জাহেলি সমাজে নারীরা ছিল সবচেয়ে অবহেলা, বঞ্চনা ও নিপীড়নের শিকার। কন্যাশিশু জন্মগ্রহণকে ভাবা হতো অলক্ষুণে এবং কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়া ছিল আভিজাত্যের পরিচয়। এমন একটি অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজব্যবস্থায় ইসলামের আগমন নারীর অধিকারকে সমুন্নত করেছে। সমাজের বৈষম্য থেকে তাদেরকে মুক্ত করে তাদের মর্যাদাকে পৃথিবীকে জানিয়ে দিয়েছে। তারা মা হিসেবে সম্মানিত হয়েছে, আবার স্ত্রী হিসেবেও মর্যাদার অধিকারিণী হয়েছে।
ইসলাম সাধারণত সব ক্ষেত্রে নারী এবং পুরুষ উভয়ের ন্যায্য অধিকার সাব্যস্ত করেছে। নারী এবং পুরুষকে একে অন্যের পরিপূরক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা তোমাদের পোশাকস্বরূপ আর তোমরা তাদের পোশাকস্বরূপ।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৭)
আল্লাহতায়ালা আরও বলেছেন, ‘নারীদের তেমন ন্যায়সঙ্গত অধিকার আছে, যেমন আছে তাদের ওপর পুরুষদের।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২২৮)
রাসুল (সা.) বিদায় হজের ভাষণে ঘোষণা করেছেন, ‘হে জনতা, তোমাদের নারীদেরকে তোমাদের ওপর কিছু অধিকার দেওয়া হয়েছে। তোমাদেরও তাদের কিছু অধিকার প্রাপ্য রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে নিজেদের সাথি বানিয়েছ এবং তাদের দেহকে আল্লাহর আইন অনুসারে ভোগ করে থাকো। কাজেই নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় কর এবং উত্তম পন্থায় তাদেরকে শিক্ষা-দীক্ষা দান কর। আর তাদের প্রতি সদয় ব্যবহার করবে।’ (ইসলামি তথ্যকোষ, পৃ. ৫৬)
ইসলাম বিশেষ করে যেসব ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মধ্যে পরিপূর্ণ সমতা নিশ্চিত করেছে তার মধ্যে:
১. হালাল-হারামের বিধানে সমতা: জাহেলি যুগের পুরুষরা মনে করত নারীর নিজস্ব কোনো চাওয়া-পাওয়া নেই, কিন্তু দায়িত্ব আছে অনেক। তার মতামত ব্যক্ত করার অধিকার নেই। পুরুষের জন্য যা জায়েজ, নারীর জন্য তা হারাম। নারীর প্রতি বিদ্বেষ ও বৈষম্যমূলক এ আচরণ বর্তমানেও দেখা যায়। কোরআনে তাদের এ বিদ্বেষমূলক আচরণের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তারা বলে, এসব চতুষ্পদ জন্তুর পেটে যা আছে, তা বিশেষভাবে আমাদের পুরুষদের জন্য এবং আমাদের মহিলাদের জন্য হারাম। যদি তা মৃত হয়, তবে তার প্রাপক হিসেবে সবাই সমান।’ (সুরা আনআম, আয়াত : ১৩৯)
২. ইবাদতের ক্ষেত্রে সমতা: জাহেলি যুগের পুরুষরা মনে করত পুরুষের ইবাদত আল্লাহ পছন্দ করেন আর নারীর ইবাদত মূল্যহীন। আল্লাহতায়ালা তাদের এ ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করে পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন, ‘অতঃপর তাদের পালনকর্তা তাদের দোয়া (এই বলে) কবুল করে নিলেন যে, আমি তোমাদের কোনো পরিশ্রমকারীর পরিশ্রমই বিনষ্ট করি না। তা সে পুরুষ হোক কিংবা স্ত্রীলোক। তোমরা পরস্পর সমান।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১৯৫)
৩. আখিরাতের প্রতিদানে সমতা: ইসলাম আখিরাতে নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্য তাদের কর্মফলস্বরূপ পুরস্কার ও শাস্তির সমান ব্যবস্থা রেখেছে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে কেউ অসৎ কাজ করে, তার শাস্তি তদ্রূপ হবে। আর যে কেউ সৎ কাজ করবে সে পুরুষ হোক বা নারী, আর সে মুমিন হলে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং সেখানে তাদেরকে অগণিত রিজিক দেওয়া হবে।’ (সুরা মুমিন, আয়াত: ৪০)
৪. শিক্ষার ক্ষেত্রে সমান অধিকার: জাহেলি সমাজে যখন নারীরা সব ভালো কিছু থেকে ছিল বঞ্চিত, তখন মহানবি (সা.) নারীকে দিয়েছেন শিক্ষার অধিকার। তিনি শুধু পুরুষকে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশ দেন নাই; বরং নারী-পুরুষ উভয় জাতিকে সমানভাবে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরজ।’ (বায়হাকি, ১৬১৪)
৫. বিবাহের সম্মতিতে সমান অধিকার: ইসলাম বিবাহের ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ উভয়ের সম্মতিকে বাধ্যতামূলক করেছে। কারও ওপর জোর করার কিংবা বাধ্য করার অধিকার কাউকে দেওয়া হয়নি। বিশেষ করে নারীর সম্মতির বিষয়ে মহানবি (সা.) বলেন, ‘পূর্ব বিবাহিতাকে তার সুস্পষ্ট অনুমতি না নিয়ে এবং কুমারীকে তার সম্মতি না নিয়ে বিবাহ দেওয়া যাবে না।’ (মুসলিম, ৩৩৬৪)
লেখক: শিক্ষার্থী, আল-হাদিস অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া