ইসলামের দৃষ্টিতে স্বপ্ন আল্লাহর নিদর্শন। এটি সুসংবাদ অথবা দুঃস্বপ্ন বা অবচেতন মনের প্রতিফলনও হতে পারে। স্বপ্ন কেবল একটি অভিজ্ঞতাই নয়, বরং আল্লাহর সঙ্গে আমাদের আত্মার সংযোগের একটি মাধ্যমও। হজরত আলি (রা.) বলেন, ঘুমের সময় মানুষের আত্মা শরীর থেকে চলে যায়, কিন্তু আত্মার একটি রশ্মি বা সংযোগ শরীরে থেকে যায়, যার কারণে মানুষ জীবিত থাকে। এই সংযোগের মাধ্যমেই মানুষ স্বপ্ন দেখে। (তাফসীরে মাআরেফুল কোরআন, পৃষ্ঠা: ১২৮০)
ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের স্বপ্ন তাৎপর্যহীন নয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) সত্য স্বপ্নকে নবুওয়াতের অংশ বলেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, কেবল মুবাশশিরাত (সুসংবাদ) ছাড়া নবুওয়াতের আর কিছু অবশিষ্ট নেই। সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন, মুবাশশিরাত কী? তিনি বললেন, ভালো স্বপ্ন।’ (বুখারি, ৬৯৯০)। অন্য হাদিসে মহানবি (সা.) বলেন, মুমিনের স্বপ্ন নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের এক ভাগের সমান। (আবু দাউদ, ৫০১৮)।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ওপর সত্য স্বপ্নের মাধ্যমেই ওহি নাজিলের সূচনা হয়। আর উম্মতের ভেতর তাদের স্বপ্নই বেশি সত্য হয়, যারা কথা ও কাজে অধিক সত্যবাদী। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, (কিয়ামতের) সময় যখন কাছাকাছি হবে তখন মুসলিমদের স্বপ্ন মিথ্যা হবে না এবং যে যত সত্যবাদী হবে তার স্বপ্নও তত সত্য হবে। (আবু দাউদ, ৫০১৯)। রাসুলুল্লাহ (সা.) স্বপ্নের বর্ণনা করে বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যারা সবচেয়ে সত্যবাদী, তাদের স্বপ্নও সবচেয়ে সত্য হয়। স্বপ্ন তিন প্রকার—১. সত্য স্বপ্ন, যা আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ। ২. শয়তানের পক্ষ থেকে ভীতিকর স্বপ্ন। ৩. নিজের মন থেকে উদ্ভূত স্বপ্ন। যদি কেউ এমন স্বপ্ন দেখে যা তার অপছন্দ, তবে সে যেন উঠে নামাজ পড়ে এবং এ বিষয়ে মানুষের সঙ্গে কথা না বলে। (মুসলিম, ২২৬৩)
মুসলিম ও অমুসলিম উভয়েরই স্বপ্ন সত্য হতে পারে, তবে মুসলিমদের ক্ষেত্রে সত্য স্বপ্নকে নবুওয়াতের ৪৬ ভাগের এক ভাগ হিসেবে গণ্য করা হয় এবং এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ। একজন ব্যক্তির সত্যবাদিতা এবং তাকওয়ার ওপর তার স্বপ্নের সত্যতা নির্ভর করে অর্থাৎ যে ব্যক্তি যত বেশি সত্যবাদী ও ধার্মিক, তার স্বপ্ন তত বেশি সত্য হবে। আবার অমুসলিমদের স্বপ্নও সত্য হতে পারে, বিশেষ করে ভালো স্বপ্নগুলো সত্য হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। যেমনটা কোরআনের সুরা ইউসুফের ঘটনায় দেখা যায়, দুই অমুসলিম কারাবন্দি সঙ্গীর স্বপ্নের যে ব্যাখ্যা হজরত ইউসুফ (আ.) করেছিলেন তা সত্য হয়েছিল। তবে অমুসলিমদের স্বপ্ন নবুওয়াতের অংশ নয়।
স্বপ্ন দেখার পর ইসলামের কিছু নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো হলো—১. স্বপ্ন শুধু তাদের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে, যারা আপনার কল্যাণ কামনা করে অথবা অভিজ্ঞ স্বপ্নের ব্যাখ্যাকারী। (আল-মুস্তাদরাক আলা আস-সহিহাইন, ৮১৭৭)। ২. স্বপ্নে দেখা ব্যক্তি বা যারা আপনার জন্য দোয়া করবে ভালো স্বপ্ন তাদের সঙ্গে শেয়ার করতে হবে। ৩. ইস্তিখারার ক্ষেত্রে নিদর্শন পেলে তা গ্রহণ করতে হবে। ৪. দিনের শুরুতে দুনিয়ার ঝামেলায় মশগুল হওয়ার আগে স্বপ্নের ব্যাখ্যা জেনে নিতে হবে। (মাফাতিহুল জিনান, ৬৫৪)
অপছন্দনীয় স্বপ্ন দেখলে পাঁচটি কাজ করতে হবে—১. ঘুম থেকে চোখ খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলতে হবে। ২. আল্লাহতায়ালার কাছে অভিশপ্ত শয়তান থেকে এবং স্বপ্নের খারাবি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করে তিনবার বলতে হবে, আউজু বিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম, ওয়া শাররি হাজিহির রুইয়া অর্থাৎ আমি আল্লাহর কাছে শয়তান থেকে এবং এই স্বপ্নের অপকারিতা হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি। (ইবনে মাজাহ, ৩৯১০)। ৩. অপছন্দনীয় স্বপ্নটি কারও কাছে না বলে, উঠে নফল নামাজ আদায় করতে হবে। (মুসলিম, ২২৬৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, স্বপ্নের ব্যাপারে যে পর্যন্ত আলোচনা করা না হয়, সে পর্যন্ত এটা পাখির পায়ে (ঝুলে) থাকা জিনিসের মতো। আলোচনা করার সঙ্গে সঙ্গে তা যেন পা থেকে পড়ে গেল। তাই স্বপ্নদ্রষ্টা ব্যক্তি যেন জ্ঞানী ব্যক্তি অথবা পছন্দনীয় ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও কাছে স্বপ্নের ব্যাপারে আলোচনা না করে। (তিরমিজি, ২২৭৮)।
৪. রাত বাকি থাকলে বা ঘুম পূর্ণ না হলে যে দিকে কাত হয়ে শুয়েছিলেন, সেই দিক পরিবর্তন করে অন্য দিকে কাত হয়ে শুয়ে পড়তে হবে। (আহকামে জিন্দেগী, পৃষ্ঠা: ৪৮৪)। ৫. স্বপ্নের অপকারিতা থেকে পানাহ চাওয়ার জন্য এই দোয়াটি পাঠ করা সুন্নত। আরবি উচ্চারণ—আল্লাহুমা ইন্নি আসআলুকা খাইরা হাজিহিল রুইয়া, ওয়া খাইরা মা ফিহা, ওয়া আউজুবিকা মিন শাররি হাজিহিল রুইয়া ওয়া শাররি মা ফিহা। বাংলা অর্থ—হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে এই স্বপ্ন এবং এর অন্তর্নিহিত যা কিছু রয়েছে তার মঙ্গল কামনা করি। আর এই স্বপ্ন ও তার মধ্যকার অনিষ্ট থেকে আপনার কাছে পানাহ চাই। (আহকামে জিন্দেগী, পৃষ্ঠা: ৪৮৪)।
লেখক: প্রাবন্ধিক