এমন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি আগে কখনোই ঘটেনি শাহতাবের মন ও শরীরে! এ যেন আগুনকে ভালোবেসে তারই শিকার হওয়ার যুদ্ধ; অথচ, কী আশ্চর্য, এর মাঝেও সুখপাখি উড়ে বেড়ায়! সবেমাত্র কলেজে যেতে শুরু করেছে শাহতাব, গোফে ও মুখে নবীন চুল দেখা দিয়েছে। তার মধ্যে মনের উথালপাতাল তাকে প্রতি মুহূর্তে কাঁপিয়ে দিচ্ছে।
চৈত্রের শেষ সন্ধ্যা- উৎকট ভ্যাপসা গরম পড়েছে। বাতাস বন্ধ হওয়ায় আবহাওয়াটাও গুমোট। ঘর থেকে বাইরে বেরোতেই শাহতাব দেখে, মা দাঁড়িয়ে আছেন। বললেন, ‘আয়, আমাদের সঙ্গে আয়, সবাই আঙিনায় গিয়ে বসি, যা গরম পড়েছে!’
‘না, তোমরা বস, আমি রাস্তায় একা একা হাঁটব।’
‘বলিস কী, এই অন্ধকারে-!’ মা উৎকণ্ঠা নিয়ে বললেন।
কিন্তু শাহতাব দাঁড়ায় না। ঘর থেকে বেরিয়ে প্রথমে সে বাড়ির সামনের পুকুরপাড়ে যায়। গরম বলে অনেকেই ঘাটে জড়ো হয়েছে। পুরোনো শানবাঁধানো ঘাট। দু-তিন জায়গায় ফাটল ধরেছে। ফাঁটলগুলোয় কিছু লতাগুল্ম জন্ম নিয়েছে। ফাঁটলের ভেতরে পোকামাকড় থাকাও অস্বাভাবিক কিছু নয়। এ রকম পুরোনো পুকুরঘাটে বিষাক্ত সাপ-বিচ্চুরা ঘাপটি মেরে থাকে। তবু গরমের দিনে সন্ধ্যা হলেই লোকজন ঘাটটায় এসে বসে। অর্ধাঙ্গ উদোম করে গামছা দুলিয়ে বাতাস খায়। গল্পগুজব করে।
কিন্তু শাহতাবের বসতে ইচ্ছে হলো না। পুকুরের পাড় ধরে লম্বালম্বি হাঁটতে হাঁটতে সে গাঁয়ের উত্তর মাথায় চলে যায়।
মাগরেবের নামাজ পড়ে অনেকেই তখন মসজিদ থেকে ফিরতে শুরু করেছে। গরমে অতিষ্ঠ মুসল্লিদের পাঞ্জাবি-গেঞ্জি ভিজে গেছে। বছর কয়েক আগে একটি হাফেজি মাদ্রাসা খোলা হয়েছে গ্রামে। নবীন তালবে এলেমরা মসজিদ থেকে বেরিয়ে দ্রুত রাস্তায় নেমেছে। টুপি ও পাঞ্জাবি খুলে বেশির ভাগই উদোম হয়েছে। কেউ কেউ লাফিয়ে সামনের ডোবাটায় ডুব দিচ্ছে। ইমাম সাহেব কিংবা হুজুর ধারেকাছে নেই বলে পিচ্চি নামাজিদের আনন্দের সীমা নেই।
‘শাহতাব মিয়া নাকি, যাও কই?’ কে একজন বয়স্ক মুরুব্বি তাকে চিনতে পারে। গ্রামের প্রতিটি মানুষ তার পরিচিতি, তবু ডাকটা শুনে শাহতাব চমকে ওঠে, বলে-
‘না, এমনি- গরম তো তাই হাঁটি।’
লোকটি গামছা দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বিড়বিড় করে বলতে থাকে, ‘যা গরম রে বাবা; যাও, হাঁটো, দেখো সাপ-বিচ্চুর ওপর পাও দিও না আবার।’
লোকটা চলে গেলে শাহতাবের শরীর থেকে আগের চাইতেও বেশি ঘাম ঝরতে থাকে। খোলা পায়ে যখন দূর্বা ঘাসের ছোঁয়া লাগে, তখন অদ্ভুত এক অনুভূতির জন্ম হয়- শরীর কেঁপে ওঠে। বাতাসেরা শরীর ছুঁয়ে দিতেই কেন যেন লজ্জা ও ভয় মেশানো অনুভূতি আসে।
সাপ বা বিষাক্ত সরীসৃপের ভয় যতই থাক কিন্তু তা থমকে দিতে পারল না শাহতাবকে। জীবননাশের ভয় মানুষের কাছে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়, কিন্তু সে মানুষ যখন আবিষ্কারের নেশায় মত্ত হয়, তখন সব ভয় উবে যায়। শাহতাব কি আজ কিছু আবিষ্কার করতে পথে নেমেছে? নাকি অন্য কিছু?
খানিকটা হেঁটে উত্তরপাড়ার নির্দিষ্ট বাড়িটার দিকে তাকিয়ে থাকে শাহতাব। ওই বাড়িটায় তার জীবনের এক অসীম গোপনীয়তা লুকিয়ে আছে- যাকে আবিষ্কার করতে চায় সে। আর তা করতে ব্যর্থ হলে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে সে মারা যেতে পারে, চলন্ত গাড়ির ধাক্কা খেয়ে স্মৃতিভ্রম হতে পারে- এ রকমই একটি অনুভূতি জন্ম নেয় ওর মধ্যে।
দেখতে দেখতে অন্ধকার হয়ে আসে। জঙ্গলের কীটপতঙ্গরা চারদিকে ডেকে যাচ্ছে। দূর থেকে বাড়িটার ভিতরে হারিকেনের আলো দেখা যায়। সূর্যমুখী ফুলের মতো মাথা উঁচু করে টিনের ফুঁটো দিয়ে আলো বেরিয়ে আসছে অন্ধকার ভেদ করা আলো। গরম ঠেকাতে বাড়ির আঙিনায় গোল হয়ে বসেছে একদল নারী। কম বয়স্কদের হাত থেকে রেশমি চুড়ির আওয়াজ কানে আসে। তালপাতার পাখা চালানোর শব্দ পাওয়া যায় মাঝেমধ্যে। আঙিনাটা খুব কাছে নয়। কিন্তু এর পরও শাহতাবের শরীরটা কেঁপে ওঠে। বুকটা ধরফর করতে থাকে। কখনো ভয় আবার কখনো সেই ভয়কে জয় করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রবল জেদ আঁকড়ে ধরে।
আর কয়েক মাসের মধ্যে সে উনিশে পড়বে। এমন বর্ণনারহিত কষ্ট, সুখ কিংবা উত্তেজনার অনুভূতি আজই তার জীবনে প্রথম। সে বুঝতে পারে না, সে অনুভূতি সুখ না কষ্টের। রক্তের মধ্যে তোলপাড় করে দিচ্ছে একটি ঝড়, যার সঙ্গে মিশে আছে লজ্জা, যা কাউকে সে বলতে পারে না, এমনকি নিজেকে পর্যন্ত নয়!
বিকেল থেকেই কিছু একটা ঘটে চলেছে শাহতাবের মন ও শরীরে। কাউকে কিছু বলতে পারে না- সইতে পারে না। বিকেলে যে মেয়েটিকে দেখেছিল, কিছুক্ষণের জন্য, তাকে সে আরেকবার দেখতে চায়। কিন্তু সম্ভব হয় না। বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে সে ফিরে আসে বাড়িতে। রাতে তার খেতে ইচ্ছে করে না। গরমে রুচি নেই ভেবে মা খুব একটা জেদও করেন না। শাহতাব এক সময় বিছানায় যায়। ভয় পেত বলে ঘুমোতে যাওয়ার আগে আলো জ্বালিয়ে শুতো। কিন্তু আজ তার মনে হয় অন্ধকার ভালো। শাহতাব ঘুমাতে চেষ্টা করে কিন্তু পারে না। শুধু একটি মুখ ভেসে ওঠে মনের পর্দায়, উত্তরপাড়ার সেই মেয়েটিকে একবার দেখতে ইচ্ছে করে। ওর সামনাসামনি হতে ইচ্ছে করে। ওর কী নাম তা সে ভালো করে জানে না। জেরিন, হবে হয়তো। স্কুলের ফাইনাল দিয়ে বোনের বাড়িতে বেড়াতে এসেছে। বিকেলেই পরিচয়। একদল মেয়ের মধ্যে ভীষণ আলাদা মনে হয়েছিল ওকে। পাহাড়চূড়ার ভাঁজের মতো ঢেউ খেলানো চুল। সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো সর্বাঙ্গ আলিঙ্গন করা গভীর চোখ। ওই চোখের দিকে একবার তাকাতেই সবকিছু ওলটপালট হয়ে যায় শাহতাবের।
জেরিনের পাগুলো, দৌড়ঝাঁপ করার সময় যতটা দেখেছে, তরতর বেড়ে ওঠা পুকুরপাড়ের অনূরা কলাগাছের মতো। যৌবনের আলাদা রং থাকে- তা সে মানুষ হোক কিংবা অন্য প্রাণী- যা কেবলই বিপরীত লিঙ্গের চোখে আবিষ্কারের বিষয়- অন্য কারও নয়। জেরিন যখন হাঁটে, মনে হয়, সে নাচছে এবং শাহতাবের দিকে তাকিয়ে, হাত বাড়িয়ে বলছে, হাত ধর আমার, দূরে কেন, কাছে এসো, চল দুজনে মিলে নাচি!
ওর ঠোঁটে কি লিপস্টিক ছিল? না। লিপস্টিক লাগালে সবাইকে এক রকম মনে হয়। কিন্তু জেরিন আলাদা। টুনু আপার চেয়ে আলাদা, ভাবীর চেয়ে আলাদা, মার চেয়ে আলাদা, বোনের চেয়ে আলাদা; নদী, ঝরনা ও পাহাড়ের চেয়ে আলাদা!
বিছানায় একা একা শুয়ে ঘুমহীন শাহতাবের ভেতরটা বারবার কেঁপে ওঠে। এ কীসের ভয়? গরম বলে ঘরের বেশির ভাগ লোক বেশ রাত করে শুয়েছে। কেউ কেউ ঘুমিয়েও গেছে। নাক ডাকার শব্দ শোনা যাচ্ছে কিছু কিছু বাড়ি থেকে। তবুও এক নিস্তব্ধতা গ্রাস করছে চারদিক। শাহতাব ভাবতে থাকে, জেরিন কি ওরই মতো বিছানায় শুয়ে আছে? একা একা? নাকি জেগে আছে?
অদ্ভুত চোখে তাকিয়েছিল জেরিন! হাসতে হাসতে বলেছিল- ‘আপনি খুব জোরে হাঁটেন, জোরে কথা বলেন, জোরে সাইকেল চালান। কেন, বলেন তো?’
‘আমি গতি পছন্দ করি। আস্তে চলতে, আস্তে কথা বলতে আমার ভালো লাগে না। আস্তে, ধীরে এসব আমার অভিধানে নেই।’
‘তাই নাকি?’
‘হ্যাঁ তাই। কিন্তু তুমিও তো হরিণের মতো, ছুটে চল, চোখগুলো দূরবীনের মতো। এত দ্রুত তাকাও কী করে?’
জেরিন হঠাৎ ফেঁকাসে হয়ে ওঠে- কিন্তু হেসে দেয়। হাসলে ওর বাম গালের মাঝামাঝি জায়গাটার টোল পড়ে। ঠিক যেন নদীর স্রোতের পাকে নিম্নমুখী পানি, শিল্পীর ব্রাশে আঁকা সমুদ্রের অতলান্তে হারিয়ে যাওয়ার সিঁড়ি। শাহতাব ওই সিঁড়ির দিকে তাকায়, কয়েকবার, কিন্তু বেশিক্ষণ তাকানো যায় না। মেয়েটি আরও কিছু বলতে চেষ্টা করে- অস্পষ্ট। বোঝা যায় ওর বুকটা ওঠানামা করছে। চোখদুটি এদিক-ওদিক ঘুরছে। ভ্রুগুলো বানরের মতো চঞ্চল। পনেরো বছরের মেয়েটি উনিশ বছরের একটি ছেলের সামনে দাঁড়িয়ে এই প্রথম যৌবনের জয়গান করছে। ওর ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছে।
এক সময় কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় দুজনের। শাহতাব ও জেরিন নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে নতুন ফল ধরা কাঁঠাল গাছটির তলে। বিকেল গড়িয়েছে কিন্তু সন্ধ্যা হয়নি তখনো। একটু আগেই বাতাস বন্ধ হয়েছে। চৈত্রের শেষ দিন। আগামীকাল বৈশাখ- নতুন বছর আসবে। মেলা বসবে, এলাকার দোকানগুলোয় হালখাতা হবে। কিন্তু এভাবে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না- যদি কেউ দেখে ফেলে! ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে ওঠে ওরা। এর পরও কেউ সরতে পারে না- ইচ্ছের কাছে দাঁড়াতে পারে না। ইস আরও একটু বেশি যদি থাকা যেত!
‘আমি কালই চলে যাব। আমাদের বাড়িতে আসবেন?’
‘আমি তো তোমাদের বাড়ি চিনি না।’
‘আমাদের বাড়ি, ব্রহ্মপুত্রটা পার হয়েই যে চর, সবাই চেনে, ওখানে। যাওয়ার ইচ্ছে থাকলেই পারবেন।’
বিছানায় শুয়ে শাহতাবের আরও অনেক কিছু মনে পড়ছে। ঘুম আসছে না। এক সময় মা ঘরে ঢুকে মশারি তুলে মাথায় হাত রাখলেন। বললেন, ‘কী রে- তুই এখনো ঘুমাসনি, আলো নিভিয়েছিস কেন?’
শাহতাব কোনো উত্তর দেয় না। মা চলে যেতেই জেরিনের মুখটা আবার ঘরের দেয়াল, মশারির জাল ভেদ করে ঠিক ওর মুখের ওপর চলে আসে। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা- নিষিদ্ধ কষ্টের সুখ। জীবনের সবগুলো স্মৃতি আজ ধসে যাচ্ছে এক অচেনা মেয়ের সঙ্গে দুদণ্ড কথা বলে। শরীরের রক্তগুলো তোলপাড় করে উঠছে, গা কাঁটা দিচ্ছে। কখনো ভয় করছে, কখনো বুকের ভেতরটা সাহসের ডিঙিতে যেদিকে ইচ্ছে হয় ছুটছে। কেন এমন হয় ? কই আগে তো কখনো এ রকম হয়নি!
একবার এক বড় মামাতো বোনের সঙ্গে এক বিছানায় শুয়েছিল শাহতাব। বেশ কয়েক বছর আগের ঘটনা। এইট কী নাইনে পড়ে তখন। বোনটি তার চেয়ে কম করে হলেও তিন-চার বছরের বড়। শীতের রাত বলে লেপের নিচে জড়াজড়ি করে শোয়াটাই স্বাভাবিক ছিল। টুনু আপার সঙ্গে আগেও অনেকবার শুয়েছে। আগেও টুনু আপা তাকে কতবার চুমো খেয়েছে। কিন্তু সে রাতের মতো অদ্ভুত অভিজ্ঞতা একবারও হয়নি। রাত তখন কত সে বলতে পারে না। হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। বুঝতে পারে টুনু আপা তার উদাম বুকে শক্তি দিয়ে টেনে নিচ্ছে। জামাকাপড় ভেদ করে ওর হাত তার শরীর হাতড়ে এদিক-ওদিক নাড়াচাড়া করছে। টুনু আপা তার শরীরের ওপর উলঙ্গ পা তুলে দিচ্ছে। পাগলের মতো চুমো খাচ্ছে। কিন্তু মুখে কিছুই বলছে না।
আরও খানিকক্ষণ পর সে লক্ষ্য করল টুনু আপা তার হাফপেন্টের বোতাম খুলছে। তার যৌনাঙ্গে হাত রাখছে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পাচ্ছে সে। প্রথম দিকে আধাঘুমের মধ্যে এক ধরনের সুখ, কিংবা সুখের মতো কী এক অদ্ভুত অনুভূতি টের পাচ্ছিল শাহতাব। সে অনুভূতি ছিল শরীরের যাতে মন ছিল না। কিন্তু মামাতো বোনের শরীর তাকে পুড়োপুড়ি দখল করে নেওয়ার পর একটি বড় ধরনের ভয় ও লজ্জা তাকে গ্রাস করতে থাকে। টুনু আপাকে তার ভীষণ খারাপ মনে হতে থাকে। কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারে না। সে লাফিয়ে বিছানা থেকে উঠে নিচে নেমে যায়।
কিন্তু আজ রাতের অনুভূতিটা একেবারে অন্যরকম। আজ তার শরীরের সঙ্গে মন ঘর বেঁধেছে। এ ঘর নিজের। জেরিনকে পাশে বসিয়ে সে গাঙপাড়ের লাল-নীল-সাদা পাখি উড়তে দেখে- শত শত। ওই পাখিরা এত সুন্দর রং-বেরঙের যে ওগুলোকে তার ধরতে ইচ্ছে করে, ওদের পাঁপড়ি দিয়ে নিজেদের সাজাতে ইচ্ছে করে।
মন শরীরের মধ্যে থাকে না মনের মধ্যে শরীর? কোনটা আগে? এসব প্রশ্নের উত্তর জানে না শাহতাব। শুধু বুঝতে পারে, সে কেঁপে উঠছে, ঘেমে উঠছে। কেউ যেন তাকে বড়ই গাছের কাঁটা দিয়ে হানছে, একের পর এক। কিন্তু এর পরও সে কষ্ট ভালো লাগে, সুখের মনে হয়! একে কি প্রেম বলে? ভালোবাসা বলে? ভালোবাসার অনুরণন কি এ রকম হয়?
এরই মধ্যে হৃদয়ের ক্ষতস্থানগুলো থেকে বিন্দু বিন্দু ঘাম ঝরে পড়ছে। অদ্ভুত সেই যন্ত্রণার গহিন এক মোহ আছে। বিছানার চাদর আর বালিশটাকে দুমড়ে-মুচড়ে বুকের তলায় ফেলছে শাহতাব। অনেক বছর পর আবার টুনু আপার উদাম বুকের কথা মনে পড়ছে। টুনু আপার বিয়ে হয়েছে। বিয়েতে সেও গিয়েছিল। তাকে দেখে টুনু আপা হেসে বলেছে, ‘অনেকদিন পর তোকে দেখলাম। তোর বিয়েতে আমাকে কিন্তু আনবি, তোর বউ দেখাবি, ভুল যেন না হয়?’
একদিন টুনু আপাকে খারাপ মনে হলেও আজ খারাপ মনে হয় না। টুনু আপা একদিন তাকে একটি নতুন ভাষা বোঝাতে চেয়েছিল- যা সে বোঝেনি। সেই একই ভাষা কি আজ নিজের মধ্যে তৈরি হচ্ছে!
নির্ঘুম রাত কেটে যায়- পরদিন ভোরবেলা। ঘুম থেকে উঠেই উত্তরপাড়ার বাড়িটার সামনে বারকয়েক ঘোরাঘুরি করল শাহতাব। নারী-পুরুষের সম্পর্কের প্রথম উপলব্ধি তার বুকের মধ্যে। একটি মেয়েকে ভালোলাগার প্রয়োজন ও দংশন সেই কেবল বুঝতে পারে। এ প্রয়োজন ও দংশন জীবনের সব প্রয়োজন থেকে আলাদা। আঠারো পেরিয়ে উনিশে পড়া এক বালকের শরীরে, মস্তিষ্কে এবং শিরা-উপশিরায় গতরাতে যে ঝড় বয়ে গেছে- সে ঝড় তার মন ও শরীরের সঙ্গম উপলব্ধির, যা তাকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের বিশ্বে পদার্পিত করেছে। শাহতাব সে কারণেই নিজেকে আজ নতুন নামে ডাকতে পারে।
গতকালও একটি কাঁঠাল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল শাহতাব। উত্তরপাড়ার বাড়িটা কাছেই- সামনেই। জেরিন কি জানবে, এই ভোরবেলায় ওকে একনজর দেখতে শাহতাব আবার দাঁড়িয়ে আছে? গ্রামের কেউ কেউ গরু ও লাঙল নিয়ে মাঠে যাচ্ছে। দিনমজুররা কাস্তে ও নিড়ানি হাতে দ্রুত পায়ে হেঁটে চলেছে। ১০টার দিকে শাহতাবকেও যেতে হবে কলেজে। সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, অতএব সে অস্থির হয়ে ওঠে। যেতে হবে জেনেও গাছতলা থেকে পা সরাতে পারে না।
হঠাৎ ছোট্ট একটি মেয়ে দৌড়ে আসে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে হাতে একটি কাগজ গুঁজে দিয়ে সে ছুটে চলে যায়। ছোট্ট একটি চিঠি, হাতে নিতেই অস্থির করা আরেক ভয় জাপটে ধরে শাহতাবকে। কী লেখা আছে, কে লিখেছে, কাকে লিখেছে- এসবের কিছুই ভাববার অবকাশ পায় না সে। চিরকুটটিকে হাতের আঙুলে মুড়িয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
বাড়িতে ঢুকেই ঘরের দরোজা বন্ধ করে দেয় শাহতাব। দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজটি খুলতে ওর সাহস হয় না। শরীর ভয়ংকরভাবে কাঁপতে থাকে। জীবনের প্রথম প্রেমপত্র হাতে তার। বিস্ময়কর অমূল্য এক সম্পদ অথচ কী শ্বাসরুদ্ধকর যন্ত্রণার! কোথায় রাখবে? কেউ যদি দেখে ফেলে! দরজার খিলটা ঠিকমতো লাগানো আছে কি না- পরখ করে আসে শাহতাব। না, ঠিক আছে, কেউ ঢুকতে পারবে না। একবার নিঃশ্বাস বন্ধ করে শাহতাব, চোখগুলো বড় হয়ে ওঠে, দুমড়ানো-মুচড়ানো কাগজটাকে চোখের সামনে মেলে ধরে।
‘...কাল সারা রাত আমার ঘুম হয়নি। আপনার কি হয়েছে? আজ বৈশাখের প্রথম দিন। আপা-দুলাভাই বললেন, এই দিনে ঝড় হয়। কিন্তু ওরা জানে না আমি কত বড় ঝড়ের মধ্যে আছি। ওদের বলেছি, আমি ঝড়কে ভয় পাই না- হলে হোক।... আপনাকে খুব দেখতে ইচ্ছে করে। কেন করে- তা জানি না। আসবেন আমাদের বাড়ি- অবশ্যই আসবেন ইতি। জেরিন।...’
চিঠিটা পড়ার পর শরীর অবস হয়ে আসে শাহতাবের। নিজেকে পরাজিত মনে হয়। মনে হয় জেরিন তার চেয়ে অনেক বড়। এ সময় তার স্বক্রোধ প্রশ্ন জাগে, কেন যাবে জেরিন এ গ্রাম ছেড়ে? কেন আরও অনেক দিন থাকবে না সে ? ওর বোন আর দুলাভাইকে মুহূর্তের মধ্যে ভয়ানক অমানুষ, নির্দয় মনে হয়। উত্তেজনায় রক্তাক্ত হয়ে ওঠে সে। এরপর স্থির করে, সে ঠেকাবে- যে করেই হোক। কিছুতেই ওকে যেতে দেবে না।
এর মধ্যে মা আর ছোট ভাইবোনেরা বার-কয়েক দরজায় টোকা দেয়। বাইরে থেকে মা চেঁচিয়ে বলেন, ‘কী হলোরে তোর! দরজা খোল দেখি।’
দ্রুত চিঠিটাকে লুকিয়ে রাখে শাহতাব। তার পর বাইরে বেরোয়। কারও সঙ্গে কথা বলে না। সবার অদৃশ্যে নৃত্য করতে করতে এক আনন্দপরী এসে ভর করে তার ওপর। সবার অলক্ষে, সবার অগোচোরে সেই আনন্দপরী তার উঠন্ত শরীরের প্রতিটি অঙ্গে চুমো খাচ্ছে। কখনো মনে হয়- ফুলবাগানে ঘুরে বেড়াচ্ছে সে আর জেরিন, আবার মনে হয় দরজা দেওয়া ঘরে মশারির নিচে সে আর জেরিন একজন আরেকজনের দিকে তাকিয়ে আছে; আরও দেখে, এক পাল সাদা হাঁস লাল শাপলার পাতা উল্টে শামুক খাচ্ছে বিলের পানিতে। বকন বাছুরটার লেজে নাক দিয়ে ঘ্রাণ নিচ্ছে মর্দা গরুটা। ভেতর থেকে অজানা এক যন্ত্রণায় ফুঁসে ওঠে শাহতাবের রক্ত।
হঠাৎ ঝোড়ো বাতাস শুরু হয়। পয়লা বৈশাখে প্রায়সই ঝড় হয়। ঘরবাড়ি ভাঙে, গাছপালা মুচড়ে দেয়। কিন্তু সেদিনের ঝড়টি বড় অদ্ভুত। প্রথমে এক-দুবার দমকা হাওয়া- শন শন- তার পর ক্ষণিকের জন্য স্তব্ধ। এর পর আবারও। ভাইবোনেরা বাইরে থেকে দৌড়ে এসে দরজা পেটাতে থাকে।
‘ভাইজান, দরজা-জানালা সব বন্ধ কর, কালবোশেখি শুরু হয়েছে। আজ যে পয়লা বৈশাখ- জানো না?’
ঝড়ের মধ্যেই ঘর থেকে বেরোয় শাহতাব। বাতাস তাকে তাড়া করে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা ও শিলা শরীরে চাবুক মারে। দ্রুত পা ফেলে সে এগিয়ে যায় উত্তরপাড়ার সেই কাঁঠাল গাছটির তলায়। সবাই যার যার ঘরে ঢুকেছে নিরাপদে থাকবে বলে। কিন্তু শাহতাব দাঁড়িয়ে আছে সেই কাঁঠাল গাছটির তলায়। সে এক পলকে তাকিয়ে আছে নির্দিষ্ট বাড়িটার দিকে। জেরিনকে দেখার অন্তহীন চোখ তার। এই ঝোড়ো বাতাস আর প্রথম বৈশাখী বৃষ্টির মতো কি ওদের মিলন হবে? এই কাঁঠাল তলায়? ওরা কি ঝড় ঠেলে, প্রলয় ঠেলে দুজনে হাত ধরাধরি করে সবার অলক্ষ্যে অন্য কোথাও চলে যেতে পারবে?
আরও খানিকক্ষণ পর প্রকৃতি তার প্রবল আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে নদীবাহিত অঞ্চলটিতে। প্রথম দিকে খড়ের ঢিবিগুলো উড়িয়ে নেয়। গাছের পাতা ও কচি ডালগুলোর কাণ্ড ছিঁড়ে ফেলে। তার পর হালকা বাঁশের চাপে বেঁধে রাখা টিনের দোচালা ঘরগুলোকে মুচড়ে-দুমড়ে ধ্বংস করে দিতে থাকে। কিন্তু আঠারো পেরিয়ে উনিশে পড়া শাহতাব এক পা-ও তার জায়গা থেকে নড়ে না। জেরিনকে সে একবার দেখবেই। অদ্ভুত কাণ্ডজ্ঞানহীন এক নেশায় পেয়ে বসে ওকে, যা থেকে সে নিজেকে মুক্ত করতে পারে না।
হঠাৎ মাঝারি একটি ডাল কাণ্ডচ্যুত হয়ে প্রথমে শাহতাবের ঘারে এবং পরে মাথায় এসে আঘাত করে। ফিনকি দিয়ে রক্ত বেরোয়। বাতাস ও বৃষ্টির যৌথ স্রোতে লাল রক্তগুলো ওর সাদা শার্ট চুয়ে, চোখের কোনা বেয়ে, বাহু গড়িয়ে, বুক, কোমর, যৌনাঙ্গ এবং পা পর্যন্ত ছুঁয়ে মাটিতে মিশতে থাকে। প্রথমে মাথাটা ঘুরে ওঠে- সবকিছু অন্ধকার মনে হয়। এরপরও অদ্ভুত, একরোখা এক শক্তি তাকে ঠিক আগের জায়গায় টিকিয়ে রাখে। শাহতাবের প্রথম প্রেমের রক্তধারা- যৌবনের প্রথম প্রলয়ের সাক্ষী।
ঝড় থেমে যায় এক সময়। বুক পকেটে রাখা চিঠিটাকে কিছুতেই আর দ্বিতীয়বার পড়া যায় না। পানিতে ভিজে লেখাগুলো ক্ষয়ে গেছে। একমাত্র জেরিন এবং শাহতাব ছাড়া কেউ কখনো জানবে না এক বৈশাখের পয়লা দিনে কী এক বিস্ময়কর প্রলয় ঘটেছিল তাদের জীবনে।