কুতুব মিনার কেন্দ্রিক যে পর্যটন গড়ে উঠেছে, তাতে কুতুব উদ্দিন বখতিয়ারের মাজার, ভুলভুলাইয়া, বাওলি কি রাজন, জামালি-কামালি মসজিদ, লাল কোট কেল্লাসহ অন্য সুলতানদের সমাধি অন্তর্ভুক্ত। কুতুব মিনার কমপ্লেক্স ছাড়া উল্লেখিত ঐতিহাসিক স্থানে যেতে হলে টিকিট লাগে না। কুতুব মিনার কমপ্লেক্স ঢোকার পরে, আমার সবটুকু দেখার ইচ্ছা ছিল। অবশ্যই কুতুব মিনার, মাদরাসা, স্তম্ভ, পিলার, পুরাকীর্তি, সুলতানদের সমাধিসহ অন্যান্য স্থাপনা ঘুরে ঘুরে দেখেছিলাম।
কুতুব মিনারের গেটে ঢুকেই মিনারে না গিয়ে বাম দিকে ছোট খিলান দিয়ে বের হয়ে একটা সমাধি চোখে পড়ে। আমি সমাধিতে উল্লেখ করা নাম দেখে চিনতে পারিনি। সেখানে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে তার পরে কুতুব মিনার কমপ্লেক্স ঘুরে দেখি। আমি সেখানে সব সুলতান ও অন্যান্য মৃত মানুষের জন্য একবারেই কবর জিয়ারত করে ফেলি। সমাধির পাশে ও গুগল ম্যাপে লেখা রয়েছে ইমাম জামিন। আমি তখনো বুঝিনি কার কবর জিয়ারত করলাম। ইমাম জামিন কোনো সম্রাট বা উজির ছিলেন না। তবে তিনি কে ছিলেন? ইসলাম প্রচারে মধ্যপ্রাচ্য থেকে অনেকেই ভারতবর্ষে এসেছেন। ইমাম জামিন (রহ.) তাদের মধ্যে অন্যতম।
ইমাম জামিন দিল্লির সুলতানদের সময়ে কুতুব মিনারের কাওয়াত-উল-ইসলাম মসজিদে ইমামতি করতেন। তিনি মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর ছিলেন। ইমাম জামিন (রহ.) একজন সৈয়দ ছিলেন এবং সুফিবাদের চিশতি তরিকার অনুসারী ছিলেন। তার প্রকৃত নাম মোহাম্মদ আলী। তিনি ‘ইমাম জমিন’ নামেও পরিচিত ছিলেন। সুলতান সিকান্দার লোদীর সময়ে তিনি তুরস্ক থেকে দিল্লি আসেন। তিনি আসলে ষোড়শ শতকের একজন ধর্মগুরু ছিলেন। প্রবেশদ্বারের শিলালিপি অনুসারে, ইমামের সমাধি মোঘল সম্রাট হুমায়ুনের সময় (১৫৩৭ থেকে ১৫৩৮ সালের মধ্যে) নির্মিত হয়। ইমাম জামিন ১৫৩৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন।
এই মাজারটি কুতুব মিনার কমপ্লেক্সের শেষ সংযোজন। আলায় দরজার পূর্ব দিকে অবস্থিত সমাধিটি মূল স্থাপত্যের অনেক পরে নির্মিত হয়েছিল। মহানবি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর বংশধর ইমাম জামিনের কবরস্থান কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে অবস্থিত। প্রতিদিন ভারত ও বিশ্বের অন্য দেশের মুসলিমরা এখানে আসেন। ইমাম জামিনের সমাধিটি লোধি স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত হয়েছে। সমাধিটি বর্গাকার আকারের এবং দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ উভয় ক্ষেত্রেই এর পরিমাপ ৭.৩ মিটার (২৪ ফুট)। মোট ১২টি স্তম্ভ রয়েছে। এছাড়া গম্বুজটি অষ্টভুজাকৃতির ড্রাম থেকে উঠে ওপরে একটি মার্বেল প্যানেল দিয়ে সজ্জিত করা হয় (ওপর ঝুলে থাকা ইভস বা ছাদের আচ্ছাদন) সঙ্গে একটি ডবল সারি ক্রেনেল।
অভ্যন্তরীণ অলংকরণ এবং সেনোটাফ নির্মাণে মার্বেল ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সমাধির পশ্চিম দিকে একটি মার্বেল-নির্মিত মিহরাব রয়েছে (মসজিদের দেয়ালে কুলুঙ্গি যা মুসলমানরা যে দিকে প্রার্থনা করে তা নির্দেশ করে)। প্রবেশদ্বার, দক্ষিণ দিকে অবস্থিত, তাও মার্বেল দিয়ে তৈরি। সম্পূর্ণ বেলেপাথরের কাঠামোটি মূলত পালিশ করা স্টুকো দ্বারা আবৃত ছিল, যার একটি অংশ এখনো বিদ্যমান। প্রবেশদ্বারের দরজার ওপরে নাসখ লিপিতে জমিনের নাম লেখা আছে।
একজন মসজিদের ইমাম যাকে দিল্লি সালতানাত এবং দিল্লির সম্রাটরাও ভীষণ শ্রদ্ধা করতেন। সবাই তাকে মেনে চলতেন। সমসাময়িক ও সাম্প্রতিক বিশ্বে এই ঘটনা বিরল ও নজিরবিহীন। সেই সময়ের শাসকদের উদারতা ছিল। মসজিদের ইমাম জ্ঞান, চারিত্রিক দক্ষতা ও কর্মগুণেই সম্রাট ও সুলতানদের মাথার তাজ হতে পেরেছিলেন। তিনি ক্ষণজন্মা ছিলেন বলেই কুতুব মিনার কমপ্লেক্সে তাকে সমাহিত করা হয়।
লেখক: ব্যাংকার ও গল্পকার