আরবের মরুপ্রান্তরের কোরাইশ বংশের আব্দুল্লাহ ও আমেনার ঘরে এক অমূল্য রত্নের আবির্ভাব ঘটে, যিনি মানবতার মুক্তির আলো হয়ে পৃথিবীতে আগমন করেন। তিনি হলেন হজরত মুহাম্মদ (সা.), যিনি পরবর্তী সময়ে ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’ (বিশ্বের জন্য রহমত) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশবকাল ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যা ইসলামের ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আরবদের ঐতিহ্য অনুযায়ী, নবজাতক শিশুর জন্মের পর প্রাথমিক দুগ্ধপান এবং লালন-পালনের জন্য তাকে গ্রামীণ, নির্মল এবং কোলাহলমুক্ত পরিবেশে পাঠানো হতো, যাতে শিশু সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে পারে। সেই অনুযায়ী, শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে বনু সাদ গোত্রের এক দুধমায়ের কাছে পাঠানো হয়। তাঁর নাম ছিল হালিমা সাদিয়া (রা.), যিনি ৫৭১ সালে নবী মুহাম্মদ (সা.)-কে লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশবের যত্ন ও প্রতিপালনে হালিমা সাদিয়া (রা.)-এর পরিবারের অবদান ছিল অপরিসীম। তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিশেষ করে তাঁর কন্যা সায়মা নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে যথাযথ যত্নে লালন-পালন করেছিলেন। সায়মা নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে গোসল করানো, হাঁটাতে নিয়ে যাওয়া এবং অন্য শৈশবীয় কার্যাবলিতে সাহায্য করতেন।
নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর দুধপান প্রক্রিয়াটি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং গভীরভাবে ভাবনার বিষয়। নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে শিশুকালে তিনজন নারীর দুধ পান করানো হয়। জন্মের পর প্রথম তিন-চার দিন তাঁর মাতা আমিনা দুধ পান করিয়েছিলেন। কিন্তু শোকে বিধ্বস্ত আমিনার বুকে দুধের স্বল্পতা দেখা দেয়। এর পর আবু লাহাবের আজাদকৃত দাসি সুয়াইবিয়া তাঁকে এক সপ্তাহ দুধ পান করান। এর পর হালিমা সাদিয়া (রা.)ই নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে প্রতিপালন করেন।
আরও পড়ুন : পৃথিবীতে মহানবির (সা.) ৬৩ বছর—১ কী ঘটেছিল ৫৭০ সালে?
হালিমা (রা.)-এর সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হলো, নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে গ্রহণের পর তাঁর পরিবারে আশ্চর্যজনকভাবে বরকত দেখা দেয়। তাঁদের জীবনে অভাব দূর হয়ে যায় এবং পশুদের দুধসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয়তার ক্ষেত্রেও উন্নতি হয়। এমনকি দুর্ভিক্ষের সময়েও তাঁরা কষ্টের সম্মুখীন হননি, যা দেখে আশপাশের মানুষ ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়েছিল। হালিমা (রা.) নিজেই বলেন, ‘শিশু মুহাম্মদ (সা.)-কে কোলে নেওয়ার পর আমার বুকে দুধ পূর্ণ হয়ে উঠল এবং তিনি পরিতৃপ্ত হয়ে দুধ পান করলেন। এর পর তাঁর দুধভাইও তৃপ্তির সাথে দুধ পান করলেন।’ শিশুনবি মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিবি হালিমার গৃহে অবস্থান করেন পাঁচ বছর।
এ ছাড়া, সুওয়াইবা এবং অন্য নারীরা, যারা নবি মুহাম্মদ (সা.)-কে দুধ পান করিয়েছিলেন, তাদেরও তাৎপর্যপূর্ণ অবদান ছিল। সুওয়াইবা ছিলেন এক মুসলিম দাসী, যিনি নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মের পর তাঁকে দুধ পান করান এবং তাঁর মাতৃস্নেহে ভরা অবদান ইতিহাসে চিরকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
দুধমাতা হালিমা (রা.)-এর দুধপান সূত্রে নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর বেশ কিছু দুধভাই ও বোন ছিলেন। তারা ছিলেন হালিমার সন্তান আনিসা, হুজাইফা, সায়েমা ও আবদুল্লাহ এবং সুওয়াইবার অন্যান্য দুধপুত্র ও দুধপুত্রী। যেহেতু সুওয়াইবা নবি মুহাম্মদ (সা.)কে দুধ পান করিয়েছিলেন, তাই অন্যান্য দুধভাইয়ের সঙ্গেও তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে। এর মধ্যে হামজা (রা.)-এর অবস্থান ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, যেহেতু তিনি দুই সূত্রে নবি মুহাম্মদ (সা.)-এর দুধভাই ছিলেন।
হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর শৈশবের এই সময়গুলো ইসলামি ইতিহাসে এক অনন্য স্থান অধিকার করে রয়েছে। তাঁদের ত্যাগ, ভালোবাসা এবং যত্ন শিশুটির একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেছে, যা পরে বিশ্বের ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
হজরত হালিমার এসব ঘটনা সিরাতু ইবনি হিশাম গ্রন্থে বর্ণিত আছে। আরও বহু গ্রন্থে রয়েছে এর উল্লেখ। যেমন জালালুদ্দিন সুয়ুতি তার খাসায়িসুল কুবরা (১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৪) গ্রন্থে মুহাম্মদ ইবনু ইসহাক, তাবারানি ও বাইহাকি থেকে বর্ণনা করেছেন। (তাবাকাত, ইবনু সাদ, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা : ২০৪, ২১০; উনুল আসার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা: ৩; ফাতহুল বারি,খণ্ড : ৭, পৃষ্ঠা : ১২৪)
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক