যারা ঈমান রাখে আপনার প্রতি, যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং আপনার পূর্বে যা অবতীর্ণ করা হয়েছে তাতেও এবং তারা আখিরাতে পরিপূর্ণ বিশ্বাস রাখে। পবিত্র কোরআনের শুরুতে মুত্তাকি বা খোদাভীরু বান্দাদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহতায়ালা তাদের এমন কিছু গুণের কথা বলেছেন, যা একজন মুমিনের জীবনদর্শনকে পূর্ণতা দেয়। সুরা বাকারার চতুর্থ ও পঞ্চম আয়াতে এই গুণাবলি এবং এর পুরস্কার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
মুত্তাকিদের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, তারা মহানবি হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ কোরআন এবং তাঁর পূর্ববর্তী নবিগণের ওপর নাজিলকৃত সব কিতাবের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেন। সাহারিগণের যুগে দুই ধরনের মুমিন ছিলেন–একদল যারা সরাসরি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন, আর অন্যদল যারা আগে ইহুদি বা খ্রীষ্টান ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেন। পূর্ববর্তী কিতাবসমূহের প্রতি বিশ্বাসের অর্থ হলো–সেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে সত্য ছিল এবং তৎকালে তা মানা বাধ্যতামূলক ছিল। তবে কোরআন আসার পর আগের সব বিধান রহিত হয়ে গেছে; এখন আমল হবে কেবল কোরআনের অনুশাসনে।
এই বর্ণনায় একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লুকায়িত আছে, তা হলো খতমে নবুওয়াত বা নবুওয়াতের সমাপ্তি। কোরআন মজিদের অন্তত ৫০টি স্থানে পূর্ববর্তী ওহি ও নবিগণের কথা উল্লেখ করা হলেও, কোথাও নবিজি (সা.)-এর পর কোনো নবি বা কিতাব আসার সামান্য ইঙ্গিতও দেওয়া হয়নি। এটিই প্রমাণ করে যে, মুহাম্মদ (সা.)ই শেষ নবি এবং কোরআনই শেষ আসমানি কিতাব।
আরো পড়ুন: যে আয়াত আপনার নিরাপত্তার স্বর্গীয় ঢাল
মুত্তাকিদের চূড়ান্ত গুণ হলো পরকালের প্রতি সুদৃঢ় বিশ্বাস। কোরআন একে ইয়াকিন বা ধ্রুব সত্য হিসেবে অভিহিত করেছে। আখেরাতে বিশ্বাস কেবল একটি ধর্মীয় মতবাদ নয়, বরং এটি মানুষের চরিত্রে আমূল পরিবর্তন আনার এক মহৌষধ। মানুষ যখন বিশ্বাস করে যে, তার প্রতিটি কাজ, চিন্তা এবং গোপন ইচ্ছাও একজন মহাপ্রজ্ঞাবান সত্তার নজরে আছে এবং একদিন তাকে সবকিছুর হিসাব দিতে হবে, তখন সে আর অপরাধে লিপ্ত হতে পারে না। কেবল রাষ্ট্রীয় আইন দিয়ে সমাজ থেকে অপরাধ নির্মূল করা অসম্ভব। কারণ মানুষ নির্জনে বা আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধ করে। কিন্তু আখেরাতের ইয়াকিন মানুষকে প্রকাশ্য ও গোপন–সর্বাবস্থায় পাপাচার থেকে বিরত রাখে।
আয়াতের শেষে ইউমিনুন (বিশ্বাস করে) না বলে ইউকিনুন (দৃঢ়প্রত্যয় রাখে) বলা হয়েছে। অর্থাৎ, পরকালকে চোখের সামনে দেখার মতো করে বিশ্বাস করতে হবে। যাদের অন্তরে এই পর্যায়ের বিশ্বাস ও পরকালীন জবাবদিহিতা জাগ্রত থাকে, কোরআন তাদেরই সফল বলে ঘোষণা করেছে।আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেছেন, তারাই তাদের রবের পক্ষ থেকে হেদায়েতের ওপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম। (সুরা বাকারা, ৫)
কোরআন ও পূর্ববর্তী কিতাবের প্রতি সম্মান এবং আখেরাতের প্রতি অবিচল বিশ্বাসই মানুষকে প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলে। এই বিশ্বাসের মাধ্যমেই অর্জিত হয় দুনিয়ার শান্তি ও পরকালের মুক্তি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক