আজ থেকে সাড়ে চৌদ্দশ বছর আগে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মুমিনদের ওপর রোজা ফরজ করেছেন। সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কেবল পানাহার থেকে বিরত থাকাই নয়, বরং এটি আত্মিক পরিশুদ্ধি ও তাকওয়া অর্জনের এক অনন্য মাধ্যম। তবে আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, রোজার এই বিধান কেবল ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং মানবদেহের রোগপ্রতিরোধ ও নিরাময়ে এটি এক মহৌষধ। সারা বিশ্বের বিজ্ঞানীরা এখন একবাক্যে স্বীকার করছেন— সুস্থ থাকার অনন্য চাবিকাঠি হলো সিয়াম সাধনা।
শরীর যখন বিষমুক্ত হয় (ডিটক্সিফিকেশন)
রোজার সময় দীর্ঘক্ষণ পরিপাকতন্ত্র বিশ্রাম পায়। ফলে দেহের কোষগুলো নিজস্ব পরিচ্ছন্নতা অভিযানে নামে। একে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘ডিটক্সিফিকেশন’। এতে শরীরের রক্ত সঞ্চালন বৃদ্ধি পায় এবং টিস্যু থেকে বিষাক্ত বর্জ্য বেরিয়ে গিয়ে শরীরকে সতেজ করে তোলে।
ওজন হ্রাস ও শক্তিশালী বিপাক প্রক্রিয়া
রোজার সবচেয়ে দৃশ্যমান সুফল হলো ওজন নিয়ন্ত্রণ। না খেয়ে থাকার ফলে যকৃতের এনজাইমগুলো শরীরের সঞ্চিত চর্বি ও কোলেস্টেরল গলিয়ে শক্তিতে রূপান্তর করে। এর ফলে স্থূলতা কমে এবং বিপাক হার (Metabolism) ত্বরান্বিত হয়। পাশাপাশি এটি ক্ষুধার হরমোনকে নিয়ন্ত্রণে আনে। ফলে অল্প খাবারেই তৃপ্তি পাওয়া সম্ভব হয়।
রোগপ্রতিরোধে ‘অটোফেজি’র বিস্ময়
জাপানি বিজ্ঞানী ইয়োশিনোরি ওসুমি ‘অটোফেজি’ আবিষ্কার করে নোবেল পেয়েছিলেন। রোজা রাখলে শরীরের এই অটোফেজি প্রক্রিয়া সক্রিয় হয়, যেখানে সুস্থ কোষগুলো ক্ষতিগ্রস্ত বা মৃত কোষগুলোকে খেয়ে ফেলে নতুনের জায়গা করে দেয়। এটি শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করে এবং শ্বেত রক্তকণিকার কার্যকারিতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
হৃদযন্ত্র ও রক্তচাপের সুরক্ষা
রোজায় লবণ গ্রহণের পরিমাণ কমে এবং শরীর থেকে অতিরিক্ত সোডিয়াম প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়। ফলে রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে। রক্তনালিতে জমে থাকা চর্বি দূর হওয়ায় হৃৎপিণ্ড অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সচল ও স্বাস্থ্যকর হয়ে ওঠে।
তারুণ্য ধরে রাখা ও ত্বকের উজ্জ্বলতা
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘমেয়াদি রোজা ‘অ্যান্টি-এজিং’ বা বার্ধক্যরোধী প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করে। নতুন কোলাজেন তৈরির মাধ্যমে ত্বক হয়ে ওঠে উজ্জ্বল ও দাগহীন। শরীরের অপ্রয়োজনীয় টিস্যু ধ্বংস হয়ে নতুন টিস্যু গঠিত হওয়ার কারণে তারুণ্য দীর্ঘস্থায়ী হয়।
মানসিক ভারসাম্য ও মস্তিষ্কের কার্যকারিতা
রোজা কেবল দেহের নয়, মনেরও প্রশান্তি আনে। সংযম ও একাগ্রতার ফলে চিনি ও ক্যালোরি গ্রহণ কমে যায়, যা শারীরিক অবসাদ দূর করে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, শারীরিক ব্যায়ামের মতো রোজাও মস্তিষ্কের নিউরনের কার্যকারিতা বাড়ায়। এতে মনোযোগ এবং স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি পায়, দূর হয় মানসিক অস্থিরতা।
রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ
যারা টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিতে আছেন, রোজা তাদের জন্য আশীর্বাদ। নিয়মিত রোজা রাখলে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কমে এবং রক্তের শর্করা স্থিতিশীল থাকে।
প্রতিটি সুস্থ ও সক্ষম মুসলিমের জন্য রোজা রাখা ফরজ ইবাদত। এই মহান ইবাদতের সর্বোচ্চ সুফল পেতে হলে সেহরি ও ইফতারে সুষম খাবার গ্রহণ, পর্যাপ্ত ঘুম এবং দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন নিশ্চিত করা প্রয়োজন। আল্লাহর দেওয়া এই বিশেষ উপহার যেমন আমাদের পরকালীন পাথেয়, তেমনি ইহকালীন সুস্থতারও শ্রেষ্ঠ গ্যারান্টি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক