মৃত্যু চিরন্তন অবিচল সত্য। মৃত্যুর চেয়ে কঠিন সত্য পৃথিবীতে খুব বেশি নেই। যে জন্মেছে, সে মরবেই। মৃত্যু থেকে পালানোর পথ নেই। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক প্রাণী মরণশীল।’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত ১৮৫; সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩৫; সুরা আনকাবুত, আয়াত : ৫৭)
উল্কার রেডিওমেট্রিক বয়স নির্ণয় থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, প্রায় ৪৫৪ ± কোটি বছর বয়সের এই পৃথিবীতে কেউ বেঁচে থাকতে পারেনি। শুধু মানুষ নয়; কোনো প্রাণীও অমরত্ব লাভ করেনি। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবী! তোমার আগেও আমি কোনও মানুষকে অমরত্ব দান করিনি। তোমার মৃত্যু হলে ওরা কি চিরকাল বেঁচে থাকবে?’ (সুরা আম্বিয়া, আয়াত : ৩৪)
মৃত্যু কী? মৃত্যু মানে কী শেষ হয়ে যাওয়া; নাকি নতুন কোনো কিছুর শুরু হওয়া? মরে যাওয়া মানে কি হারিয়ে যাওয়া নাকি বেঁচে যাওয়া? মৃত্যু হলো ইহলৌকিক জীবনের ইতি টেনে পারলৌকিক জীবনে প্রবেশ। চিরস্থায়ী জীবনের দিকে যাত্রা। মৃত্যু হওয়া মানে হারিয়ে যাওয়া কিংবা শেষ হয়ে যাওয়া নয়; বেঁচে যাওয়া কিংবা চিরস্থায়ী জীবনের সূচনা ঘটা।
জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো— পুনরুত্থিত হওয়া এবং ওপারের জীবনে সফলতা লাভ করা। পুনরুত্থিত হওয়ার ব্যাপারটা চিরসত্য। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আল্লাহই তোমাদের জীবন দান করেছেন। তিনিই তোমাদের মৃত্যু ঘটাবেন। আবার তোমাদের পুনরুত্থিত করবেন তিনিই।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৬৬)
দারুল আমল বা কর্মক্ষেত্র হলো পৃথিবী। আর আখিরাত হলো দারুল জাজা বা প্রতিদান জগৎ। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ ‘দারুল আমল’ থেকে ‘দারুল জাজা’য় প্রবেশ করে। কর্মের জগতে রয়েছে কর্ম; রয়েছে অকর্মের অবকাশ। কর্মজগতের কর্ম আর অকর্মের ভিত্তিতে সজ্জিত হবে প্রতিদান জগৎ।
সেখানে থাকবে শুধু প্রতিদান। থাকবে না কোনো কর্ম বা অকর্মের কোনো অবকাশ। কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। আর তোমাদের কর্মফল তো পূর্ণমাত্রায় বুঝিয়ে দেওয়া হবে কিয়ামতের দিন। এরপর যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হবে এবং জান্নাতে দাখিল করা হবে— সেই সফলকাম। আর পার্থিব জীবন তো ছলনাময় ভোগ ছাড়া কিছুই নয়। (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৮৫)
মানবজীবনটাই হলো পরীক্ষাকেন্দ্র। সীমিত প্রশ্ন। নির্দিষ্ট উত্তর। পরীক্ষা শেষে অপেক্ষমাণ চূড়ান্ত সফলতার হাতছানি অথবা শাস্তি। আল্লাহ বলেন, ‘পুণ্যময় তিনি, যার (কুদরতের) হাতে রাজত্ব। তিনি সব কিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। যিনি সৃষ্টি করেছেন মরণ ও জীবন, যাতে তোমাদের পরীক্ষা করেন; কে তোমাদের মধ্যে কর্মে শ্রেষ্ঠ? তিনি পরাক্রমশালী, মহাক্ষমাশীল।’ (সুরা মুলক, আয়াত : ২)
পরীক্ষার হলের সময়কুটু যথার্থ মূল্যায়ন করে সঠিক উত্তর প্রদানের মাধ্যমে চূড়ান্ত সফলতা অর্জন করা বুদ্ধিমানের কাজ। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘বুদ্ধিমান সে; নিজের হিসাব নেয় এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য উপার্জন করে যে। আর অক্ষম সে; নিজেকে প্রবৃত্তির অনুগামী করে এবং আল্লাহর প্রতি অলীক প্রত্যাশা পোষণ করে যে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৪৫৯)
ওমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলকে (সা.) জিজ্ঞাসা করা হলো, হে আল্লাহর রাসুল! সবচাইতে বুদ্ধিমান লোক কে? তিনি (সা.) বললেন, যে অধিকহারে মৃত্যুকে স্মরণ করে এবং মৃত্যুপরবর্তী জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণে ব্যস্ত থাকে।’ (ইবনে মাজাহ) দুনিয়াতে মুমিন সব সময় থাকতে পারবে না। নির্দিষ্ট সময় শেষে চলে যেতে হবে। তাই বেঁচে থাকার সময়ে চিরস্থায়ী জীবনে সুখে থাকার জন্য আল্লাহর আদেশ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ মেনে চলতে হবে।
লেখক : আলেম ও গবেষক।