ইসলামের দৃষ্টিতে রিজিক নির্ধারিত, আবার কমবেশিও হয়। দুটি বিষয়ই সত্য এবং একটি অপরটির বিরোধী নয়। রিজিক আল্লাহর কাছে লিখিত (লাওহে মাহফুজে নির্ধারিত)। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আকাশে রয়েছে তোমাদের রিজিক এবং তোমাদের প্রতিশ্রুত সবকিছু। (সুরা জারিয়াত, ২২)। অর্থাৎ রিজিক আগে থেকেই আল্লাহ নির্ধারণ করে রেখেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, তোমাদের প্রত্যেকেই আপন মাতৃগর্ভে ৪০ দিন পর্যন্ত (শুক্রাণু হিসেবে) জমা থাকে। তারপর ৪০ দিন রক্তপিণ্ড হিসেবে, এরপর ৪০ দিন গোশত পিণ্ড হিসেবে জমা থাকে। এরপর আল্লাহতায়ালা একজন ফেরেশতা পাঠান এবং বান্দার রিজিক, মৃত্যু, দুর্ভাগ্য ও সৌভাগ্য—এ চার বিষয় লেখার আদেশ দেন। (বুখারি, ৬৫৯৪) ইমাম হুসাইন বিন আলি (রা.) বলেছেন, রিজিক নির্ধারিত, লোভীরা বঞ্চিত। আর কৃপণ নিন্দিত এবং হিংসুক পীড়িত। (তাফসিরে রুহুল মাআনি, ৪/৯৭)।
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করে তাকে বললেন, লিখো। কলম বলল, হে আমার প্রতিপালক! কী লিখব? আল্লাহ বললেন, কিয়ামত পর্যন্ত আগমনকারী প্রতিটি বস্তুর তাকদির লেখো’ (আবু দাউদ, ৪৭০০) অধিকাংশ আলেম-ওলামা ও ফকিহদের মতে, এই লিখিত যাবতীয় বিষয়ের নামই হলো তাকদির। রিজিক নির্ধারিত নাকি কম-বেশি হয়; সে আলোচনাটি বুঝতে হলে তাকদিরের আলোচনা আগে বোঝা জরুরি। তাকদিরবিষয়ক আলোচনা বুঝলে, রিজিকের আলোচনা বুঝতে সহজ হবে। তাকদির শব্দটি আরবি। এর অর্থ নির্ধারণ করা, নির্দিষ্ট করা, ধার্য করা, নিয়তি, ভাগ্য, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। এই মহাবিশ্বে যা কিছু ঘটেছে, ঘটছে এবং ভবিষ্যতে ঘটবে; প্রজ্ঞাময় আল্লাহতায়ালা তাঁর পূর্বজ্ঞান ও প্রজ্ঞা অনুযায়ী সেসব নির্ধারণ করে রাখাকে তাকদির বলে। পৃথিবীর সব বস্তু তথা মানব-দানবসহ যত সৃষ্টি রয়েছে, সবকিছুর উত্থান-পতন, ভালো-মন্দ, উপকার-অপকার, লাভ-ক্ষতি, থাকা-খাওয়া, জীবনযাপন ইত্যাদি কোথায়, কোন সময়, কীভাবে ঘটবে, আল্লাহতায়ালা নির্ধারণ করে রেখেছেন। তাকদিরের বাইরে কোনো কিছু নেই। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, আল্লাহর আদেশ নির্ধারিত ও অবধারিত। (সুরা আহজাব, ৩৮)।
আবদুল্লাহ বিন আমর (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা আসমান-জমিন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর আগে সব সৃষ্টির তাকদির লিপিবদ্ধ করেছেন। তখন তার আরশ ছিল পানির ওপর। (মুসলিম, ২৬৫৩) তাকদির দুই প্রকার। প্রথম প্রকারের নাম তাকদিরে মুবরাম। মানে হলো চূড়ান্ত স্থির, অপরিবর্তনযোগ্য তাকদির। এ প্রকার তাকদিরে কোনো রকম পরিবর্তন ও পরিবর্ধন হয় না। যেমন জন্ম, মৃত্যু, লিঙ্গ, ইত্যাদি কিছু বিষয়। আর দ্বিতীয় প্রকারের নাম তাকদিরে মুআল্লাক। মানে ঝুলন্ত বা পরিবর্তনযোগ্য তাকদির। এ ধরনের তাকদির পরিবর্তনযোগ্য, যা সংযোজন বা বিয়োজন হতে পারে। এ ধরনের তাকদিরকে আল্লাহতায়ালা অন্য কাজ বা আমলের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেছেন উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মানুষ যদি পিতা-মাতার সেবা-যত্ন করে, তবে জীবন দীর্ঘ ও সুখকর হয়। যদি সেবাযত্ন না করে, তাহলে জীবন দীর্ঘ হয় না, সুখকর হয় না। বস্তুত তাকদিরে মুবরাম ও মুআল্লাক অর্থাৎ চূড়ান্ত ও ঝুলন্ত তাকদির শুধু বান্দার ইলম ও অনুভূতি হিসেবে। আল্লাহতায়ালার ইলম ও প্রজ্ঞায় ঝুলন্ত বলতে কিছুই নেই, তাঁর কাছে সবই মুবরাম। কারণ, যেকোনো কাজ বা বিষয়ের শেষ ও চূড়ান্ত ফল আল্লাহতায়ালা অনাদিকাল থেকেই অবগত। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, আল্লাহ যা ইচ্ছা তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন। আর তারই কাছে আছে উম্মুল কিতাব। (সুরা রাদ, ৩৯)।
উক্ত আয়াতের তাফসিরে বলা হয়েছে, আল্লাহতায়ালা তাঁর কিতাব (লাওহে মাহফুজে লিখিত তাকদির) থেকে যা ইচ্ছা তা মিটিয়ে দেন এবং যা ইচ্ছা তা প্রতিষ্ঠিত রাখেন। তবে উম্মুল কিতাব তথা মূল কিতাব ছাড়া। মানে ওখান থেকে কোনো কিছু পরিবর্তন করা হয় না। (তাফসিরে বাগাবি, সংশ্লিষ্ট আয়াত) শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.)-কে রিজিক নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল—রিজিক কি নির্ধারিত নাকি কম-বেশি হয়? তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, তাকদিরের মতো রিজিকও দুই প্রকার। প্রথম প্রকার রিজিক হলো—আল্লাহ যা জানেন যে তিনি তা বান্দাকে দেবেন। এটি পরিবর্তন হয় না। এটাকে তাকদিরে মুবরামের সঙ্গে মিলিয়ে বোঝা সম্ভব। আর দ্বিতীয় প্রকারের রিজিক হলো—আল্লাহ যা লিপিবদ্ধ করেছেন এবং ফেরেশতাদের তা জানিয়ে দিয়েছেন। এটি বিভিন্ন কারণের ওপর ভিত্তি করে বাড়ে ও কমে। বান্দার জন্য আল্লাহ ফেরেশতাদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ রিজিক লেখার নির্দেশ দেন। কিন্তু সে যদি আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে, তাহলে আল্লাহ তার রিজিক আরও বাড়িয়ে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি চায় যে তার রিজিকে প্রশস্ততা আসুক এবং তার জীবন দীর্ঘ হোক—সে যেন তার আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে। (বুখারি, ২০৬৭; মুসলিম, ২৫৫৭)।
হজরত দাউদ (আ.)-এর জীবনের উদাহরণ রয়েছে। তার বয়স প্রথমে ৬০ বছর নির্ধারিত করা ছিল, কিন্তু তা আরও ৪০ বছর বাড়িয়ে ১০০ বছর করা হয়েছিল। (তিরমিজি, ৩০৭৬) হজরত নুহ (আ.) তার জাতিকে উপদেশ দিয়ে বলেছিলেন—আর বলেছি, তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও; নিশ্চয় তিনি পরম ক্ষমাশীল। তিনি তোমাদের ওপর মুষলধারে বৃষ্টি বর্ষণ করবেন আর তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করবেন এবং তোমাদের জন্য বাগবাগিচা দেবেন আর দেবেন নদী-নালা। (সুরা নুহ, ১০-১২) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি সদাসর্বদা ক্ষমা প্রার্থনা করবে (মানে ইসতেগফার পাঠ করবে বা তওবা করবে) আল্লাহ তাকে প্রতিটি দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তির পথ ও প্রতিটি সংকট থেকে উদ্ধারের পথ বের করে দেবেন এবং তাকে তার ধারণাতীত উৎস থেকে রিজিক দান করবেন। (ইবনে মাজাহ, ৩৮১৯; আবু দাউদ, ১৫১৮)
উমর (রা.) একটি দোয়া করতেন, তিনি বলতেন—হে আল্লাহ, যদি তুমি আমাকে সৌভাগ্যবানদের মধ্যে লিখে থাকো, তবে আমাকে এর ওপর দৃঢ় রাখো। আর যদি তুমি আমাকে হতভাগ্যদের মধ্যে লিখে থাকো, তাহলে আমার নাম সেখান থেকে মুছে দাও এবং আমাকে সৌভাগ্যবানদের মধ্যে লিপিবদ্ধ করো, কারণ তুমি যা ইচ্ছা তা মুছে দাও এবং যা ইচ্ছা তা বহাল রাখো। ইবনে তাইমিয়াহ (রহ.) বোঝাতে চেয়েছেন, তাকদিরের কিছু অংশ পরিবর্তনশীল, যেমনটা রিজিক ও হায়াত বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বলা হয়েছে এবং উমর (রা.)-এর দোয়া থেকে তা বোঝা যায়। তবে যেসব কারণে রিজিক লাভ হয়, সেগুলো আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নির্ধারিত ও লিপিবদ্ধ। তিনি বান্দাকে তার চেষ্টা ও উপার্জনের মাধ্যমে রিজিক দেবেন এবং তিনি তাকে সেই চেষ্টা ও উপার্জনের অনুপ্রেরণা দেন। আর যে রিজিক উপার্জনের মাধ্যমে পাওয়ার কথা, তা চেষ্টা ছাড়া পাওয়া যায় না। অন্যদিকে যা কোনো ধরনের চেষ্টা ছাড়া পাওয়ার কথা (যেমন উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পদ), তা তার কাছে বিনা চেষ্টায় এসে যায়।
ইসলাম বলে, মূল রিজিক নির্ধারিত, তবে তার প্রাপ্তির ধরন, সময়, পরিমাণ, বারাকাহ—এগুলো আমলভেদে পরিবর্তন হয়। উদাহরণত, একজনের জন্য বছরে ১০ লাখ টাকা রিজিক নির্ধারিত। কিন্তু এই ১০ লাখ টাকা তিনি ১২ মাসে পাবে, নাকি ৬ মাসে পাবে—সহজে পাবে নাকি অনেক কষ্ট করার পর পাবে; সুস্থ দেহে পাবে, নাকি রোগে ভুগে পাবে অথবা বারাকাহসহ পাবে, নাকি বারাকাহ ছাড়া পাবে—এসব পরিবর্তন হতে পারে তার আমল, দোয়া, তাকদিরের শর্ত ও পরীক্ষার কারণে। তাকওয়া, আত্মীয়তার সম্পর্ক, দোয়া, কৃতজ্ঞতায় যেমন রিজিক বাড়ে, পাপাচারের কারণে তেমন রিজিক কমে।
লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক