لَنْ يَنَالَ اللهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَاؤُهَا وَلٰكِنْ يَنَالُهُ التَّقْوٰى مِنْكُمْ
‘আল্লাহর কাছে পশুর গোশত বা রক্ত পৌঁছায় না—পৌঁছায় কেবল তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)
তাকওয়া মানে কেবল নামাজ-রোজা নয়—তাকওয়া মানে আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশের প্রতি সচেতনতা। পরিবেশ রক্ষার নির্দেশ, প্রতিবেশীর হকের নির্দেশ—এগুলোও আল্লাহরই নির্দেশ। তাই কুরবানির পর বর্জ্য পরিষ্কার না করা মানে কুরবানির তাকওয়াকেই অসম্পূর্ণ রাখা। রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন—রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলা সদকা। (বুখারি, হাদিস: ২৯৮৯) তাহলে কুরবানির বর্জ্য পরিষ্কার করা—শুধু দায়িত্ব নয়, এটি সদকার সমতুল্য ইবাদত।
স্বাস্থ্যবিজ্ঞান যা বলছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) গবেষণা বলছে—পশুর রক্ত ও নাড়িভুঁড়ি খোলা পরিবেশে ফেলে রাখলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কলেরা, সালমোনেলা ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়া দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে। এই ব্যাকটেরিয়া পানির সাথে মিশে ডায়রিয়া, টাইফয়েড ও আমাশয়ের মহামারি ঘটাতে পারে। কুরবানির পশুর রক্ত যখন নর্দমায় মিশে জলাবদ্ধতা তৈরি করে—তখন সেখানে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়ার বাহক মশার প্রজনন হয় দ্রুতগতিতে। বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী—প্রতি বছর ঈদুল আযহার পর রাজধানীতে পানিবাহিত রোগের প্রাদুর্ভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পচা রক্ত ও নাড়িভুঁড়ি থেকে নির্গত অ্যামোনিয়া ও হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাস শ্বাসকষ্ট, মাথাব্যথা ও বমির কারণ হয়। শিশু ও বৃদ্ধরা এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন।
পরিবেশবিজ্ঞান যা বলছে: পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন—পশুর রক্ত ও বর্জ্য মাটিতে পুঁতে ফেললে তা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। কিন্তু খোলা রাস্তায় ফেলে রাখলে তা পানি দূষণ করে, মাটির pH পরিবর্তন করে এবং দীর্ঘমেয়াদে মাটির জীবাণু সক্রিয়তা নষ্ট করে। একটি পরিসংখ্যান হৃদয়কে নাড়া দেয়—বাংলাদেশে প্রতি বছর কুরবানি ঈদে প্রায় এক কোটির বেশি পশু কুরবানি হয়। প্রতিটি পশু থেকে গড়ে ১০-১৫ কেজি বর্জ্য তৈরি হয়। মোট বর্জ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১০-১৫ লক্ষ টন। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্য যদি সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা না হয়—তাহলে পরিবেশ বিপর্যয় অনিবার্য।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ: রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা পরিচ্ছন্নতার প্রতি যত্নশীল ছিলেন। তিনি বলেছেন—
وَتُمِيطُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ
‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ করাও একটি সাদাকা।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০০৯) তিনি আরও বলেছেন—’তোমরা তোমাদের আঙিনা পরিষ্কার রাখো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৭৯৯) যে নবি (সা.) রাস্তা থেকে একটি পাথর সরানোকেও সদকা বলেছেন—সেই নবির উম্মত হয়ে আমরা কি কুরবানির বর্জ্য রাস্তায় ফেলে রাখব?
একটি গল্পের মতো সত্য ঘটনা: গত বছর ঈদুল আযহার পরদিন ঢাকার একটি আবাসিক এলাকায় পাঁচ বছরের শিশু আরাফ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল—তীব্র ডায়রিয়া ও বমিতে। ডাক্তার বলেছিলেন—পানি দূষণ থেকে সংক্রমণ। সেই পানি দূষিত হয়েছিল কুরবানির রক্ত ড্রেনে পড়ে। কে দায়ী ছিল সেই শিশুর অসুস্থতার জন্য? যে কুরবানি দিয়েছিল এবং রক্ত ড্রেনে ফেলে দিয়েছিল—সে কি জানত না যে এই রক্ত একটি শিশুকে অসুস্থ করতে পারে? আল্লাহর দরবারে সেই কুরবানির হিসাব কী হবে—যে কুরবানির বর্জ্য একটি নিরীহ শিশুর কষ্টের কারণ হয়েছে?
আমরা কী করব? প্রিয় কুরবানিদাতা ভাই ও বোনেরা—এবার কুরবানির আগেই একটু প্রস্তুতি নিন। জবাইয়ের আগে একটি গর্ত করুন—যাতে রক্ত সরাসরি মাটিতে শোষিত হয়। জনবহুল রাস্তায় বা ড্রেনের মুখে কুরবানি দেবেন না। জবাইয়ের পর নাড়িভুঁড়ি ও অপ্রয়োজনীয় বর্জ্য মাটিচাপা দিন—পরিবেশ উপকৃত হবে, মাটির উর্বরতা বাড়বে। জবাইয়ের স্থান পানি দিয়ে ধুয়ে ব্লিচিং পাউডার ছিটিয়ে দিন। সিটি কর্পোরেশনের ডাস্টবিনে নির্ধারিত ব্যাগে বর্জ্য রাখুন। এই কাজগুলো করতে মাত্র কিছু সময় লাগবে। কিন্তু এতে যা অর্জন হবে তা অমূল্য—প্রতিবেশীর দোয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং একটি সুস্থ পরিবেশ।
কুরবানি ইবরাহিম (আ.)-এর সেই মহান ত্যাগের স্মরণ—যিনি আল্লাহর জন্য সবকিছু উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন। সেই ত্যাগের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের হৃদয়ে থাকে—তাহলে একটু কষ্ট করে বর্জ্য পরিষ্কার করা কি এত কঠিন?
আসুন এবার প্রতিজ্ঞা করি—কুরবানির পর আমার এলাকা আমি নিজেই পরিষ্কার করব। শুধু সিটি কর্পোরেশনের অপেক্ষায় থাকব না। কারণ পরিষ্কার রাখা শুধু আমার দায়িত্ব নয়—এটি আমার ঈমানের অঙ্গ।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—’তোমাদের মধ্যে সে-ই উত্তম, যে তার প্রতিবেশীর কাছে উত্তম।’ (বুখারি, হাদিস: ৬০১৫)
এই ঈদে সেরা কুরবানিদাতা শুধু সে নয় যে সবচেয়ে বড় পশু কুরবানি দিয়েছে—সেরা সে, যার কুরবানির পর তার এলাকা সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন হয়েছে। যার প্রতিবেশী বলেছে—’আলহামদুলিল্লাহ, এই ভাই কুরবানি দিয়েছেন কিন্তু আমাদের কোনো কষ্ট হয়নি।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক