আমাদের সমাজে পারিবারিক কলহের অন্যতম প্রধান কারণগুলোর মধ্যে একটি হলো মিরাস (উত্তরাধিকার সম্পত্তি) বণ্টনে অযথা বিলম্ব করা। অনেকেই মনে করেন, ত্যাজ্যসম্পদ ভাগ-বণ্টন করাটা বুঝি সৌজন্য পরিপন্থি, পারিবারিক সুসম্পর্কের অন্তরায় বা লজ্জাজনক। ভাইয়ে-ভাইয়ে বা পিতা-পুত্রে আবার ভাগাভাগি কীসের! এক সঙ্গে মিলেমিশে আছি এক সঙ্গেই থাকব। এমন মন্তব্য হরহামেশাই শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এই মনোভাবের কারণে সৃষ্ট যৌথ কারবার ও মিশ্র মালিকানাই পরবর্তী সময়ে মারাত্মক কলহের জন্ম দেয়।
কেন এই বিলম্ব বিপদ ডেকে আনে?
শরিয়তের দাবি হলো, যৌথ কারবারে কে কিভাবে শ্রম দেবে, কার কি পরিমাণ মালিকানা থাকবে এবং কে কি পরিমাণে খরচ করবে সবকিছুই স্পষ্ট থাকতে হবে। কিন্তু যখন ত্যাজ্যসম্পদ বণ্টন করা হয় না, তখন এই স্পষ্টতা থাকে না। প্রাথমিক পর্যায়ে এই বিষয়গুলো সাধারণ মনে হলেও, ধীরে ধীরে এর পরিণতি হয় অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এটি পিতা-পুত্রে, ভাইয়ে-ভাইয়ে, চাচা-ভাতিজায়, এমনকি নিকটতম আত্মীয়দের পরস্পরের মধ্যে বিভাজন ও শত্রুতা সৃষ্টি করে। ছোটখাটো মনোমালিন্য থেকে শুরু হয়ে এই বিরোধ এক সময় বিদ্বেষ, মামলা-মোকদ্দমা এবং চরম পর্যায়ে খুনোখুনি পর্যন্ত গড়াতে পারে। বিজ্ঞজনরা তাই বলেন, তোমরা পরস্পর আচার-আচরণে এমনভাবে থাকো, যেন ভাই-ভাই; কিন্তু লেনদেন এমনভাবে করো, যেন কেউ কাউকে চেনো না।
ইসলাম অস্পষ্ট মালিকানা সমর্থন করে না
ইসলাম এমন অস্পষ্ট যৌথ মালিকানা সমর্থন করে না, যেখানে নিজস্ব সম্পদের পরিমাণ অস্পষ্ট থাকে। পিতা-পুত্র, ভাই-বোন, স্বামী-স্ত্রী প্রত্যেকের মালিকানার হিসাব আলাদা ও চিহ্নিত থাকা আবশ্যক। এর একটি বড় কারণ হলো, ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ বিধান যেমন জাকাত, সাদাকাতুল ফিতর, হজ, কোরবানি ইত্যাদি প্রত্যেকের মালিকানার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সম্পদের হিসাব পৃথক না হওয়ায় অনেকে চিন্তাই করে না যে, শরিয়তের এসব বিধান তার ওপর আরোপিত হয়ে আছে। আবার কারও কারও ক্ষেত্রে জানাও সম্ভব হয় না, তার ওপর এই বিধানগুলো আরোপিত হয়েছে কি না। ফলে তার থেকে আল্লাহর অনেক ফরজ-ওয়াজিব বিধান ছুটে যাওয়ারও আশঙ্কা তৈরি হয়।
সম্মতি ছাড়া সম্পদ ভোগ হারাম
মিরাস বণ্টন করে প্রত্যেকের সম্পদের হিসাব আলাদা না করলে সমুদয় সম্পদে সব ওয়ারিশের যৌথ মালিকানা বহাল থাকে। তাই সেই সম্পদ দিয়ে কেউ কোনো কাজ করতে চাইলে সব ওয়ারিশের অনুমতির প্রয়োজন হয়। কারণ হাদিসে স্পষ্ট উল্লেখ আছে, ‘একজন মুসলিমের সম্পদ তার স্বতঃস্ফূর্ত অনুমতি ছাড়া অন্যের জন্য ভোগ করা হালাল নয়। (মুসনাদু আহমাদ, ২৩৬০৫; মুসনাদু আবি ইয়লা, ১৫৭০; সুনানুদ দারাকুতনি, ২৮৮৯)। আর জানা কথা, সবার অনুমতি নিয়ে কাজ করা সব সময় সম্ভব হয়ে ওঠে না। আবার সব কাজে সবাই সন্তুষ্টও থাকে না। এমতাবস্থায় অনুমতি নিতে গেলে কাজ হয় না, আবার অনুমতি না নিলে তা বৈধও হয় না।
সমাধান
বস্তুত, সৌজন্য পরিপন্থি মনে করে যারা মিরাস সময়মতো বণ্টন করেন না, তাদের দ্বারা যেমন শরিয়তের বিধান লঙ্ঘিত হয়, তেমনি পরবর্তী সময়ে তারা নিজেদের স্বার্থ নিয়ে হানাহানিতে লিপ্ত হয়, মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে পড়ে, পরস্পর মুখ দেখাদেখি বন্ধ করে দেয়; এমনকি খুনোখুনির ঘটনা পর্যন্ত ঘটে। অতএব, ঝামেলা ও অনৈক্য থেকে বাঁচার একমাত্র উপায় হলো যথাসময়ে সম্পদ বণ্টন করে নেওয়া এবং প্রত্যেকের মালিকানার হিসাব-নিকাশ স্পষ্ট রাখা। এটি কেবল শরিয়তসম্মত সমাধানই নয়, বরং পারিবারিক শান্তি ও সুসম্পর্ক বজায় রাখারও একমাত্র পথ।
লেখক : আলেম ও সাংবাদিক