দাওয়াত ও তাবলিগ ইসলামের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আল্লাহতায়ালা সব নবি-রাসুলকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন এ কাজের দায়িত্ব দিয়ে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে উদ্দেশ্য করে আল্লাহ বলেন, ‘হে রাসুল, তোমার প্রতিপালকের কাছ থেকে যা তোমার প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে, তা তাবলিগ বা প্রচার করো।’ (সুরা মায়েদা, আয়াত: ৬৭)
দাওয়াত ও তাবলিগ শুধু দ্বীনি কাজই নয়; বরং এটি নববি দায়িত্ব। ইসলাম ও নববি দায়িত্ব সঠিক পন্থায় পালন এবং প্রচারের ক্ষেত্রে আলেমদের বিকল্প নেই। আলেম হলো, যারা কোরআন-হাদিস ও ইসলাম ধর্মের প্রতিটি খুঁটিনাটি বিষয়ে গভীর জ্ঞানের অধিকারী। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তাদেরই আলেম বলা হয়, যারা দীর্ঘসময় মাদরাসায় প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো ও সিলেবাসের আলোকে কোরআন-হাদিস ও ফিকহের জ্ঞান অর্জন করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আলেমরা নবিদের উত্তরাধিকারী।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৬৪১)
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে মানুষকে আলেম বা জ্ঞানীদের শরণাপন্ন হতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যদি না জান, তা হলে তোমরা আল্লাহর কিতাব সম্পর্কে যারা অবগত, তাদের জিজ্ঞেস করো।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ৪৩)
ইসলাম প্রচারের বিষয়টি হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন দাওয়াত ও তাবলিগের এ রূপরেখার প্রতিষ্ঠাতা দারুল উলুম দেওবন্দের সন্তান মাওলানা ইলিয়াস (রহ.)। দাওয়াত ও তাবলিগ যেহেতু দ্বীনি কাজ, তাই এ কাজ শুরুর আগে তৎকালীন আলেমদের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন তিনি। কোনো সাধারণ মানুষ বা সাধারণ শিক্ষিত-পণ্ডিতের সঙ্গে পরামর্শ করেননি। যখন আলেমদের কাছে তার কাজের ধরন ও পদ্ধতি কোরআন-সুন্নাহ মোতাবেক মনে হয়েছে, তখন তারা অনুমতি দিয়েছেন। তিনি তখন এ কাজ শুরু করেন। পরে তিনি তৎকালীন ভারত উপমহাদেশের গ্রান্ড মুফতি কেফায়াতুল্লাহ (রহ.), সাইয়েদ হুসাইন আহমাদ মাদানি (রহ.), শাহ আব্দুল কাদির রায়পুরি (রহ.), শাইখুল হাদিস জাকারিয়া (রহ.), আশরাফ আলি থানভি (রহ.), শিব্বির আহমাদ উসমানি (রহ.), মুফতি শফি (রহ.) প্রমুখ আলেমের সঙ্গে প্রতিটি পদে পদে পরামর্শ করেছেন এবং তাদের পরামর্শ মেনে কাজ করেছেন। এ কাজের সুমহান বাণী পৌঁছে দিয়েছেন পৃথিবীর শহর-নগর, পাড়া-মহল্লা ও অলি-গলিতে।
আরও পড়ুন: হাসবুনাল্লাহু ওয়া নিমাল ওয়াকিল কখন পড়বেন
ছোট-বড় যেকোনো সংগঠনের আলাদা অফিস থাকে। কিন্তু দাওয়াত ও তাবলিগের এ বিশাল কার্যক্রম পরিচালনার আলাদা কোনো অফিস নেই। এ কাজের মূল অফিস এবং কেন্দ্র পৃথিবীর প্রতিটি মসজিদ। মসজিদকে কেন্দ্র করেই সারা বিশ্বে এ কাজ চলমান রয়েছে। আর বিবেকমান ব্যক্তিমাত্রই এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য যে, আলেমদের তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো মসজিদ সঠিক পন্থায় চলতে পারে না। তেমনি মসজিদভিত্তিক কাজও আলেমদের তত্ত্বাবধান ছাড়া চলতে পারে না। এ কাজের প্রতিষ্ঠাতা ইলিয়াস (রহ.) নিজে এ কাজের ক্ষেত্রে আলেমদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘উলামায়ে কেরাম যদি তোমাদের কাজের প্রতি আকৃষ্ট হন, তা হলে তাদেরকে মুরব্বি হিসেবে পৃষ্ঠপোষকতার জন্য আবেদন জানাবে এবং তাদের প্রতি দ্বীনি আদব ও সম্মান বজায় রেখে নিজেদের কথাগুলো তাদের সামনে তুলে ধরবে। আহলে ইলম (জ্ঞানী) ও আহলে জিকির (আল্লাহকে স্মরণকারী) তাবলিগ আপন করে নিলেই এ কাজ পূর্ণতা পাবে।
১৯২৪ সাল থেকে আজ প্রায় শত বছর যাবৎ দ্বীনের এ মহান কাজকে আলেমরা নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে পরম যত্নে তা পূর্ণতায় পৌঁছাতে সহায়তা করেছেন। মুফতি যাইনুল আবেদিন, মাওলানা কারি জহির, মাওলানা উমর পালনপুরি, মাওলানা উবাইদুল্লাহ বালয়াবি, মাওলানা মনজুর নুমানি, মাওলানা আবুল হাসান আলি নদভি, মাওলানা সলিমুল্লাহ খান, মাওলানা ফখরুল হাসান (রহ.)সহ বিশ্বের বড় বড় আলেম ও বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠগুলো তাবলিগের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে। বর্তমানেও দারুল উলুম দেওবন্দ, মাজাহিরুল উলুম সাহারানপুর, দারুল উলুম করাচি, নিউ টাউন করাচি, ঢাবেল, হাটহাজারি, পটিয়া, লালবাগ, ফরিদাবাদ, ইউনুসিয়া ও নুরিয়াসহ বিখ্যাত সব দীনি প্রতিষ্ঠান ও বিশ্বের বড় বড় আলেমের প্রায় সবাই এ কথা বিশ্বাস করেন, দাওয়াত ও তাবলিগ আলেমদের তত্ত্বাবধানেই নিরাপদ। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী ও সাধারণ মানুষ সবাই এ কাজের সঙ্গে যুক্ত হবে, সময় দেবে। তবে আলেমদের পরামর্শ মেনে চলবে। তাদের নেতৃত্বে চলবে। এতে আছে জীবনের কল্যাণ ও জান্নাতে যাওয়ার সহজ পথ।
ইসলামের প্রতিটি কাজই কোরআন ও সুন্নাহর ওপর নির্ভরশীল। আলেমদের তত্ত্বাবধান ছাড়া কোনো ধর্মীয় কাজ পরিচালিত হলে সেখানে কোরআন-হাদিস পরিপন্থি কাজ হওয়ার আশঙ্কা থাকে অনেক বেশি। সেখানে ইসলামবিরোধী কাজ হয়। কুসংস্কার প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন নতুন নিয়ম-পদ্ধতির সংযোজন হয়। যা এক সময় মানুষকে জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়।
প্রচলিত তাবলিগের সূচনা হয়েছে হজরত ইলিয়াস (রহ.)-এর হাতে। তিনি একজন আলেম। তাবলিগের বিশ্বব্যাপী জমায়েতকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের বিশ্ব ইজতেমার শুরু থেকে সবসময় এর নেতৃত্ব ও দায়িত্বের মূলে ছিলেন একজন আলেম। আলেমের তত্ত্বাবধান ও নেতৃত্বে ইজতেমা যতটা নিরাপদ, অন্য কারও বেলায় তেমন নয়। আলেমরা নবিদের উত্তরাধিকার। তাদের প্রতি থাকে আল্লাহর দয়া ও রহমত। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘যাকে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও বিচারশক্তি দেওয়া হয়েছে, তাকে অনেক কল্যাণ দেওয়া হয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৯)
লেখক: মিডিয়া সমন্বয়ক, শুরায়ি নেজাম, তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ