দুঃখজনকভাবে এক মহা বিচ্যুতি তৈরি হয়েছে। একদল মানুষ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কেই আলিমুল গায়েব (অদৃশ্য জ্ঞানের অধিকারী) বানিয়ে দিয়েছে। তাঁকে সর্বজ্ঞানী সাব্যস্ত করেছে। তাহলে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ইলমের মাঝে পার্থক্য কী রইল? এভাবে মুসলিমদের কিছু সম্প্রদায় রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ব্যাপারে এতটাই বাড়াবাড়ি করেছে, যা খ্রিষ্টানরা ঈসা (আ.) ও পৌত্তলিক ধর্মের অনুসারীরা তাদের ধর্মের বড় বড় ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে করেছে। অথচ রাসুলুল্লাহ (সা.) এই বাড়াবাড়ি থেকে আগেই সতর্ক করে গিয়েছিলেন, ‘তোমরা আমার প্রশংসায় বাড়াবাড়ি করো না, যেভাবে খ্রিষ্টানরা ঈসা ইবনে মারইয়ামের ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করেছে। আমি তো শুধু আল্লাহর বান্দা। তাই তোমরা বলো, আল্লাহর বান্দা ও তাঁর নবি।’ (বুখারি, হাদিস: ৩৪৪৫)
কিন্তু তারা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এই সতর্কবাণীতে কান না দিয়ে বাড়াবাড়ি অব্যাহত রেখেছে। তাদের কথা, ‘এত কিছু যিনি জানেন, তিনি আলিমুল গায়েব হন না কী করে? যিনি সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত সাহাবিদের সৃষ্টির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কী ঘটেছে ও কী ঘটবে সবকিছু বলে দিয়েছেন, তিনি আলিমুল গায়েব হন না কী করে?’
আমরা বিনয়ের সঙ্গে বলব, এটা মুদ্রার এক পিঠ। অন্য পিঠে তারা দৃষ্টি দিলেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারতেন, বাড়াবাড়ি-ছাড়াছাড়িমুক্ত ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্বাসের অনুসারী হতে পারতেন। আল্লাহর রাসুল (সা.) তাঁর জীবদ্দশায় অসংখ্য বিষয় জানতেন না। কয়েক কদম দূরে পড়ে থাকা তাঁর স্ত্রী আয়েশা (আ.)-এর ‘হার’ সম্পর্কে তার অবগতি ছিল না। অথচ হাজার বছর আগে শত সহস্র মাইল দূরত্বে অবস্থিত তুর পর্বতে কী ঘটেছিল; তা তিনি জানতেন। তাঁর স্ত্রী আয়েশা (আ.)-এর চরিত্রে অপবাদের কালিমা লেপন করা হলে দীর্ঘ এক মাস তিনি ব্যথিত-ভারাক্রান্ত ও সিদ্ধান্তহীন থাকেন। বাস্তবে কী ঘটেছিল, সে সম্পর্কে অনবগত থাকেন। অথচ শত শত বছর আগে ফিলিস্তিনের ছোট্ট এক গ্রামে ঈসা (আ.)-এর মা মারইয়ামের সম্প্রদায় তার চরিত্রে কালিমা লেপন করলেও তিনি যে পবিত্র ও নিষ্কলুষ ছিলেন, তা তিনি জানতেন!
এর মূল কারণ ওহি (প্রত্যাদেশ); বরং নবি-রাসুল মানেই ওহি। সাধারণ মানুষ থেকে তাদের অসাধারণ করে এই ওহি। ওহির বাইরে তারা মানুষ। ফলে ওহির মাধ্যমে যখন তাদের জানানো হয় তখন অতীত ও ভবিষ্যতের যেকোনো নিগূঢ় বিষয় তাদের সামনে দৃশ্যমান হয়ে ভাসতে থাকে। বিপরীতে ওহি না এলে তারা দেওয়ালের ওপাশে কী আছে সেটাও বলতে পারেন না। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তিনি প্রবৃত্তির তাড়নায় কথা বলেন না। এটা তো ওহি, যা তার প্রতি প্রেরিত হয়।’ (সুরা নাজম, আয়াত: ৩-৪)
আল্লাহতায়ালা তাদেরকে যতটুকু জানান ততটুকু তারা জানেন। এর বাইরে অদৃশ্য জ্ঞানের ওপর তাদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিয়ামতের আলামতগুলোর কিছু অংশ আল্লাহতায়ালা নবি-রাসুলকে জানিয়েছেন যেন তারা মানুষকে সেগুলো জানিয়ে দেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘রাসুলের দায়িত্ব শুধু পৌঁছে দেওয়া। তোমরা যা প্রকাশ করো আর যা গোপন করো সব আল্লাহ জানেন।’ (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯৯)
জিবরাইল (আ.) রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাবে বলেন, ‘প্রশ্নকারীর চেয়ে প্রশ্নকৃত ব্যক্তি বেশি জানে না।‘ (অর্থাৎ এই বিষয়ে আমিও আপনার মতো কিছুই জানি না। তখন জিবরাইল (আ.) কিয়ামতের আলামতের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে নবিজি ওহির ভিত্তিতে জিবরাইলকে কয়েকটি আলামতের কথা জানান।’ (মুসলিম, হাদিস: ৮)
নবি-রাসুলদের দায়িত্ব শুধু আল্লাহর পয়গাম মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। গায়েবের অধিকারী হওয়া, গায়েবের জ্ঞান লুকিয়ে রাখা, নিজেদের পক্ষ থেকে যোগ-বিয়োগ করা, কোনো কিছু তাদের ব্যক্তিগত ইচ্ছা-স্বাধীনতার ওপর নির্ভরশীল নয়।
লেখক: আলেম ও গবেষক