সম্প্রতি বিভিন্ন মিডিয়ায় কুকুর-বিড়ালের মতো নিরীহ প্রাণীর ওপর বর্বর নির্যাতন ও হত্যার কিছু চিত্র আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। এ ছাড়া, সুন্দরবনের বন্যপ্রাণী শিকার ও তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এ অমানবিকতা একদিকে যেমন আইনত দণ্ডনীয়, তেমনই ইসলামের দৃষ্টিতে এটি মারাত্মক গুনাহের কাজ। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহতায়ালা সমগ্র প্রাণিজগৎকে একটি স্বতন্ত্র সম্প্রদায় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এটি প্রাণীর অধিকার ও তাদের গুরুত্বের এক ঐশী স্বীকৃতি।
আল্লাহ বলেন, ‘পৃথিবীতে বিচরণশীল যত প্রাণী আছে, তারা সবাই তোমাদের মতোই এক একটি জাতি (সুরা আল-আনআম, আয়াত, ৩৮)। এ আয়াত থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, প্রাণীরা কেবল আমাদের ভোগের বস্তু নয়, বরং তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় আল্লাহর সৃষ্ট এক বিশেষ সম্প্রদায়। আমাদের মতো তাদেরও জীবনধারণ ও স্বাভাবিক বিচরণের অধিকার রয়েছে। বিশ্বনবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন ও কর্মে প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার অসংখ্য নজির পাওয়া যায়। এক লোকের কুকুরকে পানি পান করানোর প্রেক্ষাপটে একদিন সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল, পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্যও কি আমাদের পুরস্কার আছে?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রত্যেক প্রাণীর প্রতি দয়া প্রদর্শনের জন্য পুরস্কার রয়েছে’ (বুখারি, ২৩৬৩)।
এর বিপরীতে, প্রাণীর প্রতি সামান্য নিষ্ঠুরতার পরিণতিও অত্যন্ত ভয়াবহ। রাসুল (সা.) বলেন, ‘একজন মহিলাকে একটি বিড়ালের কারণে আজাব দেওয়া হয়েছিল। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল। ফলে সেটি ক্ষুধায় মারা যায়। এ কারণে মহিলাটি জাহান্নামে প্রবেশ করল। কারণ, সে ওকে কোনো খাবার দেয়নি, আবার খাবার খুঁজে খাওয়ার জন্য ছেড়েও দেয়নি’ (বুখারি, ৩৪৮২)।
এ দুটি হাদিস থেকে প্রাণীর প্রতি দয়া ও নিষ্ঠুরতার পুরস্কার এবং তিরস্কার সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত পরিষ্কার। ইসলাম প্রাণীর অধিকার রক্ষায় কিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে—
◉ নিছক বিনোদনের জন্য বা খেলাচ্ছলে প্রাণী হত্যা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। যে ব্যক্তি অকারণে একটি চড়ুই পাখি হত্যা করে, কেয়ামতের দিন পাখিটি আল্লাহর কাছে নালিশ করবে (নাসায়ি, ৪৪৪৭)।
◉ কোনো পশুকে প্রহার করা, তার মুখে আঘাত করা বা আগুনের ছ্যাঁকা দেওয়াকে নবিজি (সা.) নিষেধ করেছেন। তিনি এমন কাজ করতে দেখলে তীব্র নিন্দা জানাতেন (মুসলিম, ৫৩৬৯)।
◉ একবার রাসুল (সা.) একটি উটকে ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত অবস্থায় ছটফট করতে দেখে ব্যথিত হলেন। তিনি উটের মালিককে ডেকে বললেন, ‘এই পশুর ব্যাপারে তুমি কি আল্লাহকে ভয় করো না? এই পশুটি আমার কাছে অভিযোগ করেছে যে, তুমি তাকে ক্ষুধার্ত রাখো এবং তার ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপিয়ে কষ্ট দাও।
◉ জীবন্ত কোনো পশুপাখিকে নিশানা বানিয়ে তীর ছোড়া বা গুলি করা একটি বর্বর কাজ এবং ইসলামে তা সম্পূর্ণরূপে হারাম (মুসলিম, ৪৯৫৫)।
◉ ইসলামে হালাল পশু খাওয়ার অনুমতি থাকলেও জবাইয়ের ক্ষেত্রে দয়া দেখানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। জবাই করার আগে ছুরিতে ভালোভাবে ধার দিয়ে নিতে হবে এবং পশুকে কষ্ট দেওয়া যাবে না (মুসলিম, ৪৯৪৯)।
আমাদের দায়িত্ব হলো প্রতিটি সৃষ্টির প্রতি সদয় হওয়া। পথের কুকুর-বিড়ালকে অকারণে ঢিল মারা বা কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকা, পাখিদের জন্য বাড়ির ছাদে বা বারান্দায় খাবার ও পানির ব্যবস্থা করা এবং বন্যপ্রাণী শিকারের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা আমাদের ইমানি দায়িত্বের অংশ। মনে রাখতে হবে, এ পৃথিবী শুধু মানুষের জন্য নয়। আল্লাহর সৃষ্ট প্রতিটি প্রাণের এখানে শান্তিতে বসবাসের অধিকার রয়েছে।
লেখক: শিক্ষার্থী
টেকেরহাট পপুলার হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজ, মাদারীপুর