ইহজগৎ মুমিনের ক্ষণস্থায়ী ঠিকানা। তার চিরন্তন আবাস হলো চিরসুখের জান্নাত। মৃত্যুর পর ইহজাগতিক কর্মফলের ওপর নির্ভর করে কেউ জান্নাতের, কেউ জাহান্নামের অধিবাসী হবে। মৃত্যু এমন চিরন্তন সত্য, যা নাস্তিক, আস্তিক, মুমিন, কাফের; সর্বোপরি পৃথিবীর কেউই অস্বীকার করে না। প্রতিটা মুমিনের একান্ত কামনা—তার মৃত্যু এবং শেষ পরিণতিটা যেন ভালো হয়। কারণ শেষ সময়টাই আল্লাহতায়ালার নিকট সবিশেষ গ্রহণযোগ্য। হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘শেষ আমলই গ্রহণযোগ্য।’ (ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৩৪০) গুরুত্ব দিয়ে কিছু আমল করলে সুন্দর মৃত্যু আশা করা যায়। এমন কতিপয় আমল হলো—
নামাজের প্রতি গুরুত্বারোপ: ইমানের সঙ্গে নামাজের সম্পর্ক খুবই গভীর। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ‘নামাজ’ বুঝাতে ‘ইমান’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ এমন নন যে তোমাদের ইমান তথা নামাজ নষ্ট করে দেবেন।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩)
এ থেকে বোঝা যায় যে, ইমান ও নামাজ পরস্পর আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িত। হজরত জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘(মুমিন) বান্দা এবং কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো নামাজ পরিত্যাগ করা।’ (মুসলিম, হাদিস: ৮২) অর্থাৎ মুমিন নামাজ পরিত্যাগ করে না আর কাফের নামাজ আদায় করে না।
দৃষ্টির হেফাজত করা: মানবজীবনের অধিকাংশ পাপাচার সংঘটিত হয় দৃষ্টির হেফাজত না করার কারণে। এ জন্য আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে নারী-পুরুষের দৃষ্টিকে সংযত রাখতে আদেশ করেছেন। (সুরা নুর, আয়াত: ৩০) দৃষ্টি সংযত রাখলে ইমানের স্বাদ অনুভব করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে আমার ভয়ে স্বীয় দৃষ্টি ফিরিয়ে নেবে, আমি তার মধ্যে এমন ইমান সৃষ্টি করব যে, সে অন্তরে এর স্বাদ অনুভব করবে।’ (তাবরানি, হাদিস: ১০৩৬২)
মিসওয়াক করা: মিসওয়াক প্রিয় নবির খুবই পছন্দনীয় আমল। এর দ্বারা মহান রবের সন্তুষ্টি অর্জিত হয়। হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত, হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মেসওয়াক মুখের পবিত্রতা এবং আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জনের মাধ্যম।’ (নাসায়ি, হাদিস: ০৫)
আল্লাহর সন্তুষ্টিই যদি অর্জিত হয়ে যায়, তা হলে সুন্দর মৃত্যু নিশ্চিতভাবেই আশা করা যায়। ইবনে আবেদিন শামি (রহ.) লেখেন, ‘মেসওয়াকের উপকার ত্রিশের অধিক। এর মধ্যে সবচেয়ে ছোট হলো, তা দ্বারা মুখের দুর্গন্ধ দূর হয়। আর সর্বোচ্চ উপকারিতা হলো মৃত্যুর সময় কালেমা শাহাদাত স্মরণ হয়।’ (ফতোয়ায়ে শামি: ১/২৩৯)
সব সময় অজু অবস্থায় থাকা: অজু অবস্থায় কেউ মৃত্যুবরণ করলে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ হয় বলে হাদিস থেকে প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) একদিন তাকে নসিহত করে বলেন, ‘হে ছেলে! সম্ভব হলে সব সময় অজু অবস্থায় থেকো। মৃত্যুর ফেরেশতা অজু অবস্থায় যার রুহ কবজ করবে, তার জন্য শাহাদাতের মর্যাদা লাভ হয়।’ (ইবনে হিব্বান: ২/১৫৪)
সদকা করা: সদকার মাধ্যমে অপমৃত্যু রোধ হয় এবং সুন্দর মৃত্যু ভাগ্যে জোটে। হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সদকা অপমৃত্যু রোধ করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ৬৬৪) অন্য হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটি সদকা করল এবং এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলো, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২২৮১৩)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ