আল্লাহতায়ালা মানবজাতিকে সৃষ্টির পর ফেরেশতাদের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদমকে সিজদা করার জন্য। সবাই সিজদা করেছিলেন, কেবল ইবলিস ব্যতীত। জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় সে তার রবের আদেশ অমান্য করেছিল। আল্লাহতায়ালা এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আর যখন আমি ফেরেশতাদের আদমকে সিজদা করতে বললাম, তখন ইবলিস ছাড়া সবাই সিজদা করল। সে ছিল জিনদের অন্তর্ভুক্ত। সে তার রবের আদেশ অমান্য করল। অথচ তোমরা তাকে এবং তার বংশধরকে আমার পরিবর্তে অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করেছ। জালিমদের জন্য রয়েছে নিকৃষ্টতম প্রতিদান।’ (সুরা কাহফ, ৫০)
জান্নাতে আদম ও হাওয়ার একমাত্র শত্রু ছিল এই ইবলিস। তাদের দুজনকে বিভ্রান্ত করা তার জন্য সহজ হলেও অগণিত বনি আদমকে একা পথভ্রষ্ট করা সম্ভব নয় উপলব্ধি করে সে আল্লাহর কাছে তার বংশধর ও সৈন্যদল বৃদ্ধির প্রার্থনা করে। আখিরাতে তার জন্য কোনো প্রতিদান না থাকায়, আল্লাহতায়ালা তার চাওয়া মঞ্জুর করেছিলেন। শুয়াবুল ঈমান গ্রন্থে বর্ণিত আছে, ইবলিস তখন চারটি ক্ষমতা চেয়েছিল:
১. মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেওয়ার সামর্থ্য।
২. একজন মানুষ জন্মালে দশটি করে শয়তানের জন্ম।
৩. মানুষের রক্তনালিতে প্রবেশের ক্ষমতা ।
৪. মানুষের ওপর বারবার আক্রমণের সুযোগ।
অন্যদিকে, আদম (আ.)-এর প্রার্থনার প্রেক্ষিতে আল্লাহতায়ালা বনি আদমকে তিনটি বিশেষ অনুগ্রহ দান করেন:
১. জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দুই ফেরেশতা হেফাজত করবে।
২. প্রতিটি সৎ কাজের সওয়াব দশগুণ।
৩. মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাওবার দরজা খোলা থাকবে।
কোরআন ও হাদিসের স্পষ্ট বক্তব্য থাকার পরও ইবলিসের বংশধরকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। তবে ইবলিস কীভাবে সন্তানের জন্ম দেয়, সে বিষয়ে বিস্তারিত ও নির্ভরযোগ্য কোনো হাদিস আমাদের কাছে নেই। কিছু সালাফের বর্ণনায় এমন তথ্য পাওয়া যায়, যা কোরআন-হাদিসের সাথে সাংঘর্ষিক না হলেও, বিবেক সেগুলো সহজে গ্রহণ করতে চায় না। উদাহরণস্বরূপ, মুজাহিদ (রহ.) থেকে বর্ণিত, ইবলিসের ডান ঊরুতে পুরুষাঙ্গ এবং বাম ঊরুতে যোনি রয়েছে এবং সে প্রতিদিন দশটি করে ডিম পাড়ে, যা থেকে সত্তরটি করে শয়তান জন্ম নেয়।
ইমাম কুরতুবি (রহ.) বলেন, এ বিষয়ে বিশুদ্ধ সূত্রে সামান্য কিছু হাদিস পাওয়া যায়। সালমান ফারসি (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সর্বপ্রথম যে বাজারে প্রবেশ করে অথবা যে সবার শেষে বাজার থেকে বের হয়, ইবলিস তার মধ্যে ডিম পাড়ে এবং বাচ্চা ফোটায়।’ এই হাদিস থেকে প্রতীয়মান হয় যে, শয়তান ডিম পাড়ে এবং তার ঔরস থেকেই সন্তানের জন্ম হয়। তবে হাদিসের মূল উদ্দেশ্য সম্ভবত এই নয় যে বাজারে প্রথম প্রবেশকারী বা সর্বশেষে বের হওয়া ব্যক্তি ইবলিসের স্ত্রী। বরং এর রূপক অর্থ হতে পারে যে শয়তান এমন ব্যক্তিকে সহজেই কুমন্ত্রণা দিতে ও পথভ্রষ্ট করতে পারে।
ইমাম তাবারি ( রহ.) মুজাহিদ (রহ.)-এর সূত্রে ইবলিসের কিছু সন্তানের নাম উল্লেখ করেছেন, যদিও সেগুলো নবি (সা.) থেকে প্রমাণিত নয়। তবে, হাদিসের গ্রন্থগুলোতে দু-একটি শয়তানের নাম পাওয়া যায়। যেমন- রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, `শয়তান আমার সালাতে বাঁধা সৃষ্টি করেছিল এবং আমার তিলাওয়াতে সংশয় তৈরি করেছিল। এই শয়তানের নাম খানযাব।’
কোরআনের বিভিন্ন স্থানে ইবলিসকে ‘শয়তান’ নামে সম্বোধন করা হয়েছে। হিযবুশ শাইতন অর্থ হলো ইবলিসের দল, পক্ষান্তরে হিযবুল্লাহ হলো আল্লাহর দল। এই দুটি শব্দই কোরআনে বিদ্যমান। ইবলিসের প্রধান সহযোগী হলো তার সন্তান ও বংশধর, যারা মূলত জিন জাতির অন্তর্ভুক্ত। এ ছাড়াও, মানুষ ও অন্যান্য জিন যারা সর্বদা ইবলিসের অনুসরণ করে, তারাও এক সময় তার শক্তিশালী সৈন্যদলে পরিণত হয়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘শয়তান তাদের ওপর প্রবল হয়ে গেছে, ফলে তাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ভুলিয়ে দিয়েছে। তারাই শয়তানের দল। জেনে রাখ, শয়তানের দলই ক্ষতিগ্রস্ত।’ (সুরা মুজাদালাহ,১৯)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক