বাজারে ফল বা অন্যান্য পণ্য কিনতে গেলে আমরা সাধারণত দাম, তাজা অবস্থা কিংবা পরিমাণের দিকে নজর দিই। কিন্তু খুব কম মানুষই খেয়াল করি, যে ঠোঙায় করে পণ্যটি মেপে দেওয়া হচ্ছে, সেটি আসলে কতটা ওজনের। সাম্প্রতিক সময়ে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- কাগজের ঠোঙা তৈরির সময় আঠার সঙ্গে সিমেন্ট বা ভারি উপাদান মিশিয়ে ঠোঙার ওজন বাড়ানো হচ্ছে। ফলে ক্রেতা বুঝতে না পারলেও প্রতিবারই কিছুটা আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন।
বিষয়টি বিশেষভাবে চোখে পড়ে দামি ফলের ক্ষেত্রে যেমন আঙুর, বেদানা, কমলালেবু বা আপেল। অনেক সময় দোকানিরা পলিথিনের পরিবর্তে কাগজের ঠোঙায় ফল মেপে দেন। এটি পরিবেশবান্ধব বলে আমরা খুশিই হই। কিন্তু যদি সেই ঠোঙার ওজন অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়, তাহলে বাস্তবে আমরা ফলের চেয়ে ঠোঙার ওজনের জন্যই টাকা দিচ্ছি। অর্থাৎ এখানে পরিবেশবান্ধবতার আড়ালে চলছে এক ধরনের সূক্ষ্ম প্রতারণা।
প্রশ্ন হচ্ছে, কেন এমনটি করা হচ্ছে? এর পেছনে প্রধান কারণ হলো লাভের প্রবণতা। বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক বিক্রেতা বাড়তি লাভের উপায় খোঁজেন। সিমেন্ট মেশানো ঠোঙা ব্যবহার করলে প্রতি কেজি পণ্যের সঙ্গে অতিরিক্ত ওজন যোগ হয়ে যায়। প্রতিদিন শত শত বিক্রির ক্ষেত্রে এটি উল্লেখযোগ্য আর্থিক লাভে পরিণত হয়। কিন্তু সেই লাভের উৎস হচ্ছে ক্রেতার সাথে এক ধরনের প্রতারণা।
আরেকটি কারণ হলো, নজরদারির অভাব। আমাদের দেশে ওজন ও পরিমাপ সংক্রান্ত আইন থাকলেও বাজার পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং খুব শক্তিশালী নয়, ফলে এ ধরনের অনৈতিক চর্চা সহজেই ছড়িয়ে পড়ে।
এরপর প্রশ্ন আসতে পারে, ক্রেতারা কেন বুঝতে পারেন না? প্রথমত, সাধারণ মানুষ ঠোঙার ওজন আলাদাভাবে মাপার কথা ভাবেন না। আমরা ধরেই নিই, বিক্রেতা সৎভাবেই পণ্য মেপে দিচ্ছেন। দ্বিতীয়ত, বাজারের ব্যস্ততা ও তাড়াহুড়োর কারণে খুঁটিনাটি যাচাই করার সুযোগও কম থাকে। তৃতীয়ত, অনেকেই জানেনই না যে এমন কৌশল ব্যবহার করা হতে পারে। এইসব অজ্ঞতাই প্রতারণার সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হয়ে থাকে।
তাহলে ক্রেতার করণীয় কী?
প্রথমত, পণ্য কেনার সময় সম্ভব হলে খালি ঠোঙার ওজন সম্পর্কে ধারণা নেওয়া উচিত। সন্দেহ হলে ঠোঙা বাদ দিয়ে বিক্রেতাকে ওজন করার জন্য বলতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল স্কেলে টেয়ার অপশন থাকে, যেখানে পাত্রের ওজন বাদ দেওয়া যায়। এটি ব্যবহার করলে প্রতারণার সুযোগ কমে।
তৃতীয়ত, সরকারি সংস্থাগুলোর উচিত বাজারে ওজন যন্ত্র ও প্যাকেজিং উপকরণ পরীক্ষা করা। অনিয়ম ধরা পড়লে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
চতুর্থত, অনেক দেশেই মানুষ বাজারে গেলে নিজস্ব ব্যাগ বা পাত্র নিয়ে যান। এতে পরিবেশও রক্ষা হয়, আবার প্রতারণার সুযোগও কমে।
মনে রাখা প্রয়োজন, এ ধরনের ছোট প্রতারণা ধীরে ধীরে সমাজে অসততার সংস্কৃতি তৈরি করে। যখন মানুষ বারবার ঠকতে থাকে, তখন পারস্পরিক বিশ্বাস কমে যায়। অর্থনীতি শুধু টাকার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না, বিশ্বাসের ওপরও দাঁড়িয়ে থাকে। তাই এই সমস্যাকে ছোট বলে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
কাগজের ঠোঙা সাধারণ একটি জিনিস। কিন্তু সেই ঠোঙার আড়ালে যদি প্রতারণা লুকিয়ে থাকে, তাহলে তা আমাদের অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিশ্বাসের জন্যই ক্ষতিকর। সচেতনতা, সততা এবং কার্যকর নজরদারির মাধ্যমে এই সমস্যা সহজেই কমানো সম্ভব।
লেখক: অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক