ইসলামে কিছু নিকটাত্মীয় নারীকে বিয়ে করা চিরতরে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যাদেরকে 'মাহরাম' বলা হয়। এই নিষেধাজ্ঞা শুধুমাত্র ধর্মীয় অনুশাসন নয়, এর পেছনে রয়েছে সুগভীর মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক, নৈতিক এবং স্বাস্থ্যগত কারণ। এই বিধান পারিবারিক কাঠামোকে পবিত্র, নিরাপদ ও সুসংহত রাখার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক ও নৈতিক কারণে একজন উন্নত ও সুস্থ মানুষের মনে কিছু নিকটাত্মীয়ের প্রতি জৈবিক আকর্ষণ তৈরি হয় না। একজন সুস্থ মানুষ কখনও নিজের মা, বোন বা মেয়ের প্রতি জৈবিক চাহিদা অনুভব করে না। খালা ও ফুফুর প্রতিও মানুষের সহজাতভাবে মায়ের মতোই সম্মান ও স্নেহের অনুভূতি থাকে।
একইভাবে, ভাতিজি-চাচা এবং ভাগনি-মামা সম্পর্ক সমাজে সাধারণত মেয়ে-বাবার মতোই মনে করা হয়, যেখানে স্নেহ ও অভিভাবকত্বের সম্পর্কই প্রধান। অনেক বন্য প্রাণীও এই ধরনের সম্পর্ক থেকে বিরত থাকে।
পারিবারিক জীবনে এই নিকটাত্মীয়দের সাথে নিয়মিত এবং অবাধে মেলামেশা করতে হয়। সাধারণত এসব নারীর সঙ্গে দৈনন্দিন জীবনে নিয়মিত ওঠাবসা ও প্রচুর চলাফেরা করতে হয়। এজন্য এদের সঙ্গে যদি স্থায়ীভাবে বিয়ে হারাম না হতো, তাহলে যেকোনো সময় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা ঘটার বা ফিতনার সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা থাকত। মাহরামের এই বিধান দৈনন্দিন জীবনকে পবিত্র ও নিরাপদ করে।
ইসলাম শুধু বিদ্যমান সম্পর্ককে সুরক্ষা দেওয়াই নয়, বরং নতুন আত্মীয়তার বন্ধন সৃষ্টি করে সামাজিক ঐক্য বাড়াতে চায়। এসব নিকটাত্মীয় নারীদের সঙ্গে পুরুষের একটি চিরস্থায়ী ও অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক বিরাজমান থাকে—যা সম্মান, শ্রদ্ধা বা আদর-স্নেহ হিসেবে প্রকাশিত হয়। যেহেতু এই সম্পর্ক চিরস্থায়ী, তাই এখানে বিয়ের মাধ্যমে নতুন আত্মীয়তা সৃষ্টির প্রয়োজন নেই।
অনাত্মীয়দের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক গড়লে নতুন করে কিছু আত্মীয় হয়, যেমন- শ্বশুর-শাশুড়ি, দেবর, ননদ ইত্যাদি। আর এভাবেই মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও 'মুহাব্বত'-এর বিস্তার ঘটে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তিনি তোমাদের (স্বামী-স্ত্রীর) মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা ও মায়া-মমতা সৃষ্টি করেছেন। (সুরা রুম, ২১)
মাহরাম সম্পর্কগুলো চিরস্থায়ী আবেগ ও মর্যাদার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এদের মধ্যে বিয়ে হলে সেই সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
এসব নিকটাত্মীয় নারী ও পুরুষের মধ্যকার চিরায়ত সম্পর্ক (সম্মান বা স্নেহ) যেভাবে টিকে আছে, সেভাবেই সদা বহাল রাখা দরকার। কিন্তু এদের মধ্যে বিয়ে হলে এসব আবেগ ও সম্পর্ক ঝুঁকির মুখে পড়বে।
স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবনে বাকবিতণ্ডা, মতানৈক্য ও ঝগড়াঝাঁটি হতেই পারে, যা কখনো বিচ্ছেদ ও তালাকের দিকে গড়ায়। নিকটাত্মীয়দের মধ্যে যদি এমন কিছু হয়, তাহলে সেই চিরায়ত ভালোবাসা ও আবেগে ফাটল ধরে সামাজিক ভারসাম্যহীনতা তৈরি হবে এবং বৃহৎ পারিবারিক কাঠামো ভেঙে পড়বে।
নিকটাত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে হলে তাদের মধ্যে শারীরিক বা মেধাগত কোনো রোগ বা অসুস্থতা থাকলে পরবর্তী প্রজন্মও সেসব রোগ ও অসুস্থতায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা খুব বেশি থাকে। স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি এড়ানোর জন্যও এদের মাঝে পারস্পরিক বিয়ে না হওয়াটাই যৌক্তিক।
আরো পড়ুন: যে আয়াত আপনার নিরাপত্তার স্বর্গীয় ঢাল
বিবাহের পর স্ত্রীর অধিকার আদায় এবং রক্ষার জন্য সাধারণত স্ত্রীর নিকটাত্মীয়রা (যেমন ভাই বা বাবা) স্বামীর সাথে তর্ক-বিতর্ক করতে বা মধ্যস্থতা করতে পারেন।
কিন্তু যদি এই নারীর রক্ষকই (ভাই বা বাবা) বিয়ের কারণে তার স্বামী হয়ে যান, তাহলে দাম্পত্য বিরোধেু তার অধিকার রক্ষা করবে কে? এই বিধান নারীর অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি নিরাপদ অবস্থান তৈরি করে। মাহরাম নারীকে বিয়ে না করার বিধান পারিবারিক পবিত্রতা, সামাজিক ভারসাম্য এবং মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও স্বাস্থ্যগত কল্যাণের জন্য ইসলামের একটি অপরিহার্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক