ছখিনাকে প্রথম দেখায় মনে হয়েছিল চারকোলে আঁকা জয়নুল আবেদীনের অসমাপ্ত টানটোন। পুরো রমণী হয়ে ওঠেনি। কোটরে ঢুকে পড়া ছানি পড়া দুই চোখে খিদের বিলবোর্ডে স্পষ্ট ছিল প্রশ্ন। ছখিনাকে প্রথম দেখে মনে হয়নি সে মানুষ। মনে হয়েছিল ভূত। এরপর যখন মনে হয়েছিল, ভূত না হলেও হতে পারে। তখন মনে হয়েছিল, মানুষের সমাজে ছখিনা বড্ড বেমানান। জঙ্গলে ছেড়ে দিলে বুনো গাছপালা প্রকৃতি প্রাণীর সঙ্গে আলাদা করতে কষ্ট হবে। ছখিনার জন্য হয়তো সেটাই ভালো হতো।
বিশাল ধানখেতের মাঝখানে আলিশান লন্ডনি বাড়ি। উপজেলা চেয়ারম্যান আজিজ হাওলাদারের বাড়ি। জনতার তাড়া খেয়ে পলাতক। জনতা বাড়িটাতে আগুন দিয়েছিল, লুটপাটও করেছে। কিছুদিন হলো বাড়িটার দখল নিয়েছে জমশেদ আরমান। কীভাবে নিয়েছে, সেসব বৃত্তান্ত বলতে গেলে ছখিনার কথা আজ আর বলা হবে না। ঢাকা থেকে উড়িয়ে আনা দুইখান রাশিয়ান মেয়ে আর আরমানের সাত বন্ধু এই বাড়িতে এসে ছখিনাকে দেখেছে, আজ তাই ছখিনার কথাই বলা উচিত।
জমশেদ আরমান ফুর্তিবাজ। লুকোচুরি লুকোচুরি গল্পের আদলে সারা বাড়ির বাতি নিভিয়ে কে কাকে খুঁজে পাবে স্টাইলে ফুর্তির চিত্রনাট্য জমশেদের মাথা থেকেই এসেছিল। সেই চিত্রনাট্যের গভীরেও আজ যাওয়া হবে না, কেননা ছখিনা চিত্রনাট্যে না থাকা সত্ত্বেও সেখানে ছিল এবং ওরা রিভিউ হিসেবে প্রত্যেকে ছখিনার কথা বলছে, সেহেতু ছখিনার কথাই বলতে হবে।
ওরা ছখিনার কথা বলতে শুরু করে রাত পার করা সকালে। যে ধকল গেছে সবার, তাতে দুপুর পর্যন্ত গড়ানোর কথা ছিল। অথচ ঘুমহীন লাল টকটকে চোখ নিয়ে ওরা পরস্পরকে দেখে। রাশিয়ান মেয়ে দুটি রুশ ভাষায় নিজেদের ভেতর কী বলছে, তা অনুবাদ ছাড়াই বোধগম্য হয়। ওরাও ছখিনাকে নিয়েই বলছে। ওদের কাছে স্পষ্ট নয়, ওরা কি ছখিনাকে ঘুমের ভেতর দেখেছে নাকি ঘুমভরা চোখে মূত্রথলি হালকা করতে টয়লেটে যাওয়ার সময় দেখেছে। যেভাবেই হোক, দেখেছে। আলো বাদ দিয়ে অন্ধকারকে ক্যানভাস বানিয়ে সেই ক্যানভাস থেকে উঠে এসেছিল চারকোলে আঁকা টানটোন। মাথার ঘোমটা টেনে ওদের দিকে এগিয়ে এসে কাঁপা কাঁপা হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলেছে, আমি কলাম বাঁইচে আছি।
কেউ কেউ নাকি কাঁপতে কাঁপতে বলেছিল, ভূত! বাঁচাও!
তখন সেই চারকোল হাত নাড়িয়ে জানিয়েছে, সে ভূত না। মানুষ। বলেছে, আমি ছখিনা। ওই যে যারে মরা কইয়ে ঘোষণা দেছেন, আমি সেই ছখিনা। আমি কলাম বাঁইচে আছি।
নেশাভরা মাথায় ঢোকেনি, যে মানুষ বেঁচে আছে তাকে মরা বলে ঘোষণা দিয়েছে কে? ছখিনাই বুঝিয়ে বলেছে যে ঘোষক হচ্ছে চেয়ারম্যান। তাই সে চেয়ারম্যানের অফিসে বহুবার গেছে। চেয়ারম্যান আজ না কাল আসো বলে ঘোরাচ্ছে। আজ সে বাড়িতে এসেছে। বেঁচে থাকার ঘোষণা না নিয়ে যাবে না।
ছখিনা বিবির চেহারা নয়, কোটরে ঢুকে যাওয়া দুই চোখের কথা বলতে থাকে ওরা। কী আকুতি ছিল চোখে! মানুষ বেঁচে থাকলে এমন আকুতি ফুটিয়ে তুলতে পারে। ভূতরা পারে কি না জানা নেই। তবে যে ঘোষণার কথা বলছিল, সেই ঘোষণা কি ভূতদের দরকার হয়? এ কেমন ঘোষণা? মৌখিক না লিখিত? লিখিত হওয়ারই সম্ভাবনা বেশি। লিখিত ঘোষণা কী তবে প্রত্যয়নপত্র বা সার্টিফিকেট জাতীয় কিছু? ভূত হিসেবে বেঁচে থাকতে সার্টিফিকেট লাগে? জানা নেই। তবে মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকতে কখনো কখনো সার্টিফিকেটের দরকার হয়ে পড়ে বৈকি। ছখিনা তার দরকার বোঝাতে যেমন বলেছিল, বাঁইচে আছি নেহা দেখালি আমারে আবার টাহা দেবে। টাহা পাচ্ছিনে কত মাস! কিরাম অ’রে চলব কতি পারবেন?
ফুর্তির সুবিধার্থে দুজন ছাড়া বাকি চাকরদের ছুটি দিয়েছিল আরমান। সেই দুজন ছুটে এল। ছখিনাকে ডেকে আনার হুকুম পেয়ে ওরা দুজনেই চমকায়। বলে, এ নামে কেউ তো এই বাড়িতে নেই। থাকার কথাও না। অন্তত ওদের জানা নেই।
বাড়ির চারপাশে সাত ফুট উঁচু সীমানা দেয়াল। এর উপরে আবার কাঁটাতারের কুণ্ডলী। সদরে ভারী দরজা। আরমানরা ঢোকার পর সেই দরজা নিজের হাতে বন্ধ করেছে দুজন। এইবার ভাবতে বসে ওরা। সত্যিই তো, ছখিনা বাড়ির ভেতর ঢুকল কীভাবে? মানুষ হলে ঢোকা মুশকিল। ভূত হলে? মুশকিল না। হিন্দি ছবি ভুলভুলাইয়া এক দুই তিন গুলে খাওয়া শহুরে ছেলেগুলো যে যার মতো ভয়ের চর্চা করতে শুরু করে। দুজন খানিকটা মাথা খাটিয়ে সূত্র খোঁজে। আজিজ চেয়ারম্যান সরকারি ভাতা নিজের লোকদের খাওয়াতে যারে তারে সার্টিফিকেট দিত। ছখিনার কাহিনির সারসংক্ষেপ খুব সহজ। ওরা বলল, বাঁচা মানষিরে মরা বানায়ে দিয়ে চেয়ারম্যান টাকা মাইরে খাইছে।
ব্যাপারটা এতক্ষণে জাগতিক সমস্যার আকার ধারণ করায় ভৌতিক চাদরখানা ভাঁজ করে দেরাজে তুলে রেখে আরমান বন্ধুদের নিয়ে বের হলো। মেয়ে দুটিকে ঢাকার পথে বিদায় জানিয়ে পার্টি অফিসে গিয়ে ব্যস্ততার রেসে নেমে পড়ল সদলবলে। দেশ গড়ার সংগ্রামে সাথী ও বন্ধুদের উজ্জীবিত করতে তরুণ নেতা জমশেদ আরমানের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ছে দিকে দিকে। বিকেলে এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ছখিনাকে টেনে এনে বলল, অতীতে অনেক দুর্নীতি হয়েছে, অন্যায় হয়েছে। জ্যান্ত ছখিনা বিবিকে মরা বানিয়ে ভাতার টাকা তছরুপ করা হয়েছে। বাংলার মাটিতে এসব আর চলবে না। ছখিনা বিবিকে ক্ষতিপূরণসহ ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিতেই তুমুল হাততালির সঙ্গে সঙ্গে স্লোগান দিতে থাকল বন্ধু ও সাথীরা। জমশেদ আরমান জিন্দাবাদ!
এরপরই এক সাংবাদিক প্রশ্ন ছুড়ে দিল, ছখিনা বিবি কি বেঁচে আছেন?
কী জ্বালা! এই প্রশ্নের জবাব জমশেদ আরমান কেন দেবে? যান না আজিজ চেয়ারম্যানের কাছে। তার কাছে জানতে চান, ছখিনা বিবি মরে গেছে না বেঁচে আছে? জানতে চান, যখন ছখিনা বিবি বেঁচে থাকতে কোন কারণে চেয়ারম্যান তাকে মৃত ঘোষণা করেছিল। পলাতক আজিজ চেয়ারম্যানকে খুঁজে বের করুন। গণমাধ্যম আছে কী করতে? খুঁজে বের করুন ছখিনা বিবিকে।
সাংবাদিক নিজের পশ্চাদ্দেশ চেয়ারে শক্ত করে চেপে চুপ করে যায়। আগামীকালের পত্রিকায় যে খবরটি এক্সক্লুসিভ করা হবে, তার খসড়া সাজাতে থাকে মনের পাতায়। মোবাইলের কি-বোর্ডে ঝড় তোলার সময় লিখে ফেলে ছখিনার বিবির মর্মস্পর্শী কাহিনি। গরিব বৃদ্ধা ছখিনা বিবি বয়স্ক ভাতা পেতেন মোবাইলে। হঠাৎ সেই ভাতা আসা বন্ধ হয়ে গেলে বিপদে পড়েন অসহায় বিধবা। নাতিকে নিয়ে উপজেলা সমাজ সেবা কার্যালয়ে যান। জানতে পারেন, তালিকায় তার নাম নেই। চেয়ারম্যান আগের তালিকায় থাকা ছখিনা বিবিকে মৃত বলে লিখে দিয়েছে। চেয়ারম্যান ছখিনা বিবিকে জীবিত বলে লিখিত না দেওয়া পর্যন্ত সমাজ সেবা কর্মকর্তার কিছু করার নেই। এরপর ছখিনা বিবি বারংবার উপজেলা পরিষদে গেছেন। চেয়ারম্যানের দেখা পেতে তাকে ২৭ বার যেতে হয়েছে। ইউপি চেয়ারম্যান ও তার চ্যালা চামুণ্ডাদের, উপজেলা চেয়ারম্যানের চ্যালা চামুন্ডাদের চাপানি খাওয়ার পয়সা দিতে ভিক্ষে পর্যন্ত করেছেন তিনি। এসব ঘটনায় শারীরিক পরিশ্রম ও মানসিক হয়রানির পাশাপাশি দরিদ্র বৃদ্ধার অর্থনৈতিক ক্ষতি কতটা, তার পরিমাপ করা জরুরি। এসব বিষয়ে উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আগে যিনি ছিলেন তিনি বদলি হয়ে চলে যাওয়ার পর তিনি সম্প্রতি যোগদান করেছেন বলে বিষয়টি তার জানা নেই। তিনি খোঁজ নিয়ে দেখবেন। ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান শওকত আলী পলাতক বলে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। উপজেলা চেয়ারম্যান আজিজ হাওলাদারও পলাতক বিধায় তার বক্তব্যও জানা গেল না। আর ছখিনা বিবির সন্ধানে বের হয়ে দেখা মিলেছে অসংখ্য ছখিনা বিবির। প্রত্যেকেই নিজেকে ছখিনা বিবি বলে দাবি করছে, ক্ষতিপূরণ চাইছে। এমনকি বয়সে তরুণ এবং তরুণী কেউ কেউ নিজেদের ছখিনা বিবির প্রকৃত ওয়ারিশ দাবি করে বাড়ির উঠানে ছখিনা বিবির কবর খুঁড়ে কঙ্কালও দেখিয়েছে। জনগণ আশু বিষয়টির মীমাংসা চায়। প্রকৃত ছখিনা বিবি ন্যায়বিচার পাবেন, এই দাবি এখন গণমানুষের।
খবরটি পত্রিকার পাতায় এসেছিল। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও শেয়ার হয়েছে প্রচুর। এরপর বিষয়টা জমশেদ আরমান আর ওর বন্ধুদের নজরে এসেছিল, নজরে এসেছিল বলেই কি রাতের ঘুমে ছখিনা বিবি কল্পনা হয়ে ফিরে এসেছিল, নাকি সংবাদ সম্মেলনের পরদিন খবরটি পত্রিকায় এসেছিল? এই গোলকধাঁধা আরমানের আর ওর বন্ধুদের মাথার ভেতর তালগোল পাকিয়ে দেয়, বিশেষ করে নেশা জমে গেলে অথবা নেশাকে জমানোর জন্য তালগোল পাকাতে আরমান আর ওর বন্ধুদের ভালোই লাগে। তখন ওরা উচ্চমার্গীয় আলাপে ছখিনা বিবিকে শ্রোডিঙারের বেড়ালের মতো বাঁচা অথচ মরা অথবা মরা অথচ বাঁচা অবস্থানে ফেলে দেয়।
এখানেই বিষয়টির সমাপ্তি হতে পারে। ছখিনা বিবি এবস্ট্রাক্ট আর্টের মতো কল্পনায় থেকে যাবে হয়তো। অথবা ছখিনা বিবির সত্যি সত্যি বেঁচে থাকার সংগ্রামটি উঠে আসতে পারে। ছখিনা বিবি সত্যি সত্যি বেঁচে থাকতে পারে। পারে কেন, ছখিনা বিবি সত্যিই হয়তো বেঁচে আছে। কোনো এক নতুন সকালে ছখিনা বিবি তার চারকোলে টানটোন শরীরটাকে সোজা রেখে দুই হাত ছড়িয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বলবে, আমি কলাম বাঁইচে আছি!