লোকমান হাকিম নামেই তিনি পৃথিবীব্যাপী পরিচিত। সেসময় লোকেরা তাকে হাকিম নামে জানত। তার মুখ থেকে প্রজ্ঞাপূর্ণ কথা বের হতো বলেই তাকে হাকিম বলা হতো। তার কথা ছিল অর্থবহ। তার কথা চুম্বকের মতো মানুষকে আকর্ষণ করত। তার নামে কোরআনে একটি সুরা রয়েছে। তিনি কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন।
মুহাম্মদ বিন জারির আত-তাবারি (রহ.), ইমামদুদ্দিন বিন কাসির (রহ.) ও আবুল কাসেম আস-সুহাইলি (রহ.) প্রমুখ বিখ্যাত ইতিহাসবেত্তার মত এই যে, বিখ্যাত লোকমান হাকিম আফ্রিকি বংশের লোক ছিলেন এবং একজন ক্রীতদাসরূপে আরবে এসেছিলেন। তার নাম লোকমান বিন আনকা বিন সাদুন। (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা লোকমানের ১২ নং আয়াতের ব্যাখ্যা দ্রষ্টব্য)
জাবির (রা.) লোকমান হাকিমের দৈহিক বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘তিনি ছিলেন খর্বাকৃতির, ঠোঁট দুটি ছিল মোটা এবং তিনি নাওবা গোত্রের লোক ছিলেন।’ (আল-বিদায়া ওয়ান-নিহায়া, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ১২৪)
সাইদ বিন মুসাইয়িব (রা.) বলেন, ‘লোকমান ছিলেন সুদান-মিসরীয় বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গ। ছিলেন প্রজ্ঞাবান। ওষ্ঠাধর ছিল অত্যন্ত পুরু এবং তিনি নবি ছিলেন না।’ (আহকামুল কোরআন, মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহ আল-আন্দালুসি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ২৮৬)
লোকমান হাকিম নবি ছিলেন কিনা সে ব্যাপারে মতানৈক্য রয়েছে। ইবনে আব্বাস (রা.), জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) এবং সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব (রা.)-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে সুফিয়ান সাওরি (রহ.) বলেন, ‘তিনি নবি নন; বরং আল্লাহর একজন সৎ বান্দা ছিলেন।’
অধিকাংশ আলেম বলেন, ‘লোকমান ছিলেন প্রজ্ঞাবান ও আল্লাহর ওলি। তিনি নবি ছিলেন না। আল্লাহতায়ালা কোরআনে তার কথা উল্লেখ করেছেন এবং তার প্রশংসা করেছেন।’ (কাসাসুল কোরআন, খণ্ড: ৮, পৃষ্ঠা: ১৬)
লোকমান হাকিম নিজের ছেলেকে বেশ কিছু উপদেশ দিয়েছিলেন। সেগুলো আল্লাহতায়ালা কোরআনে বর্ণনা করেছেন। এখানে ১০টি উপদেশ তুলে ধরা হলো—
১. আল্লাহর সঙ্গে শরিক (অংশীদারিত্ব) সাব্যস্ত না করা: পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘হে ছেলে, আল্লাহর সঙ্গে শরিক করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহর সঙ্গে শরিক করা মহা অন্যায়।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৩)
২. পিতা-মাতার সঙ্গে সদাচার: ‘আর আমি মানুষকে তার মাতা-পিতার সঙ্গে সদ্ব্যবহারের জোর নির্দেশ দিয়েছি। তার মাতা তাকে কষ্টের পর কষ্ট করে গর্ভে ধারণ করেছে। দুই বছরে তার দুধ ছাড়ানো হয়। নির্দেশ দিয়েছি যে আমার প্রতি ও তোমার মাতা-পিতার প্রতি কৃতজ্ঞ হও। অবশেষে আমারই কাছে ফিরে আসতে হবে।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৪)
৩. অন্যায়-অপরাধ থেকে বিরত থাকা: ‘হে বৎস, কোনো বস্তু যদি সরিষার দানা পরিমাণও হয় অতঃপর তা যদি থাকে প্রস্তরগর্ভে অথবা আকাশে অথবা ভূগর্ভে, তবে আল্লাহ তাও উপস্থিত করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ গোপন-ভেদ জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৬)
৪. নামাজ আদায়: ‘হে বৎস, নামাজ কায়েম করো।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৭)
৫. সৎ কাজের আদেশ ও মন্দ কাজের নিষেধ: ‘সৎ কাজে আদেশ দাও, মন্দ কাজে নিষেধ করো।’ (প্রাগুক্ত)
৬. বিপদে ধৈর্যধারণ: ‘বিপদাপদে সবর করো। নিশ্চয়ই এটা সাহসিকতার কাজ।’ (প্রাগুক্ত)
৭. মানুষকে অবজ্ঞা না করা: ‘অহংকারবশে তুমি মানুষকে অবজ্ঞা করো না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)
৮. অহংকার না করা: ‘পৃথিবীতে গর্বভরে পদচারণ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ কোনো দাম্ভিক অহংকারীকে পছন্দ করেন না।’ (সুরা লোকমান, আয়াত: ১৮)
৯. বিনয়ী হওয়া: ‘পদচারণে মধ্যবর্তীতা অবলম্বন করো।’ (প্রাগুক্ত)
১০. মানুষের সঙ্গে নিচু কণ্ঠে আকর্ষণীয়ভাবে কথা বলা: ‘কণ্ঠ নিচু করো। নিঃসন্দেহে গাধার স্বরই সর্বাপেক্ষা অপ্রীতিকর।’ (প্রাগুক্ত)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক