পৃথিবী ধ্বংসের সময়কাল এবং হিসাবের জন্য নিখিল সৃষ্টিজগতের সব কিছু এক জায়গায় সমবেত হওয়ার দিনটিকে কোরআনে নানা নামে পরিচিত করা হয়েছে। তন্মধ্যে কয়েকটি নাম হলো, কিয়ামত দিবস, হিসাব দিবস, বিচার ও প্রতিদান দিবস, পুনরুত্থান দিবস। এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ও প্রসিদ্ধ নাম হচ্ছে, ‘সাআহ’ তথা হঠাৎ সংঘটিত বিষয়। পবিত্র কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় আল্লাহতায়ালা এর কথা উল্লেখ করে বলেন, ‘মানুষ আপনাকে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বলুন, এর জ্ঞান আল্লাহর কাছেই। আপনি কী করে জানবেন, সম্ভবত কিয়ামত নিকটেই।’ (সুরা আহজাব, আয়াত: ৬৩)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘কিয়ামত অত্যাসন্ন। চাঁদ বিদীর্ণ হয়ে গেছে। যখনই তারা কোনো নিদর্শন দেখে তখনই মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে, এটা তো চিরাচরিত জাদু।’ (সুরা কমার, আয়াত: ১-২)
পৃথিবীর সূচনা ও পৃথিবীতে মানুষের সূচনা সম্পর্কে যেমন আমাদের নিশ্চিত জ্ঞান নেই, প্রচলিত অনুমান ও ধারণার বাইরে সুসংহত ও সুনিশ্চিত কোনো তথ্য নেই। একইভাবে পৃথিবীর সমাপ্তি ও ধ্বংসের সময় সম্পর্কেও আমাদের কোনো জ্ঞান নেই; এর জ্ঞান শুধু আল্লাহতায়ালার কাছে। তিনি কোনো ফেরেশতা, নবী-রাসুল কিংবা সৃষ্টির কাউকে এই ব্যাপারে অবহিত করেননি। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করে, কিয়ামত কবে সংঘটিত হবে? বলে দিন, এর জ্ঞান শুধু আমার পালনকর্তার কাছে। তিনিই তা উন্মোচিত করবেন নির্ধারিত সময়ে। আসমান ও জমিনের জন্য তা অতি কঠিন বিষয়। তা তোমাদের ওপর আসবে হঠাৎ করেই। তারা আপনাকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, যেন আপনি তার অনুসন্ধানে লেগে আছেন। বলে দিন, এর জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছেই রয়েছে; কিন্তু অধিকাংশ লোকই সেটা বোঝে না।’ (সুরা আরাফ, আয়াত: ১৮৭)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘কিয়ামতের জ্ঞান শুধু আল্লাহর কাছে রয়েছে। তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন এবং তিনি জানেন মাতৃগর্ভে কী আছে। কেউ জানে না, আগামীকাল সে কী উপার্জন করবে এবং কেউ জানে না, কোন স্থানে তার মৃত্যু ঘটবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সবর্বিষয়ে অবহিত।’ (সুরা লুকমান, আয়াত: ৩৪)
কিয়ামতের সময়সীমা প্রচ্ছন্ন রাখার নানা হেকমত ও রহস্য রয়েছে। যেমন আল্লাহতায়ালার জ্ঞানগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করা। তাঁর জ্ঞানের সামনে সৃষ্টির সকলের জ্ঞানগত দীনতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করা। আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ গায়েব জানে—এমন ধারণা নাকচ করা।
মানুষকে কিয়ামতের দিনক্ষণ জানিয়ে দেওয়া হলে সেটা যদি দূরে হতো, তবে কেউ কিয়ামতকে পাত্তা দিত না। নিজেকে সংশোধন করত না। আর নাস্তিক ও অবিশ্বাসীরা কিয়ামতের দিন-তারিখ দূরে দেখে সেগুলো মিথ্যা সাব্যস্ত করত। ঠাট্রাবিদ্রুপ ও উপহাস করত। বিপরীতে যদি কিয়ামত কাছে হতো, তবে সবাই সেই ভয়ে নিজেদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার ছন্দ হারিয়ে ফেলত। সবাই দিনরাত সিজদায় পড়ে থাকত। এগুলো করত কিয়ামতের ভয়ে; আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা কিংবা প্রেমে নয়। অথচ এটা দাসত্বের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া নয়, আল্লাহর ইবাদত ও তাঁর প্রতি ভালোবাসার কাঙ্ক্ষিত রূপ নয়। এজন্য যুক্তিরও দাবি হলো, কিয়ামতের বিষয়টি মৃত্যুর মতোই গোপন রাখা। এর সময়সীমা সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, শীর্ষস্থানীয় ফেরেশতা কিংবা নবী-রাসুলকেও জানানো হয়নি। এর জ্ঞান শুধু আল্লাহতায়ালার কাছেই রয়েছে। তাই আল্লাহতায়ালা গোটা বিষয়টি লুকিয়ে রেখেছেন।
পৃথিবী ধ্বংসের আগে অনেকগুলো সতর্কবার্তা দেবেন। যাদের ন্যূনতম অন্তর্দৃষ্টি এবং সুস্থ বিবেকবোধ থাকবে, তারা সেসব নিদর্শন দেখে বুঝতে পারবে কিয়ামত ঘনিয়ে এসেছে। সেগুলোর মধ্যে পৃথিবী ধ্বংসের বার্তা পাবে। সতর্ক হবে। শোধরাবে। এসব নিদর্শনাবলিকেই ইসলামি আকিদার পরিভাষায় ‘আশরাতুস সাআহ’ তথা কিয়ামতের আলামত বলা হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা কি শুধু এজন্য অপেক্ষা করছে যে, কিয়ামত তাদের ওপর এসে পড়ুক আকস্মিকভাবে? বস্তুত কিয়ামতের আলামতসমূহ তো এসেই পড়েছে। কিয়ামত এসে পড়লে তারা উপদেশ গ্রহণ করবে কেমন করে?’ (সুরা মুহাম্মাদ, আয়াত: ১৮)
আরবি ‘সাআহ’ শব্দটি একাধিক অর্থ বহন করে। একটি অর্থ হলো, সামান্য সময়। দিনরাতের চব্বিশ ঘণ্টার এক ঘণ্টা। আরেকটি অর্থ হলো, মৃত্যু। কারণ এটা সামান্য সময়ের ব্যাপার। হঠাৎ ঘটে যায়। মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মানুষ পৃথিবী ত্যাগ করে ও পরপারের সীমানায় ঢুকে পড়ে। (সুরা আনয়াম, আয়াত: ৩১)
‘সাআহ’র আরেকটি অর্থ হলো, কোনো প্রজন্ম বিলুপ্ত হওয়া। সমজাতীয় ও সমকালীন সকল লোক মৃত্যুবরণ করা। যেমন, একবার একদল লোক রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করল, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ, কিয়ামত (সাআহ) কবে? তিনি সেখানে বিদ্যমান এক আনসার বালকের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘যদি এই বালক বেঁচে থাকে, তবে বৃদ্ধ হওয়ার আগেই তোমাদের কাছে সাআহ চলে আসবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫১১)
‘সাআহ’র আরেকটি অর্থ হলো, কিয়ামত। পৃথিবীর বিলুপ্তি ও আখেরাতের সূচনা। সবকিছু ধ্বংসের পরে পুনরুত্থানের প্রক্রিয়া। যেহেতু আচমকা পৃথিবী বিলুপ্ত হয়ে যাবে, চোখের পলকে কিয়ামত হঠাৎ এসে মানুষকে আঘাত করবে এজন্য এটাকে ‘সাআহ’ বলা হয় ৷
লেখক : আলেম ও গবেষক