পবিত্র রমজান কেবল একটি মাস নয়, বরং এটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বাসী বান্দাদের জন্য এক জান্নাতি উপহার। মুমিনের আত্মিক প্রশান্তি, গুনাহ থেকে মুক্তি এবং মহান রবের নৈকট্য লাভের শ্রেষ্ঠতম বসন্ত এটি। কিন্তু আমাদের এই অতি মূল্যবান সময়টি কেমন হওয়া উচিত? এর উত্তর রয়েছে আমাদের প্রিয় নবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রাত্যহিক আমল ও জীবনচর্যায়। রমজানে নবিজি (সা.) নিজেকে পরিপূর্ণভাবে সঁপে দিতেন আল্লাহর দরবারে। আসুন জেনে নিই, রহমতের এই দিনগুলোতে কেমন ছিল নবিজি (সা.)-এর দিনলিপি।
১. আল-কোরআনের সঙ্গে গভীর মিতালি
রমজান ও কোরআন যেন অবিচ্ছেদ্য। রাসুল (সা.) এ মাসে প্রচুর পরিমাণে কোরআন তেলাওয়াত করতেন। হযরত জিবরাইল (আ.)-এর সঙ্গে চলত তেলাওয়াতের বিশেষ আদান-প্রদান। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, দীর্ঘ তেলাওয়াতের কারণে রাতগুলো হয়ে উঠত নুরানি। মুমিনের উচিত অন্তত এবারের রমজানে কোরআনের অর্থ বুঝে পড়ার এক নতুন শপথ নেওয়া।
২. প্রশান্তির সেজদা, তারাবি ও তাহাজ্জুদ
দিনের রোজা শেষে রাতের নিস্তব্ধতায় রাসুল (সা.) দীর্ঘ রুকু ও সেজদার মাধ্যমে তাহাজ্জুদ আদায় করতেন। তিনি বলতেন, ‘যে ব্যক্তি ইমানের সঙ্গে সওয়াবের আশায় রমজানে কিয়াম (তারাবি) করবে, তার পূর্বের সব গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।’ নবিজির তাহাজ্জুদ ছিল রবের সঙ্গে এক নিবিড় কথোপকথন।
৩. দান-সদকায় প্রবাহিত বাতাসের মতো বদান্যতা
রাসুল (সা.) সব সময়ই দানশীল ছিলেন, কিন্তু রমজান এলে তাঁর বদান্যতা বহুগুণ বেড়ে যেত। হাদিসের ভাষায়, তাঁর দান তখন ‘প্রবাহিত বাতাসের’ মতো বেগবান হতো। অভাবী মানুষের মুখে হাসি ফোটানো আর ব্যথিতের পাশে দাঁড়ানোই ছিল তাঁর রমজানের অন্যতম ব্রত।
৪. ইফতারি করানো ও ভালোবাসার বন্ধন
রোজাদারকে ইফতার করানো নবিজি (সা.)-এর অত্যন্ত প্রিয় আমল ছিল। তিনি শিখিয়েছেন, অন্যকে ইফতার করালে রোজাদারের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। সাহাবায়ে কেরামও এই শিক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়ে অভুক্ত ও ক্ষুধার্তদের আহারের সংস্থান করাকে গোলাম আজাদ করার চেয়েও সওয়াবের কাজ মনে করতেন।
৫. শেষ দশকের ব্যাকুলতা ও ইতিকাফ
রমজানের শেষ দশ দিন রাসুল (সা.) কোমর বেঁধে ইবাদতে নামতেন। হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রজনী ‘লাইলাতুল কদর’ পাওয়ার জন্য তিনি ইতিকাফ করতেন এবং ব্যাকুল হয়ে স্রষ্টাকে খুঁজতেন। তাঁর এই সাধনা ছিল উম্মতের জন্য মুক্তির এক অনন্য গাইডলাইন।
৬. পরিচ্ছন্ন জীবন ও পাপাচার বর্জন
রোজা কেবল উপবাসের নাম নয়, বরং কুপ্রবৃত্তি দমনের এক ঢাল। রাসুল (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, মিথ্যা ও পাপাচার বর্জন না করলে পানাহার ত্যাগের কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।
রমজানের প্রতিটি মুহূর্ত হীরার চেয়েও দামি। নবিজি (সা.)-এর এই আদর্শগুলো যদি আমরা আমাদের জীবনে প্রতিফলিত করতে পারি, তবেই আমাদের সিয়াম সাধনা সার্থক হবে। আসুন, এবারের রমজানকে আমরা আমল ও আখলাকের মাধ্যমে জীবনের শ্রেষ্ঠ রমজানে পরিণত করি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক