ইসলাম পরিপূর্ণ ও পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। শরিয়ত (আইন বা বিধান), তরিকত (পদ্ধতি বা নিয়ম), মারেফত (জানা বা আলো) ও হাকিকত (সত্য বা বাস্তব) হচ্ছে ইসলামি জীবনবিধানের এক একটি বিশেষ পদ্ধতি। আরবের প্রাচীন আইনগুলো মানুষের মনের অজ্ঞাতসারে ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছিল। মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে কোরআন নির্দেশিত পথে আইনের বিকাশ হয়। এই আইন যুগোপযোগী করে প্রকাশিত হয় ইমাম ও সুফিদের মাধ্যমে। প্রাক ইসলামি যুগে লিখিত কোনো আইন ছিল না। যেগুলো ছিল, তা অনিশ্চিত ছিল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে নবুয়াতপ্রাপ্তির পর আল্লাহর ইচ্ছায় মুসলিম আইনগুলো নির্দিষ্ট করে দেন।
চারটি পর্যায়ে আইনগুলো প্রণীত হয়। সেগুলো হলো, প্রথম যুগ—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর হিজরতের পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সময়টা ছিল মুসলিম আইনের প্রথম যুগ। এটার নাম ছিল ‘বিধান প্রবর্তনের যুগ’। দ্বিতীয় যুগ—রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর সাহাবিদের থেকে তাবেয়িদের পর্যন্ত দ্বিতীয় যুগ। তৃতীয় যুগ— উমাইয়াদের পর থেকে আব্বাসীয়দের সময়টা তৃতীয় যুগ। চতুর্থ যুগ—হিজরি তৃতীয় শতাব্দী বা চার ইমামের পর থেকে চতুর্থ যুগ শুরু হয়। ইসলামি আইনের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর নির্দেশ ও রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ মোতাবেক মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করা। মুসলিম আইনের প্রধান উৎস চারটি—কোরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস।
আইনের প্রথম উৎস কোরআন : কোরআন মানবজাতির সঠিক পথপ্রদর্শক। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর আরবি ভাষায় নাজিল হয়। কোরআন আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট সংবিধান। ইসলামি আইনের অন্যতম প্রধান উৎসরূপে এর বিধিনিষেধ স্বীকৃত হয়েছে। ইসলামকে জানতে হলে কোরআনের মাধ্যমে জানতে হবে। কোরআনের আধ্যাত্মিক বিষয়গুলো সুফিদের মাধ্যমে বেশি প্রকাশ ও প্রচার হয়েছে। কোরআনকে জানতে হলে বুঝতে হলে ইমাম ও সুফিদের অনুসরণ করা একান্ত কর্তব্য।
আরও পড়ুন : নামাজে শরীরের কতটুকু অংশ ঢেকে রাখতে হয়?
আইনের দ্বিতীয় উৎস হাদিস: ইসলামি আইনের দ্বিতীয় উৎস হাদিস। হাদিসকে কোরআনের ভাষ্য বলা হয়। কোরআনে ইসলামি আইন-কানুন ও জীবনব্যবস্থার মূলনীতি এবং আয়াতগুলোর ইঙ্গিত থাকলেও এগুলোর সঠিক ব্যাখ্যা হাদিস ছাড়া জানা সম্ভব নয়। হাদিস হলো মুসলিম আইনের নির্ভরস্থল এবং কোরআনের পরিপূরক। কোরআন সম্পর্কে বিস্তৃতভাবে আলোচিত হয় হাদিসে। কোরআনের আয়াতগুলো সর্বসাধারণের মধ্যে সাবলীল ভাষায় ব্যাখ্যা করা হয় হাদিসের মাধ্যমে।
ইজমা: ইসলামের আইনে তৃতীয় উৎস ইজমা। কোনো বিশেষ যুগে কোনো বিশেষ প্রশ্নে মুসলিম আইনজ্ঞদের ঐকমত্যকে আইনের পরিভাষায় ইজমা বলে। এর দুটি তাৎপর্য রয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর মুসলিম রাষ্ট্রের বিস্তৃতির ফলে নবোদ্ভূত অনেক সমস্যা দেখা যায়, যা কোরআন-হাদিস নিয়ে সমাধা হয় না। ফলে মুসলিম সমাজ কোরআন হাদিসের শিক্ষার ভিত্তিতে স্বাধীন চিন্তায় ইজমার প্রয়োজন অনুভব করে। ইজমা তিনটি উপায়ে নির্ধারিত হয়—কথা, কাজ ও নীরবতায়।
কিয়াস: কিয়াস ইসলামি আইনের চতুর্থ উৎস। চিন্তার মাধ্যমে নতুন সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া হলো কিয়াস। যে প্রশ্নে কোরআন-হাদিস নিশ্চুপ এবং ইজমাতেও সমাধান নেই, সেই প্রশ্নের সমাধানকল্পে সব সুন্নি মাজহাব যে উৎসের আশ্রয় গ্রহণ করেন, তাকে কিয়াস বলা হয়।
আরও কিছু বিষয়কেও ইসলামি আইনের উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হয়, সেগুলো হলো—
ইজতেহাদ: ইসলামি জীবনব্যবস্থার পঞ্চম উৎস ইজতেহাদ। ইজতেহাদ অর্থ গবেষণা করা। ইসলামি পরিভাষায় শরিয়তের কোনো নির্দেশ সম্পর্কে সুষ্ঠু জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে সর্বাঙ্গীণ চেষ্টা ও সমাধানের নাম ইজতেহাদ। সাধারণ লোকের চিন্তাধারায় ইজতেহাদ হয় না। পবিত্র কোরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে কিয়াস প্রয়োগ করে ইজতেহাদ করতে হয়।
ইসতিহসান: পরবর্তী শতাব্দীতে কোনো বিধান কিয়াসের চাহিদা থেকে পৃথক হলে তাকে ইসতিহসান বলা হতো। ইসতিহসান অর্থ বিচার-বিবেচনায় যা মঙ্গলজনক। কিয়াসের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান কঠিন মনে হলে জনসাধারণের সাহায্যের জন্য ইসতিহসান করা হয়।
ইসতিসলাহ: ইসতিহসানের থেকে সহজ ইসতিসলাহ। ইসতিসলাহ অর্থ জনকল্যাণ। এটা জনসাধারণের কল্যাণে সমস্যা সমাধানের সহজ মাধ্যম।
ইসতিদলাল: যেসব পুরোনো ধর্মের আইনগুলো কোরআনে বাতিল ও হাদিসে নিষেধ ঘোষণা করা হয়নি, তার ওপর নির্ভর করে যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তা ইসতিদলাল। ইসতিদলাল হলো যুক্তি নির্ণীত সিদ্ধান্ত বা দলিল।
আরও পড়ুন : স্বপ্নে কিয়ামত হতে দেখলে কী হয়?
ইসতিসহাব: এটি যুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে শরিয়তের বিধান নির্ধারণের একটি প্রক্রিয়া। এর অর্থ যোগসূত্রের সন্ধান।
আইন হলো একটি জাতি পরিচালনা ও অগ্রগতির স্বচ্ছ দর্শনস্বরূপ। সমাজ ও জাতির প্রয়োজনে মানব রচিত আইন উদ্ভূত হয়। এটা সর্বজনবিদিত—আরব ভূমিতেই ইসলামি আইনের জন্ম এবং আরবের ফকিহ, সুফিরা বিভিন্ন দেশে এর বিকাশ সাধন করেন। ফয়েজপ্রাপ্ত ও বেলায়েতপ্রাপ্ত সুফিরা সমগ্র বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলায় ইসলামি আইনের উৎস প্রকাশ করেছেন।
যার মাধ্যমে মানুষ আত্মশুদ্ধি লাভ করে সঠিক পথে পরিচালিত হয়েছে ও হচ্ছে। এই আইনের উৎসগুলো রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মূল আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অগ্রসর হয়েছে। কোরআন দিয়েছে প্রস্তাবনা ও আদর্শ, হাদিস দিয়েছে ব্যাখ্যা। সেই প্রস্তাবনা ও ব্যাখ্যার ওপর ভিত্তি করে রচিত হয়েছে ইসলামি আইনের উৎস। প্রত্যেক মানুষের দরকার এই আইনের মাধ্যমে জীবনকে অতিবাহিত করা এবং এ প্রসঙ্গে সুফিবাদের সম্পর্ককে নিগূঢ়ভাবে জানা।
লেখক: গবেষক ও অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষিক