রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরজ।’নতুন বছর এলেই সন্তানের পড়াশোনা নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েন বাবা-মা। কোথায় পড়াবেন, কেন পড়াবেন—নানা চিন্তায় কাটতে থাকে দিন-রাত। সন্তানের ইসলামি শিক্ষা নিয়ে বিশেষজ্ঞ কয়েকজন ইসলামি শিক্ষাবিদের সঙ্গে কথা বলে দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হলো।
‘সন্তানের ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার বিকল্প নেই’
—আরীফ মুহাম্মদ আল-আযহারী
প্রিন্সিপাল, মাহাদুস সুফারা বাংলাদেশ, মিরপুর
মানুষকে মানবীয় গুণের জন্য মানুষ বলা হয়। মানবীয় গুণ মানুষকে বড় বানায়। নৈতিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় শিক্ষা ছাড়া একজন মানুষ কখনও ভালো মানুষ হতে পারে না। জাগতিক শিক্ষার সঙ্গে নৈতিক শিক্ষা না থাকলে ভালো ফল বয়ে আনে না। সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে না। নৈতিক শিক্ষার অভাবে সমাজ ও দেশে নানাবিধ সমস্যা দেখা দিয়েছে। ফলে অভিভাবকরা এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিকে ধাবিত হচ্ছেন, যেখানে নৈতিক শিক্ষার নিশ্চিয়তা আছে।
মুসলিম সন্তানের জন্য ইসলামের ওপর টিকে থাকা আবশ্যক। মুসলমানের জন্য ঈমান হেফাজত করা যেমন ফরজ, তেমনি ঈমান হেফাজতের জন্য সম্যক ধারণা অর্জন ফরজ। পরকালের জীবনকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য ইসলামি জ্ঞানার্জন জরুরি। জাগতিক জ্ঞানের পাশাপাশি ইসলামের ফরজ বিধিবিধান সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞান লাভ করা আবশ্যক। প্রত্যেকে মুসলিম হবে, তবে প্রত্যেকের আলেম হওয়া জরুরি নয়। মানুষের কল্যাণে সব ধরনের জ্ঞানার্জনকে ইসলাম সমর্থন করে। ধর্মীয় প্রয়োজনীয় জ্ঞানার্জনের পাশাপাশি মুসলিম সন্তানদের জাগতিক জ্ঞানার্জনে ইসলামে কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই।
যেখানে নৈতিক শিক্ষা আছে, শিক্ষাগত মান আছে, চিন্তা-চেতনা উন্নয়নের পরিবেশ আছে, মন-মানসিকতা গড়ার পরিবেশ আছে; একজন মুসলমানের সন্তানকে এরকম পরিবেশে পড়ানো উচিত। প্রতিটি শিশু সন্তান আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। আগামী দিনের নেতৃত্ব, দেশ পরিচালনা, বিশ্ব পরিচালনা এদের ওপর নির্ভর করছে। সুতরাং প্রতিভা বিকাশ থেকে শুরু করে চিন্তা-চেতনার গঠনের পাশাপাশি মেধা গঠন করা হয়, নৈতিক মন-মানসিকতা তৈরি করা হয়, একজন ভালো মানুষ হিসেবে জীবনযাপনে উদ্বুদ্ধ করা হয়, এরকম প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়ানো উচিত।
‘ধর্মীয় শিক্ষাই মানুষকে মানবিক ও সহনশীল বানায়’
—সদরুদ্দীন মাকনুন
মুহতামিম, (প্রশাসন) জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ, রামপুরা
শিক্ষা সবার জন্যই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দ্বীনি শিক্ষা অতীব জরুরি। সমাজের অবক্ষয়, অনাচারের এই সময়ে শিশু-কিশোরদের মধ্যে যদি ধর্মীয় ও মানবিক শিক্ষা না থাকে, তা হলে বড় হয়ে সে হিংস্র, মানবতাহীন ও চেতনাশূন্য মানুষে পরিণত হবে। একমাত্র ধর্মীয় শিক্ষাই মানুষকে মানবিক ও সহনশীল বানায়। তাই বর্তমানে ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্য ধর্মীয় শিক্ষা জরুরি। এ যুগের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিশেষ করে টিনএজারদের মধ্যে পরমতসহিষ্ণুতা ও সৌজন্যবোধের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। তাদের মাঝে মাদক গ্রহণ ও বিভিন্ন অশ্লীল ও মন্দ কাজের যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, এগুলো থেকে নতুন প্রজন্মকে বাঁচাতে হলে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।
আদর্শিক চৈতন্যবোধ ও ধর্মীয় শিক্ষায় ছাত্র গড়ার একটি অনন্য বিদ্যাপীঠ জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ। এর বিশেষত্ব হচ্ছে, এটি দারুল উলুম দেওবন্দের মূল স্রোতধারার সঙ্গে একাত্ম। অনেক প্রতিষ্ঠানে এখানকার চেয়ে ভালো রেজাল্ট থাকতে পারে, কিন্তু আমরা এ কারণে অনন্য যে, এখানকার ছাত্ররা আদব-আখলাক, তালিম-তরবিয়ত ও একটি বিশুদ্ধ আদর্শিক দর্শন ধারণ করে বেড়ে ওঠে। কেউ যদি তার সন্তানকে উত্তম আখলাক, বিশুদ্ধ ইসলামি শিক্ষা এবং দারুল উলুম দেওবন্দের সুমহান চিন্তাধারায় গড়ে তুলতে চান, তা হলে আমাদের প্রতিষ্ঠানে আপনাকে স্বাগতম।
জামিয়া ইকরা অত্যন্ত উদার এবং সহনশীল একটি প্রতিষ্ঠান। এখানের শিক্ষার্থীরা উদার মানসিকতায় গড়ে ওঠে। ইসলামের মূল স্রোতধারা এবং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সিরাতের ওপর ভিত্তি করে তার চিন্তা পরিশীলিত করা হয়। এখানে পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিকতা ও সৌজন্যবোধ শেখানো হয়। দারুল উলুম দেওবন্দের আকাবিরগণও এখানে নিয়মিত আসা-যাওয়া করেন। তাই এ কথা দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, বর্তমানে তরবিয়ত, আদব-আখলাক এবং নববি আদর্শের ওপর ছাত্র গড়ার অনন্য প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জামিয়া ইকরা বাংলাদেশ।
‘নারীর জন্য যাবতীয় বিধান জানা জরুরি’
—হাফিজ আল মুনাদী
প্রিন্সিপাল, মাদরাসাতুন নাহদা, আফতাবনগর
ইসলামের মৌলিক জ্ঞান শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের জন্য ফরজ। জ্ঞান হচ্ছে মৌলিক অধিকার। পুরুষের জন্য যেমন যাবতীয় বিধিবিধান জানা জরুরি, তেমনি নারীর জন্যও জরুরি। ইসলামি জীবন পরিচালনার জন্য সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ের জ্ঞান নারীর জানা আবশ্যক। সন্তানের লালন-পালন, মা-বাবার সেবা, নারীর সুরক্ষা, নারীর মাতৃত্বকালীন দায়িত্ব, মায়ের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুর মানসিক বিকাশ ও সামাজিক উন্নয়নসহ আরও অনেক বিষয় আছে, যেসব বিষয়ে নারীর পরিপূর্ণ জানা কর্তব্য। নারী যদি এসব বিষয়ে জ্ঞান না রাখেন, তা হলে একটি সমাজ ও দেশ কখনো বুক টান করে পৃথিবীতে দাঁড়াতে পারে না।
আমাদের সমাজে প্রান্তিকতা বিদ্যমান আছে। কোথাও শুধু জাগতিক শিক্ষা আছে, দ্বীনি শিক্ষা নেই। কোথাও দ্বীনি শিক্ষা আছে, জাগতিক শিক্ষা নেই। দ্বীনহীন জাগতিক শিক্ষা যেমন জাতিকে আল্লাহবিমুখ করে এবং জাতিকে অন্তঃসারশূন্য করে, ঠিক একইভাবে জাগতিক শিক্ষামুক্ত দ্বীনি শিক্ষা জাতিকে পঙ্গু করে দেয়। মুসলমানকে দুটো শিক্ষাই লাভ করতে হবে।
আমরা দ্বীনি জ্ঞান এবং জাগতিক শিক্ষার সমন্বয়ে একজন কন্যাশিশুকে যোগ্য করে গড়ে তোলার চেষ্টা করছি। আমাদের মাদরাসায় শুধু মেয়েদের পড়ানো হয়। তাদের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য আমরা শুধু নারী শিক্ষক দ্বারাই পাঠদান করি। পরিবেশটাকে একেবারে আশঙ্কামুক্ত রাখছি। শিক্ষাবান্ধব নিরাপদ পরিবেশ দিচ্ছি। অভিভাবকদের সম্পূর্ণ চিন্তামুক্ত রাখতে চেষ্টা করছি। একজন মেয়েকে আদর্শ মা হিসেবে গড়ে তোলাই মাদরাসাতুন নাহদার লক্ষ্য। যিনি একটি পরিবারের নেতৃত্ব দেবেন, একটি সভ্যসমাজ গড়ে তুলবেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। যার হাত ধরে এগিয়ে যাবে পরিবার, সমাজ ও দেশ।