বুরায়দা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কবর জিয়ারত করা থেকে নিষেধ করেছিলাম। তবে এখন তোমরা কবর জিয়ারত করো। কারণ কবর জিয়ারত আখেরাতকে স্মরণ করায়।’ (আবু দাউদ: হাদিস নং- ৩২৩৫; ইবনে মাজাহ : হাদিস নং- ১৫৭১)। জীবনের শেষদিকে রাতের শেষ প্রহরে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে যেতেন এবং মৃতদের জন্য দোয়া করতেন। তাঁর এ ঘটনার সাক্ষী আয়েশা (রা.)। আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘প্রতি রাতের শেষদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) জান্নাতুল বাকি কবরস্থানে যেতেন এবং দোয়ায় বলতেন, মুমিনদের বাসস্থানে (কবরস্থান) শান্তি বর্ষিত হোক। তোমাদের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তোমরা তা পেয়েছ। অপেক্ষা করছ আগামী দিনের। আল্লাহর ইচ্ছায় আমরাও আসব। হে আল্লাহ! বাকি গারকাদবাসীকে ক্ষমা করে দিন।’ (মুসলিম : হাদিস নং- ৯৭৪; আবু দাউদ : হাদিস নং- ৩২৩৭।)
রাসুলুল্লাহ (সা.) কবরবাসীদের প্রতি সালাম পেশ করতেন এবং তাদের জন্য দোয়া করতেন। আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) মদিনার কবরবাসীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় এই দোয়া পাঠ করেন—বাংলা উচ্চারণ—আসসালামু আলাইকুম ইয়া আহলাল কুবুর; ইয়াগফিরুল্লাহু লানা ওয়ালাকুম, আনতুম সালাফুনা ওয়া নাহনু বিল আসার।
বাংলা অর্থ—হে কবরবাসী! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। আল্লাহ আমাদের ও তোমাদের ক্ষমা করুন। তোমরা আমাদের আগে কবরে গিয়েছ এবং আমরা পরে আসছি।’ (তিরমিজি : হাদিস নং- ১০৫৩।)
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি কবর জিয়ারতে গিয়ে বলেন—
বাংলা উচ্চারণ— আসসালামু আলাইকুম আহলাদ দিয়ারি মিনাল মুমিনিনা ওয়া ইন্না ইনশাআল্লাহু বিকুম লাহিকুন। আসয়ালুল্লাহা লানা ওয়ালাকুমুল আফিয়া।
বাংলা অর্থ— মুমিনদের বাসস্থানের অধিবাসীরা! তোমাদের ওপর শান্তি বর্ষিত হোক। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সঙ্গে মিলিত হব। আমি আমাদের এবং তোমাদের জন্য (আজাব থেকে) নিরাপত্তা কামনা করি।’ (মুসলিম : হাদিস নং- ২৪৯।)
কবর জিয়ারত করার গুরুত্বপূর্ণ ৩ বিষয়—
১. কবর জিয়ারতের ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে নির্ধারিত পদ্ধতির কথা এবং নির্ধারিত কোনো সুরা বা দরুদ পাঠের কথাও পাওয়া যায় না। যেকোনো সুরা তিলাওয়াত করা এবং জিকির করা যাবে। তবে সুরা মুলক তেলাওয়াত করা উত্তম। ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘একবার এক সাহাবি একটি কবরের ওপর তার তাঁবু স্থাপন করেন। তিনি বুঝতে পারেননি যে এটি কবর। হঠাৎ তিনি অনুভব করেন—কবরে একজন লোক সুরা মুলক তেলাওয়াত করছেন। অবশেষে তিনি তা পাঠ শেষ করেন।
তিনি পরে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহর রাসুল! আমি একস্থানে আমার তাঁবু ফেলি। আমার ধারণা ছিল না যে এটি কবর। হঠাৎ অনুভব করি একজন লোক সুরা মুলক তেলাওয়াত করে খতম করলেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, এটি (সুরা মুলক) হলো প্রতিরোধক। এটি হলো মুক্তিদায়ক। (তিরমিজি: হাদিস নং- ২৮৯০)
২. নারীদের কবর জিয়ারতে না যাওয়াই উত্তম। কারণ আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কবর জিয়ারতকারী নারীদের ওপর অভিসম্পাত করেছেন।’ (তিরমিজি : হাদিস নং- ১০৫৬; ইবনে মাজাহ : হাদিস নং- ১৫৭৫) তবে কোনো নারী যদি কবরস্থানে গিয়ে কোনো প্রকারের বিদআত, শরিয়াহ পরিপন্থি কার্যকলাপসহ কান্নাকাটি বা বিলাপে লিপ্ত না হয়, তা হলে তার জন্য অনুমতি আছে। বৃদ্ধ নারীরা যেতে পারেন, যুবতীদের না যাওয়াই ভালো। (ফাতাওয়ায়ে শামি: ২/২৪২)
৩. কবর জিয়ারত নিয়ে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি করা যাবে না। কবর পাকা করা, গম্বুজসদৃশ্য বানানো, চাদর চড়ানো, মোমবাতি জ্বালানো, কবরকে তাওয়াফ করা, কবরকে মসজিদ বানানো, কবরে শায়িত ব্যক্তির কাছে নিজের প্রয়োজন পূরণের জন্য আবেদন করা এবং সিজদা করা—সবই শিরক ও বিদআত। ইমানবিধ্বংসী এসব কাজ থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।
আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেছেন, ‘তুমি আল্লাহর পরিবর্তে তাদের কাছে আহ্বান করো না; যারা তোমার উপকার করতে পারে না এবং অপকারও করতে পারে না। (এমনটা) করলে তুমি সীমা লঙ্ঘনকারী (মুশরিকদের) শ্রেণিভুক্ত হবে।’ (সুরা ইউনুস : আয়াত নং- ১০৬।)
ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) নারী কবর জিয়ারতকারী, তার ওপর মসজিদ নির্মাণকারী এবং কবরে বাতি প্রজ্বালনকারীকে অভিশাপ দিয়েছেন।’ (আবু দাউদ : হাদিস নং- ৩২৩৬)
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক