ঢাকার নাগরিকদের জন্য বাংলাদেশের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের প্রথম তোপ দাগা হলো ২৫ মার্চ রাত ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে আমরা যখন কামানের গর্জন শুনতে পেলাম। ইপিআর এবং পুলিশ সদর দপ্তরের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর আক্রমণ শুরু হওয়ার সংকেত ছিল এটা। ধানমন্ডি ৩২-এর একটি সরাসরি টেলিফোন নম্বর আমার কাছে ছিল। সেটাতেই ফোন করে বঙ্গবন্ধুর নিরাপত্তার বিষয়ে খোঁজ নিলাম। জানি না ফোনে কে কথা বলেছিল, তবে কণ্ঠস্বরে ইঙ্গিত ছিল যে তিনি সেখানেই রয়েছেন। পরের কলগুলো নিরুত্তর থেকে যায়। তার পর সব সংযোগ ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
পরের ৩৬ ঘণ্টা আমরা কামানের গর্জন আর স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলিবর্ষণের আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমাদের গুলশানের বাড়ির ছাদ থেকে দেখা গেল দূরে সামরিক আক্রমণে আগুনের লেলিহান শিখা। বালিশে দানবীয় মুষ্টাঘাতের মতো শোনাচ্ছিল গোলাবর্ষণের আওয়াজ। প্রতিটি ধড়াস শব্দে বুঝতে পাচ্ছিলাম মৃত পাকিস্তানের শবাধারে আর একটি পেরেক পোঁতার আওয়াজ শুনছি আমরা।
পরদিন সকালে ইয়াহিয়ার বেতার ভাষণে আমরা শুনলাম আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ঘোষণা, আর তার সঙ্গে ছিল ঢাকা আলোচনার গতি-প্রকৃতি নিয়ে মিথ্যা বিবরণ। সে বলল, তার প্রাথমিক লক্ষ্য শৃঙ্খলা ফেরানো। কিন্তু বাঙালিরা ইয়াহিয়ার এই কাজকে ঠিকই স্বাধীন বাংলাদেশের ওপর বিদেশি সেনার আক্রমণ হিসেবে ধরে নিল এবং সেই মতোই জবাব দিল। আমরা বুঝলাম মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। কখন তা শেষ হবে তার কোনো ধারণা কারও ছিল না।
পরের ৩৬ ঘণ্টা আমাদের বাড়িতে আটক থেকে টেলিফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন আমরা কেবল গণহত্যার আওয়াজ শুনতে পাচ্ছিলাম। ২৬ মার্চ মাজহার গুলশান অ্যাভিনিউ পেরিয়ে রাশিয়ান কনস্যুলেটে গিয়ে খোঁজ নিতে চাইছিলেন সেখানে তার চেনাশোনা কেউ যদি তাকে বিমানবন্দরে পৌঁছাবার ব্যবস্থা করে দিতে পারে। মিশন সফল হয়েছিল এবং দূতাবাসের এক কর্মীর গাড়িতে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর পৌঁছে লাহোরগামী প্লেনে উঠতে পেরেছিলেন মাজহার। আমরা পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিলাম এই জেনে যে, হয়তো আর কোনোদিনই আমাদের দেখা হবে না।
২৭ মার্চ সকালে কারফিউ তুলে নেওয়া হলো। এ সময় পর্যন্তও নিজেকে যোদ্ধা ভাবিনি। সুতরাং সেদিন সকালে আমি প্রথমেই গুলশানে ফোর্ড ফাউন্ডেশন-এর গেস্ট হাউসে গিয়ে ওখানকার আবাসিক এবং পিআইডিইর ভিজিটিং স্কলার সরবোর্নের ড্যানিয়েল থর্নার-এর সঙ্গে দেখা করি। নুরুল ইসলামের ব্যাপারে আমি বিশেষ চিন্তিত ছিলাম। তার ধানমন্ডির বাড়ি মার্চের ২৫ দিন বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপের কেন্দ্রস্থল ছিল। ফলে সে সামরিক বাহিনীর লক্ষ্যবস্তু হতেই পারে। আমি সেজন্য ড্যানিয়েলকে বলি তখনই গাড়ি নিয়ে ধানমন্ডি গিয়ে নুরুল ও তার পরিবার নিরাপদে আছে কি না তা দেখে আসতে।
বাড়ি ফিরে দেখি আমার বন্ধু মঈদুল হাসান আমার জন্য অপেক্ষা করছে। সে আমাকে বলল, আমি যদি প্রাণের মায়া করি, তবে যেন এক্ষুণি এই বাড়ি ছেড়ে যাই। সে জানায়, সেনাবাহিনী ইতোমধ্যেই ব্যাপক হারে মানুষ মারা শুরু করেছে। সে কামাল হোসেনের বাড়ির সঙ্গে যোগাযোগ করে জেনেছে তাকে তুলে নিতে সেনারা এসেছিল, কিন্তু কামাল সে সময় বাড়িতে ছিল না। একইভাবে মঈদ নুরুলসহ আরও বেশ কয়েকজন বন্ধুর নিরাপত্তার খোঁজ নেয়। শুরুর সে দিনগুলোতে তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয় সে এবং দরকারমতো সীমান্ত পেরিয়ে তাদের ঢাকা থেকে পালাবার বন্দোবস্ত করে দেয়। সে নিজে ঢাকা ছাড়ার আগে আমাদের ঘনিষ্ঠ যে দুই বন্ধু এখানে থেকে গিয়েছিল, যথাক্রমে জিয়াউল হক (টুলু) ও মোখলেসুর রহমান (সিধু মিয়া) এদের দুজনকে নিয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং মুজিবনগরের গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের কাছে সেগুলো পৌঁছে দেওয়ার একটা পদ্ধতি গড়ে তুলেছিল মঈদ।
আমি এতদিন পর্যন্ত অত্যন্ত নির্বোধের মতো একবারও ভাবিনি যে আমি নিজে কখনো সেনাবাহিনীর টার্গেট হতে পারি। কারণ, রাজনৈতিক অর্থনীতিকের খোলসে থাকায় মনে করেছিলাম সেনাবাহিনী আমাকে সক্রিয় রাজনীতিবিদ হিসেবে বিবেচনা করবে না বা আমাকে একজন সম্ভাব্য যোদ্ধা হিসেবে গ্রেপ্তারের কথা ভাববে না। মঈদ আমার ভুল ভেঙে দেয় এবং বিপদ সম্পর্কে সতর্ক করে পরামর্শ দেয় যে, একটুও দেরি না করে বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত আমার। আমি কোনোভাবেই আমার পরিবারকে বিপদের মুখে ছেড়ে যেতে রাজি ছিলাম না। কিন্তু সালমার তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত ছিল আমার উপস্থিতি বরং তাদের বিপদ ডেকে আনতে পারে, এবং যেভাবেই হোক ঢাকা ছেড়ে যাওয়া বাচ্চাদেরসহ তার একার জন্য অনেক সহজ হবে। ফলে আমি স্বাধীনভাবে মুক্তিযুদ্ধে যুক্ত হতে পারব।
ভীষণ অনিচ্ছায় আমি আমার পরিবারকে ফেলে মঈদের গাড়িতে উঠি। সে আমাকে নিয়ে যায় আমার খালাতো বোন সারওয়ার এবং জামিলুর রহমান খানের বাড়িতে। সেখানে দেখি, তাদের বাসায় ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে পালিয়ে আসা মানুষে ভরে গেছে, যারা ভেবেছিল সেনাবাহিনীর বন্দুকের হাত থেকে বাঁচতে রমনা বা ধানমন্ডির তুলনায় নিরাপদ আশ্রয় হতে পারে গুলশান। সেখানে হামিদা হোসেন, তার দুই অল্পবয়সী মেয়ে সারা এবং দিনা এবং তার ভাতিজি ফওজিয়া আহমেদকে দেখলাম। হামিদা আমাকে জানায়, কামাল বাড়ি ছেড়ে তাজউদ্দিনের বাড়িতে চলে যায়, যেখান থেকে তারা দুজন ২৫ মার্চ রাতে আমি তাদের বাড়ি থেকে বের হওয়ার অল্প কিছুক্ষণ পরেই বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। পরে ভোর রাতে কামালের খোঁজে একদল সেনা তাদের বাড়িতে চড়াও হয়। হামিদার সঙ্গে তারা উদ্ধতভাবে কথা বলে, দুই মেয়েকে ভয় দেখায় এবং ফওজিয়া তাদের এ ধরনের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন তুললে সেনাদলের কমান্ডিং অফিসার তাকে চড় মারে; সামরিক ভব্যতা ও শৃঙ্খলার দারুণ এক নমুনা বটে। কামালকে সেখানে না পেয়ে তারা চলে যায়, তবে যাওয়ার আগে শাসিয়ে যায় যে, তারা ফিরে আসবে। তাদের আবার আসার বিষয়ে হামিদা খুব একটা উদ্বিগ্ন হয়নি, তবে সান্ধ্য আইন ওঠা মাত্র জামিলের কাছে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।
জামিল আমাকে পরামর্শ দেয় যে, আত্মগোপন যদি আমার উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তবে এত পালিয়ে আসা মানুষের সমাগমে দ্রুত ভরে ওঠা তার বাড়ি নিরাপদ স্থান নয়। তখন আমি মুঈদকে বলি, গুলশানে ১ ও ২ নম্বরের মাঝামাঝি আমাদের আর এক বন্ধু ব্যারিস্টার ভিকারুল ইসলাম ও তার স্ত্রীর বাড়িতে আমাকে নিয়ে যেতে। ভিকার জানায় তার বাড়ি খুব নিরাপদ নয়, কারণ পাশেই একটি অ্যাপার্টমেন্টে অজানা জায়গা থেকে আসা এক পাকিস্তানি থাকে। যে আমার উপস্থিতির কথা জানিয়ে দিতে পারে। ভিকার তখন মহাখালীর কলেরা রিসার্চ ল্যাবরেটরি (সিআরএল)-তে কাজ করা এক আমেরিকান জন রোডি (Rhode)-এর কাছে আমাকে নিয়ে যায়। রোডি পরিবার গুলশান অ্যাভিনিউর উল্টো দিকে একটা ছোটো বাড়িতে থাকত। কোনোরকম দ্বিধা ছাড়াই রোডিরা আমাকে স্বাগত জানায় এবং পরবর্তী দুরাত সেখানে থাকতে দেয়। রোডি পরিবার এবং উইলিয়াম গ্রিনহাউ এবং ডেভিড নলিন প্রমুখ তাদের সিআরএল সতীর্থদের পরে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেখানে তারা নিজেদের বাংলাদেশের সবচেয়ে সরব ও সক্রিয় বন্ধু প্রমাণ করেছিল মার্কিন কংগ্রেসে বাংলাদেশ গণহত্যার প্রমাণ পেশ করে এবং সেখানকার মিডিয়ায় আমাদের অবস্থার কথা প্রচার করে।
বিকেলে মঈদ জানাল, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিচার্স কোয়ার্টারে গিয়েছিল, সেখানে সে হত্যাকাণ্ডের নমুনা দেখেছে। মঈদ জানাল, সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টিচার্স কোয়ার্টারে গিয়েছিল, যে ফ্ল্যাটগুলোয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক আনিসুর রহমানরা থাকতেন মুঈদ সে ব্লকে গিয়ে পরিত্যক্ত বিল্ডিংয়ের মেঝেতে, সিঁড়িতে রক্তের স্রোত দেখতে পায়। খবর ছড়িয়েছে যে, অধ্যাপক রাজ্জাক সেনাদের হাতে নিহত হয়েছেন। এ খবরে আমি অত্যন্ত বিচলিত হয়ে পড়ি। তিনি শুধু যে আমার ঘনিষ্ঠজন ছিলেন সেজন্যই নয়, এ থেকে আমি এতক্ষণে পরিষ্কার বুঝতে পারি যে, সেনাবাহিনীর বর্ধিত নিশানায় এমন মানুষও রয়েছেন, যারা সাম্প্রতিক ঘটনাবলির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্তও নন।
অর্থনীতিক থেকে যোদ্ধা
২৭ মার্চ রাত কাটালাম আমার নতুন আশ্রয়ে। সে রাতে রেডিও খুলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করা মেজর জিয়াউর রহমানের একটা ক্ষীণ বেতারবার্তা শুনি। আমরা ভেবে অবাক হই কে এই মেজর জিয়া এবং আশা করি যে, এই ঘোষণা নাগরিক মনে এবং বিশ্বে বিভ্রান্তি তৈরি করবে না, যারা একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানকেই বাংলাদেশের মুখপাত্র জেনে এসেছে।
আমি যোদ্ধা পদমর্যাদার নই, এ বিষয়ে আমার যা কিছু সংশয় ছিল পরের সকালে তা কাটিয়ে দেয় মঈদ। সে আমাদের বাড়িতে গিয়ে সালমার সঙ্গে দেখা করে আমার কাছে এসেছিল। সালমা তাকে জানিয়েছে, আগের সন্ধ্যায় কারফিউ উঠে যাওয়ার ঠিক পরই জনৈক ক্যাপ্টেন সাঈদউদ্দিনের সৌজন্যে আমি আনুষ্ঠানিকভাবে মুক্তিযোদ্ধা পদে উন্নীত হয়েছি। একদল সৈন্য নিয়ে সাঈদউদ্দিন আমাদের বাড়িতে এসেছিল আমাকে গ্রেপ্তার করতে। সেনাবাহিনীর যে দলটি ২৫ মার্চ রাতে ধানমন্ডির ৩২ নম্বর রোডের বাড়ি থেকে বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে তাদের নেতাদের একজন ছিল সাঈদউদ্দিন।
পাকিস্তানি সেনারা যখন আমার বাড়িতে হানা দেয়, আমার বড় ছেলে সবে আট বছরের তৈমুর তখন একা ঘরের মেঝেয় শুয়ে বই পড়ছিল। সাঈদউদ্দিন তাকে জিজ্ঞেস করে আমি কোথায় আছি। আমাদের বাড়ি লুটপাট করতে থাকা বন্দুক বাগানো সেনাদের সামনে তৈমুর খুব ঠাণ্ডা মাথায় নিজেকে সামাল দিয়েছিল। বাবরকে নিয়ে পাশের বাড়িতে আমিনা ও আলিজুনের সঙ্গে কফি খাচ্ছিল সালমা। আমাদের দুটো বাড়ির মাঝের দেয়ালে একটা ছোটো সংযোগকারী দরজা ছিল। আমাদের পরিচারিকা নয় মাসের জাফরকে নিয়ে গ্যারাজের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। সে তাড়াতাড়ি পাশের বাড়ি চলে গিয়ে জাফরকে সালমার হাতে দিয়ে চিৎকার করে বলে পাকিস্তানি সেনারা আমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। বাড়িতে একা থাকা তৈমুরের জন্য তাৎক্ষণিক উদ্বিগ্ন সালমা খালি পায়ে সংযোগকারী গেট দিয়ে বাড়িতে ছুটে আসে কিন্তু বন্দুকের নল ঠেকিয়ে তাকে ঢুকতে দেওয়া হয় না। সাঈদউদ্দিন তাকে ঢুকতে দিয়ে প্রথমেই আমি কোথায় আছি জানতে চায়। যখন সে শোনে সবে সেদিন সকালে আমি বাড়ি ছেড়েছি, সে সালমাকে বলে খুব সাহসী অথবা বোকা লোক বলেই আমি এত দীর্ঘ সময় বাড়িতে কাটিয়েছি। তারা ভেবেছিল খুব বেশি দূরে আমি যেতে পারিনি এবং সে বলে যদি আমার স্ত্রী ও ছেলেদের সে পণবন্দি করে নিয়ে যায় তবে ‘আমি বেরিয়ে আসতে বাধ্য হব’।
সাঈদউদ্দিনের হিসাব খুব নিখুঁত ছিল কারণ এরকম ক্ষেত্রে আমি অবশ্যই বিনা দ্বিধায় সামরিক বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করতাম, যদি তার বিনিময়ে আমার পরিবারের মুক্তি সুনিশ্চিত হতো। আমিনা ও আলিজুনের হস্তক্ষেপে এই ভয়ংকর ঘটনা এড়ানো গিয়েছিল। পাশের বাড়িতে সালমার উপস্থিতির জামিনদার থাকার প্রতিশ্রুতি দেয় তারা। সাঈদউদ্দিন এই আশ্বাস মেনে নিয়েছিল, কারণ সে জানত যে জেনারেল ইয়াকুব ইস্পাহানি বাড়ির নিয়মিত অতিথি ছিলেন। আমিনা ও আলিজুনের কাছে আমি রক্তঋণে আবদ্ধ, যা আমি কোনোদিন শোধ করতে পারিনি।
তাদের অভিযানের প্রথম ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আমাকে ধরতে চেয়ে যে সম্মান পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাকে দেয়, তা প্রমাণ করে দিল যে আমি এবার তাদের টার্গেট। মঈদ আমাকে পরামর্শ দেয় আমার ঢাকা ছেড়ে যাওয়া উচিত কারণ এর পর বাড়ি বাড়ি তল্লাশি হবে যেটা আমার আশ্রয়দাতা যে কাউকে বিপদে ফেলবে। মুঈদের হাত দিয়ে সালমাও আমাকে একটা বার্তা পাঠিয়ে পরামর্শ দিল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব দেশ ছেড়ে চলে যাওয়া উচিত আমার। যাতে তাদের বিপদের আশঙ্কা কমবে। যুদ্ধ কোনদিকে গড়াবে বা আমাদের ভূমিকা সেখানে কী রকম হতে পারে সে সম্পর্কে কোনো দূরদৃষ্টি সে পর্যায়ে ছিল না। আমি একটা চিরকুট পাঠিয়ে সালমাকে বলি, ঢাকা ছেড়ে যেতে এবং সেটা বিদেশ হওয়া বাঞ্ছনীয় যাতে মুক্তিযুদ্ধে আরও নিশ্চিন্তভাবে সক্রিয় হতে পারি আমি।
ঢাকা থেকে সালমার করাচি প্রস্থানে সহজ করেছিল আরেক বন্ধু আখতার ইস্পাহানি, যার তখন বিয়ে হয়েছে আলিজুনের চাচাতো ভাই ইস্কি ইস্পাহানির সঙ্গে। ইস্কি সেন্ট পলস স্কুলে আমার সঙ্গে পড়েছে। আখতার ক্যান্টনমেন্টে তার নিজস্ব যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে সালমা ও আমাদের ছেলেদের করাচি যাওয়ার অনুমতি আদায় করে এই আবেদন জানিয়ে যে, সালমা একজন দেশভক্ত সরলমতি পাকিস্তানি, যে এই বিচ্ছিন্নতাকামী রেহমান সোবহানকে বিয়ে করেছে তার বিপজ্জনক সঙ্গের কথা না জেনে। সুখের কথা এই ফন্দি কাজে লাগে এবং আমার প্রস্থানের এক সপ্তাহের মধ্যে সালমা ও ছেলেরা করাচি পৌঁছিয়ে তার মায়ের কাছে গিয়ে ওঠে। দিল্লিতে বসে এ খবর পেয়ে খুব আশ্বস্ত হয়েছিলাম আমি, তবু চাইছিলাম পাকিস্তানের বাইরে, সামরিক বাহিনীর আওতার বাইরে চলে যাক সালমা।
[উতল রােমন্থন বউ থেকে সংকলিত]
লেখক: বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ