কিয়ামতের নিদর্শনগুলো ইলমুল গায়েব তথা গায়েবের জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সাধারণ গায়েবের জ্ঞান নয়; বরং চূড়ান্ত গায়েবের জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। আবহাওয়ার পূর্বাভাস, মায়ের গর্ভের সন্তান ইত্যাদিও গায়েবের জ্ঞান, তথাপি সেগুলো আপেক্ষিক। বিভিন্ন উপায়-উপকরণের মাধ্যমে সেগুলো জানা যায়। বিজ্ঞানের উৎকর্ষের ফলে অতীতের মানুষ গর্ভের সন্তান কিংবা আগামীকালের আবহাওয়া সম্পর্কে না জানলেও আজকের মানুষ সেগুলো সহজেই জানতে পারছে। জন্মের বহু আগেই সন্তান কেমন আছে, ছেলে নাকি মেয়ে সবকিছু বলে দিতে পারছে। গর্ভের ভ্রূণের অবস্থা জানাও দীর্ঘ একটা সময় পরে সম্ভব হচ্ছে। এগুলো আপেক্ষিক জ্ঞান। এক দৃষ্টিতে অদৃশ্য। অন্য দৃষ্টিতে দৃশ্যমান।
কিয়ামতের নিদর্শনগুলো হলো চূড়ান্ত অদৃশ্য জ্ঞান। ফলে কোনো উপায়-উপকরণ, যন্ত্র কিংবা মেশিনের মাধ্যমে কিয়ামতের সময়সীমা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। কিয়ামত কখন ও কীভাবে হবে তা কিছুতেই বলা সম্ভব নয়। পৃথিবীর শেষ পরিণতি কী হবে, কোনো কিছুর ব্যাপারে অনুমান করা সম্ভব নয়। ঈসা (আ.) কখন পৃথিবীতে পুনরাগমন করবেন, এটা বিজ্ঞান কিংবা যন্ত্র দিয়ে খুঁজে পাওয়ার বিষয় নয়। দাজ্জাল কী, সেটা সায়েন্সের বিষয় নয়। ইয়াজুজ-মাজুজ কিংবা দাব্বাতুল আরদ অণুবীক্ষণ কিংবা দূরবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজে ফেরার বিষয় নয়। কারণ এগুলো এমনই গায়েবের জ্ঞান, যার একমাত্র উৎস অহি।
মোটকথা, কিয়ামত সম্পকর্তি জ্ঞান চূড়ান্ত ও নিগূঢ় গায়েবের জ্ঞান; আল্লাহতায়ালা ছাড়া অন্য কেউ এই জ্ঞানের অধিকারী নয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘গায়েবের চাবিকাঠি তাঁরই কাছে। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। জল ও স্থলের সবকিছু সম্পর্কেই তিনি অবগত। তাঁর অজ্ঞাতসারে একটি পাতাও পড়ে না। মৃত্তিকার অন্ধকারে এমন কোনো শস্যকণা অঙ্কুরিত হয় না বা আর্দ্র কিংবা শুষ্ক এমন কোনো বস্তু নেই, যা সুস্পষ্ট কিতাবে নেই।’ (সুরা আনয়াম, আয়াত: ৫৯)
তথাপি আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রতি অনুগ্রহপূর্বক নবী-রাসুলগণকে কিয়ামত সম্পর্কে অনেক কিছু জানিয়েছেন। ফলে পৃথিবীর সকল নবী-রাসুল হাজার হাজার বছর আগে পৃথিবীর শেষ দিনগুলো সম্পর্কে এমন অনেক তথ্য দিয়েছেন, যা আজও মানুষকে বিস্ময়ে বিমূঢ় করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) কিয়ামত ও কিয়ামতের আলামতগুলো নিয়ে এতই সবিস্তার কথা বলেছেন যে, সে সম্পকর্কে আজ আমরা অনেক কিছুই জানতে পারছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পুরো একটি দিন তিনি এগুলো নিয়ে কথা বলেছেন। উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) থেকে বর্ণিত, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের মাঝে সৃষ্টির সূচনা থেকে শুরু করে জান্নাতবাসীর জান্নাতে ও জাহান্নামবাসীর জাহান্নামে প্রবেশ পর্যন্ত কী হয়েছে ও হবে, সবকিছু আলোচনা করেছেন। অনেকে মনে রেখেছে। অনেকে ভুলে গেছে!’ (বুখারি, হাদিস: ৩১৯২)
আমর ইবনে আখতাব (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন ফজরের নামাজ আদায় করে মিম্বরে আরোহণ করলেন। জোহর পর্যন্ত তিনি আলোচনা করলেন। জোহরের ওয়াক্ত হয়ে গেলে তিনি মিম্বর থেকে নেমে নামাজ আদায় করলেন। নামাজের পরে আবার মিম্বরে উঠলেন। আসর পর্যন্ত কথা বললেন। আসরের সময় হলে মিম্বর থেকে নেমে নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর আবার মিম্বরে আরোহণ করলেন। সূর্যাস্ত পর্যন্ত আলোচনা করলেন। সেদিন তিনি আমাদের অতীতে সংঘটিত ও ভবিষ্যতে ঘটিতব্য সবকিছু জানিয়েছেন। যে সবচেয়ে বেশি মুখস্থ রাখতে পেরেছে সেই সবচেয়ে বেশি জ্ঞানী হয়ে গেছে।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৮৯২)
লেখক : আলেম ও গবেষক