বিশ্বমানবতার মুক্তির দূত রাসুলুল্লাহ (সা.) মানবজাতির আলোকবর্তিকা। তিনি উত্তম আদর্শের জনক। মহান চরিত্রের অধিকারী। পবিত্র সভ্যতার অধিপতি। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য রাসুলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সুরা আজহাব, আয়াত: ২১)। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছিলেন ন্যায়, সততা ও সাম্যের মূর্ত প্রতিচ্ছবি। তিনি মানুষের জন্য সর্বোচ্চ অনুসরণযোগ্য ব্যক্তি। তাঁর মহত্তম জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে রয়েছে উত্তম আদর্শ।
সারা দিন চলার পথে, কাজ-কর্মে কত মানুষের সঙ্গে আমাদের সাক্ষাৎ হয়। একজন মুসলিম হিসেবে অপর ভাইয়ের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ কেমন হওয়া উচিত, নবিজি (সা.) সেটা আমাদের শিখিয়েছেন। তিনি শিখিয়েছেন একজন মুসলিম অপর ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করবে। এই হাসিমুখে সাক্ষাৎ করাটা সদকা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রতিটি ভালো কাজ সদকা। আর গুরুত্বপূর্ণ একটি ভালো কাজ হলো অপর ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করা।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৭০)। আরেক হাদিসে নবিজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমার ভাইয়ের (সাক্ষাতে) মুচকি হাসাও একটি সদকা।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৯৫৬)। হাসিমুখে সাক্ষাৎ করলে ব্যক্তি খুশি হয়। এতে আল্লাহ তার ওপর সন্তুষ্ট হন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নিজের কোনো মুসলিম ভাইকে খুশি করার জন্য এমনভাবে সাক্ষাৎ করে, যেমনটি সে পছন্দ করে (এর বিনিময়ে) কিয়ামতের দিন আল্লাহতায়ালা তাকে খুশি করবেন।’ (মাজমাউজ জাওয়ায়িদ, হাদিস: ১৩৭২১)
হাসি তাকওয়া ও আল্লাহভীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়। মহান আল্লাহই মানুষের সুখ-দুঃখ প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে হাসিকান্না সৃষ্টি করেছেন। তিনিই মানুষকে হাসান ও কাঁদান। তিনিই এগুলো মানবপ্রকৃতি হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই তিনি হাসান এবং তিনি কাঁদান।’ (সুরা নাজম, হাদিস: ৪৩)
হাসি হচ্ছে একপ্রকার মুখমণ্ডলীয় বহিঃপ্রকাশ–যা সচরাচর মুখের নমনীয় পেশিকে দুই পাশে প্রসারিত করার মাধ্যমে অর্জিত হয়। মুখমণ্ডল ছাড়াও চোখের মধ্যেও হাসির বহিঃপ্রকাশ ফুটে উঠতে পারে। মানুষের হাসি-আনন্দ, সুখ বা মজা পাওয়ার উপলক্ষ হিসেবে হাসির চল আছে।
নবি-রাসুলরাও বেশির ভাগ সময় মুচকি হাসতেন। আল্লাহ বলেন, ‘তার কথা শুনে সুলায়মান মুচকি হাসলেন এবং বললেন, হে আমার পালনকর্তা, আপনি আমাকে সামর্থ্য দিন, যাতে আমি আপনার সেই নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারি, যা আপনি আমাকে ও আমার পিতা-মাতাকে দান করেছেন এবং যাতে আমি আপনার পছন্দনীয় সৎকর্ম করতে পারি এবং আমাকে নিজ অনুগ্রহে আপনার সৎকর্মপরায়ণ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন।’ (সুরা নামল, আয়াত: ১৯)
নবিজি (সা.) বেশির ভাগ সময় মুচকি হাসতেন। আবদুল্লাহ ইবনু হারিস (রা.) থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) সাধারণত মুচকি হাসি দিতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৬৪২)। সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় কথা বলতেন রাসুলুল্লাহ (সা.)। জাবের (রা.) বলেন, ‘আমি যখন ইসলাম গ্রহণ করেছি তখন থেকে আল্লাহর রাসুল (সা.) আমাকে তাঁর কাছে প্রবেশ করতে বাধা দেননি এবং যখনই তিনি আমার চেহারার দিকে তাকাতেন, তখন তিনি মুচকি হাসতেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৩৮২১)
মুচকি হাসা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত। কখনো এই হাসিতে (আওয়াজ ছাড়া) দাঁত প্রকাশ পেলেও কোনো সমস্যা নেই; কিন্তু অট্টহাসি কোনো মুসলিমের মুখে শোভা পায় না। কোনো ব্যক্তি নামাজ অবস্থায় অট্টহাসি দিলে তার অজু নষ্ট হয়ে যায়। হাসির শারীরিক উপকারিতাও রয়েছে। হাসির মাধ্যমে শরীরের রোগ প্রতিরোধ-ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। মানসিক চাপ কমে। ফুসফুস সুস্থ রাখে। রক্ত চলাচল ভালো থাকে। হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়। মন ভালো রাখে। হতাশা দূর হয়। সুতরাং আমাদের সবার সুন্নত মেনে হাসিমুখে কথা বলা উচিত।
লেখক : সহ-সম্পাদক, কালান্তর প্রকাশনী
, , ,