প্রতি বছর ঈদুল আজহার পর আমাদের শহর ও গ্রামের রাস্তাঘাটে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা হৃদয়কে ব্যথিত করে। রক্তের স্রোত, নাড়িভুঁড়ির স্তূপ, পচা মাংসের দুর্গন্ধ–এই দৃশ্য দেখে যে কেউ প্রশ্ন করতে পারেন, এটাই কি সেই কোরবানির পরিণতি, যা আল্লাহর নৈকট্য লাভের জন্য করা হয়েছিল?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) গবেষণা অনুযায়ী, পশুর রক্ত ও অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খোলা পরিবেশে মাত্র ছয় থেকে আট ঘণ্টায় কলেরা, সালমোনেলা ও ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার ঘনত্ব ১০০০ গুণ বৃদ্ধি পেতে পারে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের হিসাব অনুযায়ী, কোরবানির ঈদের পরদিন রাজধানীতে প্রায় ৩ লাখ টন বর্জ্য সংগ্রহ করা হয়, যা স্বাভাবিক দিনের তুলনায় ছয় থেকে আটগুণ বেশি। আইসিডিডিআর,বির গবেষণা অনুযায়ী, ঈদুল আজহার পরের সপ্তাহে ঢাকায় ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা গড়ে ৪০-৬০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়।
আরো পড়ুন: হজ না করলে ইসলামের দৃষ্টিতে শাস্তি কী?
আমরা কোরবানি করি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। কিন্তু সেই কোরবানির বর্জ্য যদি প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হয়, পরিবেশ দূষণের উৎস হয়, অসুস্থতার কারণ হয়–তাহলে কি আমাদের সেই ইবাদত পূর্ণতা পায়?
যে হাত দিয়ে আজ কোরবানি দিলাম, সেই হাতেই কি বর্জ্য পরিষ্কার করব না? যদি না করি, তাহলে কি সেই ভালোবাসার দাবি করতে পারি, যা আল্লাহ পবিত্রতা অবলম্বনকারীদের জন্য রেখেছেন?
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! জিজ্ঞেস করা হলো–কে, ইয়া রাসুলুল্লাহ? তিনি বললেন, যার অনিষ্ট থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারি, ৬০১৬)
আমার কোরবানির রক্ত ও বর্জ্য কি আমার প্রতিবেশীর কষ্টের কারণ হচ্ছে? পাশের বাড়ির শিশুটি দুর্গন্ধে ঘুমাতে পারছে না। বৃদ্ধ প্রতিবেশী অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। রাস্তায় চলতে পারছেন না পথচারী। এই কষ্ট দেওয়া কি ঈমানদারের কাজ?
পরিবেশবিজ্ঞানীরা জানান, পশুর রক্ত ও বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেললে তা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। কিন্তু খোলা রাস্তায় ফেলে রাখলে তা পানি দূষণ করে, মাটির pH পরিবর্তন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির জীবাণু সক্রিয়তা নষ্ট করে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন, ‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সদকা।’ (মুসলিম, ১০০৯) তিনি আরও বলেছেন, ‘তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো।’ (তিরমিজি, ২৭৯৯) যে নবি (সা.) রাস্তা থেকে একটি পাথর সরানোকেও সদকা বলেছেন, সেই নবির উম্মত হয়ে আমরা কি কোরবানির বর্জ্য রাস্তায় ফেলে রাখব?
প্রিয় কোরবানিদাতা ভাই ও বোনেরা–এবার কোরবানির আগেই একটু প্রস্তুতি নিন। জবাইয়ের আগে একটি গর্ত করুন, যাতে রক্ত সরাসরি মাটিতে শোষিত হয়। জনবহুল রাস্তায় বা ড্রেনের মুখে কোরবানি দেবেন না। জবাইয়ের পর নাড়িভুঁড়ি ও অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য মাটিচাপা দিন—পরিবেশ উপকৃত হবে, মাটির উর্বরতা বাড়বে। জবাইয়ের স্থান পানি দিয়ে ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিন। সিটি করপোরেশনের ডাস্টবিনে নির্ধারিত ব্যাগে বর্জ্য রাখুন। এই কাজগুলো করতে মাত্র কিছু সময় লাগবে। কিন্তু এতে যা অর্জন হবে তা অমূল্য–প্রতিবেশীর দোয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং একটি সুস্থ পরিবেশ।
আরো পড়ুন: শরিকানা কোরবানির অজানা কিছু কথা
কোরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মরণ–যিনি আল্লাহর জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। সেই ত্যাগের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের হৃদয়ে থাকে–তাহলে একটু কষ্ট করে বর্জ্য পরিষ্কার করা কি এত কঠিন?
আসুন এবার প্রতিজ্ঞা করি–কোরবানির পর আমার এলাকা আমি নিজেই পরিষ্কার করব। শুধু সিটি করপোরেশনের অপেক্ষায় থাকব না। কারণ, পরিষ্কার রাখা শুধু আমার দায়িত্ব নয়–এটি আমার ঈমানের অঙ্গ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।’ (বুখারি, ৬০১৫)
এই ঈদে সেরা কোরবানিদাতা শুধু সে নয় যে সবচেয়ে বড় পশু কোরবানি দিয়েছে–সেরা সে, যার কোরবানির পর তার এলাকা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হয়েছে। যার প্রতিবেশী বলেছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ, এই ভাই কোরবানি দিয়েছেন কিন্তু আমাদের কোনো কষ্ট হয়নি।’
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়