কিয়ামতের দিন বান্দাকে তার ধন-সম্পদ সম্পর্কে দুই ভাগে প্রশ্ন করা হবে, যা তার অর্থনৈতিক সততা, তাকওয়া এবং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের ভিত্তি নিশ্চিত করে। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস অনুযায়ী, এই প্রশ্নগুলো হলো: ১. ধন-সম্পদ কীভাবে উপার্জন করেছে? (উৎস), ২. সেই সম্পদ কোথায় ব্যয় করেছে? (ব্যয়ের খাত)
প্রথম প্রশ্নটি ব্যক্তির অর্থনৈতিক সততার মূল পরীক্ষা। ইসলামে উপার্জনের উৎস অবশ্যই বৈধ (হালাল) হতে হবে। অবৈধ (হারাম) উপায়ে অর্জিত সম্পদ আল্লাহর দরবারে কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। হারাম উপার্জনে লিপ্ত ব্যক্তির দোয়াও কবুল হয় না। কারণ হালাল রিজিক প্রতিটি আমল কবুল হওয়ার জন্য একটি অনিবার্য পূর্বশর্ত।
আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, হে লোকসকল, নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বিষয়ই গ্রহণ করেন। আল্লাহতায়ালা রাসুলগণকে যে নির্দেশ প্রদান করেছেন, মুমিনদেরকেও সে নির্দেশই প্রদান করেছেন। আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে রাসুলগণ, তোমরা পবিত্র ও ভালো বস্তু থেকে খাও এবং সৎকর্ম কর। নিশ্চয় তোমরা যা কর সে সর্ম্পকে আমি সম্যক জ্ঞাত।’ (সুরা মুমিনুন, ৫১)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘হে মুমিনগণ, আহার কর আমি তোমাদেরকে যে হালাল রিজিক দিয়েছি তা থেকে।’ (সুরা বাকারা, ১৭২)।
এরপর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে দীর্ঘ সফরে উষ্কখুষ্ক ও ধূলিমলিন অবস্থায় আকাশের দিকে দু’হাত প্রসারিত করে দোয়া করে: হে আমার রব! অথচ তার পানাহার হারাম, পোশাক-পরিচ্ছদ হারাম এবং হারাম মাল দিয়েই সে খাবার গ্রহণ করেছে, কীভাবে তার দোয়া কবুল করা হবে!’ (মুসলিম, ১০১৫)
ফিকহবিদগণ উপার্জনের ক্ষেত্রে হারাম লি-যাতিহি (বস্তুগত হারাম, যেমন চুরি বা মদ বিক্রি) এবং হারাম লি-কাসবিহি (উপার্জনের পদ্ধতিগত হারাম, যেমন সুদি ব্যাংকে কাজ করা) এর মধ্যে পার্থক্য করেছেন। আল্লাহতায়ালা সুদকে হারাম ঘোষণা করে বলেন: ‘যারা সুদ খায়, তারা তার ন্যায় (কবর থেকে) উঠবে, যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল বানিয়ে দেয়। এটা এ জন্য যে, তারা বলে, বেচা-কেনা সুদের মতোই। অথচ আল্লাহ বেচা-কেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।
অতএব, যার কাছে তার রবের পক্ষ থেকে উপদেশ আসার পর সে বিরত হলো, যা গত হয়েছে তা তার জন্যই ইচ্ছাধীন। আর তার ব্যাপারটি আল্লাহর হাওলায়। আর যারা ফিরে গেল, তারা আগুনের অধিবাসী। তারা সেখানে স্থায়ী হবে।’ (সুরা বাকারা, ২৭৫)
যদি কোনো ব্যক্তি অজ্ঞতাবশত হারাম উপায়ে উপার্জন করে, কিন্তু পরে বিধান জানার পর তওবা করে এবং সেই হারাম কাজ ছেড়ে দেয়, তবে পূর্বের উপার্জিত অর্থ তার জন্য ক্ষমাযোগ্য হতে পারে। তবে শর্ত হলো, তাকে অবশ্যই হারাম কাজ থেকে অবিলম্বে বিরত হতে হবে।
ধন-সম্পদসংক্রান্ত দ্বৈত প্রশ্ন ছাড়াও আরও তিনটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে, যা জীবনের সামগ্রিক উদ্দেশ্য ও ব্যবহারকে কেন্দ্র করে। এই প্রশ্নগুলো জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করে:- ৩. জীবন কোথায় ব্যয় করেছে?— যা জীবনের সামগ্রিক উদ্দেশ্য ও ব্যবহারের ওপর কেন্দ্রীভূত। ৪. যৌবন কোন কাজে অতিবাহিত হয়েছে?—শারীরিক ও মানসিক সক্ষমতার চূড়ার এই সময়ের বিশেষ গুরুত্ব প্রমাণ করে, যখন ইবাদত বা সৎকর্ম করা যেমন সহজ, তেমনি পাপের প্রলোভনও প্রবল। ৫. যা জানত তার ওপর কতটুকু আমল করেছে?—জ্ঞান কেবল তাত্ত্বিক পুঁজি নয়, বরং তা কাজে পরিণত করার এক অপরিহার্য নির্দেশ। জ্ঞান অনুযায়ী আমল না করা এক প্রকার ভণ্ডামি (নিফাক)। এই পাঁচটি আমানতের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমেই আল্লাহর দরবারে মুক্তি সম্ভব।
কিয়ামতের দিনটি মানব ইতিহাসের সবচেয়ে দীর্ঘ ও কঠিনতম মহাকাল। নবি (সা.)-এর বর্ণনা অনুযায়ী, কিয়ামতের দিন সূর্যকে সৃষ্টির এত কাছে আনা হবে যে, তা তাদের থেকে মাত্র এক ‘মিল’ পরিমাণ দূরত্বে থাকবে। এই অসহনীয় উত্তাপের কারণে মানুষ তাদের কর্মফল অনুযায়ী ঘামতে থাকবে।
এই দিন কেবল বিচার ও হিসাবের দিন নয়। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে কিয়ামতের দিনের পরিমাপ উল্লেখ করেছেন, যা কাফির ও পাপীদের জন্য ৫০,০০০ বছরের মতো দীর্ঘ ও দুঃসহ মনে হবে (সুরা আল-মাআরিজ)। এর বিপরীতে, মুমিন বান্দাদের জন্য তাদের আমল ও আধ্যাত্মিক অবস্থার ভিত্তিতে এই সময় একটি ফরজ সালাতের সময়ের মতোই দ্রুত অতিবাহিত হয়ে যাবে। মুমিনের জন্য এই জ্ঞান হলো পরকালের সফরের জন্য অপরিহার্য পাথেয়।
আখিরাতে মুক্তির জন্য তাই প্রয়োজন— হালাল উপার্জনের মাধ্যমে অর্থনৈতিক পবিত্রতা অর্জন করা, সম্পদকে আল্লাহর আমানত হিসেবে সৎ ও কল্যাণকর পথে ব্যয় করা, জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত ও সৎকর্মে ব্যয় করা এবং জ্ঞান অনুযায়ী ইখলাসের সঙ্গে আমল করা। এই পাঁচটি প্রশ্নের সফল জবাব এবং তাকওয়া ও ইখলাসের ভিত্তিতে জীবন পরিচালনা করাই হলো মুক্তির একমাত্র পথ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক