসে মেজর জেনারেল নাগরার সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা বিষয়ে আলোচনা করেন। মঙ্গলবার ১৪ ডিসেম্বর টাঙ্গাইল থেকে সম্মিলিত বাহিনীর ঢাকা অভিযান শুরু হয় দুটি পথে: সাভার এবং টঙ্গী হয়ে। মিত্রবাহিনীর এক কলাম পূর্বে কডডা, অন্য কলাম কালিয়াকৈর নয়ারহাট ফরেস্ট রোড দিয়ে এসে ঢাকা-আরিচাঘাট রোডের ওপর পড়ল। তুরাগ নদীর ওপর দিয়ে সবার আগে ঢাকায় প্রবেশ করেন মেজর জেনারেল গন্ধর্ব সিং নাগরা এবং কাদেরিয়া বাহিনীর কমান্ডার কাদের সিদ্দিকী।
রেসকোর্স ময়দানে দলিলে স্বাক্ষর করেন নিয়াজি ৪.৫৫ মিনিটে। আত্মসমর্পণের অনুষ্ঠানে ভারতের পক্ষে সাক্ষী হিসেবে শেষ মুহূর্তে এসে উপস্থিত হতে সক্ষম হন লেফটেন্যান্ট জেনারেল সগত সিং। সে সময় পশ্চিম ফ্রন্টে মেজর জেনারেল টি এন রায়না আর উত্তর-পশ্চিম ফ্রন্টে মেজর জেনারেল থাপানের বাহিনী পৃথিবীর দুই শ্রেষ্ঠ স্রোতস্বিনী নদীর বাধার মুখে গতিরুদ্ধ হয়ে অপেক্ষমাণ। দুটি বাহিনীর পক্ষে হেলিকপ্টারে করে ঢাকা এসে উপস্থিত হওয়াও ছিল অসম্ভব ব্যাপার। যদিও বেলা সাড়ে ৩টায় হেলিকপ্টারে কলকাতা থেকে ঢাকায় পৌঁছান এ কে খন্দকার। তার আগে দুপুর ১টায় কলকাতা থেকে ঢাকা আসেন ভারতীয় মিত্রবাহিনীর কমান্ডার জেনারেল অরোরার চিফ অব স্টাফ মেজর জেনারেল জ্যাকব। ১৯৭১ সালে প্রথম ঢাকা জয়ের গৌরব লাভ করে উত্তর ফ্রন্ট, সেরা অভিযানের মর্যাদা লাভ করে অপারেশন ঢাকা বোল। সেরা নদীর মর্যাদা লাভ করে তুরাগ নদী, শ্রেষ্ঠ বাহকের মর্যাদা লাভ করে লোহার ঝুলন্ত ব্রিজ।
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, মিরপুর কলেজ