৫৭০ সাল এক নতুন ভোরের আগমনি বার্তা
৫৭০ সাল ছিল এক অন্ধকার রাতের শেষে নতুন ভোরের আগমনি বার্তা। যা ইসলামের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা হিসেবে চিহ্নিত। এটি শুধু ইসলামের জন্য নয়, বরং পুরো মানবতার জন্য একটি নতুন দিশার সূচনা ছিল। মক্কার কোরাইশ গোত্রের হাশিমি বংশে, আব্দুল্লাহ ইবনে আব্দুল মুত্তালিব এবং আমেনা বিনতে ওয়াহাবের ঘরে জন্মগ্রহণ করেন বিশ্বনবি মুহাম্মদ (সা.)। তার জন্মের সময়েই এমন কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছিল, যা ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর প্রভাব রেখে যায়।
এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত
৫৭০ সালে যে ঘটনা অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য, তা ছিল ঈলফিলের বছর বা অ্যাম ইয়ার। যা ইসলামের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এ বছর ইথিওপিয়ার শাসক আব্রাহা তার বিশাল হাতির বাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেছিল। তার উদ্দেশ্য ছিল কাবাঘর ধ্বংস করে মক্কায় ধর্মীয় শাসন প্রতিষ্ঠা করা। আব্রাহা বিশাল বাহিনী নিয়ে মক্কার দিকে অগ্রসর হয়, কিন্তু আল্লাহর বিশেষ রহমতে তার আক্রমণ একেবারে ব্যর্থ হয়ে যায়। আল্লাহতায়ালা আবাবিল নামে পাখি পাঠিয়ে আব্রাহার বাহিনীর ওপর পাথর নিক্ষেপ করেন। ফলে তারা পরাজিত হয় ও মক্কা শহর নিরাপদ থাকে।
এ ঐতিহাসিক ঘটনা কোরআনের সুরা ফীলে বর্ণিত হয়েছে, যা ইসলামিক শিক্ষা এবং বিশ্বাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সুরা ফীলে আল্লাহতায়ালার রহমত ও মক্কার সুরক্ষা বর্ণনা করা হয়েছে, যা মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত পুণ্যময়। এটি আল্লাহর অসীম শক্তি এবং তার প্রার্থিত গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য নিখুঁত পরিকল্পনার একটি উদাহরণ।
নবিজি (সা.)-এর জন্মের প্রেক্ষাপট
বিশ্বনবি মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের প্রেক্ষাপট ছিল এক ভীষণ প্রতিকূল সময়। মক্কার ধর্মীয় ও সামাজিক পরিস্থিতি ছিল একদম অন্ধকারাচ্ছন্ন, যেখানে মানুষ বিভিন্ন ধর্মীয় বিশ্বাসে বিভক্ত ছিল এবং সামাজিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত অস্থির। তবে নবিজি (সা.)-এর জন্মের সাথে সাথে পৃথিবীতে এক নতুন দিশা আসে, যা পুরো মানবজাতির জন্য আলোকবর্তিকা হয়ে ওঠে। ইসলামের মর্মবাণী, একত্ববাদ এবং মানবতার মূলনীতি বিশ্বকে এক নতুন পথের দিকে পরিচালিত করতে শুরু করে।
নবিজি (সা.)-এর জীবন ও শিক্ষা মানুষকে অঙ্গীকারবদ্ধ করেছিল মানবাধিকার, ন্যায়, শান্তি এবং সমবেদনার পথে। তার জন্ম কেবল একটি ব্যক্তিগত ঘটনা নয়, বরং এটি এক মহৎ আন্দোলনের সূচনা ছিল, যা পরবর্তী যুগে বিশ্বজুড়ে সমাজ ও ধর্মীয় মানদণ্ডকে পাল্টে দেয়। ইসলাম শুধু একটি ধর্ম নয়, এটি মানুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এটি একটি সামাজিক ও নৈতিক আদর্শ প্রদান করে, যার মাধ্যমে মানুষকে আধ্যাত্মিক উন্নতির দিকে পরিচালিত করা হয়।
নবিজি (সা.)-এর জন্মের পরবর্তী ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া
নবিজি (সা.)-এর জন্মের পর এক ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া প্রকাশ পায়। সহিহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, জন্মের সময় বিশ্বনবির মায়ের পেট থেকে এমন একটি নূরের বিচ্ছুরণ ঘটেছিল, যার আলোতে পূর্ব থেকে পশ্চিম দিগন্ত পর্যন্ত সবকিছু আলোকিত হয়ে গিয়েছিল। কোনো কোনো বর্ণনায় পাওয়া যায়, বিশ্বনবি (সা.) যখন ভূমিতে আবির্ভূত হলেন, তখন উভয় হাতের ওপর ভর দিয়েছিলেন। অতঃপর এক মুষ্টি মাটি নিয়ে আকাশের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন। (মাওয়াহিবে লাদুন্নিয়া)
হজরত ইরবাজ ইবনে সারিয়া (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মানিত মা রসুলুল্লাহ (সা.)-এর শুভজন্মক্ষণে এক নূর দেখেন, যার মাধ্যমে সিরিয়া এলাকার প্রাসাদগুলো উজ্জ্বলভাবে দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। (মাজমাউ যাওয়ায়েদ ৮২২২)
মহানবির জন্মে ঐতিহাসিক প্রতিক্রিয়া
মহানবির জন্মমুহূর্তে একদিকে পৃথিবীতে নবুয়তের সূর্যোদয়, অপরদিকে পারস্য সম্রাট কিসরার রাজপ্রাসাদে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়। এই ভূমিকম্পের দরুন রাজপ্রাসাদের ১৪টি গম্বুজ ভেঙে গুঁড়িয়ে যায়। পারস্যের এক অগ্নিকুণ্ড, যা এক হাজার বছরব্যাপী বিরতিহীনভাবে জ্বলছিল, তা সেই শুভ মুহূর্তে হঠাৎ নিভে যায়। সাওয়াহ নামক এক নদীতে যথারীতি পানি প্রবাহিত হচ্ছিল, নবির আগমন মুহূর্তে হঠাৎ তার অথৈ জলরাশি শুকিয়ে যায় (সিরাতে মুস্তফা ১৬৯)। এটি ছিল অগ্নিপূজাসহ সব ভ্রান্তির অবসানের ইঙ্গিত।
নবিজি (সা.)-এর জন্মের মহিমা
হজরত আবু উমামা (রা.) থেকে বর্ণিত, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তোমাদের আমার প্রাথমিক বিষয় সম্পর্কে বলছি। আমি হলাম ইবরাহিম (আ.)-এর দোয়া ও ঈসা (আ.)-এর সুসংবাদ। আমার মায়ের স্বপ্ন, যা তিনি আমাকে প্রসব করার সময় দেখেছিলেন তা হলো, এমন এক নূর উদ্ভাসিত হয়েছে, যার মাধ্যমে আমার আম্মাজানের জন্য সিরিয়ার প্রাসাদও উজ্জ্বল হয়েছিল।’ (দালায়েলুন নবুওয়াত লিল-বায়হাকি, পৃ.৩৫)
৫৭০ সাল, নবিজি (সা.)-এর জন্মের বছর, ইসলামের ইতিহাসে একটি অমূল্য রত্ন হয়ে থাকবে। আল্লাহতায়ালার রহমত ও নবিজি (সা.)-এর নেতৃত্বে ইসলাম শান্তি, ন্যায় এবং মানবতার এক নতুন পথ প্রদর্শন করেছে।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক