আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘জাহান্নামের সাতটি দরজা (স্তর) রয়েছে। প্রত্যেকটি দরজার বা স্তরের জন্য ভিন্ন ভিন্ন দল নির্ধারিত।’ (সুরা হিজর, আয়াত : ৪)
জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর রয়েছে এবং প্রত্যেক স্তরের জন্য আলাদা আলাদা দলের জন্য আলাদা শাস্তির ব্যবস্থা নির্ধারিত রয়েছে। সবাইকে এক স্তরে রেখে একই মাত্রা বা পরিমাণের শাস্তি দেওয়া হবে না। অপরাধীর অপরাধ অনুপাতে আলাদা আলাদা স্তরে আলাদা আলাদা শাস্তির ব্যবস্থাসম্পন্ন একটি শাস্তিঘরের নাম জাহান্নাম। (জান্নাত-জাহান্নাম, শাইখ ড. উমার সুলাইমান, অনুবাদ : মাওলানা আকরাম হুসাইন, সমকালীন প্রকাশন, পৃষ্ঠা : ২১২)
কোরআন-হাদিসের বিভিন্ন বর্ণনায় জান্নাতের বিভিন্ন স্তর বোঝাতে ‘লিল-জান্নাতি দারাজাতুন’ অর্থাৎ জান্নাতের বিভিন্ন স্তর এবং জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর বোঝাতে ‘লিন-নারি দারাকাতুন’ অর্থাৎ জাহান্নামের বিভিন্ন স্তর ব্যবহৃত হয়েছে। আগুন বা জাহান্নামের স্তর যত নিম্নমুখী, তার উত্তাপ ও শাস্তি তত ভয়াবহ। (আত-তাজকিয়া, আল্লামা কুরতুবি, পৃষ্ঠা : ৩৮২) আব্দুর রহমান ইবনে জায়িদ ইবনে আসলাম (রহ.) বলেন, ‘জান্নাতের স্তরগুলো উর্ধ্বমুখী আর জাহান্নামের স্তরগুলো নিম্নমুখী। (আত-তাখওয়াইফ মিনান্নার, ইবনে রজব, পৃষ্ঠা : ৫)
জাহান্নামের স্তরগুলো হলো—
১. জাহান্নাম : জাহান্নামের প্রথম স্তরের নাম হলো জাহান্নাম। অনেকে একে ‘নার’ বলেও অভিহিত করেছেন। জাহান্নামের এ স্তরে গুনাহগার মুমিনদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম গোপন ফাঁদ।’ (সুরা নাবা, আয়াত : ২১-২২)
২. লাজা : জাহান্নামের দ্বিতীয় স্তরের নাম লাজা। অর্থ লেলিহান আগুন। জাহান্নামের এ স্তরে ইহুদিদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘সেটা আগুন। যারা কুফুরি করে, আল্লাহ তাদের এর ওয়াদা করেছেন।’ (সুরা হজ, আয়াত : ৭২)
৩. হুতামা : জাহান্নামের তৃতীয় স্তরের নাম হলো হুতামা। অর্থ প্রজ্বলিত আগুন। জাহান্নামের এ স্তরে খ্রিস্টানদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘কখনও নয়, অবশ্যই সে নিক্ষিপ্ত হবে হুতামায়।’ (সুরা হুমাজাহ, আয়াত : ৪)
৪. সাইর : জাহান্নামের চতুর্থ স্তরের নাম সাইর। অর্থ জ্বলন্ত আগুন। জাহান্নামের এ স্তরে ভূত-পেত ও চন্দ্র-তরকা পূজাকারীদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘একদল থাকবে জান্নাতে আরেকদল থাকবে সাইর বা জ্বলন্ত আগুনে।’ (সুরা আশ-শুরা, আয়াত : ৭)
৫. সাকার : জাহান্নামের পঞ্চম স্তরের নাম সাকার। অর্থ ঝলসে দেওয়া আগুন। জাহান্নামের এ স্তরে অগ্নিপূজকদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘কিসে তোমাদের জানাবে সাকার বা ঝলসে দেওয়া আগুন কী? (এটা এমন আগুন) যা অবশিষ্টও রাখবে না আবার ছেড়েও দিবে না।’ (সুরা মুদ্দচ্ছির, আয়াত : ২৭-২৮)
৬. জাহিম : জাহান্নামের ষষ্ঠ স্তরের নাম জাহিম। অর্থ কঠিন অগ্নিদাহ। জাহান্নামের এ স্তরে মুশরিকদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘আর জাহিম বা জাহান্নামকে প্রকাশ করা হবে তার জন্য যে দেখতে পায়।’ (সুরা নাজিয়াত, আয়াত : ৩৬)
৭. হাবিয়া : জাহান্নামের সপ্তম স্তরের নাম হাবিয়া। অর্থ গভীর বা পাতাল। এটা সর্বনিম্ন ও সবচেয়ে নিকৃষ্ট জাহান্নাম। জাহান্নামের এ স্তরে মুনাফিকদের রাখা হবে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘আর যার পাল্লা হালকা হবে, তার আবাস হবে হাবিয়া। আর তোমাকে কিসে জানাবে হাবিয়া কী? তা প্রজ্বলিত অগ্নি।’ (সুরা কারিয়াহ, আয়াত : ৮-১১)
এ ছাড়া বিভিন্ন বর্ণনায় আরও কিছু জাহান্নামের নাম পাওয়া যায়। অনেক স্কলার বলেছেন, এগুলো জাহান্নামের বিভিন্ন স্তরের বিভিন্ন ঘাটি।
ক. দারুল বাওয়ার : ধ্বংসের ঘর। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘তুমি কি তাদের দেখো না, যারা আল্লাহর নিয়ামতকে কুফরি দ্বারা পরিবর্তন করেছে এবং তাদের কওমকে ধ্বংসের ঘরে নামিয়ে দিয়েছে? তারা জাহান্নামে দগ্ধ হবে, আর তা কতই না নিকৃষ্ট অবস্থান।’ (সুরা ইবরাহিম, আয়াত : ২৮, ২৯) আল্লামা ইবনে কাসির (রহ.) এ আয়াতের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, ‘দারুল বাওয়ার হলো জাহান্নাম।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির, ২/৫৩৯)
খ. গাছ্ছাক : একটি হ্রদ। জাহান্নামিদের রক্ত, ঘাম ও পুঁজ প্রবাহিত হয়ে সেখানে জমা হবে।
গ. গিছলিন : জাহান্নামিদের মলমূত্র জমা হওয়ার স্থান।
জাহান্নামিরা যখন খুব ক্ষুধা-তৃষ্ণা অনুভব করবে তখন গাছছাক ও গিছলিন থেকে তাদের পান করতে দেওয়া হবে।
ঘ. তীনাতুল খাবাল : বিষ ও পুঁজে পরিপূর্ণ একটি কুপ।
ঙ. সাউদ : তীনাতুল খাবালের পাড়ে অবস্থিত একটি বিশাল পাহাড়। এক শ্রেণির জাহান্নামিদের এই পাহাড়ের ওপর উঠিয়ে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলা দেওয়া হবে, আবার উঠানো হবে এবং আবার ফেলা দেওয়া হবে। এভাবে শাস্তি দেওয়া হবে। (সুরা মুদ্দচ্ছির, আয়াত : ১৭)
চ. জুববুল হুজন : এখানে অহংকারী লোকদের শাস্তি দেওয়া হবে।
ছ. গাই : জাহান্নামের সবচেয়ে ভয়ংকর জায়গা। এর ভীতিজনক হুঙ্কার শোনার পর জাহান্নামের অন্যান্য স্থান প্রতিদিন ‘গাই’ থেকে ৪০০ বার আশ্রয় চায়। (জান্নাত-জাহান্নাম, শাইখ ড. উমার সুলাইমান, অনুবাদ : মাওলানা আকরাম হুসাইন, সমকালীন প্রকাশন, পৃষ্ঠা : ২১৫)
লেখক : আলেম ও গবেষক