অবলা প্রাণীদের কোনো ভাষা নেই, তীব্র যাতনা হলেও ওরা মুখ ফুটে বলতে পারে না। কিন্তু আপনি কি জানেন, ওদের চোখের পানি সরাসরি স্রষ্টার আরশে গিয়ে পৌঁছায়? একটি নিরীহ প্রাণীর প্রতি সামান্য নিষ্ঠুরতা যেমন পরকালে ভয়াবহ শাস্তির কারণ হতে পারে, তেমনি ওদের প্রতি একটুখানি ভালোবাসাই হতে পারে আমাদের মুক্তির উসিলা। বিশেষ করে কোরবানির এই পবিত্র সময়ে, অবলা পশুর প্রতি আমাদের আচরণ কেমন হওয়া উচিত?
কোরবানি মুসলমানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত। এর মূল শিক্ষাই হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ত্যাগ, তাকওয়া ও মানবিকতা অর্জন করা। ইসলাম যেমন মানুষের প্রতি সহমর্মিতার শিক্ষা দেয়, তেমনি পশু-পাখির প্রতিও দয়াশীল হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রত্যেক বিষয়ে 'ইহসান' বা সদয় আচরণ আবশ্যক করেছেন। সুতরাং তোমরা যখন জবাই করবে, তখনো সদয়ভাবে করবে। ছুরি ভালোভাবে ধারালো করে নেবে এবং পশুকে যথাসম্ভব আরাম দেবে।’
ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি শুধু একটি প্রথা নয়, এটি নৈতিক উৎকর্ষের পরীক্ষা। তাই পশুকে ধরা, শোয়ানো বা জবাই করার প্রতিটি ধাপে সর্বোচ্চ কোমলতা বজায় রাখা আমাদের ঈমানি দায়িত্ব। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের সমাজে অনেক সময় দেখা যায়—পশু জবাইয়ের পরপরই, ছটফটানি বন্ধ হওয়ার আগেই চামড়া ছাড়ানো, পায়ের রগ কাটা কিংবা গলায় বারবার খোঁচাখুঁচি করা হয়। তখনো পশুর প্রাণ পুরোপুরি বের হয় না। এই তাড়াহুড়ো ও অসতর্কতা চরম নিষ্ঠুরতা এবং ইসলামের শিক্ষার সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
ইসলামি আইন বা ফিকহের কিতাবগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—পশু পুরোপুরি নিস্তেজ হওয়ার আগে তার চামড়া খসানো বা অঙ্গ কাটা 'মাকরুহ' বা অপছন্দনীয়। বিখ্যাত ফকিহ আল্লামা মাওসিলি (রহ.) বলেছেন, নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া খসানো যাবে না, কারণ এতে পশু তীব্র যন্ত্রণা ভোগ করে।তবে হ্যাঁ, অসচেতনতাবশত কেউ যদি নিস্তেজ হওয়ার আগে চামড়া কেটেও ফেলে, তাতে পশুর গোশত হারাম হবে না, কিন্তু এমন নিষ্ঠুর আচরণের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
কোরবানি আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয়, নিষ্ঠুরতার নয়। আসুন, জবাইয়ের পর তাড়াহুড়ো না করে পশুর প্রাণ সম্পূর্ণ বের হওয়া নিশ্চিত করি। আমাদের কোরবানি যেন শুধু লোকদেখানো না হয়ে, প্রকৃত তাকওয়া আর মানবিকতার প্রতীক হয়। মহান আল্লাহ আমাদের কোরবানি কবুল করুন। আমিন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক