ইবরাহিম (আ.) যখন বিবি সারাকে নিয়ে হিজরত করে একটি জনবসতিতে প্রবেশ করলেন, তখন তাদের আগমনের সংবাদ এক জালিম বাদশার কানে পৌঁছায়। জালিম বাদশা দূত পাঠিয়ে ইবরাহিমের কাছে জানতে চাইল, তার সঙ্গে থাকা নারীটি কে? ইবরাহিম (আ.) কৌশল অবলম্বন করে উত্তর দিলেন, কিন্তু বাদশার কামচোখ থেকে এড়িয়ে থাকতে পারলেন না। বাদশার আদেশে বিবি সারাকে বাদশার দরবারে পাঠাতে বাধ্য হলেন তিনি।
বিবি সারাকে দেখে বাদশা তার অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার দিকে অগ্রসর হলো। বাদশার কুমতলব বুঝতে পেরে বিবি সারা অজু করে নামাজ আদায়ে মগ্ন হলেন এবং দুই হাত তুলে প্রভুর দরবারে প্রার্থনায় বলতে লাগলেন, ‘হে আল্লাহ আমি আপনার ওপর এবং আপনার প্রেরিত রাসুলের ওপর ঈমান এনেছি। আমি আমার সতীত্বকে একমাত্র আমার স্বামীর জন্য অবধারিত করেছি। সুতরাং আমার ওপর কোনো কাফেরকে চাপিয়ে দেবেন না।’
বিবি সারার দোয়া সঙ্গে সঙ্গে কবুল হলো। জালিম বাদশার মাঝে অলৌকিকভাবে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়ে মৃগী রোগীর মতো ছটফট করতে লাগল। কোনোভাবেই সে বিবি সারার ওপর তার কামবাসনা পূর্ণ করতে সক্ষম হচ্ছিল না।
বাদশার এমন পরিস্থিতি দেখে বিবি সারা কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন। তিনি মনে মনে দোয়া করতে লাগলেন, এই মুহূর্তে যেন বাদশার মৃত্যু না হয়। অন্যথায় লোকেরা তাকে বাদশাকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার করবে।
আল্লাহর ইচ্ছায় প্রথমবারের মতো ছাড়া পেয়ে গেলেন বিবি সারা। দ্বিতীয়বার আবার বাদশা তাকে ডেকে পাঠালেন এবং বিবি সারার দোয়ায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। বাধ্য হয়ে বিবি সারাকে বিদায় জানাল বাদশা। তৃতীয়বার বিবি সারাকে বাদশা আবার ডাকল এবং একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল এবারও।
এবার বাদশার চোখ খুলে গেল। ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে সে বলতে লাগল, তোমরা আমার জন্য শয়তান পাঠিয়েছ। একে আর আমার কাছে এনো না। একে ইবরাহিমের কাছে পাঠিয়ে দাও এবং আমার পক্ষ থেকে কিছু উপঢৌকন দিয়ে দাও।
জালিম বাদশার কামচক্ষুর সামনে নিজের সতীত্বকে বিলিয়ে দিতে হলো না বিবি সারাকে। সসম্মানে তিনি ফিরে গেলেন স্বামী ইবরাহিমের কাছে। স্বামীর কাছে পৌঁছে কৃতজ্ঞতা জানালেন আল্লাহতায়ালার প্রতি। শুকরিয়া সেজদায় লুটিয়ে পড়লেন মহান প্রভুর দরবারে।
হাদিসের এই ঘটনাটি প্রসিদ্ধ সাহাবি আবু হোরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। (বুখারি, হাদিস : ২১০৪, ২২১৭)
ঘটনাটি হাদিসের আরও দু একটি বিখ্যাত কিতাবে একটু অন্যভাবে এসেছে। বর্ণিত হয়েছে, বিবি সারাকে জালিম বাদশার কাছে তুলে নেওয়ার পর ইবরাহিম নিজে নামাজে দাঁড়িয়েছিলেন এবং বিবি সারাকে তিনি দোয়া শিখিয়ে দিয়েছিলেন। স্বামীর শেখানো দোয়া পাঠ করার কারণে জালিম বাদশা কোনোভাবেই বিবি সারার ওপর তার অসৎ কামনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম হচ্ছিল না। একবার, দুইবার, তিনবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার পর বাদশা তার কামনা পূরণের আকাঙ্ক্ষা ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল।
এরপর বাদশা রাগে ক্ষিপ্ত হয়ে সুন্দরী নারীর সংবাদ যে তাকে দিয়েছিল তাকে ডেকে এনে বলেছিল, তুমি আমাকে একটি শয়তান উপহার দিয়েছ। এ কোনো রূপসী নারী নয়। একে আমার ঘর থেকে বের করে দাও।
জালিম বাদশার কবল থেকে বের হয়ে বিবি সারা ছুটে গেলেন স্বামীর কাছে। স্বামীর সঙ্গে সাক্ষাতের সঙ্গে সঙ্গে ইবরাহিম তার কাছে জানতে চাইল— কী খবর, তোমার কিছু হয়নি তো। বিবি সারা বললেন, আমি ভালো আছি। আল্লাহতায়ালা কাফের ও পাপাচারী ব্যক্তির হাত থেকে আমাকে মুক্ত রেখেছেন। (মুসলিম, হাদিস: ২৩৭১)
অনেক ইতিহাসবিদ তাদের লেখনীতে উল্লেখ করেছেন, ইবরাহিম (আ.) কৌশল অবলম্বন করে বাদশার দূতকে বলেছিলেন, তার সঙ্গে যে নারী রয়েছে তিনি তার বোন হন। (কাসাসুল আম্বিয়া, আব্দুল ওয়াহাব নাজ্জার, পৃষ্ঠা ১২৭)
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক