মক্কাতুল মুকাররমা—আল্লাহতায়ালা পৃথিবীর কিছু স্থানকে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছেন। বারাকাহপূর্ণ করেছেন কিছু জমিনকে। এ তালিকার প্রথম স্থানে রয়েছে মক্কাতুল মুকাররমা। মাসজিদুল হারামের সীমানায় এক রাকাত নামাজ আদায় করলে, ১ লাখ গুণ বেশি ফজিলত পাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য যেকোনো মসজিদের নামাজ আদায় করার চেয়ে আমার মসজিদে (মসজিদে নববি) নামাজ আদায় করা হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ বা ফজিলতপূর্ণ। অন্যান্য মসজিদের নামাজের তুলনায় মাসজিদুল হারামের নামাজ আদায় করা ১ লাখ গুণ উত্তম বা ফজিলতপূর্ণ।’ (ইবনে মাজাহ, ১৪০৬)
এ ঘরের আরও একটি বারাকাহময় বিশেষত্ব হচ্ছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর উদ্দেশ্যে হজ করল এবং অশালীন কথাবার্তা ও গুনাহ থেকে বিরত থাকল, সে ওই দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরবে যে দিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছিল।’ (বুখারি, ১৫২১)
এর চেয়ে বারাকাহময় ঘর পৃথিবীর বুকে আর দ্বিতীয়টি নেই। এর চেয়ে কল্যাণকর আর কোনো ঘর জমিনের ওপর আসমানের নিচে নেই। এর চেয়ে স্থিতিশীল, এর চেয়ে উপকারী ঘর পুরো সৃষ্টির মধ্যে দ্বিতীয়টি আর নেই।
আল্লাহতায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘নিশ্চয় মক্কায় মানুষের জন্য প্রথম ঘর স্থাপন করা হয়েছে। (যে ঘরটি) বারাকাহময় ও হিদায়াত বিশ্ববাসীর জন্য।’ (সুরা আলে ইমরান, ৯৬)
মক্কার আরও একটি বিশেষ বারাকাহ হচ্ছে, মক্কা বিজয়ের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) জনতার সামনে বলেছিলেন, আল্লাহতায়ালা হাতির দল থেকে মক্কাকে রক্ষা করছেন এবং সে মক্কার ওপর তার রাসুল ও মুমিনদের বিজয় দান করছেন। এ মক্কা আমার আগে কারও জন্য কখনো হালাল (লড়াই করার অনুমতি) ছিল না। তবে আজ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাকে আমার জন্য হালাল করা হয়েছে (এতে লড়াই করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে) এবং আজকের পর আর কখনো এটাকে কারও জন্য হালাল করা হবে না। অতএব এখানকার কোনো পশুকে তাড়ানো যাবে না, এখানকার কোনো কাঁটা তোলা যাবে না। এখানকার পড়ে থাকা কোনো বস্তু কারও জন্য হালাল হবে না। তবে ঘোষণাকারী সঠিক মালিকের কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্যে ঘোষণা দেওয়ার জন্য সেটা উঠাতে পারবে।
মক্কার আরেকটি বারাকাহ হলো সেখানে দাজ্জাল প্রবেশ করতে পারবে না। আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মক্কা ও মদিনা ছাড়া এমন কোনো শহর নেই যেখানে দাজ্জাল পদচারণ করবে না। মক্কা ও মদিনার প্রত্যেকটি প্রবেশ পথেই ফেরেশতারা সারিবদ্ধভাবে পাহারায় নিয়োজিত থাকবে।’ (বুখারি, ১৮৮১; মুসলিম, ২৯৪৩)
মদিনাতুল মুনাওয়ারা—রাসুলে আরাবি (সা.)-এর শহর মদিনা হলো পৃথিবীর দ্বিতীয় বারাকাহময় স্থান। মসজিদে নববিতে এক রাকাত নামাজ আদায় করলে হাজার রাকাত নামাজের সওয়াব পাওয়া যায়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মাসজিদুল হারাম ছাড়া অন্য যেকোনো মসজিদের নামাজ আদায় করার চেয়ে আমার মসজিদের (মসজিদে নববি) নামাজ আদায় করা হাজার গুণ শ্রেষ্ঠ বা ফজিলতপূর্ণ। অন্যান্য মসজিদের নামাজের তুলনায় মসজিদুল হারামের (কাবাঘরের সীমানায়) নামাজ আদায় করা ১ লাখ গুণ উত্তম বা ফজিলতপূর্ণ।’ (ইবনে মাজাহ, ১৪০৬)
মদিনায় আরও একটি মসজিদ রয়েছে, যেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলে একটি কবুল উমরাহর সওয়াব পাওয়া যায়। সেটি হলো মসজিদে কুবা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, মসজিদে কুবাতে নামাজ আদায় করলে উমরাহর সওয়াব পাওয়া যায়। (তিরমিজি, ৩২৪)
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজের ঘরে পবিত্রতা অর্জন করে, অতঃপর কুবা মসজিদে এসে এক ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, তার জন্য একটি উমরাহর সমান সওয়াব রয়েছে। (ইবনে মাজাহ, ১৪১২; তারগিব, ১১৪১)
রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না মদিনা তার মধ্যে থাকা খারাপ লোকদের এমনভাবে বের করে দেবে, যেভাবে কামারের আগুন লোহার মরিচা দূর করে। (মুসলিম, ১৩৮২)
মদিনায় বরকতের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) দোয়া করেছেন, তিনি বলেছেন, হে আল্লাহ! আমাদের ফল-ফলাদিতে বারাকাহ দিন, আমাদের শহরে (মদিনায়) বারাকাহ দিন, আমাদের সা (ওজনের পাত্র)-এ বারাকাহ দিন, আমাদের মুদ্দ (ওজনের পাত্র)-এ বারাকাহ দিন। হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই ইবরাহিম (আ.) আপনার বান্দা, আপনার বন্ধু (খলিল) এবং আপনার নবি। আর আমি আপনার বান্দা এবং আপনার নবি। তিনি আপনার কাছে মক্কার জন্য দোয়া করেছিলেন, আর আমি আপনার কাছে মদিনার জন্য দোয়া করছি, যেমন তিনি মক্কার জন্য দোয়া করেছিলেন এবং তার সঙ্গে আরও (এক গুণ) বেশি। (মুসলিম, ১৩৭৩)
মদিনার খাবারেও বারাকাহ দান করেছেন আল্লাহতায়ালা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মদিনার আলিয়া অঞ্চলের আজওয়ায় (এক প্রকারের বিশেষ খেজুর) রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা বা রোগের আরোগ্য রয়েছে।’ (মুসলিম, ২০৪৮)
বায়তুল মুকাদ্দাস ও পুণ্য ভূমি ফিলিস্তিন—বায়তুল মুকাদ্দাস বা আল আকসা মসজিদ হলো পৃথিবীর বুকে তৃতীয় বারাকাহময় স্থান। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোনো স্থানে ইবাদতের উদ্দেশ্যে সফর করা যাবে না। আমার এই মসজিদ (মসজিদে নববি), মসজিদে হারাম এবং মসজিদে আকসা।’ (বুখারি, ১১৮৯; মুসলিম, ১৩৯৭)
আর ফিলিস্তিন হলো সেই ভূমি, যেখানে নবুয়তের যাত্রা শুরু হয়েছে। আল্লাহর পথে দাওয়াতের জন্য বিভিন্ন নবি (আলাইহিমুস সালাম) এ ভূমিতে আগমন করেছেন, বিচরণ করেছেন। হজরত ইবরাহিম (আ.), হজরত ইসহাক (আ.), হজরত ইয়াকুব (আ.), হজরত ইউনুস (আ.), হজরত সুলাইমান (আ.) ও হজরত ঈসা (আ.)-সহ অনেক নবি এই ভূখণ্ডে আল্লাহর একত্ববাদের বার্তা প্রচার করেছেন। এটি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মিরাজে গমন করার স্থান। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় সেই সত্তা, যিনি তার বান্দাকে রাতে ভ্রমণ করিয়েছেন মাসজিদুল হারাম থেকে মাসজিদুল আকসা পর্যন্ত। আর এর চারপাশকে আমি বারাকাহময় করেছি, যেন আমি তাকে আমার কিছু নিদর্শন দেখাতে পারি।’ (সুরা ইসরা, ১)
মিরাজের রজনিতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ঊর্ধ্ব জগতের সফর শুরু করার আগে জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে প্রথমে এই মসজিদে এসেছেন এবং নামাজ আদায় করেছেন। তিনি ইমামতি করেছেন আর সব নবি তার ইকতিদা করেছেন। আনাস ইবনে মালেক (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অতঃপর আমি বায়তুল মাকদিসে প্রবেশ করলাম। সব নবিকে একত্র করা হলো। জিবরাইল (আ.) আমাকে সামনে এগিয়ে দিলেন আর আমি তাদের ইমামতি করলাম।’ (নাসায়ি, ৪৪৯)
মসজিদে আকসার একটি বড় পরিচয় ও বৈশিষ্ট্য হলো, এটি পৃথিবীর ইতিহাসে দ্বিতীয় প্রাচীন মসজিদ। মসজিদে হারামের পরেই এই মসজিদের বুনিয়াদ স্থাপিত হয়েছে। আবু জর (রা.) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসুল! পৃথিবীতে সর্বপ্রথম কোন মসজিদ স্থাপিত হয়েছে? তিনি বললেন, মসজিদে হারাম। আমি বললাম, অতঃপর কোন মসজিদ? তিনি বললেন, মসজিদে আকসা। বললাম, এই দুইয়ের নির্মাণের মাঝে কত সময়ের ব্যবধান? তিনি বললেন, ৪০ বছর। (বুখারি, ৩৩৬৬; মুসলিম, ৫২০)
আবুদ দারদা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মসজিদে হারামের নামাজ ১ লাখ নামাজের সমতুল্য। আমার মসজিদে (মসজিদে নববিতে) নামাজ ১ হাজার নামাজের সমতুল্য। আর বায়তুল মাকদিসের নামাজ ৫০০ রাকাত নামাজের সমতুল্য।’ (বায়হাকি, ৩৮৪৫)
লেখক: শিক্ষার্থী, মারকাযুন নাহদা